মুন্সীগঞ্জের সফল চারণ সাংবাদিক সফিউদ্দিন আহমেদ

Shafi1পূরবী বসু: প্রতিদিনের চেনা যে মুখ, যাঁর উদ্দীপ্ত কণ্ঠস্বর, প্রশস্ত ললাট, দৃঢ় চিবুক, ঋজু চোয়াল, ঝাঁকড়া কালো চুল আর পুরু গোঁফ, বড় বড় পদক্ষেপে হেঁটে যাবার পরিচিত ভঙ্গি, সব কিছুই অতি চেনা, অতি জানা, তিনি যে আমাদের সকলের প্রিয়, অজাতশত্রু প্রিয়জন ছাড়া আর কেউ হতে পারেন, তাঁর-ও যে আলাদা আরেকটি পরিচয় থাকতে পারে, অন্যত্র এবং বৃহত্তর কোন কর্মক্ষেত্রে বহুদিন ধরে দীপ্ত চলাচল অব্যাহত রাখতে পারেন, থাকতে পারে তাঁর গর্ব করার মতো কোন অতীত বা মহত্তর কোন দাবির সঙ্গে সংযুক্তি, এটা কখনো ভেবে দেখিনি। তাঁকে কেবল, এবং একাস্ত-ই কেবল আমাদের সকলের ভালোবাসার মানুষ, কাজ-পাগল ‘সফি ভাই’ বলেই জানতান আমরা। আর যেন কিছু নন, আর যেন কেউ ছিলেন না তিনি আমাদের কাছে, তখন, যখন মুন্সীগঞ্জ শহরে স্কুলে পড়ি আমরা। তাঁকে ভালো করে জানার সুযোগ এসেছে আরো পরে, যখন তাঁর কর্মকা- এবং অসীম সাহসের বিস্তারিত সংবাদ জানতে পারি। কিন্তু সেসব অনেক পরের কথা।

সেই অতি ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি সফি ভাইকে, যখন আমরা সবে শিশু_ ছানা, ননী, সন্ধ্যা, মমতাজ, পারুল, আরিফ, আনোয়ার, প্রতিবেশি সব শিশুদের সঙ্গে ঘরের সামনে, অথবা পাড়ার রাস্তায় খেলে বেড়াই। মুন্সীগঞ্জের প্রতিটি ধূলিকণা সফি ভাই-এর চেনা। মহকুমার এ-মাথা থেকে ও-মাথা সমস্ত অঞ্চলটি হেঁটে, চষে বেড়াতেন তিনি। ক্রমাগত। আর তাঁর বিভিন্ন ধরনের কাজের জন্যে এখানে সেখানে যাবার পথে আমাদের বাসায় একবার সামান্য সময়ের জন্যে হলেও ঢুঁ মেরে যেতে ভুলতেন না। আর সেটা ঘটতে পারতো যখন তখন, দিনে-রাত্রে, সকালে, দুপুরে, বিকেলে, সন্ধ্যায়, রাতে। উঠান থেকেই ভারি গলায়, উচ্চৈস্বরে আমাদের নাম ধরে ডাক দিতেন তিনি। কখনো সখনো বাবাকেও ডাকতেন ডাক্তারবাবু এই নামে, যদি তখন বাবা ঘরে আছেন বলে টের পেতেন, তবেই। আমাদের সকল ভাইবোনকেই ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন তিনি, সকলের নাম-ই জানা ছিল তাঁর, সেই সঙ্গে কে কী পড়ছি ইত্যাদিও। আমাদের প্রত্যেককেই তিনি তুই বলে সম্বোধন করতেন। সফি ভাইয়ের সেই পরিচিত ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গভীর ও সুউচ্চ কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেই ঘর থেকে বেরিয়ে ছুটে যেতাম আমরা তাঁর কাছে। নতুন নতুন সংবাদ এবং ভবিষ্যতের সব আশার-স্বপ্নের কথা শোনাতেন তিনি আমাদের। সফি ভাই ছিলেন আমাদের কাছে মুন্সীগঞ্জ ও ঢাকার মেলবন্ধন। প্রায় প্রতিদিন-ই যেহেতু ঢাকা মুন্সীগঞ্জ করতে হতো তাঁকে, তিনি আমাদের কাছে দেশের সামপ্রতিক হালচাল, গতিপ্রকৃতি বোঝার মাধ্যম হয়ে পড়েছিলেন। এছাড়া চারদিকের নতুন নতুন, তরতাজা সব সংবাদ। এসব সফি ভাই ছাড়া কে দেবে আমাদের? সফি ভাই এলে তাই ছোটরা আমরা ঘিরে ধরতাম তাঁকে, মা ছুটে যেতেন রান্নাঘরে গরম চা বানিয়ে বিস্কুট বা লুচির সঙ্গে পরিবেশনের জন্যে। সফি ভাইয়ের কখনো সময় হতো, কখনো হতো না সেই চা-টা খেয়ে যাবার। যখন আসতেন, কখনো ঘরের ভেতর, কখনো উঠোনে একটা মোড়া টেনে বসে পড়তেন তিনি। ধূমায়িত চা পান করতে করতে কথা বলতেন। একটি অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। না থেমে অনবরত কথা বলতে পারতেন। একটানা সেই বাক্যালাপের আসরে বক্তা প্রধানত তিনি নিজেই। তাঁর পরনে বরাবর-ই থাকত অতি সাধারণ পোশাক। পায়ে বেশিরভাগ সময়েই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ধুলোয় ভরা স্যান্ডেল। গায়ে কখনো সাদা পায়জামা, খদ্দরের বা সাধারণ সুতির গেড়ুয়া পাঞ্জাবি, কিংবা হাল্কা-নীল অথবা সাদা শার্টের সঙ্গে কালো বা গাঢ় নীল রং-এর প্যান্ট। ঘাড়ে ঝুলতো উপচে পড়া কাগজপত্র আর বই-এ ঠাঁসা এক বিশাল কাপড়ের ঝুলি অথবা জরাজীর্ণ বহু পুরাতন এক চামড়ার ব্যাগ। শীতকালে সমস্ত গায়ে জড়ানো থাকতো চওড়া এক সুতি চাদর। বড়-সাদাসিধে, নিরহঙ্কার, সাম্যবাদী মানুষ ছিলেন সফি ভাই। তার কাছে ধনী-দরিদ্রের, হিন্দু-মুসলমানের, নেতা-কৃষকের কোন পার্থক্য ছিল না।Shafi1

আরো পরে বড় হয়ে সফি ভাই সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারি। জানতে পারি লৌহজং-এর বাসিন্দা সফিউদ্দিন আহমেদ স্কুলে পড়তে থাকাকালীন সময় থেকেই সাংবাদিকতা করেন, ছাত্র রাজনীতি করেন, চলি্লশের দশকে তিনি অবিভক্ত ভারতে কংগ্রেসে যোগ দেন, যখন মুসলিম লীগে যোগ দেওয়া তাঁর মতো মানুষের কাছে সকলের-ই প্রত্যাশা ছিল। সাপ্তাহিক জনযুদ্ধ নামক কাগজে সর্বপ্রথম সাংবাদিকতার চাকরি নেন তিনি ১৯৪৩ সালে। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের সময় সফিউদ্দিন আহমেদ ছিলেন ঢাকার জগন্নাথ কলেজের ছাত্র পরিষদের নেতা। তিনি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে গড়ে-ওঠা ভাষা আন্দোলনের পক্ষে সক্রিয় কর্মী ছিলেন, জগন্নাথ কলেজ ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এছাড়া ১৯৬২ সালে হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে যে ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তার সঙ্গে সম্পৃক্তির অভিযোগে অন্যান্য দেশবরেণ্য নেতাদের সঙ্গে তাঁকেও কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। পাকিস্তান রাজত্বকালে সাধারণ মানুষের দুর্দশা ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে সাংবাদিক হিসেবে তাঁর সাহসী ও বলিষ্ঠ ভূমিকার জন্যে তিনি বেশ কয়েকবার জেল খাটেন দেশের বিভিন্ন জেলার কারাগারে। জেলে থাকাকালীন অবস্থায় কয়েকবার তাঁর ওপর নির্দয় অত্যাচার ও নিপীড়ন-ও হয়। সফি ভাই গ্রাম ও মফস্বলের সাংবাদিকদের ন্যায্য বেতন, সম্মান ও বিবিধ সুযোগসুবিধার জন্যে আজীবন লড়ে গিয়েছেন। অকুতোভয় সফিউদ্দিন আহমেদ প্রেস কাউন্সিলের মাধ্যমে এইসব দাবিদাওয়া নিয়ে দিনের পর দিন যুদ্ধ করেছেন। দেশের নামকরা সব জাতীয় দৈনিকে, যেমন, আজাদ, ইত্তেফাক, সংবাদ, ইত্তেহাদ, মিল্লাত, আমার দেশ, বাংলাদেশ অবজার্ভার, মর্নিং নিউজ ইত্যাদি কাগজে তিনি কাজ করেছেন। ‘দৈনিক বাংলা’ বন্ধ না হয়ে যাওয়া পর্যস্ত সেখানেই সাংবাদিকতা করতেন তিনি। সফি ভাই বাংলাদেশ মফঃস্বল সাংবাদিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন। তিনি এই সংস্থায় ৭ বার প্রেসিডেন্ট ও তিনবার জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯৬২ সালে তিনি মুন্সীগঞ্জ প্রেস ক্লাব প্রতিষ্ঠা করেন, এবং প্রথম বছর সেই প্রতিষ্ঠানের প্রেসিডেন্টও ছিলেন। এছাড়া জাতীয় প্রেস ক্লাব ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার কর্মকা-ের সঙ্গে বরাবর যুক্ত ছিলেন।

আস্তর্জাতিক প্রেস কাউন্সিল আয়োজিত ২৬টি দেশের সাংবাদিকদের নিয়ে সংগঠিত সম্মেলনে সফিউদ্দিন আহমেদ বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি মুন্সীগঞ্জ থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘বিক্রমপুরবার্তা’র প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ছিলেন। সাংবাদিকতায় তাঁর বিশেষ অবদানের জন্যে তিনি বহুরকম পুরস্কার ও সম্মান লাভ করেন। এর মধ্যে জাতীয় পুরস্কার যেমন রয়েছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দেওয়া বেশ কিছু স্থানীয় পুরস্কার-ও রয়েছে। ১৯২২ সালে মুন্সীগঞ্জ মহকুমার লৌহজং থানায় জন্মগ্রহণ করে, তাঁর দীর্ঘ বর্ণিল কর্মময় জীবন পার করে দিয়ে অবশেষে ২০০৯ সালে আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় ও ভালোবাসার মানুষ সফি ভাই আমাদের ছেড়ে মৃত্যুর ডাকে সাড়া দেন। মুন্সীগঞ্জ প্রেসক্লাবের মিলনায়তন কক্ষের নামকরণ করা হয়েছে সাংবাদিক সফিউদ্দিন আহমেদ মিলনায়তন।

আকাশে অনেক গ্রহ, উপগ্রহ, তারা বা নক্ষত্র এবং উল্কা রয়েছে। এদের ভেতর কেবল তারাদের-ই মানে স্টার বা নক্ষত্রের-ই নিজস্ব আলো, উজ্জ্বল জ্যোতি আছে। অন্যান্য গ্রহ, উপগ্রহ এইসব তারার কাছ থেকে আলো ধার করে তাদের ভেতর বিদ্যমান প্রাণ-অপ্রাণ রক্ষা করে চলে। যেমন, আমরা যে গ্রহে বাস করি সেই পৃথিবী সূর্য নামক তারা বা নক্ষত্র থেকে তার আলো আহরণ করে, যা দিয়ে যা নিয়ে আমরা বেঁচে থাকি। দিনের আলোয় পৃথিবী থেকে আকাশের দিকে তাকালে আমরা কোন তারার অস্তিত্ব দেখতে পাই না। কেননা দিনের ফকফকে পরিচিত আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে তারাদের উপস্থিতি আমরা ভুলে যাই, তারারাও আকাশে আলোর গভীরে তখন নিজেদের লুকিয়ে রাখে। যখন সূর্য ডুবে যায়, অন্ধকার নেমে আসে চরাচরে, আস্তে আস্তে উজ্জ্বল তারা বা নক্ষত্রগুলো আবার ভেসে ওঠে আকাশে, যেই পাশে যেগুলো থাকা দরকার, ঠিক সেই পাশে, সেখানেই। এই নক্ষত্রদের দেখে আমরা দিক নির্ধারণ করি, সময় পরিমাপ করি, রাত কত হলো অনুমান করি। এইসব গ্রহ-উপগ্রহ আর নক্ষত্রের অবস্থানের জন্যে সমুদ্রে জোয়ারভাটা হয়, ফসলের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়, সেই সঙ্গে আমরা আমাদের যাত্রার লক্ষ্য নির্ণয় করি, গস্তব্য স্থির করি।

আমার মনে হয়, আমাদের সফি ভাই, চারণ সাংবাদিক সফিউদ্দিন আহমেদ, ছিলেন তেমনি একটি নক্ষত্র_ একটি উজ্জ্বল তারকা। প্রায়শ-ই দিনের প্রচ- আলোয় ঘাড়ে চাদর, হাতে ঝুলি, ধুলোময় পা নিয়ে আমাদের ঘরের উঠান বা বসবার ঘরে অতি পরিচিত তাঁকে যখন দেখতাম, আমরা ভুলে যেতাম, তিনি কত বড়মাপের মানুষ। আজ যখন তিনি নেই, রাতের বেলায়, অন্ধকারে, আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবার চেষ্টা করি, কোন উজ্জ্বল তারকাটি_ বিশেষ নক্ষত্রটি প্রতিনিধিত্ব করছে তাঁর। যাঁকে জীবদ্দশায় ‘অতি চেনা’, ‘অতি জানা’ বলে আমাদের প্রিয় ‘সফি ভাই’ করেই কেবল রেখে দিয়েছিলাম, নক্ষত্রের মর্যাদা দিইনি, যাঁর বিশাল ও মহৎ কর্মযজ্ঞের সন্ধান তেমন করে পাইনি তখনো, সেই সফি ভাই, সাংবাদিক সফিউদ্দিন আহমেদ, আকাশের উজ্জ্বল তারাটির মতোই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন আমাদের দেশের সাংবাদিকতার জগতে।

সংবাদ

Leave a Reply