একটি আত্মাবন্ধন ও কিছু কথা

PinakOvijan2দুই-তিনশ’ যাত্রী নিয়ে লঞ্চ ডুবি আমাদের দেশে নতুন কোনো ঘটনা নয়। ১৫, ২০জন থেকে শুরু করে শ’খানেক যাত্রী নিয়ে নৌকা বা লঞ্চ ডুবির ঘটনা অহরহই ঘটে এখানে। এই ঈদেও মাওয়া-কাওরাকান্দির দুর্ঘটনা বাদেই আরো দু’তিনটি র্দুঘটনা ঘটেছে যেগুলোতে কমপক্ষে অর্ধশতাধিক যাত্রীর প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে।

তাই এ দুঘর্টনাগুলো যেনো আর দুর্ঘটনা নেই, ঘটনা হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছে আমাদের জীবনে। কিন্তু তারপরও কেনো যেনো কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে, চোখ হয়ে ওঠে ঝাপসা।

কুষ্টিয়ার ঘটনার আপডেট শেষ হতে না হতেই টাঙ্গাইল, অত:পর মাওয়া। এর পরে কোথায় কে জানে? ওই মৃত্যু মিছিলে কে শামিল হবে তা-ই বা কে জানে? হয়তো আমাদেরই স্বজন, আপনার নয় আমার, নয়তো নৌমন্ত্রীর বা অন্যকারো।

এরকম দুর্ঘটনা যেমন নতুন নয়, তেমনি যেসব কারণে এ দুর্ঘটনা তাও আমাদের জানা। একই কারণে অগণিত দুর্ঘটনা। তাই এগুলো আর সাধারণ দুর্ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা সঙ্গত নয়। এগুলো মারাত্মক ধরনের ফৌজদারী অপরাধ।

কিন্তু তারপরও দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করে সেই মোতাবেক পদক্ষেপ নেওয়ার কথা আমরা শুনিনা। কর্তৃপক্ষ সেই কারণগুলোকে দূর করে যথাযথ প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে আজ অবধি সফল হতে পারেনি। সফল হওয়ার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে কিনা সেটিও বড় প্রশ্ন।

অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করাই আমাদের বিদ্যমান নৌপরিবহনের রেওয়াজ। কেবল বিশেষ মওসুমে বা ঈদ-কোরবানিতেই নয়, সব সময় সুযোগ পেলেই অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই করে নৌচলাচল একটি স্বাভাবিক ঘটনা।

এসব ক্ষেত্রে ছোট ছোট দুর্ঘটনা ঘটলে স্থানীয় প্রশাসন কিছু দৌড়-ঝাপ করে। আর বড় ঘটনা হলে মাত্রা বুঝে দৌড়-ঝাপ বা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত। ছোট ঘটনা হলে মালিক সমিতি, মাঝারি গোছের হলে বিআইডিব্লওটিএ আর বড় ঘটনা হলে নৌপরিবহন মন্ত্রী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন ও অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশ দেন। আপাতত দৃষ্টে এসব ঘটনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সরকারের সদিচ্ছার তেমন কোনো অভাব পরিলক্ষিত হয় না, কারণ, এক্ষেত্রে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শোক ও দু:খ প্রকাশ করেন ও তিনি নিজে হস্তক্ষেপ ও উদ্ধার অভিযান মনিটরিং করেন।

যদিও মাওয়ার ঘটনায় মন্ত্রণালয় ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কোনো রকম কালবিলম্ব না করেই দ্রুত পদক্ষপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।প্রধানমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এক্ষেত্রে সাধুবাধ জানাতে হয়।

কিন্তু তারপরও রুস্তম আসতে একদিন, কাণ্ডারি আসতে দুই দিন।

এসব দুর্ঘটনা ঘটার পরে সরকারের পক্ষ থেকে দুইটি কাজ করা হয়। প্রথমত, উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা। সরকার অনেক ঘটনাতেই সদিচ্ছার পরিচয় দিলেও বাস্তব কারণে অনেক উদ্ধার অভিযানই শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারে না। প্রয়োজনীয় লজিস্টিক না থাকা এর বড় একটি কারণ।

আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতা সম্পন্ন উদ্ধারকারী জাহাজ আমাদের নেই।

বিআইডব্লিউটিএ’র রুস্তম আর হামজাই শেষ ভরসা।

এছাড়া জরিপ ও কাণ্ডারি আছে। কিন্তু খবরে প্রকাশ, জরিপ-১০ জাহাজটি চট্টগ্রাম বন্দরে ফিরে গেছে। কারণ, বৈরি আবহাওয়ায় এ জাহাজটি অভিযান চালাতে সক্ষম নয়। আর কাণ্ডারি-২ গতকালের সংবাদ অনুযায়ী এখনো মাওয়ার পথে।

তাই জরিপের কিছু যন্ত্রপাতি কাণ্ডারিতে তুলে দেওয়া হয়েছে উদ্ধার কাজ পরিচালনা করার জন্য। তার মানে, জরিপ সাধারণ দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় জরিপ পরিচালনা করতে সক্ষম নয়, আর কাণ্ডারি-২ এর রয়েছে প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতা। এছাড়া সন্ধানী, তিস্তা ও রেসকিউ-২সহ অন্যান্য জাহাজগুলো উদ্ধার অভিযানে মূল জাহাজকে সহায়তাকারী জাহাজ বা স্পিডবোট হিসেবে কাজ করে।

আর সরকারের দ্বিতীয় কাজটি হলো তদন্ত কমিটি গঠন করে তদন্তের নির্দেশ প্রদান। এব্যাপারে আর বিষদ ব্যাখ্যার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়না।

আজ পর্যন্ত কোনো দুর্ঘটনা ঘটার পর দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিৎ করা যায়নি। দোষীরা ধরা ছোড়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। বড়জোর সারেং-সুকানিকে দুই, চার, ছয় মাসের হাজতবাস, অত:পর খালাস। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আজ পর্যন্ত আইনের আওতায় আনা যায়নি।শাস্তিতো পরের কথা।

খবরে প্রকাশ, পিনাক-৬এর কোনো ফিটনেস ছিল না। প্রশ্ন হলো, একটি ফিসনেসবিহীন লঞ্চ দিনের পর দিন কিভাবে এরকম একটি গুরুত্বপূর্ণ রুটে যাতায়াত করলো। এখানে বিআইডব্লিউটিএর কি কোনো দায় নেই?

১৯৭৬ সালের বাংলাদেশ শিপিং অধ্যাদেশ এখানে অকার্যকর। আইন না মেনে চলছে নৌপথের বহু যানবাহন। আইনের দুই অধ্যায়ে বর্ণিত নিবন্ধন ও সার্ভে সংক্রান্ত বিধান অনেক ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না।

৩ ধারা অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ নৌরুটে চলাচলকারী প্রত্যেকটি যানবাহনের নিজস্ব ডিজাইন ও প্লান থাকার কথা। সেই ডিজাইন পাশ হওয়ার পর পরিদর্শন জাহাজ পরিদর্শন করা হয়। এসব পদ্ধতি অনুসরণ করার পর একটি জাহাজকে বৈধতার সার্টিফিকেট দেওয়া হয়।

৫ ধারায় বর্ণিত পরিদর্শন সংক্রান্ত বিধান নিয়মিত মেনে চলার কোনো নজির নেই। মাঝে মাঝে পরিদর্শন করা হয় বটে। কিন্তু তাতে পরিদর্শনের আসল উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। কারণ, এসব পরিদর্শনে পরিদর্শনকারীর উদ্দেশ্য থাকে ভিন্ন। আইনের উদ্দেশ্য ও ব্যক্তি স্বার্থ এখানে ভিন্ন। পরিদর্শনকারী কর্তৃপক্ষ যেকোনো সময় যেকোনো যানবাহন পরিদর্শন করতে পারেন ও সে অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেন।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আজপর্যন্ত কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। আর যদি পরিদর্শন ঠিকভাবে হতো তাহলে যথাযথ ফিটনেসবিহীন নৌযান কীভাবে চলাচল করে? কাজেই দায়-দায়ীত্ব সারেং-সুকানির যতোটুকু তার চেয়ে ঢের বেশি এসব দেখার দায়িত্বে নিয়োজিত কর্তৃপক্ষের।

এছাড়া আইনের ৯ ধারায় বর্ণিত যে সার্টিফিকেটের কথা বলা আছে, তাকি পিনাক-৬ এর ছিল? যদি থেকে থাকে তবে তা কি যথাযথ পদ্ধতি ও নিয়ম অনুসরণ করে দেয়া হয়েছিল? আর যদি না থেকে সে ক্ষেত্রে কেন নেই? এসব দেখার দায় কার?

৩৬ ধারায় বর্ণিত সারেং বা চালকদের জন্য যে যোগ্যতার সার্টিফিকেটের কথা বলা আছে তাও কি ছিল ওই লঞ্চের চালকের?

ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রি নিয়ে লঞ্চটি কীভাবে ঘাট ত্যাগ করলো? ঘাটকর্তৃপক্ষ কি বিআইডব্লিউটি’এর আওতাভুক্ত নয়? এরকম আরো বহু প্রশ্ন করা যায় আইনের আওতার মধ্য থেকেই। যতো ধারা ততো প্রশ্ন। কিন্তু কোনো প্রশ্নেরই উত্তর নেই।

আইনতো বইয়ের কথা, এসব কথা বইয়েই শোভা পায়। আমাদের দেশে বাস্তবের সাথে মিলালেই যতো গণ্ডগোল। তাই সে সব কথা থাক।

প্রিয় সহকর্মী আজাদ তার ফেসবুকে স্টাটাস দিয়েছে, ‘মুন্সিগঞ্জের ডুবে যাওয়া লঞ্চের যাত্রীদের আত্মা তীরে উঠে এসেছে। তারা বাস-ট্রাকের ছাদে চড়ে রাজধানীতে পৌঁছে গেছে; তাদের প্রাথমিক গন্তব্যস্থল অফিস-বাসা। শুনলাম বিকেলে তারা প্রেসক্লাবের সামনে আত্মাবন্ধন করবে। তারপর মিশে যাবে তুবা গ্রুপের আন্দোলনরত শ্রমিকদের সাথে, আগামীকাল তারা সংসদে যাবে, বিরোধীদলের ফাঁকা আসনগুলোতে বসতে।

তারপর প্রধানমন্ত্রী, নৌমন্ত্রীর অফিসের ফাইলের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকবে, আর হুহু করে কাঁদবে, কিন্তু কেউ শুনতে পারবে না। কখনোবা তারা মন ভালো করার জন্য মিশে যাবে সময়ের স্রোতে।“

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর