তিন বোনের সেই হৃদয়ছোঁয়া সেলফি

PinakHiraসোমবার সকালে মাদারীপুর শিবচরের বাড়ি থেকে ঢাকার উদ্দেশে ভ্যানগাড়ি করে কাওড়াকান্দি লঞ্চঘাটে এসেছিলেন তিন বোন। পথিমধ্যে তারা একটি সেলফি তোলেন। পরে তাদেরই একজন সোমবার সকাল ৯টা ৩৬ মিনিটে নিজের ফেসবুক পেজে হাস্যোজ্জ্বল তিন বোনের একটি ছবি আপলোড করেন। ছবিটির ক্যাপশন ছিল ‘অন দ্য ওয়ে সিস্টার জার্নি’। তাদের আনন্দযাত্রাকে বিষাদে ডুবিয়ে এ সেলফিই হয়ে থাকলো তাদের জীবনের শেষ স্মৃতি, যেটা পাওয়া গেছে মাওয়ার লঞ্চ দুর্ঘটনায় এখনও নিখোঁজ জান্নাতুন নাঈম লাকীর ফেসবুক পেজে।

আসলেও তিন বোনের এ যাত্রা ছিল অন্যরকম! উদ্দেশ্যটাই যেন তিন বোনের হারিয়ে যাওয়া। কে জানতো প্রমত্তা পদ্মায় মরণেও তিন বোন একই সঙ্গে যাত্রা করবে! তখনও তারা জানতেন না তাদের আর ফেরা হবে না ঢাকায়, ফেরা হবে না প্রিয় ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে, পাওয়া হবে না প্রিয় বন্ধুদের সান্নিধ্য। ২৬শে আগস্ট জন্মদিন ছিল নূসরাত জাহান হীরার। জয়নুল হক শিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের তার সহপাঠীদের কথা দিয়েছিলেন, ঈদের ছুটি কাটিয়ে যথাসময়ে ফিরে আসবেন তাদের মাঝে। বড় হওয়ার পরে সচরাচর জন্মদিন পালন হয়নি তার।
PinakHira
এবার অন্তত বেশ ঘটা করে বন্ধুদের নিয়ে জন্মদিন পালন করবেন। কিন্তু সে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল নূসরাত জাহান হীরার। আজীবন একজন ভাল চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন দেখেছিলেন মেধাবী হীরা। বাবা মাকে কথা দিয়েছিলেন, নামী একজন চিকিৎসক হবেন। উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন গরিব রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা দেবেন বলে। চিকিৎসা বিজ্ঞানে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে পরিবার ও দেশের মুখ উজ্জ্বল করবেন। একই সঙ্গে ছোট বোনকেও চিকিৎসক বানাবেন।

কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। সর্বনাশা পদ্মা কেড়ে নিয়েছে হীরা ও তার ছোট বোন ফাতেমা আক্তার স্বর্ণা (১৭)-কে। তাদের সঙ্গে হারিয়ে গেছে তাদের খালাতো বোন চীনের জইনজু ইউনিভার্সিটির চিকিৎসা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী জান্নাতুল নাঈম লাকী (২২)। শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলার আবদুল জব্বার সরদার ও পারভীন আক্তারের তিন কন্যার মধ্যে দ্বিতীয় জান্নাতুল নাঈম। ঢাকায় তারা বসবাস করতেন ৪২/২ বিসি দাস লেন লালবাগ এলাকায়। লঞ্চ দুর্ঘটনায় হীরার লাশ পাওয়া গেলেও অন্য দু’বোন স্বর্ণা ও লাকী এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে পদ্মা নদীতে লঞ্চ ডুবির ঘটনায় তাদেরও সলিল সমাধি ঘটেছে।

সোমবার মাদারীপুরের কাওড়াকান্দি থেকে ছেড়ে আসা এম এল পিনাক-৬ নামের লঞ্চটি মুন্সীগঞ্জের মাওয়া লঞ্চ ঘাট থেকে আধা কিলোমিটার দূরত্বে পদ্মা নদীতে ডুবে যায়। এ লঞ্চের যাত্রী ছিলেন মাদারীপুরের শিবচরের নুরুল হক হাওলাদার (৫০)। তার দুই কন্যা নূসরাত জাহান হীরা (২০), ফাতেমা আক্তার স্বর্ণা (১৭) ও তাদের খালাতো বোন জান্নাত নাঈম লাকী (২২)। বাড়িতে ঈদের ছুটি কাটিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন তারা। নদী থেকে উদ্ধার হওয়া প্রথম লাশটিই ছিল হতভাগী হীরার।

দুর্ঘটনায় নিজে বাঁচলেও দুই কন্যাকে বাঁচাতে পারেননি পিতা নুরুল হক হাওলাদার। ছোটবেলা থেকে যেভাবে দু’কন্যাকে বুকে আগলে রেখেছিলেন, এম এল পিনাক-৬ নামের লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার সময়ও তাদের সেভাবেই আগলে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শত চেষ্টা করেও তা পারেননি। চোখের সামনে সর্বনাশা পদ্মা হীরা ও স্বর্ণাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সেই সঙ্গে ভেসে যায় তার আজীবন লালিত স্বপ্ন ও সাধ। একই সঙ্গে বিলীন হয়ে যায় হীরা ও স্বর্ণার চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন। কন্যা শোকে পাগলপ্রায় নুরুল হক হাওলাদার কন্যা হীরার লাশ পেয়ে শোকে হতবিহবল হয়ে যান। একই সঙ্গে দুই কন্যাকে হারিয়ে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন হীরা ও স্বর্ণার মা মাকসুদা বেগম। কেবলই মাতম করছেন তিনি। শোকের ছায়া নেমে এসেছে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার তাদের গ্রামের বাড়িতে। মেধাবী তিন বোনের এমন অকাল করুণ মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না এলাকাবাসী।

সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলার গুয়াতলা গ্রামের বাসিন্দা নুরুল হক হাওলাদার। পেশায় শিবচর সাব রেজিষ্ট্রী অফিসের দলিল লেখক তিনি। দুই মেধাবী কন্যা হীরা ও স্বর্ণাকে নিয়ে ছিল তার স্বপ্ন। এ নিয়ে গর্ববোধ করতেন তিনি সকলের কাছে। ওদের চিকিৎসক বানাতে চেয়েছিলেন নুরুল হক হাওলাদার। সেজন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে নিজের সর্বস্ব ঢেলে দিয়েছিলেন তিনি ও তার স্ত্রী মাকসুদা বেগম। দুবোন এক ভাইদের মধ্যে বড় বোন হীরা মাদারীপুরের শিবচর নন্দকুমার ইনস্টিটিউট থেকে ২০১০ সালের জিপিএ ৫ পেয়ে এসএসসি ও ২০১২ সালে ফরিদপুর সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজ থেকে জিপিএ ৫ পেয়ে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ধানমন্ডির রায়েরবাজারের অবস্থিত জয়নুল হক শিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে ২০১২-২০১৩ শিক্ষাবর্ষে এমবিবিএস প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছিলেন। ভর্তি পরীক্ষায় তার মেরিট স্কোর ছিল ১৩৭।

যা ‘খুবই ভাল’ বলে মন্তব্য করেছেন তার কলেজের শিক্ষক ও সহপাঠীরা। কিছুদিন আগে এমবিবিএস প্রথম বর্ষ (প্রথম পেশাগত এমবিবিএস পরীক্ষার্থী) লিখিত পরীক্ষায় কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। আজ (৬ই আগস্ট) মৌখিক পরীক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নের অপেক্ষায় ছিলেন হীরা। বাড়ি থেকে ঢাকায় ফেরার তাড়া ছিল এ কারণেই। ছোট বোন স্বর্ণা চলতি বছর শিবচরের শেখ ফজিলাতুন্নেসা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পিলখানার বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ রাইফেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত ছিলেন। ৭ই আগস্ট তার কলেজ ছুটি শেষে তার ক্লাস শুরু হওয়ার কথা ছিল। সেজন্য ঢাকায় ফেরার তাড়া ছিল তারও। জীবনে বড় হওয়ার সাধ ছিল দু’বোনের। কিন্তু মাওয়ায় লঞ্চ দুর্ঘটনায় তাদের স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটেছে।

গতকাল হীরা ও স্বর্ণার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ধানমন্ডির রায়েরবাজার বধ্যভূমির পাশেই জয়নুল হক শিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল ও পিলখানার বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়ে দেখা যায় শোকাতুর পরিবেশ। সহপাঠী প্রাণোচ্ছল হীরাকে হারিয়ে শোকে স্তব্দ হয়ে গেছে তার বন্ধুরা। শিকদার মেডিকেল কলেজে হীরার কয়েকজন সহপাঠী জানান, খুবই প্রাণোচ্ছল ও বন্ধুবৎসল ছিল হীরা। একই সঙ্গে ছিল মেধাবী ও পরোপকারী। কোন অহঙ্কার ছিল না তার।

৭ই আগস্ট মৌখিক পরীক্ষার আগেই ঢাকা ফিরতে চেয়েছিল। এছাড়া ২৬শে আগষ্ট তার জন্মদিন বান্ধবীদের নিয়ে বেশ ঘটা করে পালন করার কথা ছিল। কলেজের অধ্যক্ষ মেজর জেনারেল (অব.) প্রফেসর বিজয় কুমার সরকার বলেন, হীরার অকালমৃত্যু খুবই মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক। যতদূর জানতে পেরেছি হীরা ছিল অমায়িক ও চনমনে। দুর্ঘটনায় একজন মেধাবীর প্রাণ ঝরে গেল। আমরাও হারিয়েছি ভবিষ্যতের একজন মেধাবী চিকিৎসককে। ইতিমধ্যে আমরা তার পরিবারকে সমবেদনা জানিয়েছি।

তিনি বলেন, শুধু হীরা বা স্বর্ণা নয় এভাবে লঞ্চ দুর্ঘটনায় একের পর এক প্রাণ অকালে ঝরে যাচ্ছে। এর কি কোন প্রতিকার নেই? এ ধরনের ঘটনায় যাতে এভাবে অকালে প্রাণ ঝরে না যায় সেজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও সতর্ক হওয়ার জন্য দাবি জানাচ্ছি। স্বর্ণার সহপাঠী সাজিয়া আক্তার বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেধাবী স্বর্ণা এসএসসিতে ভাল ফলাফল করে কলেজে ভর্তি হয়েছিল। তার স্বপ্ন ছিল নামী একজন চিকিৎসক হওয়ার। মেধাবী বড় বোনকে নিয়েও গর্ব ছিল তার। স্বর্ণাকে হারিয়ে আমরা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছি।

কাজী শহীদ আল জারিন শিবচর (মাদারীপুর) থেকে জানান, সরজমিন নুরুল হক হাওলাদারের শিবচর পৌর এলাকার গুয়াতলার বাড়িতে গেলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়। এক মেয়ের লাশ পেয়েছেন। আরেক মেয়ে এখনও নিখোঁজ। দুই মেয়েকে হারিয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছেন মা মাকসুদা বেগম ও পিতা নুরুল ইসলাম হাওলাদার। এ প্রতিবেদক তাদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে মেয়েদের কথা বলে তারা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। আত্মীয়স্বজন ও দুই সহোদরার সহপাঠীদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস তখন ভারি হয়ে ওঠে। কোন বাঁধ মানছে না কন্যা হারা এ পিতামাতার।

আত্মীয় স্বজন যাকেই কাছে পাচ্ছেন জড়িয়ে ধরে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছেন আমার মেয়েদের এনে দাও। ওদের খুব কষ্ট হচ্ছে। ওদের এনে দাও। মেয়েদের ছাড়া আমরা বাঁচব কি করে? তাদের আহাজারিতে সান্ত্বনা দিতে আসা স্বজন ও এরাকাবাসীও চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না। নুরুল হক হাওলাদারের গ্রামের বাড়ি উপজেলার কাদিরপুর ইউনিয়নের গাছিকান্দি গ্রামে। ছেলেমেয়েদের পড়ানোর জন্য পৌর এলাকার গুয়াতলার বাড়িতে বসবাস করতেন তিনি। দুই বোনের অতি আদরের একমাত্র ছোট ভাই নাঈম চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছিল দুই মেয়েকে ডাক্তার বানাবেন। তারা মানুষের সেবা করবে।

বিশেষ করে গরিব, দুখী ও সুবিধাবঞ্চিতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেবে। সে লক্ষ্যে দুই মেয়েকে অনেক কষ্টে শিক্ষিত করেছিলেন হীরা ও স্বর্ণার মা-বাবা। মাওয়ায় লঞ্চডুবির ঘটনায় তাদের সে স্বপ্নের অপমৃত্যু ঘটলো। গত সোমবার সন্ধ্যায় শিবচর পৌরসভার গুয়াতলার বাড়িতে জানাজা শেষে গ্রামের বাড়ি কাদিরপুরের গাছিকান্দির পারিবারিক কবরস্থানে হীরাকে দাফন করা হয়।

মানবজমিন