একটি অবশ্যম্ভাবী দুর্ঘটনা!

mawa overloadঢাকার সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের ২৫ জেলার যাতায়াতে গুরুত্বপূর্ণ মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুট। তবে তা সারা দেশের মানুষের মনোযোগের কেন্দ্রে আসেনি কখনো। কিন্তু উৎকণ্ঠিত মানুষের দৃষ্টি এখন বলতে গেলে এই একটি পথেই। মর্মান্তিক লঞ্চডুবিতে শতাধিক মানুষের সলিল সমাধির পর কেন হয়েছে এই পরিণতি, কে দায়ী, কেন এই দুর্ঘটনা রোধ করা যায়নি, সে চিন্তা এখন মানুষের মুখে মুখে।

এই রুটে লঞ্চ পারাপারে ঝুঁকি অজানা ছিল না কারো কাছেই। বর্ষায় উত্তাল পদ্মার বুক চিড়ে চলা ছোট লঞ্চগুলোর আদৌ এই মৌসুমে চলাচলের ক্ষমতা আছে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে দুর্ঘটনার পর। সরকারি নথিপত্রও বলছে এই রুটে চলা ৮১টি লঞ্চের বেশির ভাগই চলার কথা শান্ত নদীতে। অর্থাৎ বর্ষায় নদীতে নামার কথা না লঞ্চগুলোর। তাহলে কীভাবে চলে সেগুলো? যাত্রী এমনকি নৌ-কর্মকর্তাদের একাংশের অভিযোগ সরাসরি সরকারের প্রতি। নজরদারি আর তদারকি নেই। নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীদের নিজেদের উদাসীনতাও কম দায়ী নয় এই পরিণতির জন্য। ভরা বর্ষায় অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে নৌযানে উঠার ঝুঁকি নানা সময় জেনেছে তারা। তবু সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি, এই আপ্তবাণী ভুলে সময় বাঁচাতে বারবার উঠে তারা ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানে।

মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটের দুর্ঘটনা অবশ্যম্ভাবী ছিল কি না, সে বিতর্কও উঠতে পারে সহজেই। কারণ এই রুটে বিপজ্জনক ছোট নৌযানের সতর্কতাহীন চলাচল, উত্তাল নদীতে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ন্ত্রণে নজরদারি না থাকার বিপদ নিয়ে বারবার প্রতিবেদন প্রকাশ এবং প্রচার হয়েছে গণমাধ্যমে। সরকারও নানা সময় জানিয়েছে প্রতিক্রিয়া। ঈদের আগে নৌমন্ত্রী একাধিকবার ছুটে গেছেন দুই ঘাটে। বলেছেন, অতিরিক্ত যাত্রী ঠেকাতে থাকবে কার্যকর ব্যবস্থা। কিন্তু সব চলেছে আগের মতোই। বানের স্রোতের মতো মানুষকে ঠেকানোর কোনো উপায়ই বের করতে পারেনি প্রশাসন।

যে লঞ্চগুলো চলে উত্তাল পদ্মায়
পদ্মায় ডুবে যাওয়া পিনাক-৬ তৈরি হয়েছিল ১৯৯১ সালে। শান্ত পানিতে চলার উপযোগী এই লঞ্চটিতে উঠার কথা সর্বোচ্চ ৮৫ জন। কিন্তু তাতে উঠেছিল তিন গুণেরও বেশি যাত্রী। প্রতিটি লঞ্চে যাত্রীদের নিরাপত্তার যে ব্যবস্থাগুলো থাকার কথা তার কিছুই ছিল না সেটিতে। ফলে লঞ্চটি ডোবার সময় যাত্রীদের একটি বড় অংশই বের হতে পারেনি।

এত দিন ছিল না নজরদারি, মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পরও যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে- সে আশা করাও কঠিন। কারণ শতাধিক মানুষের মৃত্যুর পরও পরিস্থিতি পাল্টায়নি এতটুকু। এখনো চলছে ঝুঁকিপূর্ণ নৌযানগুলো, এখনো সেগুলোতে যাত্রী উঠানো হচ্ছে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত।

দুর্ঘটনার পরদিন মঙ্গলবার মাওয়া ঘাটে গিয়ে সেখানে অবস্থান করতে দেখা গেল লঞ্চ এমভি সাগর পাড়ে, এমভি হাওলাদার এক্সপ্রেস, এম এন বোরহান কবীর, এমভি সৈকত সেতু, এস এন তায়েফ, মকবুল-২ লঞ্চকে। এর প্রতিটির কাঠামোই দেখা গেছে ভাঙাচোরা। বেশ কটি লঞ্চের জানলা খুলে পড়ে গেছে বহুদিন আগেই। একদিকে কাত হয়ে থাকতেও দেখা যায় এগুলোকে।
mawa overload
এর কোনোটিই পিনাক-৬-এর চেয়ে বড় না, বরং কোনো কোনোটি তার চেয়েও ছোট। কাওড়াকান্দি যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছিল যে লঞ্চগুলো তার প্রতিটিতেই যাত্রী সংখ্যা ৮৫ জনের বেশি ওঠার পরও কর্মচারীরা আরো যাত্রীর জন্য ডাকাডাকি করছিল। সে সময় ঘাটে কোনো নিরাপত্তাকর্মীকেই দেখা যায়নি।

এত যাত্রী কেন তুলছেন- একাধিকবার এমন প্রশ্ন করা হলেও লঞ্চের কর্মচারীরা যেন শুনতেই চায়নি সে কথা। তাই জবাব দিল না কেউ।

মাওয়া ঘাট ছাড়ার আগেই প্রায় সবগুলো লঞ্চ যাত্রীতে পরিপূর্ণ হয়ে যেতে দেখা গেল। কাওড়াকান্দি ঘাটে পৌঁছার আগে সেগুলোতে তোলা হবে আরো যাত্রী।

ঘাটের পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন ইজারাদার। সাংবাদিক পরিচয়ে তার কাছেও অতিরিক্ত যাত্রী তোলার কারণ জানতে চাইলে জবাব দেননি তিনিও। পরে ঢাকায় ফিরে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হল মাওয়া ঘাটের ইজারাদার আশরাফ স্বীকার করেন সব কিছু। তিনি বলেন, ঘাটে ঝুঁকিপূর্ণ লঞ্চ আছে ৪০টার মতো। এগুলো এই সপ্তাহের মধ্যেই বাতিল করা হবে।’

এ সময় কাওড়াকান্দি ঘাট থেকে আসতে দেখা গেল আরো বেশ কয়েকটি লঞ্চকে। সেগুলোর প্রতিটিও যাত্রীতে পরিপূর্ণ। কোনোটিতেই যাত্রীসংখ্যা দুই শয়ের কম দেখা গেল না।

দিনভর অপেক্ষা করেও মাওয়া ঘাটে কোনো পুলিশ সদস্যকে দেখা যায়নি। সন্ধ্যার পর আসতে দেখা গেল কয়েকজনকে।

এ সময় মাওয়া নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক খন্দকার খালিদ হোসেনের কাছে এতসব অনিয়মের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, আমাদের ঘাট থেকে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে লঞ্চে ওঠা যায় না। লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী ওই (কাওড়াকান্দি) পাড় থেকে। আপনি ওখানে জিজ্ঞাসা করুন।’

তবে কাওড়াকান্দি ঘাটের কর্মীরাও বেমালুম অস্বীকার করেন সব অভিযোগ। খোদ মাদারীপুর জেলার সহকারী পুলিশ সুপার এ বি সিদ্দিকী ঢাকাটাইমসকে বলেন, আমাদের এখান থেকে (কাওড়াকান্দি) অধিক যাত্রী লঞ্চে উঠতে পারে না। লঞ্চ ঘাট ছেড়ে গেলে ট্রলারে করে যাত্রীরা লঞ্চে ওঠে।’ তবে তিনি বলেন, লঞ্চে যাত্রী উঠল কি নামল সেটা আমাদের দেখার বিষয় না। সেটা দেখবে বিআইডাব্লিউটিসি; কিন্তু তার পরও আমরা দেখছি।’

লঞ্চগুলোকে তদারকির দায়িত্ব যে সংস্থার, সেই বিআইডাব্লিউটিএও নিতে চায় না কোনো দায়। সংস্থাটির মাওয়া অঞ্চলের উপপরিচালকের দাবি, কোনো ফিটনেসবিহীন লঞ্চ যেন না চলতে পারে, সেদিকে আমাদের কঠোর নজরদারি আছে। কিন্তু অনেক লঞ্চমালিক ঘাট ছেড়ে এসে আবার পথে জাজিরা থেকে যাত্রী তোলে। ফলে সেগুলো ঝুঁকির মুখে পড়ে।’

ঝুঁকি কেবল এই এক রুটেই নয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বাংলাদেশে চলাচলকারী লঞ্চের অর্ধেকেরই কোনো নিবন্ধন নেই। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের হিসাবে, ঢাকার নদীবন্দর থেকে চার হাজার ৫০০ যাত্রীবাহী এবং পণ্যবাহী নৌযানের মধ্যে ফিটনেস পরীক্ষা করা হয়েছে ৭৮২টির। এর মধ্যে ১০৭টি ত্রুটিপূর্ণ চিহ্নিত করেছে প্রকৌশলীরা। প্রাথমিক জরিপও হয়নি দুই হাজার ৭৭টির। হাওর অঞ্চলে চলাচলকারী এক হাজার লঞ্চের মধ্যে অনুমোদন আছে কেবল ৫০টির।

নিজের জীবন নিয়ে যেন উদাসীন যাত্রীরাও।
‘অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে কেন এসেছেন?’
এক যাত্রীর সহাস্য জবাব, ‘আসতে তো হবেই, কী করব।’
‘দুর্ঘটনা হলে তো মারা যেতে পারতেন।’
‘যা হবার হবে।’
‘ফেরি তো ছিল, সেটা তো তুলনামূলক নিরাপদ, তাতে চড়লেন না কেন।’
‘ফেরি দেরিতে আসে।’

হিসাবে এত গন্ডগোল!
মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে নৌচলাচল কতটা বিশৃঙ্খল তা বোঝা যায় একটি পরিসংখ্যানেই। এই ঘাটে কতগুলো লঞ্চ চলে সে তথ্য বের করতেই হতে হলো গলদঘর্ম। বিআইডাব্লিউটিএর হিসাবে, এই রুটে লঞ্চ চলে ৮৭টি। কিন্তু মাওয়া-কাওড়াকান্দি লঞ্চ মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী তালিকাখুক্ত লঞ্চের সংখ্যা ১১৮টি। হিসাবে এই গড়মিল কেন, কার কথা ঠিক, সে প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারল না কোনো পক্ষ।

অর্থাৎ সরকারি নথিপত্রে ৩১টি নৌযানের কোনো অস্তিত্বই নেই। তার মানে এতগুলো লঞ্চের ন্যূনতম তদারকি পর্যন্ত নেই।

আবার বিআইডাব্লিউটিএর কাছে যেসব লঞ্চের হিসাব আছে তার অন্তত ২৫টির ফিটনেস সনদ নেই। এই হিসাব খোদ সংস্থাটির। অর্থাৎ সেগুলোর চলার কথা না বর্ষা বা শুকনো-কোনো মৌসুমেই। তার পরও চলছে সেগুলো।

আবার কোন লঞ্চগুলোর ফিটনেস সনদ নেই, সেগুলোর নাম এক দিনেও দিতে পারেননি মাওয়া ঘাটে সরকারি সংস্থাটির কর্মকর্তারা।

একজন কর্মকর্তা জানান, এই রুটে যে লঞ্চগুলোর ফিটনেস সনদ আছে, সেগুলোর অবস্থাও যে ভালো, তা নয়। কোনো কোনোটি ৩০ থেকে ৪০ বছরের পুরনো। কোনো লঞ্চেই নেই পর্যাপ্ত লাইফ জ্যাকেট ও বয়া। উত্তাল পদ্মা পাড়ি দিয়ে বর্ষা মৌসুমে এবং নৌবন্দরে সতর্কতা সংকেত থাকা অবস্থায়ও বেপরোয়া চলে এসব লঞ্চ।

সতর্ক না হলে অপেক্ষা করছে বিপদ
বর্ষায় পদ্মার উত্তাল ঢেউ আর প্রবল স্রোতের যেকোনো ছোট নৌযান চলাচলই বিপজ্জনক। এ সময় নদীর মূল চ্যানেলে স্রোতের গতিবেগ যায় বেড়ে, তৈরি হয় অসংখ্য ঘূর্ণাবর্ত। এতে নৌযান চলাচলর ক্ষেত্রে চ্যানেলে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা না হলে আশঙ্কা থাকে দুর্ঘটনার।

মাওয়া-কাওড়াকান্দি নৌরুটে এখন যে চ্যানেল দিয়ে নৌযান চলে সেগুলো সেটি ড্রেজিং করা হয়েছে বছর তিনেক আগে। কাওড়াকান্দি থেকে মাওয়া পর্যন্ত এ পথের দুরত্ব ১৭ কিলোমিটার। আগে এ দূরত্ব ছিল আরো বেশি। নতুন এই চ্যানেল দিয়ে নৌযানগুলোকে মাওয়া ঘাটে যেতে আড়াআড়ি পাড়ি দিতে হয় পদ্মার মূল স্রোতে। এ কারণে চালকদের পদ্মার মূল স্রোতে এসে ঘাটে ভিড়তে হলে স্রোতের ও ঘূর্ণাবর্তের কথা মথায় রেখে মৌসুম ভেদে আধা কিলোমিটার পর্যন্ত ঘুরে আসতে হয়। ১৫ মার্চ থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সময়ে ৬৫ ফুটের কম দৈর্ঘ্যরে নৌযান নিয়ে থাকতে হয় বাড়তি সতর্ক। বেশির ভাগ লঞ্চই যখন এই দৈর্ঘ্যরে চেয়ে কম, তখন এই বাড়তি সতর্কতা কতটা জরুরি তা ডুবে গিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে পিনাক-৬।

জীবন হাতে নিয়ে সি-বোটে যাত্রা
মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটে দ্রুত যাতায়াতের জন্য জলে সাড়ে ৩৫০টি স্পিডবোট। এগুলোর চলাচল যেন আরো বিশৃঙ্খল। প্রায়ই বোট উল্টে ঘটে প্রাণহানি। বোটের যাত্রীদের সবার চলার পথে পরার কথা লাইফ জ্যাকেট। যাত্রী ওঠার কথা নির্দিষ্ট পরিমাণে, সর্বোচ্চ আটজন। কিন্তু এগুলো কেবল কাগজ-কলমের নিয়ম।

মঙ্গলবার মাওয়া ঘাটে কাওড়াকান্দি থেকে আসা প্রতিটি স্পিডবোটেই যাত্রী দেখা গেছে ১২ জনের বেশি। কোনো যাত্রীর গায়েই দেখা যায়নি লাইফ জ্যাকেট।

এই ভরা বর্ষায় এই নৌযানগুলো চলাই বিপজ্জনক, কিন্তু সে কথা কে কাকে বোঝাবে। না চালক, না যাত্রী- যেন চিন্তা নেই কারো। অথচ দুর্ঘটনার খবর অজানা নয় কারো কাছে। ঈদের আগের দিন একটি সিবোট উল্টে প্রাণ হারিয়েছিলেন চারজন যাত্রী। সেই বোটটিও চলছে এখন। এই ঘটনায় হয়নি কোনো মামলা।

রাতের বেলায় সি-বোট চালানো সম্পূর্ণ নিষেধ। কিন্তু সেটি মানেন না মালিকরা। কোনো বোটে নেই বাতির ব্যবস্থা। রাতের বেলায় অপরটির সঙ্গে কিংবা ফেরি ও লঞ্চের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় প্রায়ই। দুর্ঘটনা ঘটলে পাওয়া যায় না মরদেহও। চলতি বছরের ২৪ মার্চ পদ্মার মাঝ নদী হাজরা পয়েন্টে রাতে দুই সি-বোটের সংঘর্ষের পর নিখোঁজ ১০ জনের মধ্যে তিনজনের মরদেহ মিললেও বাকিদের খোঁজ মেলেনি।

অবহেলায় মৃত্যু, কিন্তু প্রতিকার নেই
মুন্সিগঞ্জের মাওয়ায় ডুবে যাওয়া লঞ্চ পিনাক-৬-এর মালিক এবি সিদ্দিক কালু, সারেং, সুকানিসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছে বিআইডাব্লিউটিএ। মঙ্গলবার সংস্থাটির মাওয়া ঘাটের পরিদর্শক জাহাঙ্গীর ভূঁইয়া এই মামলা করেন।

বিআইডাব্লিউটিএর চেয়ারম্যান সামসুদ্দোহা বলেন, আইন ভঙ্গ করে মানুষের জীবন নিয়ে যারা হেলা করবে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না।

মুন্সিগঞ্জে লঞ্চডুবির পর থেকে লাপাত্তা এর মালিক। তিনি নিজে তো বটেই, স্বজনরাও ছেড়েছেন বাড়ি। এলাকা ছেড়েছেন অন্য আসামিরাও। তবে প্রশাসন বলছে, পালিয়ে বাঁচতে পারবে না কেউ। বিচারের মুখোমুখি হতে হবে সবাইকেই।

তবে এই মামলার আগেই লাপাত্তা হয়েছেন এ বি সিদ্দিক। পিনাক-৬ ডুবির পরই মুন্সিগঞ্জের লৌহজংয়ের মেদিনীমণ্ডল গ্রামে নিজেব বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন সিদ্দিক। মামলার কয়েক ঘণ্টা পর গিয়ে দেখা গেল বাড়িটি খালি পড়ে আছে। গোটা বাড়ি খুঁজে দেখা মিলল কেবল এক নারীর, যিনি আবার সিদ্দিকের পরিবারের সদস্য নন। সিদ্দিক কোথায় আছেন সে তথ্যও জানেন না ওই নারী।

মামলার পর এ বি সিদ্দিকসহ সব আসামিকে ধরতে চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। লৌহজং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন ঢাকাটাইমসকে বলেন, কেউ পালিয়ে বাঁচতে পারবে না। আসামিদের ধরতে সব থানায় বার্তা পাঠানো হয়েছে।’

এ বি সিদ্দিক কবে ধরা পড়বেন আর তার কী সাজা হবে তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু অতীতের বিভিন্ন দুর্ঘটনার পরও অবহেলার দায়ে কোনো নৌযান মালিকের সাজা হওয়ার ঘটনা বিরল। কোনো দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি করা হলেও সে সুপারিশের বাস্তবায়ন হয় না বললেই চলে।

পিনাক-৬ ডুবির আগের লঞ্চডুবির ঘটনাটিও ঘটে মুন্সিগঞ্জে। গজারিয়ায় এমভি মিরাজ-৪ ডুবেছিল গত ১৫ মে। এ ঘটনায় গজারিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হায়দার আলী বাদী হয়ে ১৮ মে গজারিয়া থানায় একটি মামলা করেন। কিন্তু প্রায় তিন মাসেও এগোয়নি তদন্ত।

জানতে চাইলে গজারিয়া থানার ওসি ফেরদৌস হাসান ঢাকাটাইমসকে বলেন, মামলাটি এখন তদন্তনাধীন। এ মামলার আসামিদের ধরা হয়েছিল। তবে শুনেছি তারা বর্তমানে জামিনে আছেন।’

চারদলীয় জোট সরকারের আমলে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নৌ দুর্ঘটনার পরও সাজা পেতে হয়নি কাউকে। ২০০৩ সালে এমভি নাসরিন ডুবে আট শতাধিক প্রাণহানির পর অভিযুক্ত ব্যক্তিকে চাকরিচ্যুত এবং লঞ্চের নিবন্ধন বাতিলের সুপারিশ করেছিল তদন্ত কমিটি। কিন্তু মানা হয়নি সে সুপারিশ।

১৯৭৯ সাল থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ৪০ বছরে ৭২৭টি লঞ্চ দুর্ঘটনায় প্রায় ৫০০ তদন্ত প্রতিবেদন হয়েছে। এগুলোর সুপারিশ সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হয়েছে তার নজির নেই।

ভয়জাগানিয়া পরিসংখ্যান
গত ১৪ বছরে বিভিন্ন নদীতে প্রায় ৪৯০টি লঞ্চ দুর্ঘটনায় ৫ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। ২০০০ সালে ১৫টি লঞ্চ দুর্ঘটনায় ৪৩৯ জন, ২০০১ সালে ৭৬টি দুর্ঘটনায় ৩৯২ জন, ২০০২ সালে ২৮টি দুর্ঘটনায় ছয় শতাধিক, ২০০৩ সালে ৬৪টি দুর্ঘটনায় এক হাজার ২০৫ জন, ২০০৪ সালে ৫৬টি দুর্ঘটনায় ৪৮৭ জন, ২০০৫ সালে ৪৯টি দুর্ঘটনায় ১৭৬ জন, ২০০৬ সালে ৩৮টি দুর্ঘটনায় ৩৭৮ জন, ২০০৭ সালে ৩৪টি দুর্ঘটনায় শতাধিক, ২০০৮ সালে ৩১টি দুর্ঘটনায় তিন শতাধিক, ২০০৯ সালে ২৯টি দুর্ঘটনায় ৩০৮ জন, ২০১০ সালে ৩৮টি দুর্ঘটনায় ৭০ জন, ২০১১ সালে ৩৫টি লঞ্চ দুর্ঘটনায় ১৫৬ জন, ২০১২ সালের মার্চে মেঘনায় এমভি শরীয়তপুর-১ ডুবে শতাধিক নিখোঁজ, ২০১৩ সালে ১১টি দুর্ঘটনায় ৪৫০ জন এবং চলতি বছরে লঞ্চ ডুবে চার শতাধিক প্রাণ হারিয়েছে। এ ছাড়া নিখোঁজ রয়েছে কয়েক শ যাত্রী, যারা আসলে প্রাণ হারিয়েছে।

তানিম আহমেদ – ঢাকাটাইমস