পদ্মাপাড়ে শোকের মাতম : প্রচণ্ড ঢেউ-তীব্র স্রোতে উদ্ধার বিঘ্ন

mirazt৩ শতধিক যাত্রী নিয়ে লঞ্চ ডুবির পর এখন পদ্মাপাড়ে চলছে স্বজনদের শোকের মাতম। এর আগে সোমবার সকাল ১১টার দিকে মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে পদ্মা নদীতে লঞ্চ ডুবির পর ১৩ ঘণ্টায় মাত্র ২ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গতকাল মাওয়া ঘাটের কাছাকাছি নদীতে লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার পর শতাধিক যাত্রীকে জীবীত উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজদের মধ্যে স্থানীয় প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করেছেন ৯১ জনের স্বজন। তবে প্রচণ্ড ঢেউ আর তীব্র স্রোতের কারণে ডুবে যাওয়ার পর ১৩ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও লঞ্চটির অবস্থান সনাক্ত হয়নি।

নিখোঁজ যাত্রীদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পদ্মা তীর। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ঢাকা অঞ্চলের সহকারী পরিচালক মাহফুজুর রহমান আকন্দ বলেন, তাদের ডুবুরি দল স্পিড বোট ও ট্রলারে করে নদীতে তল্লাশি চালাচ্ছেন। কিন্তু প্রবল স্রোত আর বাতাসের কারণে তাদের কাজ কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। দুর্ঘটনার পর সোনার ব্যবহার করে পানির নিচে লঞ্চটি সনাক্ত করার চেষ্টা চালানো হলেও তাতে সফল হননি উদ্ধারকর্মীরা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জনান, ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণেই লঞ্চটি ডুবে গেছে বলে উদ্ধার পাওয়া আরেক যাত্রী বলেন। লঞ্চটি ডুবে যাওয়ার সময় তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল প্রিন্স অব মেদিনি মণ্ডল নামের একটি লঞ্চ। এই লঞ্চের যাত্রী রুবেল মাওয়া ঘাটে সাংবাদিকদের বলেন, লঞ্চটি ঢেউয়ের তোড়ে চোখের সামনে ডুবে যায়। নিজের লঞ্চে থেকে দেখছিলাম কিভাবে লঞ্চটি ডুবছিল। এ যেন টাইটানিকের সেই ডুবে যাওয়ার দৃশ্য। লঞ্চের পেছনের অংশটি আগে পদ্মার পানিতে ডুবে যায়। আস্তে আস্তে পুরো লঞ্চটিই প্রায় ৫-৭ মিনিট সময় নিয়ে ডুবতে থাকে। এ সময় যাত্রীরা যে যেভাবে পেরেছেন পদ্মায় লাফিয়ে পড়েছেন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উদ্ধার কাজে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দিলেও তীব্র স্রোত ও ঢেউয়ের কারণে অভিযান ব্যাহত হয় বলে উদ্ধারকর্মীরা জানান। দুর্ঘটনার পরপরই ট্রলার ও স্পিডবোট নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা উদ্ধার কাজ শুরু করেন। পরে কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযানে যোগ দেন। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্ত ও নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় দুটি তদন্ত কমিটি করেছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান। তিনি জানান, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের চার সদস্যের তদন্ত কমিটির নেতৃত্বে আছেন সংস্থার প্রকৌশলী (শিপ সার্ভেয়ার) নাজমুল হক। আর নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সাত সদস্যের কমিটির প্রধান করা হয়েছে যুগ্ম সচিব নুরুর রহমানকে।
লঞ্চডুবির খবর পেয়েই প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান মাওয়ায় ছুটে যান। কয়েক ঘণ্টা অবস্থান করে উদ্ধার তৎপরতা তদারকি করেন তিনি। পরে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। ডুবে যাওয়া লঞ্চ থেকে উদ্ধার পাওয়া মিমজাল ইসলাম নামের এক যাত্রী মাওয়া ঘাটে বলেন, মাওয়ার কাছাকাছি এসে লঞ্চটি হঠাৎ করে কাত হতে যায় এবং অল্প সময়ের মধ্যে সেটি ডুবে যায়।

রাত ১০টার দিকে উদ্ধারকারী জাহাজ রুস্তম ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর লঞ্চের অবস্থান সনাক্ত করতে নতুন করে কাজ শুরু হয় বলে বিআইডব্লিউটিএর নৌ সংরক্ষণ ও পরিচালন বিভাগের পরিচালক মো. জসীম জানান। তিনি বলেন, এমভি রুস্তমের নেতৃত্বে ১৫টি নৌযান নিয়ে লঞ্চের অবস্থান চিহ্নিত করার কাজ চলছে। অন্য উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয়ও মাওয়ার পথে রয়েছে বলেও কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

লৌহজং থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেন জানান, সোমবার বেলা ১১টার দিকে কাওড়াকান্দি থেকে মাওয়া আসার সময় নদীর লৌহজং টার্নিং পয়েন্টে তীব্র স্রোতের মধ্যে ডুবে যায় এমএল পিনাক-৬ নামে লঞ্চটি। লঞ্চের ধারণ ক্ষমতা ১২০ থেকে ১৫০ জনের মতো থাকলেও তাতে প্রায় ৩৫০ যাত্রী ছিলেন। দুর্ঘটনার পর মাওয়া ঘাট ও আশপাশে থাকা স্পিড বোটগুলো ঘটনাস্থলে গিয়ে নদীতে ঝাপিয়ে পড়া শতাধিক যাত্রীকে উদ্ধার করে। ওসি জানান, এ সময় ১১০ জনকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে ২ নারী মারা গেছেন।

নিহত নূসরাত জাহান হীরা (২০) মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার কাদিরপুর গ্রামের নূরুল হকের মেয়ে। তিনি শিকদার মেডিকেল কলেজের এমবিবিএসের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ছিলেন। ঈদের ছুটি শেষে কলেজে যাচ্ছিলেন তিনি। অন্যজনের পরিচয় জানা যায়নি। তবে তার বয়স আনুমানিক ৫০ বছর। নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে এক লাখ ৫ হাজার টাকা করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে নিহতদের দাফনের জন্য তাদের প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল।

ডুবে যাওয়া এ লঞ্চে ফরিদপুর সদরপুর উপজেলার সাতরশি গ্রামের একই পরিবারের ৭ জন ছিলেন, যাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তারা হলেন- মো. রুবেল, তার স্ত্রী শিমু, বড় মেয়ে ফাইজা (৭) ছোট মেয়ে ফাতেহা (৩), সোবাহান মাতুব্বর (৩৫), তার স্ত্রী জিয়াসমিন আক্তার (২৫) ও সন্তান ইভান (৫)। তাদের কাছে থাকা ৪টি মোবাইলই বন্ধ রয়েছে বলে তাদের অভিভাবক মোহাম্মাদ মাতুব্বর ও আলেম মিয়া জানান। লঞ্চে ওঠার সময় কাওড়াকান্দি ঘাট থেকে বাড়ির লোকজনের সঙ্গে মোবাইলে কথা বলেছিল ওরা। তারপর থেকেই মোবাইল বন্ধ পাচ্ছি।

এবিনিউজ