পদ্মার ঘাটে ঘাটে অনিয়ম!

mawaএমএল পিনাক-৬ লঞ্চডুবির ঘটনার পর থেকে মাওয়া, কাওড়াকান্দি, কাঁঠালবাড়ী ও মাঝিকান্দি ঘাটে নিখোঁজ ও নিহত ব্যক্তিদের নিয়ে শোকের মাতম। প্রশাসন ব্যস্ত ডুবে যাওয়া লঞ্চ ও যাত্রীদের উদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে। কিন্তু দুর্নীতি আর পদ্ধতিগত ত্রুটির কারণে আবারও ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। গতকাল বুধবারও উত্তাল নদীতে আইন লঙ্ঘন করে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে বেপরোয়াভাবে চলাচল করতে দেখা গেছে মাওয়া-কাওড়াকান্দি রুটের লঞ্চগুলোকে। অভিযোগ উঠেছে, লঞ্চমালিক ও ঘাট ইজারাদারদের কাছ থেকে বিআইডাব্লিউটিএ ও পুলিশ প্রশাসনের সদস্যরা টাকার বিনিময়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের সুযোগ দেওয়ায় দুর্ঘটনাটি ঘটেছিল। সেই প্রশাসনের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষুব্দ হয়ে উঠছে লঞ্চডুবির নিখোঁজদের স্বজনরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কাওড়াকান্দি ফেরিঘাটের এক কর্মচারী বলেন, ‘ঈদের সময় বাড়তি টাকা আদায়ের জন্য ইজারাদার আব্দুল হাই সিকদার তিন টাকার জায়গায় ১০ টাকা করে ঘাটের টোল আদায় করতেন। পুলিশকে টাকা দিয়ে সব সময় ম্যানেজ রাখতেন। সে জন্য ২ নম্বর ফেরিঘাটে তারা সিঙ্গেল যাত্রীদের না যেতে দিয়ে লঞ্চে উঠাতে বাধ্য করত। এ কারণেই এমএল পিনাক-৬ লঞ্চটি অতিরিক্ত যাত্রী তুলে দুর্ঘটনায় পড়েছিল।’ সরেজমিনে মাওয়া, কাওড়াকান্দি, কাঁঠালবাড়ী ও মাঝিকান্দি ঘাট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নদীরপাড়ে চলছে মাতম। নিখোঁজদের অপেক্ষায় হাজার হাজার স্বজনের অপেক্ষা আহাজারি। এরই মধ্যে যেকোনো মুহূর্তে আবারও ঘটে যেতে পারে বড় ধরনের নৌ-দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনার পর উভয় পারে নৌযানে যাত্রী পারাপারে প্রশাসন কড়াকড়ি থাকলেও পদ্ধতিগত ত্রুটি ও যাত্রীদের অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা আবারও ঘটতে পারে। মাওয়ার উল্টো পাড়ে স্রোত ও ঢেউয়ের উৎসমুখে চলমান বর্ষায় স্থায়ীভাবে শক্তিশালী আইটি টাগ জাহাজ বসানোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাওয়া, কাওড়াকান্দি, কাঁঠালবাড়ী ও মাঝিকান্দির মধ্যে চারটি নৌরুট রয়েছে। মাওয়া, কাওড়াকান্দি ও কাঁঠালবাড়ী ঘাটে প্রতিদিন ৮৭টি লঞ্চ, পাঁচ শতাধিক স্পিডবোট, ১৮টি ফেরি ও শতাধিক ট্রলার চলাচল করে থাকে। এ বছর বর্ষা মৌসুমে ঈদুল ফিতর হওয়ায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় আগেভাগেই ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়। বর্তমানে ভরা বর্ষা মৌসুম চলায় পদ্মা নদীর মাওয়া পাড় থেকে চরজানাজাত মাগুরখণ্ড পাড় পর্যন্ত তীব্র স্রোত, উত্তাল ঢেউ দেখা দিয়েছে। ফেরিসহ প্রতিটি নৌযান পারাপারে দীর্ঘ সময় ব্যয় হচ্ছে। দুর্ঘটনা এড়াতে স্পিডবোটগুলোতে প্রত্যেক যাত্রীর জন্য লাইফ জ্যাকেট ও বয়া বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু প্রথম থেকেই বিষয়টি লোক দেখানোতে রূপ নেয়। এর ফলে ঈদের তিন দিন পরই স্পিডবোট ডুবে আবুল কালাম নামের এক যাত্রীসহ দুজন নিখোঁজ হয়। এরপর প্রশাসনের চাপে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহারে কড়াকড়ি করলেও মালিক ও চালকরা সুযোগ পেলেই বিষয়টি এড়িয়ে যান। ঘাটের কিছু অসৎ পুলিশকে ম্যানেজ করে আগের রূপে ফিরে যায় ঘাটের চিত্র। ঈদের আগে ও পরে লঞ্চগুলো অতিরিক্ত বোঝাই করে পারাপার ছিল সাধারণ ঘটনা। ঘাটে লঞ্চের ধারণক্ষমতার কোনো তালিকা না থাকায় যাত্রীরাও বুঝতে পারে না কোন লঞ্চে কী পরিমাণ যাত্রী উঠবে। ফলে লঞ্চচালক যে যার মতো যাত্রী বোঝাই হয়ে পদ্মা পাড়ি দেয়। ফলে গত সোমবার ঘটে এমএল পিনাক-৬ লঞ্চডুবির ঘটনা। এ ঘটনার পর বেশির ভাগ যাত্রী লঞ্চ ও স্পিডবোটের বদলে ফেরিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তবে কিছু স্পিডবোটে দু-একজনকে লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে বাকি যাত্রীদের নিয়ে জীবনে ঝুঁকির নিয়ে এখনো পদ্মা পাড়ি দিতে দেখা যাচ্ছে।

কিবরিয়া, আল আমিনসহ বেশ কয়েকজন লঞ্চের যাত্রী বলেন, ‘ঘাটে এসে যাত্রী কম তুলতে দেখে লঞ্চে উঠেছি। তবে খুব ভয় পেয়েছি। এত বড় দুর্ঘটনার পরও পদ্মায় যাত্রীবোঝাই ট্রলার চলতে দেখা গেছে।’ নূর মিয়া ও হাশেম মিয়া নামের ফেরির যাত্রী বলেন, ‘আগে কোনো দিন ফেরিতে উঠিনি। জীবনের ভয়ে ফেরিতে উঠেছি।’

রাসেল, সুমন, পারভেজসহ বেশ কয়েকজন স্পিডবোটের যাত্রী বলেন, ঈদের আগে কোনো লাইফ জ্যাকেট যাত্রীদের পরানো হতো না। এখন দুই থেকে তিনজনকে লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে স্পিডবোট ছাড়া হচ্ছে। ঘাটে উপস্থিত কয়েকজন স্পিডবোট মালিক-শ্রমিক জানান, পদ্মা নদীর মাওয়া অংশে তীব্র স্রোতের সঙ্গে ঢেউ হওয়ায় দুর্ঘটনার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মাওয়া ঘাটে গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ভাগ্নে ও বোনকে হারিয়ে বিলাপ করছিলেন সোহেল রানা নামের এক যুবক। সোহেলের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘পত্রিকায় লেখে আর কী হবে। যেই পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করা হলো। তাদের বিরুদ্ধে এখনো ব্যবস্থা নেওয়া হলো না। আমরা তাদের বিচার চাই। ভালো করে পত্রিকায় লেহেন ভাই।’ এ কথা বলতে বলতেই আবারও কান্নায় ভেঙে পড়েন সোহেল রানা।

ইজারাদারের অনিয়ম : গত মঙ্গলবার দুপুর ২টায় কাঁঠালবাড়ী ঘাটে দেখা যায়, কিনারী নামক একটি ফেরিতে গাড়ি তোলার কাজ শেষ হয়েছে। ইতিমধ্যে পাটাতনও তুলে ফেলা হয়েছে। এখন ছাড়ার পালা। কিন্তু যাত্রী উঠানো থামছে না। মাদারীপুর কাঁঠালবাড়ী ঘাটে ফেরির জন্য জনপ্রতি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৩০ টাকা। আর ঘাটের টোল হিসেবে জনপ্রতি পাঁচ টাকার জায়গায় ঈদের ছুতোয় নেওয়া হচ্ছে ৩০ টাকা। এ সময় ঘাটে একজন টোল আদায়কারীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি নাম না প্রকাশ করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ঈদ উপলক্ষে প্রতি সপ্তাহে ইজারাদারকে ১৬ লাখ টাকা পুলিশ প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দিতে হয়। এ জন্যই অতিরিক্ত টাকা তুলতে হচ্ছে।’

ঘাটে উপস্থিত মফিজুল ইসলাম শিশির নামের একজন যাত্রী বলেন, ‘কাঁঠালবাড়ী ঘাটে আগে পাঁচ টাকা ঘাটের টোল দিতাম। ঈদের কারণে এখানে ৩০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

বেশির ভাগই অবৈধ স্পিডবোট : শরীয়তপুরের মাঝিরকান্দি ঘাটে ২৫টি লঞ্চ ও ৫০টি স্পিডবোট রয়েছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র ১০টি স্পিডবোটের বৈধ কাগজ ছাড়া বাকি ৪০টি স্পিডবোট অবৈধভাবে চলাচল করে। বড় স্পিডবোটে ১৬ জন যাত্রী পরিবহনের কথা থাকলেও সেখানে ২৩ জন এবং ছোট স্পিডবোটে আটজনের জায়গায় ১২ জন যাত্রী নিয়ে পারাপার চলে। ফলে প্রায় সময়ই দুর্ঘটনার শিকার হয় যাত্রীরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাঝিকান্দি ঘাটের এক স্পিডবোট মালিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঘাটে দায়িত্ব থাকার কারণে পুলিশের একজন হাবিলদার ও একজন কনেস্টবলকে দৈনিক ৬০০ টাকা দিতে হয়। জেলার ডিসি, এসপি ও থানার ওসির আত্মীয়স্বজনদের সব সময় বিনা পয়সায় চলতে দেওয়া হয়। এ জন্য তাঁরা অবৈধ লঞ্চ ও স্পিডবোটের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেন না।’

শরীয়তপুর মাঝির ঘাটের লঞ্চ ইনচার্জ মোখলেস মাদবর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুই ঘাটের টোল আমরা একসঙ্গে পাঁচ টাকা নিয়ে থাকি। আর লঞ্চের ভাড়া ৩৩ টাকা নেওয়া হয়।’ বাস্তবে এর সত্যতা পাওয়া যায়নি। দেখা গেছে, সেখানে প্রত্যেকের কাছ থেকে ঘাটে নেওয়া হচ্ছে ১০ টাকা। আর লঞ্চের ভাড়া নেওয়া হচ্ছে ৪০ টাকা করে। কেউ এর প্রতিবাদ করলে তাকে হতে হয় লাঞ্ছিত।

পুলিশের বক্তব্য : জাজিরা থানার (মাঝির ঘাট স্থল) ওসি মো. ইকরাম আলী মিয়া বলেন, ‘একজন এএসআই ও কয়েকজন পুলিশ সদস্য ঘাটের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকেন। পুলিশের বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার অভিযোগ আমার জানা নেই। অবৈধ লঞ্চ ও স্পিডবোট দেখার বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের।’ মাওয়া লঞ্চ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ভাস্কর চৌধুরী বলেন, ‘কাগজে ধারণক্ষমতার বাইরে একটি লোডমার্ক থাকে, আমরা সেভাবে যাত্রী ভরি।

কালের কন্ঠ