পদ্মার মৃত্যু মোহনায় দোলে প্রতিটি লঞ্চ!

padmaaকাওড়াকান্দি (মাদারীপুর) ঘাট থেকে লঞ্চ ছেড়েছে ঘণ্টা দেড়েক আগে। আর শ’ দেড়েক গজ পার হলেই মাওয়া ঘাটে নোঙর করবে। বাড়ী থেকে পা বাড়ানোর সময় মায়ের অশ্রু সজল চোখ হৃদয়পটে ভাসছিল বারবার। ফের স্বজনদের চোখের আড়াল হতে যাওয়ায় মন খারাপ হলেও ঢাকায় ফিরে পড়াশোনা আর কাজের পরিকল্পনায় মগ্ন থাকতে চাইছিলাম।

হঠাৎ কান্নার শব্দ কানে বেজে উঠল। প্রথমে গুরুত্ব দিইনি। ভাবলাম কোনো শিশুর আবদার পূরণ না হওয়ায় হয়তো চিৎকার করে উঠছে। কিন্তু মুহূর্তেই আচমকা ঝাঁকুনিতে কাত হয়ে পাশের যাত্রীর গায়ের ওপর গিয়ে পড়লাম।

সম্বিত ফিরে পেতেই দেখি পাশের ভীত-সন্ত্রস্ত্র যাত্রীদের মুখ শুকনো কাঠ হয়ে হয়ে গেছে। দু’হাত ওপরে তুলে অনর্গল দোয়া আওড়ে যাচ্ছেন। পেছনের কান্নার শব্দটা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে লঞ্চের পরিবেশটা আরও ভারি হয়ে গেল।

লঞ্চটা এদিক-ওদিক ভয়াবহ রকমে দুলছে, যে কোনো সময়ই ডুবে যেতে পারে। ভয়ে আতঙ্কিত যাত্রীদের স্থির হয়ে বসার পরামর্শ দিচ্ছিলেন লঞ্চের কর্মচারীরা।

গ্রামের মাটি-জলে মানুষ। তাই সাঁতারটা শিখে নিয়েছিলাম শৈশবেই। সহযাত্রীকে জিজ্ঞেস করলাম সাঁতার জানেন কিনা। হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ায় কিছুটা নিশ্চিত হলাম।

কিন্তু ভয়মুক্ত হতে পারলাম না। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি বেশিরভাগ যাত্রীই নারী এবং শিশু। যারা দাদা অথবা নানার বাড়ীতে ঈদ করতে এসেছেন। এদের বেশিরভাগই যে শহরে বড় হচ্ছে এবং সাঁতার অজানা সে কথা মনে হতেই শঙ্কায় গা শিউরে উঠল।

আমার এবং সহযাত্রীদের ভাগ্যটা নিশ্চিতই সুপ্রসন্ন ছিল। তাই আল্লাহ-খোদা, ঈশ্বর-ভগবানের নাম জপতে জপতে আমাদের লঞ্চটা নিরাপদেই তীরে ভিড়ল।

এ ঘটনা রোববার বেলা এগারটার।

এর মাত্র একদিন পর সোমবার। ঠিক একই যায়গায় একই সময়ে এবং একই গন্তব্যেরই পিনাক-৬ নামের একটি লঞ্চ নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে প্রায় তিনশ’ যাত্রী নিয়ে।

এ প্রতিবেদন যখন লিখছি তখন মাত্র দু’টি লাশ উদ্ধার হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের হিসাব মতে, নিখোঁজ রয়েছে আরও শতাধিক। লঞ্চটিকে এখনো শনাক্ত করা যায়নি।

আমাদের মতো ‘ভাগ্য’ কিংবা পিনাক-৬ এর যাত্রীদের মতো ‘দুর্ভাগ্য’ নিয়ে এভাবেই প্রতিদিনই প্রাণ হাতে নিয়ে পদ্মা পার হয় দক্ষিণবঙ্গের ২১টি জেলার মানুষ। জীবন ও জীবিকার প্রয়োজনে যাদের এ ছাড়া আর কোনো গত্যন্তরও নেই।

বর্ষার মৌসুমে পদ্মা যে সর্বনাশা রূপ ধারণ করে সে কথা সবারই জানা। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়, অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ বা স্থানীয় প্রশাসনেরও অজানা থাকার কথা নয়।

কিন্তু কয়েক লাখ মানুষের জীবন নিয়ে ভাববার সময় কোথায় তাদের। বাংলাদেশের যে কয়টি লঞ্চ-ফেরি ঘাট আছে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত এ নৌ-রুট।

রোববার মাওয়া ঘাটের স্থানীয় কয়েক জনের সাথে কথা বলে জানা যায়, চলাচলের অযোগ্য ও বাতিল লঞ্চ-ফেরিগুলোই এখানে পারাপারের মাধ্যম। স্পিডবোট থাকলেও আকাশ চুম্বি ভাড়া কারণে সেটা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। ডাকাতির ভয়ে উচ্চবিত্তরাও খুব একটা স্পিডবোটে পার হন না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত খননের অভাবে পদ্মার গতিপথ পরিবর্তনের ধরন অনেকটা অস্বাভাবিক। বর্ষা মৌসুমে মাওয়া ঘাট থেকে ১০০-২০০ গজ দূরের এ অংশে নদীর স্রোত অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বাতাস একটু জোরালো হলেই সৃষ্টি হয় বিপজ্জনক পরিস্থিতির।

সরেজমিনে দেখা যায়, বেশিরভাগ লঞ্চেরই ফিটনেস তো দূরের কথা বসার সিটই ঠিক নেই।

সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় বেশিরভাগ লঞ্চেই ডুবে যাওয়া যাত্রীদের সহায়তাকারী ‘লাইফবয়া’ ‌বা ‘লাইফজ্যাকেট’ নেই। তাই সাঁতার না জানলে যাত্রীদের মৃত্যু অনেকটা নিশ্চিতই বলা যায়।

স্থানীয় আরও কয়েকজন জানান, অন্য সময় চলাচল স্বাভাবিক থাকলেও ঈদের সময় যাত্রীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু তাদের নিরাপদ পারাপারের জন্য বাড়ে না লঞ্চের সংখ্যা। নিদেনপক্ষে মেরামতের খরচাটুকুও করতে নারাজ লঞ্চ মালিকরা।

ঈদের সময় অধিক মুনাফালোভী লঞ্চ মালিকরা ধারণ ক্ষমতার কয়েকগুণ যাত্রী লঞ্চে তোলেন। পুলিশ ও প্রশাসনের লোক উপস্থিত থাকলেও তাদের কাজ কেবল দাঁড়িয়ে থেকে ‘চা-পান খাওয়া ও সিগারেট ফুঁকা’।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করেই এ সর্বনাশা কর্মকাণ্ড চালায় লঞ্চ মালিক ও ইজারাদাররা।

জানা যায়, অবহেলিত হলেও সবচেয়ে বেশি নৈরাজ্য হয় মাওয়া-কাওড়াকান্দি-মাঝিকান্দি ঘাটে।

ইজারাদার ও স্থানীয় ক্যাডার বাহিনী যেভাবে পারছে যাত্রীদের জিম্মি করে হাতিয়ে নিচ্ছে ন্যায্য ভাড়ার কয়েকগুণ টাকা। অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কেড়ে নিচ্ছে মূল্যবান জিনিসপত্র। যেন দেখার কেউ নেই।

স্থানীয়দের অভিযোগ, অসহায় যাত্রীরা যাদের কাছে নালিশ জানাবে সেই পুলিশের সামনেই রীতিমত ডাকাতির শিকার হচ্ছেন হাজারো যাত্রী।

ঘাট ভাড়া টিকেটে লেখা দুই টাকা। কিন্তু নেওয়া হয় জনপ্রতি ১০ টাকা। অনেক যাত্রীকে আবার টিকেটও দেওয়া হয় না। লঞ্চের ভাড়া টিকেটে লেখা ৩২ টাকা। আদায় কর‍া হয় ৪০-৫০ বা যার কাছ থেকে যা নেওয়া যায়। পাশে পুলিশ দাঁড়িয়ে থাকে ঠিকই, কিন্তু তারা যেন যাত্রী সাধারণের জন্য নয়, ইজারাদারদের জন্য। কোনো যাত্রী দুই টাকার ভাড়া ১০ টাকা নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে উল্টো তাকেই ধমকে দিচ্ছে পুলিশ!

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর