পদ্মায় ঢেউ তরঙ্গের খেলা এবং একজন ক্যাপ্টেন

সর্বনাশা পদ্মা! রাক্ষুসে পদ্মা! কত নামে তাকে ডাকা হয়। এই নামের প্রমাণ দিতেই কী পদ্মা গিলে ফেলেছিলো পিনাক-৬ লঞ্চ। বাস্তবে পদ্মার ভাষা বোঝা বড় কঠিন। ক্ষণে ক্ষণে চেহারা-রূপ বদলায় পদ্মা। তাই পদ্মার সঙ্গে পেরে ওঠেনা মানুষ।

উত্তাল পদ্মার রুদ্রমূর্তিতে একদিন কাটানোর পর মনে হলো এমনটাই। ভোরের পদ্মা দেখলাম বৃষ্টিময়, তারপর মাঝ পদ্মায় চলছে উত্তাল ঢেউ-তরঙ্গের খেলা, দুপুরে রোদ উঠেছে কিন্তু অশান্ত পদ্মার চরে আছড়ে পড়ছে ক্ষুরধার স্রোত-এমন চিত্র সারাটা পদ্মাজুড়ে।

নৌবাহিনীর একটি বিশেষ বোট আমাদের নিয়ে ছুটে চলছে পদ্মার বুকে। কিছু দূর যাওয়ার পর বোটে থাকা নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলাম নির্দেশ দিলেন, ‘বোট ঘুরাও, গন্তব্য কাণ্ডারি-২’।

সেই বোট কয়েক কিলোমিটার ঢেউ মাড়িয়ে মাঝ-পদ্মায় লৌহজং চ্যানেলে নিয়ে গেলো। সেখানে কাণ্ডারি-২ অনুসন্ধান চালাচ্ছে ডুবে যাওয়া পিনাক-৬ এর।
সদা হাস্যময় নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলাম মিডিয়াবান্ধব। অনুসন্ধান তৎপরতায় যেমন অক্লান্ত পরিশ্রমী তেমনি তার খবর জানাতে সব সহযোগিতাই করে চলছেন তিনি।

তখন পদ্মার বুকে বইছে শীতল বাতাস। সেই বাতাস মাড়িয়ে সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছি ক্যাপ্টেনের সঙ্গে। তিনি বলছেন, কোন একটি কাঠ নদী ফেলে দিলে সেটি যেমন গভীরে গিয়ে পাতলা হয়ে যায়। তেমনি কাঠের তৈরি পিনাক-৬ পদ্মাতলে গিয়ে পাতলা হয়ে কিছুটা স্থান বদল করে ফেলেছে। আর পদ্মার গভীরে বেশ কয়েকটি খাদ আছে সেসব খাদ খুব ভয়াবহ। সেসব খাদে ঢুকে পড়তে পারে পিনাক-৬ ।

অবশেষে তার অনুমানই যেন সত্যি হতে চলেছে। মাওয়া ঘাটের কাছে লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার স্থানের পাশে ধাতব স্ট্রাকচারের সন্ধান পাওয়া গেছে। এখন চলছে বিশ্লেষণ। বিশ্লেষণে নিশ্চিত হওয়া গেলেই শুরু হবে উদ্ধার অভিযান।

চল্লিশোর্ধ্ব বয়সের এই ক্যাপ্টেন বিভিন্ন অনুসন্ধান অভিযানে পরিপোক্ত। পিনাক-৬ এর উদ্ধার অভিযানেও নেতৃত্বে থাকছেন অভিজ্ঞ ক্যাপ্টেন।

পদ্মার ঢেউ-তরঙ্গে মাঝে আরও কথা হয় ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলামের সঙ্গে। বিশ্বের অন্যান্য স্থানে যেভাবে ডুবে যাওয়া লঞ্চ অনুসন্ধান করা হয় ঠিক একই কৌশলে এই অনুসন্ধান কাজ তারা করেছেন। ‘সাইড স্ক্যান সোলার’ দিয়ে শুরু করা হয় অনুসন্ধান। তারপর কাণ্ডারি-২ থেকে ‘সাব বটম প্রোফাইলার’ কাজে লাগানো হয়।
বিআইডব্লিউটিসি জানিয়েছে, প্রবল স্রোতের কারণে অনুসন্ধান ও উদ্ধার তৎপরতায় বার বার বিঘ্ন ঘটলেও ছয়দিনের মধ্যে পদ্মার তলদেশের খাদে অস্বাভাবিক কিছুর সন্ধান মিলেছে।ধারণা করা হচ্ছে এটি হতে পারে পিনাক-৬।

পিনাক-৬ এর খোঁজে কাণ্ডারি ও জরিপ ছাড়াও অনুসন্ধানে আছে সন্ধানী, তিস্তা, তুরাগ নামের জাহাজগুলো।

এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ডুবে যাওয়া লঞ্চের ১২৬ জন যাত্রী। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৪২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৪ জনের পরিচয় মিলেছে।
পরিচয় না পাওয়া ১৬ জনের মধ্যে ১২ জনকে মাদারীপুর জেলার শিবচর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। আর বাকি ৪ জনের লাশ শিবচরের পাঁচ্চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাদারীপুর জেলার প্রশাসনের জিম্মায় রাখা হয়েছে।

মাওয়া ঘাট ও শিবচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিখোঁজের স্বজনেরা এখনও অপেক্ষায় রয়েছেন। তাদের একটাই দাবি জীবিত না হোক অন্তত মরদেহটুকু যেন তারা পান।

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর