লৌহজংয়ে জেগে ওঠা পদ্মার চর দখলে মরিয়া নানা মহল

lauCharরক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা, জমির প্রকৃত মালিক ও ভূমিহীনদের ক্ষোভ
মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে জেগে ওঠা পদ্মার চরের জমি দখল করতে উঠেপড়ে লেগেছে স্থানীয় প্রভাবশালীসহ বিভিন্ন মহল। এ ছাড়া বড় বড় রাঘব বোয়ালের নজরও এড়ায়নি। বিভিন্ন কম্পানি ও সমিতির নাম দিয়ে জমি পেতে প্রশাসনের কাছে লিজের জন্য আবেদন করেছে ঢাকার বড় বড় কম্পানি। ফলে একদিকে জমির প্রকৃত মালিকরা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছেন, অন্যদিকে ভূমিহীনদেরও বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে চরের জমির প্রকৃত মালিকদের মধ্যে প্রচণ্ড ক্ষোভ বিরাজ করছে।

এদিকে হাইকোর্টের মামলার রায়ে খাজনা নেওয়ার আদেশ দেওয়া হলেও সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস খাজনা না নেওয়ায় ভূমির মালিকরা হতাশার মধ্যে পড়েছেন। এসব জমির সুষ্ঠু বণ্টন না হলে এ নিয়ে রয়েছে বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা। তবে জেলা প্রশাসক বলেছেন, কোনো স্বার্থান্বেষী মহল যাতে কোনো ফায়দা লুটতে না পারে সে ব্যাপারে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে।

জানা যায়, ১৯৯৪-৯৫ সালের দিকে লৌহজংয়ের বিস্তীর্ণ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। উপজেলা সদরসহ প্রায় ৪১টি গ্রাম বিলীন হয়ে যায়। নিশ্চিহ্ন হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সরকারি খাদ্য গুদাম, থানা ভবন, উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স, মসজিদ, স্কুল, মাদ্রাসা, সিনেমা হল, দিঘলীবাজারসহ অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। ভাঙনে লণ্ডভণ্ড এই উপজেলার পদ্মায় কয়েক বছরের মধ্যেই বিশাল চর জেগে ওঠে। তখন থেকেই একটি প্রভাবশালী মহল এসব জমি নিজের দখলে নিয়ে নেয়।

ফলে জমির প্রকৃত মালিকরা তাঁদের জমি ফেরত পেতে প্রশাসন তথা সরকারের কাছে বছরের পর বছর ধরে ধরনা দিয়ে দিচ্ছেন। সরকারি নিয়মানুযায়ী কারো জমি নদীতে বিলীন হলে তা সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় ভূমি অফিসকে লিখিতভাবে জানাতে হয়। এরপর এই জমি ৩০ বছরের মধ্যে জেগে উঠলে তা ওই মালিককেই আবার ফিরিয়ে দিয়ে খাজনা চালু করা হয়। কিন্তু আইনটি সম্পর্কে না জানায় এখানকার লোকজন ভূমি অফিসে নদীতে জমি ভাঙনের কথা লিখিতভাবে তেমন একটা জানায়নি। প্রশাসনও ওই সময় এ ব্যাপারে জনগণকে অবহিত করেনি।
lauChar
লৌহজংয়ে পদ্মায় জেগে ওঠা চরের জমির খাজনা নেওয়ার দাবিতে উপজেলা প্রশাসন কার্যালয় ঘেরাও করে স্থানীয়রা।

ফলে জেগে ওঠা এসব জমি ২০০৮ সালের দিকে ২৯টি মৌজায় দিয়ারা জরিপ শুরু হয়। অতিসম্প্রতি ২১টি মৌজার দিয়ারা জরিপ গেজেটের মাধ্যমে প্রকাশ করে এসব জমি খাসজমিতে রূপান্তর করা হয়। আরো আটটি মৌজার দিয়ারা জরিপ খাসজমি হিসেবে গ্যাজেট আকারে প্রকাশের অপেক্ষায় আছে বলে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়।

স্থানীয় প্রশাসন এসব জমি লিজ বা ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়ে দরখাস্ত আহ্বান করে। তবে যাদের নামে আগে জমির রেকর্ড ছিল তাদের অগ্রাধিকারভাবে দীর্ঘমেয়াদি লিজ দিয়ে বাকি জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণের ব্যবস্থা রাখা হয়। ইতিমধ্যে অনেক প্রকৃত মালিক ও ভূমিহীন এই ভূমি বরাদ্দের জন্য আবেদন করেছেন। একটি বেসরকারি এনজিও এই আবেদন জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিহীনদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। কিন্তু প্রভাবশালী মহল অপপ্রচার ও গুজব ছড়িয়ে চরের জমি নিজেদের ভোগ দখলে রাখতে ফায়দা লোটার অপচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। তারা লোকজনের মধ্যে নানা প্রকার গুজব ছড়িয়ে তাদের অন্দোলনে নামিয়ে একটা তালগোল পাকিয়ে নিজেরা বছরের পর বছর জমি ভোগ দখল করতে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এ নিয়ে অতিসম্প্রতি লৌহজং উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কহিনুর সিকদারের ঢাকার অফিসে একটি সভা হয়। সভার সিদ্ধার মতে, ইউএনও অফিস ঘেরাও ও মানববন্ধন করে এসব জমি যাতে লিজ দিতে না পারে তাতে বাধাগ্রস্ত করার পরিকল্পনা হয়। যার ফলে গত ২৯ জুন রবিবার একটি মহল লৌহজং ইউএনও অফিস ঘেরাও ও মানববন্ধন করে। তবে কহিনুর সিকদার সভা করার কথা স্বীকার করলেও ইউএনও অফিস ঘেরাও করার কথা অস্বীকার করেন।

তবে জেগে ওঠা চরের জমির প্রকৃত মালিকরা তাঁদের জমি সরকারের কাছ থেকে লিজ নিতে অনীহা প্রকাশ করে চলেছেন। তাঁরা বলছেন, ‘আমাদের বাপ-দাদার রেকর্ডকৃত জমি আমরা কেন লিজ নিতে যাব। বরং দিয়ারা জরিপ বাতিল করে খাজনা চালুর মাধ্যমে এসব জমি আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হোক।’

এ ব্যাপারে কোরহাটি গ্রামের মারফত আলী দেওয়ানের ছেলে এস এম আলসাম বলেন, ‘চরের টেউটিয়া, ঝাউটিয়া ও কোরহাটি মৌজায় তাঁদের প্রায় ২২ একর জমি রয়েছে। বাপ-দাদার রেকর্ডভুক্ত জমি রেখে আমি কেন লিজ নিতে যাব। হাইকোর্টে মামলা করে নিজের পক্ষে রায় পেয়েছি। সে মতে খাজনা দিয়েছি। কিন্তু ২০১০ সালের পরে প্রশাসন এখন আর খাজনা নিচ্ছে না। জমির জন্য প্রাণ দিব কিন্তু কোনোমতেই খাসজমি মেনে নেব না।’

ভোজগাঁওয়ের বর্তমানে নাগেরহাটের বাসিন্দা আবদুস ছামাদ ভূঁইয়া বলেন, ‘জমি নিয়ে মামলা করে নিজেদের পক্ষে রায় পেয়েছি। কিন্তু প্রশাসনের অসহযোগিতার কারণে খাজনা দিতে পারছি না।’ তিনি আরো বলেন, ‘চরের হামিদ মাদবর, মোশারফ ব্যাপারীসহ অনেকেই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে শত শত একর জমি দখল করে খাচ্ছে। তাঁদের কারণে কেউ চরের জমিতে ফসল বুনে ঘরে তুলতে পারে না। হয় তারা ফসল জোর করে কেটে নিয়ে যায়, নতুবা তাদের ভাগ দিয়ে ফসল ঘরে তুলতে হয়। এসব দখলদার বাহিনী নিজেদের ফায়দা লুটতে প্রশাসনসহ নানা জায়গায় তদবির করে জটিলতা পাকিয়ে আমাদের জমির খাজনা নেওয়ার কাজ ঝুলিয়ে রাখছে।’ তবে হামিদ মাদবর জানান, এসএ রেকর্ডে তাঁর নামে সাড়ে ষোল একর জমি রেকর্ডভুক্ত থাকলেও তিনি তাঁর চেয়ে অনেক বেশি জমি ভোগ দখল করছেন।

প্রশাসনের কথা : লৌহজং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আবুল কালাম জানান, লৌহজং উপজেলার লৌহজং-টেউটিয়া ও গাঁওদিয়া ইউনিয়নের ২১টি মৌজা দিয়ারা জরিপের মাধ্যমে খাস করা হয়েছে। সরকারি গেজেট আকারে তা প্রকাশও করা হয়েছে। আরো কয়েকটি নদীভাঙনকবলিত ইউনিয়নের জেগে ওঠা চরের দিয়ারা জরিপ হয়েছে। এগুলোর রিপোর্ট গেজেট আকারে প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। জমির মালিকদের মধ্যে আইন সম্পর্কে একটা ভুল ধারণা রয়েছে। সরকারি বিধান অনুযায়ী যাদের জমি ভেঙেছে তাদেরকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দীর্ঘমেয়াদি লিজ দিয়ে বাকি জমি ভূমিহীন বা অন্যান্যের মধ্যে লিজ দেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে তাঁদেরকে জমি বাবদ সরকারে কোনো টাকা-পয়সা বা সেলামি দিতে হবে না। বরং তাঁরা চাইলে এ জমি যেকোনো সময় হস্তান্তর বা বিক্রি করতে পারবেন। কোনো একটা ভুল ধারণা থেকেই হয়তো তাঁরা সরকারি বরাদ্দ নিতে চাচ্ছেন না।

হাইকোর্ট থেকে খাজনা নেওয়ার আদেশ থাকলেও কেন তা নিচ্ছেন না- এমন প্রশ্নের জবাবে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বলেন, দিয়ারা জরিপ চলাকালে কোনো অফিস সে এলাকার খাজনা নিতে পারে না। সে কারণে ওই সময়ের সরকারি কর্মকর্তারা সম্ভবত খাজনা নেওয়া বন্ধ করে দেন। তিনি আরো বলেন, আপাতত লিজ প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়েছে। আগামী ৭ জুলাই সোমবার এ নিয়ে স্থানীয় এমপি অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি, জেলা প্রশাসক, ইউএনও, ভূমি অফিসের কর্মকর্তা, জমির মালিক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে লৌহজং উপজেলা পরিষদে একটি সভা আহ্বান করা হয়েছে। এখান থেকে সবাই যে সিদ্ধান্ত নিবে প্রশাসন সেভাবেই জমির মালিকদের জমি ফিরিয়ে দিবে।

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল জানান, অনেক চেষ্টায় দিয়ারা জরিপ সম্পন্ন করা হয়েছে। এখন আইন অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্তদের এই জমি যথাযথভাবে প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। কোনো অপপ্রচার ও গুজব ছড়িয়ে যাতে স্বার্থন্বেষী মহল ফায়দা লুটতে না পারে, সে ব্যাপারে সভা আহ্বান করা হয়েছে।

নদীভাঙনের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ যাতে তাদের ভূমি ফেরত পায় এবং খাজনা প্রদান করতে পারে এ ব্যাপারে স্থানীয় সংসদ সদস্য সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু সরকারি বিধি মোতাবেক খাজনা প্রদানের সুযোগ নেই। তবে ভূমি মালিকরা আবেদন করে ৯৯ বছরের জন্য লিজ অর্থাৎ মালিকানা গ্রহণ করতে পারেন। সে ব্যাপারেই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।

এদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক হুইপ অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি জানিয়েছেন, চরে যাদের জমিজমা ছিল তাদেরকে জমি ফিরিয়ে দিয়ে খাজনা চালু করার জন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ে তাঁর পক্ষ থেকে কম করে হলেও ১৫টি ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। সাবেক ভূমি প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিম হীরা টঙ্গীবাড়িতে এলে তাঁর কাছে খাজনা চালুর বিষয়টি জানালে তিনিও কথা দিয়েছিলেন জেগে ওঠা জমির খাজনা চালুর ব্যাপারে তিনি ব্যবস্থা নিবেন। কিন্তু আইনি জটিলতায় তা আর সম্ভব হয়নি। তবে এ নিয়ে আগামী সোমবার সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে বসে প্রকৃত জমির মালিকদের কিভাবে জমি ফিরিয়ে দেওয়া যায় এর সমাধান করা হবে।

সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে কাউকে সুযোগ দেওয়া হবে না। যাঁদের জমি রয়েছে তাঁরা অবশ্যই তাঁদের জমি ফেরত পাবেন। এ নিয়ে কোনো প্রকার গুজবে কান দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

মাসুদ খান-কালের কন্ঠ