লঞ্চের খোঁজ মেলেনি : স্বজনদের বিক্ষোভ

PinakOvijan2মুন্সীগঞ্জে পদ্মা নদীতে লঞ্চডুবির পর প্রায় এক দিন পেরিয়ে গেলেও নৌযানটির অবস্থান সনাক্ত না হওয়ায় এগোচ্ছে না উদ্ধার কাজ।

ডুবে যাওয়া লঞ্চ এমএল পিনাক-৬ নদীর ঠিক কোন এলাকায় রয়েছে তা চিহ্নিত করতে চট্টগ্রাম থেকে জরিপ-১০ নামের একটি ‘সার্ভে ভেসেল’ মাওয়ায় আসছে। এছাড়া উদ্ধারকারী জাহাজ নির্ভীক সকালে মাওয়ায় পৌঁছে অভিযানে যোগ দিয়েছে।

এদিকে নিখোঁজ যাত্রীদের সন্ধান না পেয়ে উদ্ধারকাজে অবহেলার অভিযোগ এনে মঙ্গলবার সকালে প্রায় এক ঘণ্টা মাওয়া ঘাট অবরোধ করে রাখেন বিক্ষুব্ধ স্বজনরা।

সোমবার বেলা ১১টার দিকে কাওড়াকান্দি থেকে তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে মাওয়া ঘাটে যাওয়ার পথে তীব্র স্রোতের মধ্যে ডুবে যায় যাত্রী পারাপরের লঞ্চ এমএল পিনাক-৬।

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল জানান, লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার পর স্পিডবোটের মাধ্যমে শতাধিক যাত্রীকে উদ্ধার করা হয়।

স্বজনদের অভিযোগের ভিত্তিতে ১১৮ জন নিখোঁজ যাত্রীর একটি তালিকাও তৈরি করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসক জানান।

সোমবার দুর্ঘটনার পরপরই নূসরাত জাহান হীরা (২০) নামের এক মেডিকেল ছাত্রী এবং আনুমানিক ৫০ বছর বয়সী এক নারীর লাশ পাওয়া যায়।এরপর আর নতুন কোনো মৃতদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি বলে উদ্ধারকর্মীরা জানান।

এদিকে নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনদের আহাজারিতে সোমবার দুপুরের পর থেকেই ভারী হয়ে ওঠে পদ্মা তীরের পরিবেশ। সারারাত অপেক্ষার পরও উদ্ধারকাজে কোনো অগ্রগতি না দেখে তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার পর মাওয়া ঘাটে ঢোকার রাস্তায় ভ্যান উল্টে ফেলে অবরোধ করেন।

এ সময় শ’ দেড়েক বিক্ষুব্ধকে মাওয়া ঘাটের মুখে পদ্মা রেস্ট হাউসের সামনে দাঁড়িয়ে শ্লোগান দিতে দেখা যায়। বিআইডব্লিউটির নৌযান লক্ষ্য করে তাদের কেউ কেউ ঢিলও ছোড়েন।

বিক্ষোভে অংশ নেয়া ফয়সল আহমেদ জানান, তার ভাই ফাহাদ (২৪) পিনাক-৬ লঞ্চে ছিলেন। তার কোনো খোঁজ এখন পর্যন্ত তিনি পাননি।

“এই উদ্ধারকারী দল আসলে কোনো কাজ করছে না। তাদের অবহেলার কারণে আমরা স্বজনদের কোনো খবর পাচ্ছি না।”

এই অবরোধের কারণে ঘাটে যানবাহন ঢুকতে না পারায় প্রায় আধা কিলোমিটার সড়কে গাড়ির জট সৃষ্টি হয়। তবে জেলা প্রশাসকসহ কর্মকর্তারা এসে বিক্ষুব্ধ স্বজনদের বুঝিয়ে সরিয়ে নিলে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে আবার ঘাটে যানবাহন ঢোকা শুরু হয়।
Mawa-1
উদ্ধার অভিযানের নেতৃত্বে থাকা বিআইডব্লিটিএর নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের পরিচালক মো. জসিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। স্পিডবোট, ওয়ার্ক বোট, টাগবোটসহ বিভিন্ন ধরনের জলযান নিয়ে চাঁদপুর থেকে মাওয়া পর্যন্ত অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে, যাতে ভেসে যাওয়া লাশের সন্ধান পাওয়া যায়।”

তবে উত্তাল নদীতে এখন পর্যন্ত পিনাক-৬ এর অবস্থান সনাক্ত করতে না পারায় উদ্ধার অভিযানে কার্যত কোনো অগ্রগতি নেই।

রাতে বোটে করে নদীতে তল্লাশি চলেলেও সকাল ৬টা থেকে আবারো লঞ্চের অবস্থান চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়। বিআইডব্লিউটিএ, নৌবাহিনী ও ফায়সার্ভিসের স্পিড বোটে করে ১৩ জন ডুবুরি লঞ্চটি খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

বিআইডব্লিউটিএর পরিচালক শফিকুল হক জানান, মাওয়া লঞ্চ ঘাট থেকে পৌনে ১ কিলোমিটার দূরে লৌহজং চ্যানেলে লঞ্চটি ডুবেছে ধরে নিয়ে ‘সাইড স্ক্যানার সোনার’ দিয়ে নৌযানটি খোঁজা হচ্ছে।

উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম, নির্ভীকসহ ১৫টি নৌযান সেখানে রয়েছে। কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর উদ্ধারকর্মীরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছেন।
Mawa-2
“নদীর ওই এলাকায় পানির গভীরতা ৮০ থেকে ৯০ ফুট। সেখানে পানিতে একটি প্রবল ঘূর্ণাবর্ত রয়েছে। বেঁচে যাওয়া যাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলেই ওই জায়গাটি তল্লাশির জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে।”

এদিকে বর্ষা মৌসুমে নদীতে প্রচুর পলি আর বালি থাকে বলে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে লঞ্চটি খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনাও ধীরে ধীরে কমে আসছে।

উদ্ধারকারীরা বলছেন, যতো বেশি সময় পার হবে, স্রোতের টানে নদীর তলদেশে বহুদূর সরে যাবে ডুবে যাওয়া লঞ্চ। আর সেটি কোথাও আটকে গেলে দ্রুত পলির নিচে ঢাকা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে লঞ্চটির অবস্থান সনাক্ত করা বা লাশ উদ্ধার কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

দ্রুত লঞ্চটি সনাক্ত করতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জরিপ-১১ নামে একটি সার্ভে ভেসেল আনা হচ্ছে বলে জানান নৌমন্ত্রী শাজাহান খান।

সকালে মাওয়া ঘাটে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “গতকাল থেকে লঞ্চটিকে ট্রেস করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু আপনারা তো দেখছেন নদীর অবস্থা। যে জায়গায় লঞ্চটি ডুবেছিল, সেখান থেকে দূরে সরে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এছাড়া স্রোতের কারণে পলির তলায় তলিয়ে যাওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। ”

মন্ত্রী বলেন, জরিপ জাহাজটি নদীর ২৫০ মিটার গভীরেও অনুসন্ধান চালাতে পারে। জাহাজটি পৌঁছালে উদ্ধার তৎপরতা আরো গতিশীল হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তবে চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (হার্বার মেরিন) কমোডোর মো. শাজাহান চট্টগ্রামে বিডিনিউজ টেয়েন্টিফোর ডটকমের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদককে বলেন, জরিপ-১১ জাহাজটি নির্মাণাধীন। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে জরিপ-১০ নামের আরেকটি সার্ভে ভেসেল মাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছে।
Mawa-3
তিনি জানান, জরিপ-১০ মূলত বন্দর চ্যানেলে জরিপ কাজে ব্যবহার করা হয়। এর সোনার ইকুইপমেন্ট খুবই শক্তিশালী।

যেখানে লঞ্চ ডুবেছে, তার আশেপাশের ১০ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় নদীতে অনুসন্ধান চালানো হবে বলে নৌবাহিনীর উদ্ধারকর্মীরা জানান।

ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে উদ্ধার পাওয়া মিমজাল ইসলাম নামের এক যাত্রী মাওয়া ঘাটে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন,মাওয়ার কাছাকাছি এসে লঞ্চটি হঠাৎ করে কাত হতে যায় এবং অল্প সময়ের মধ্যে সেটি ডুবে যায়।

আরেক যাত্রী অফজাল হোসেন বলেন, নদীতে প্রচণ্ড ঢেউ ছিল। ঢেউয়ের আঘাতে লঞ্চের জানালা দিয়ে পানি উঠছিল। ঢেউয়ের পানি উঠতে উঠতে এক সময় লঞ্চটি আধা ডুবু হয়ে যায়।

এসময় লঞ্চের যাত্রীদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। যাত্রীরা এদিক-সেদিক ছুটোছুটি শুরু করলে লঞ্চটি পিছনের দিক প্রথমে তলিয়ে যায়। এরপর আস্তে আস্তে লঞ্চটি পদ্মার বুকে হারিয়ে যায়।

লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার সময় তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল প্রিন্স অব মেদিনি মণ্ডল নামের একটি লঞ্চ।

এই লঞ্চের যাত্রী রুবেল মাওয়া ঘাটে সাংবাদিকদের বলেন, লঞ্চটি ঢেউয়ের তোড়ে চোখের সামনে ডুবে যায়।

“নিজের লঞ্চে থেকে দেখছিলাম কিভাবে লঞ্চটি ডুবছিল। এ যেন টাইটানিকের সেই ডুবে যাওয়ার দৃশ্য। লঞ্চের পেছনের অংশটি আগে পদ্মার পানিতে ডুবে যায়। আস্তে আস্তে পুরো লঞ্চটিই প্রায় ৫/৭ মিনিট সময় নিয়ে ডুবতে থাকে। এ সময় যাত্রীরা যে যেভাবে পেরেছেন পদ্মায় লাফিয়ে পড়েছেন।”

লঞ্চডুবির সময় পাশ দিয়ে যাওয়া একটি ফেরি থেকে মোবাইল ফোনে এক ব্যক্তি একটি ভিডিও ধারণ করেন, যা পরে গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে আসে।

ওই ভিডিওতে দেখা যায়, মাঝারি আকৃতির দ্বিতল লঞ্চটি এক দিকে কাত হয়ে যায় এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে প্রবল ঢেউয়ের মধ্যে তলিয়ে যায়।

লৌহজং থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, লঞ্চের ধারণ ক্ষমতা ১২০ থেকে ১৫০ জনের মতো থাকলেও তাতে প্রায় ৩৫০ যাত্রী ছিলেন।

সোমবার উদ্ধার হওয়া দুটি লাশের মধ্যে নূসরাত জাহান হীরা (২০) মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কাদিরপুর গ্রামের নূরুল হকের মেয়ে। তিনি শিকদার মেডিকেল কলেজের এমবিবিএসের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। ঈদের ছুটি শেষে কলেজে ফিরছিলেন তিনি।

অন্যজনের পরিচয় জানা যায়নি। তবে তার বয়স আনুমানিক ৫০ বছর।

এদিকে বেলা যতো বাড়ছে, মাওয়া ঘাটে স্বজনহারা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। স্বজনদের খোঁজে রাতভর অর্ধশতাধিক লোক মাওয়া ঘাটের শেডের নিচে অবস্থান করেন। মঙ্গলবার সকালে সেই সংখ্যা তিনশ ছাড়িয়ে যায়।

বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ পাঁচ হাজার টাকা করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে নিহতদের দাফনের জন্য তাদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল।

বিডিনিউজ