কোটি টাকা খরচ, ফলাফল শূন্য!

PinakOvijan2পদ্মায় লঞ্চ ডুবি
দীর্ঘ আটটাদিন দেশের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও পদ্মায় ডুবে যাওয়া যাত্রীবাহী লঞ্চ পিনাক-৬ উদ্ধার কাজে সফল হতে পারেননি সংশ্লিষ্টরা।

বরং উদ্ধার তৎপরতার শুরু থেকে স্থানীয় ও নিখোঁজ যাত্রীর স্বজনদের যে শঙ্কা ও অভিযোগ ছিল, তাই-ই সত্যে পরিণত হয়েছে।

প্রায় এক কোটি টাকার বেশি খরচ হওয়ার পরে অভিযান বন্ধ করে দেওয়ায় ফলাফল এসে দাঁড়িয়েছে শূন্যে।

এদিকে, উদ্ধ‍ার অভিযান সফল হতে না পারায় সমন্বয়হীনতাই প্রধান কারণ হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই। আর নাম গোপন রাখার শর্তে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্ত‍ৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, বিআইডব্লিউটিএ পরিচালিত এ অভিযান পুরোটাই ছিল সমন্বয়হীনতায় পরিপূর্ণ। সে কারণে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করেও অভিযান সফল করা সম্ভব হয়নি। অভিযান বন্ধ করায় নিখোঁজ যাত্রীর স্বজনদের পাশাপাশি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নৌপথ বিশেষজ্ঞরাও।
PinakOvijan2
অভিযান প্রসঙ্গে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক আশিষ কুমার দে বাংলানিউজকে অভিযোগ করেন, কাড়ি-কাড়ি টাকা খরচ হওয়ার পরেও লঞ্চটি উদ্ধার না করেই অভিযান বন্ধ করাটা খুবই দুঃখজনক। এরপর দেখা যাবে, যে টাকা খরচ হয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি টাকার হিসাব দেখানো হবে বিআইডব্লিউটিএ’র পক্ষ থেকে।

তিনি বলেন, এ ব্যর্থতার ভার বিআইডব্লিউটিএকেই নিতে হবে। নিরপদ নৌপথ এবং দুর্ঘটনা পরবর্তী কার্যক্রমে এ বিভাগ সম্পূর্ণই ব্যর্থ। বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসব ও দুর্যোগপ্রবণ আবহাওয়ার সময় গুরুত্বপূর্ণ নৌকেন্দ্রে উদ্ধারকারী জাহাজ রাখা উচিত। অথচ এ বিষয়ে তাদের কোনো পরিকল্পনাই ছিল না।

উদ্ধার অভিযান চলার প্রতি মুহূর্তেই অন্তত মরদেহ ফেরৎ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছেন নিহতের স্বজনেরা। সে আশাও আজ থেকে শেষ হয়ে গেল।

ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার সম্রাট তার ভাইয়ের মরদেহ ফেরত পাবেন এ আশায় পথ চেয়েছিলেন। উদ্ধার কার্যক্রম বন্ধ শোনার পর থেকে তিনি আরও ভেঙে পড়েছেন।

বাংলানিউজের সঙ্গে আলাপকালে সম্রাট বলেন, ভাইয়ের মরদেহটা পেলেও কিছুটা সান্ত্বনা পেতাম। কিন্তু, সেই আশাও শেষ হয়ে গেল। তারা (কর্তৃপক্ষ) যদি ভালোভাবে অভিযান চালাতো, তাহলে হয়ত আম‍ার ভাইকে খুঁজে পেতাম।

অভিযান অব্যাহত রাখার জন্য এ সময় জোর দাবি জানান তিনি।

উদ্ধার কার্যক্রমের সার্বিক সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা বিআইডাব্লিউটিএ পরিচালক মো. হোসেন বাংলানিউজকে জানান, লঞ্চটি সম্ভবত পলিতে ঢাকা পড়েছে। সে কারণে কোনোভাবেই আর খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।

৫০ বর্গ মিটার জুড়ে উদ্ধার তৎপরতা চালানো হয়। সব মিলিয়ে প্রায় এক কোটি টাকার মতো খরচ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এ অভিযানে। সরকারের সব বিভাগ ও প্রযুক্তি নিয়ে লঞ্চ উদ্ধারের জন্য এটিই ছিল সবচেয়ে বড় অভিযান।

প্রযুক্তি আর সর্বাত্মক চেষ্টার কথা সংশ্লিষ্টরা বললেও স্থানীয় ও নিখোঁজের স্বজনরা আস্থা রাখতে পারেননি কর্তৃপক্ষের ওপর।

এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও লঞ্চটি উদ্ধারের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টার নির্দেশ দেন। স্থানীয় ও নিখোঁজের আত্মীয়-স্বজন কিছুটা ভরসা পেলেও উদ্ধার কার্যক্রম শেষ পর্যন্ত নিরাশ করে সবাইকে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীদের উদ্ধারে প্রথম এগিয়ে আসেন স্পিডবোটচালক ও স্থানীয়রা।

নৌবাহিনী ক্যাপ্টেন নজরল ইসলাম অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলানিউজকে জানান, ঘ‍ূর্ণায়মান স্রোতের কারণে পানির মধ্যে একটি গর্ত (ঘূর্ণাবর্ত) তৈরি হয়। এই গর্তের মধ্যে ঢুকে যেতে পারে লঞ্চটি।

তিনি বলেন, লঞ্চের দোতলা সাধারণত কাঠ ও লোহার সংমিশ্রণে তৈরি হয়। সে কারণে লঞ্চটি ডোবার সঙ্গে সঙ্গে কাঠ ভেসে গিয়ে লোহা পানিতে ডুবে যেতে পারে। ফলে, লঞ্চটি খুঁজে না পাওয়া যাওয়ার সম্ভাবন‍া থেকে যায়।

মাওয়া ঘাটের স্থানীয় মহসিন আলী অভিযোগ করে বলেন, পদ্মায় এর আগেও অনেক লঞ্চ, স্পিডবোট, ট্রলার ডুবেছে। কিন্তু, বেশির ভাগই উদ্ধার করতে পেরেছেন স্থানীয়রা। অথচ সরকারের এত বড় বড় সব জাহাজ নিয়েও ছোট এই লঞ্চটি উদ্ধার কর‍া যাচ্ছে না, তা মেনে নেওয়া কঠিন।

তিনি দাবি করেন, লঞ্চ পিনাক-৬ ডুবে যাওয়ার পর পরই দ্রুত পদক্ষেপ নিলে লঞ্চটি উদ্ধার সম্ভব হতো।

এদিকে, উদ্ধার কাজে যুক্তরা জানান, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্ত‍ৃপক্ষের (বিআইডাব্লিউটিএ) ‘নির্ভীক’, ‘রুস্তুম’, ‘দ‍ূরন্ত’, ‘দুর্বার’, ‘শৈবাল’, ‘তিস্তা’, ‘তুরাগ’, বদ্বীপ ও পাঁচটি স্পিডবোট অভিযানে ব্যবহার করা হয়। চট্রগ্রাম বন্দরের পক্ষ থেকে জরিপ ১০, কাণ্ডারি-২ নিয়ে আসা হয়।

এছাড়াও নৌবাহিনীর রেসকিউ বোট, পেট্রোল ক্রাফট, ফায়ার সার্ভিসের রেসকিউ বোট ছিল। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, র‌্যাব, কোস্টগার্ড, ফায়ার ব্রিগেড ও সিভিল ডিফেন্স, বিআইডব্লিউটিএ-সহ স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতাও ছিল চোখে পড়ার মতো।

গত ৪ আগস্ট সকাল ১১টার দিকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌপথে পদ্মা নদীতে তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চ পিনাক-৬ মাওয়া ঘাটের একেবারে কাছে এসে ডুবে যায়।

সোমবার দুপুরে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লঞ্চটির উদ্ধার অভিযান বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর