লাশ ভেসে ওঠার অপেক্ষায় থমকে আছে উদ্ধার তৎপরতা!

pinakuddarফায়ার সার্ভিস ছাড়া বাকি সংস্থাগুলো ঘুমিয়ে ছিল
পদ্মা নদীর লৌহজং চ্যানেলে ডুবে যাওয়া যাত্রীবাহী লঞ্চ ‘এমভি পিনাক-৬’ উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস ছাড়া উদ্ধার কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত নেভি, কোস্টগার্ড ও নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের বিআইডব্লিউটিএ (বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ কর্তৃপক্ষ) এর মধ্যে আন্তরিকতার অভাব ছিল। ফায়ার সার্ভিস ছাড়া উদ্ধার কাজে নিয়োজিত বাকি সংস্থাগুলো ঘুমিয়ে ছিল। বাকিরা মঙ্গলবার সকালে লাস ভেসে ওঠার অপেক্ষায় ছিল।

দূর্ঘটনার দিন সোমবার দুপুর ৩টা থেকে পরদিন মঙ্গলবার দুপুর ৩টা পর্যন্ত ঘটনাস্থলে সরেজমিন থেকে এবং উদ্ধার কাজে নিয়োজিতদের সঙ্গে আলাপ করে ও ভুক্তভোগিদের মাধ্যমে এই তথ্য জানা গেছে।

ঘটনাস্থলে সরেজমিন থেকে দেখা গেছে, সোমবার সকাল ১১টার কাছাকাছি সময়ে দূর্ঘটনা ঘটলেও বিকেল ৪টা পর্যন্ত একমাত্র ফায়ার সার্ভিস ছাড়া অন্য কোনো সংস্থার উদ্ধার তৎপরতা ছিল না। উদ্ধার কাজে পারদর্শী কোনো সংস্থার উপস্থিতিও ছিল না। সোমবার রাত সাড়ে ৯টা পর্যন্ত ছিল না কোনো সমন্বয়। আবার সংস্থাগুলোর কাছে উদ্ধার কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট পর্যাপ্ত সরঞ্জামও ছিল না।

লৌহজং থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম হাসান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘মূল কাজ করার কথা নেভি, কোস্টগার্ড ও বিআইডব্লিউটিএর। কিন্তু তাদের উপস্থিতি সোমবার চোখে পড়েনি। মঙ্গলবারও অর্ধেক দিন পর তাদের একটু নড়াচড়া করতে দেখা গেছে। সোমবার রাতে ফায়ার সার্ভিস কাজ করলেও বাকিরা ঘুমিয়ে ছিল। এ ছাড়া উদ্ধার কাজে পর্যাপ্ত উপকরণের অভাব দেখা গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘স্থানীয় পর্যায় থেকে আমি একটি বোট, ইট ও রশি জোগাড় করে দিয়েছি।’

দূর্ঘটনার দিন সোমবার বিকেলে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক এম আবদুস সালামের নেতৃত্বে দ্বিতীয় দফায় উদ্ধার অভিযান পরিচালনার আগে ঘটনাস্থল চিহ্নিত করার কাজ করা হয়। ওই অভিযানে ‘ওয়েট ব্যালান্স’ (উদ্ধারকাজে নিয়োজিত জাহাজকে নদীতে ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে) ছিল না। ছিল না নদীর তল মাপার জন্য ‘ওজন’ (ভারী বস্তু, যা নদীর তল পরিমাপক যন্ত্রকে টেনে গভীরে নিয়ে যাবে)।

পরিচালক এম আবদুস সালামের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় স্থানীয়ভাবে ওয়েট ব্যালান্স ও ওজন সংগ্রহ করা হয়। কিন্তু প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফায়ার সার্ভিসের বাকি কর্মকর্তারা ওই সময়ে অভিযানে যেতে শতভাগ সম্মত ছিলেন না।

অন্য কর্মকর্তারা গড়িমসি করলে আবদুস সালাম বলেন, ‘চলেন কিচ্ছু হবে না। এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অনেক অভিযান পরিচালনা করেছি।’

এই পর্যায়ে বাকিরা উর্ধ্বতন কর্মকর্তার মুখের উপর না করতে পারেননি তবে তারা শতভাগ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অভিযানে যোগ দেননি। অভিযানের এক পর্যায়ে ইচ্ছা করে নদীর মাঝখানে ‘ওজন’ ফেলে দিয়ে ছুটে গেছে ভাব দেখানো হয়। এতে ওজনসহ রশি ছিড়ে গেলে অভিযান মাঝপথে ব্যর্থ হওয়ায় আবার তীরে ফেরত আসতে হয়। ওই সময়ে এই প্রতিবেদক ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন।

তীরে আসার পর আবদুস সালাম দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিস মূলত ঘটনাস্থল চিহ্নিত করার পর উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নিবে। কিন্তু যেহেতু এখনো ঘটনাস্থল চিহ্নিত হয়নি তাই ফায়ার সার্ভিস তার শতভাগ সামর্থ্য দিয়ে ঘটনাস্থল চিহ্নিতের কাজ করছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এরই মধ্যে নেভি, কোস্টগার্ড ও বিআইডব্লিউটিএ-র লোকজন চলে এসেছে। তারা বিআইডব্লিউটিএ-র জাহাজ তিস্তায় রয়েছে। তাই আবার অভিযানে যাওয়ার আগে সবার সঙ্গে সমন্বয় করা প্রয়োজন। সমন্বয় করে কাজ না করলে সুফল আসবে না।’

সমন্বয় করার জন্য বাকি সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেন ফায়ারের এই কর্মকর্তা। কিন্তু বেশিরভাগ সংস্থার কর্মকর্তাদের তিনি মোবাইল ফোনে পাচ্ছিলেন না। এই সময়ে জানা যায়, বাকি সংস্থার লোকজন বিআইডব্লিউটিএ’র তিস্তা নামের জাহাজে আছেন। তখন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা। রাত সোয়া ৮টা পর্যন্ত পায়ে হেঁটে এবং গাড়িতে চড়ে তিস্তা জাহাজ খোঁজা হয়। পুরোটা সময় এই প্রতিবেদক ঘটনাস্থলে ছিলেন।

অনেক পরিশ্রমের পর রাত সোয়া ৮ টায় মাওয়া ফেরিঘাটের লঞ্চ ঘাটে তিস্তা জাহাজ পাওয়া যায়। সেখানে দেখা গেছে, বিভিন্ন সংস্থার লোকজন আলাপ আলোচনা করছেন। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা তিস্তায় পৌঁছলে সার্বিক কার্যক্রম নিয়ে একটি ছোট বৈঠক হয়।

ওই বৈঠক থেকে জানা গেছে, একবার নেভির একটি দল সাইড স্ক্যান সোলার দিয়ে ঘটনাস্থল শনাক্তের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়েছেন। কেননা নদীর গভীরতা কমপক্ষে ৭০ থেকে ১০০ ফুট। ঘটনাস্থল চিহ্নিতকরণ ও উদ্ধার কাজের জন্য অন্য উপকরণের সঙ্গে কমপক্ষে ২০০ ফুট রশি, ৬০ কেজি ভারের ওজন প্রয়োজন। উল্লেখ্য, ওয়েট ব্যালান্স, রশি ও ওজনের অপ্রতুলতা ছিল। বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বস্তার ভেতর পাথর ওজন বানানো হবে।

ওই বৈঠকে (ঘটনার দিন সোমবার রাত সোয়া ৮ টায়) সরকারের দায়িত্বশীল একটি সংস্থা থেকে বলা হয়, এখন রাত; ঘটনাস্থল চিহ্নিতকরণ ও উদ্ধার অভিযান সম্ভব নয়। কাল (মঙ্গলবার) সকালে নদীতে লাশ ভেসে উঠবে। লাশ ভেসে উঠতে উঠতে আনুমানিক দুপুর ১২ টা বাজবে। তখনই উদ্ধার অভিযান শুরু হবে।

ওই বৈঠক থেকে জানা গেছে, নেভি যখন সাইড স্ক্যান সোলার দিয়ে ঘটনাস্থল শনাক্তের চেষ্টা করে তখন তাদের কাছে জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) ছিল না। তাই নেভীর দলটি ঘটনাস্থল ‘পয়েন্ট’ করতে পারেনি। তবে তারা ৪ বার সাইড ওয়াচ করেছে।

দুর্ঘটনার দিন সোমবার রাত ৮টা ৪০ মিনিটে তিস্তা জাহাজ থেকে সকলে বের হয়ে স্থানীয় ডাকবাংলোতে যান। সেখানে জেলা প্রশাসকসহ সরকারের ঊর্ধতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আরেক দফা বৈঠক হয়।

ওই বৈঠকে জেলা প্রসাশক বলেন, ঘটনাস্থল চিহ্নিত ও উদ্ধার কাজে কোনো সমন্বয় নেই। বৈঠকে তিনি নেভি ও কোস্ট গার্ডের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মূল দায়িত্ব নেভি ও কোস্টগার্ডের হলেও তাদের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। যা দুঃখজনক। বৈঠক শেষে ওইদিন রাত ৯ টা ৫০ মিনিটে সবাই ডাকবাংলো ছেড়ে যার যার দলের সঙ্গে যোগ দেন।

ওইদিন রাত সাড়ে ১২টায় ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে আরেক দফা অভিযান পরিচালনা করা হয়। যা চলে রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত। কিন্তু পর্যাপ্ত উপকরণের অভাবে ওই অভিযানও ব্যর্থ হয়।

এদিকে, নৌ মন্ত্রী শাজাহান খান দূর্ঘটনার দিন সোমবার দুপুরে বলেন, ‘উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম পথে আছে। চলে এলেই উদ্ধার কাজ শুরু হবে।’

রুস্তম সোমবার রাত ৯টার কাছাকাছি সময়ে ঘটনাস্থলে চলে এলেও সারারাত, এমন কী পরদিন মঙ্গলবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত তাদের কোনো উদ্ধার কার্যক্রম চোখে পড়েনি।

রুস্তম আসার পর নৌ মন্ত্রী বলেন, ‘নির্ভীক পথে আছে। চলে এলেই উদ্ধার কাজ শুরু হবে।’ রুস্তমের মতো নির্ভীকও চলে আসে কিন্তু কোনো সফলতা দেখা যায়নি।

এরপর মঙ্গলবার দুপুরে নৌ মন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, ‘৩টি জাহাজ অনুসন্ধানের কাজ করছে। চট্টগ্রাম থেকে জরিপ-১১ রওনা দিয়েছে। মঙ্গলবার মাঝরাতে এসে পৌঁছবে। জরিপ ১১ আসলে উদ্ধার কাজ আরও গতি পাবে।’

এই প্রতিবেদন লেখার সময় মঙ্গলবার রাত ১০ টায় জানা গেছে, চট্টগ্রাম থেকে রওনা দেওয়া জরিপ ১১ ঘটনাস্থলে আসার আগেই ফেরত যাচ্ছে।

এদিকে, ঘটনাস্থল চিহ্নিতকরণ ও উদ্ধার কাজের সমন্বয় না থাকা এবং কার্যকর কোনো অভিযান পরিচালনা না করায় দূর্ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মঙ্গলবার সকালে উত্তেজিত হয়ে পড়েন এবং বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

বিক্ষোভকারীদের মধ্যে মাদারীপুরের নূর সালাম, ফরিদপুরের আবদুল্লাহ, ঢাকার উত্তরার হাকিম মিয়াসহ আরও অনেকে দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আমাদের যা হওয়ার তাতো হয়েছেই। এখন স্বজনদের মৃতদেহগুলো উদ্ধার করে দিলেইতো হয়। এতো জাহাজ এসে লাভ কী, যদি কাজ না করে। নেভি আর কোস্ট গার্ডতো সারারাত ঘুমিয়েছে, এখন মঙ্গলবার দিনেও ঘুমাচ্ছে।’

তারা আক্ষেপ করে বলেন, ‘সরকার এখনো আমাদের মিথ্যা কথা বলছে। তারা উদ্ধার কাজ শুরু করেনি।’

এমন সময় নৌ মন্ত্রী শাজাহান খান বিআইডব্লিউটিএ’রসহ সংশ্লিষ্টদের বলেন, ‘আপনারা একটা জাহাজে সাংবাদিকদের নিয়ে সাইড স্ক্যান সোলার দিয়ে দেখানোর চেষ্টা করুন, যে কাজ চলছে। এতে লোকজনের উত্তেজনা প্রশমিত হবে।’

এর পরপরই সাংবাদিকদের কয়েকটি জাহাজে নিয়ে ঘটনাস্থল ঘুরিয়ে নিয়ে আসা হয়।

একটি সূত্র দ্য রিপোর্টকে জোর দিয়ে বলেন, ‘দেখবেন বুধবার দুপুর ১১ টার পর থেকে অনেক কিছু উদ্ধার হবে। অনেক কিছু ভাসবে। তবে তা কারো চেষ্টায় নয়। প্রাকৃতিকভাবে।’

দ্য রিপোর্ট