বিনা নোটিশে ৪০ সংবাদকর্মী ছাঁটাই!

atintimesমুনাফা করতে না পারায় অনলাইন নিউজপোর্টাল এটিএন টাইমস ডটকমের ৪০ সংবাদকর্মীকে বিনা নোটিশে এবং কোনো প্রকার ক্ষতিপূরণ না দিয়েই ছাঁটাই করা হয়েছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটির ছাঁটাই হওয়া সংবাদকর্মীদের সঙ্গে আলাপ করে এই তথ্য জানা গেছে।

এদিকে এটিএন টাইমসের দায়িত্ব সম্প্রতি বুঝে নিয়েছেন সাংবাদিক মুন্নী সাহা।

এ প্রসঙ্গে মুন্নী সাহা বলেন, বিনা নোটিশে নয়, গত জানুয়ারিতে এই সংবাদকর্মীদের ছাঁটাইয়ের কথা জানানো হয়। আর যাদের ছাঁটাই করা হয়েছে তাদের স্থায়ী কোনো নিয়োগপত্র নেই।

দ্য রিপোর্টের অনুসন্ধানে জানা গেছে, নিয়োগের সময় সবাইকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন চাকরিচ্যুতির সময় ক্ষতিপূরণ দিতে না চাওয়ায় সবাইকে জোর করে এবং হুমকি দিয়ে মৌখিকভাবে ছাঁটাই করা হয়েছে।

জানা গেছে, এটিএন টাইমস তার পথ চলা শুরুর পর মাত্র ৯ মাস অতিবাহিত হয়েছে। এই সময়ে প্রতিষ্ঠানটি কোনো আর্থিক লাভের মুখ দেখেনি। তাই মালিকপক্ষ আর্থিকভাবে লাভবান এবং প্রতিষ্ঠানটিকে প্রথম সারির সংবাদ মাধ্যম হিসেবে দাঁড় করাতে সাংবাদিক মুন্নী সাহাকে দায়িত্ব দেন। মুন্নী সাহা প্রতিষ্ঠানটিতে একজন পরিচালক হিসেবে যুক্ত হয়েছেন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই কর্মরত সকল সংবাদকর্মীকে চলতি মাসের ৫ জুন মৌখিকভাবে বরখাস্ত করেন।

জানা গেছে, গত ৫ জুন অল্প কয়েকজন সংবাদকর্মীর সঙ্গে বৈঠক করেন মুন্নী সাহা। ওই বৈঠকে তিনি সবাইকে প্রতিষ্ঠানটি থেকে চলে যেতে বলেন। মুন্নী সাহা বলেন, ‘এত লোক দরকার নেই। ৩-৪ জন পাগল হলেই হয়। যাদের দিয়ে কাজটা করা সম্ভব। শাট-ডাউন করার কথাই বলেন আর ছোট করে ফেলার কথাই বলেন, সেটার জন্য আমি রেসপনসিবল এডিটর হিসেবে কথা বলছি, ম্যানেজমেন্টের পার্ট এবং একজন ডিরেক্টর হিসেবে কথা বলছি। আমরা ৩-৪ জনকে রাখব। বাকি আপনাদের জন্য কোথাও বলতে হলে বলবেন, বলে দিব। কেউ যদি দাবি করেন যে, দিদি আমাদের বেতন না দেন, কিন্তু একটু আসা-যাওয়া করতে চাই।তবে সেটা একসেপ্ট।’

জানা যায়, সংবাদকর্মীরা মুন্নী সাহার কাছে জানতে চান যে, তারা এতদিন কাজ করার পর হঠাৎ করে মাসের ৫ তারিখে চলে যেতে বলা হচ্ছে। এখানে সংবাদকর্মীদের ব্যর্থতা কোথায়। জবাবে মুন্নী সাহা বলেন, ‘আমাদের দিক দিয়ে দুর্বলতা তো অবশ্যই ছিল। টপমানে আপনাদের যারা চালানোর কথা ছিল, সেই জায়গাটাতে তাদের চুজ করার ব্যর্থতা আমাদেরই।’

ওই বৈঠকে মুন্নী সাহাকে একজন সংবাদকর্মী প্রশ্ন করেন, ‘আমরা বিভিন্ন জায়গায় ছিলাম। আপনারা আমাদের নিয়ে আসলেন। তো এইটা কী আমাদের ভুল নাকি আপনাদের ভুল। আর আপনারা বলছেন যে, তোমরা চলে যাও। কিন্তু সেটা অফিসিয়ালি বলছেন না কেন?’

জবাবে মুন্নি সাহা বলেন, ‘উই আর বিং চিটেড। আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে। আমি ছোট ভাইবোনদের কাছে মাফ চাচ্ছি এবং আমরা প্রতারণার শিকার হয়েছি। আর প্রতারিত হওয়ার অভিজ্ঞতা আমার থেকে আর কারো বেশি নেই।’

মুন্নী সাহা আরও বলেন, ‘আপনাদের সম্পর্কে আমি জানি এবং আপনাদের নিয়ে আমি ইমপ্রেসড। আপনারা অনেক ভাইব্রেন্ট, ওবিডিয়েন্ট এবং ভাল সাংবাদিক। এতগুলো ভাইব্রেন্ট, ওবিডিয়েন্ট এবং ভাল ছেলেপেলে, কিন্তু তাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। তাদের যে মেধা এবং ভালবাসার অ্যাফোর্ড তার মূল্যায়ন হয়নি। অনলি বিকজ অব এ বি সি ডি হু এভার, অনলি বিকজ অব লেক অব এ গুড লিডার অথবা যেই থাকুক না কেন, যারাই থাকুক না কেন, সবাই ওয়ান মেন শো দেখিয়েছে।’

একজন সংবাদকর্মী বলেন, ‘সাইফুল ইসলাম চৌধুরী আমাকে এটিএন টাইমসে নিয়ে এসেছেন। আমি এক জায়গাতে কাজ করছিলাম। আমি কিন্তু চাকুরিচ্যুত হইনি। ওনার কথায় রিজাইন দিয়ে আসছি…।’ এই সংবাদকর্মীকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে মুন্নী সাহা বলেন, ‘কারো নাম উল্লেখ নয়, আমি মুক্তি চাই।’

৫ জুনের বৈঠকে একজন সংবাদকর্মী মুন্নী সাহার কাছে জানতে চান, ‘আপনি বললেন যে, আপনারা প্রতারণার শিকার হয়েছেন, কিন্তু আমিও বলতে পারি যে, আামি প্রতারিত হয়েছি। আমরা তো জুনিয়র। এতকিছু তো আমাদের বোঝার দরকার নেই।’

জবাবে মুন্নী সাহা বলেন, ‘আচ্ছা, এখন এগুলো বাদ দিয়ে আমরা সামনের দিকে এগুতে পারি কিনা।’

মুন্নী সাহার কাছে সংবাদকর্মীরা জানতে চান, ‘ঠিক আছে, আপনারা সুইস অফ করছেন, কিন্তু আমাদের যাওয়ার যে প্রক্রিয়া আছে ওয়েজবোর্ড অনুসারে একজন সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে সেই প্রক্রিয়া আপনার ভালই জানা আছে। তার কি হবে।’

এমন জানতে চাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে মুন্নী সাহা বলেন, ‘এক বছর না হলে ওয়েজবোর্ড কার্যকর হয় না।’

এই সময় মুন্নী সাহা হুমকির সুরে বলেন, ‘আপনারা কে কখন অফিসে আসেন, কখন সাইন আউট হন, এই সবই দেখার ব্যবস্থা আছে আমার হাতে। আপনারা যদি আমার সঙ্গে ডিবেট করতে আসেন তবে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আপনাদের সঙ্গে ডিবেট করার সামর্থ্য, শক্তি এবং সবকিছুই আছে আমার কাছে।’

ওই বৈঠকে মুন্নী সাহার কাছে একজন সংবাদকর্মী জানতে চান, ‘আমরা এতদিন এখানে কাজ করছি। কিছু বললেন না, হঠাৎ আজ বলছেন যে, আপনারা সুইস অফ করবেন। বিষয়টা কেমন হলো? আমি নিজেই তো বিভ্রান্তিতে পড়ে গেলাম।’

মুন্নী সাহা বলেন, ‘না, বিভ্রান্তি নয়। কেউ না কেউ, কোনো না কোনো দিন বলবে। যেহেতু সুইস অফ করার সিদ্ধান্তটা আমরা নিয়েছি। যেটা গতকাল বললেও আজ দুই দিন হতো। আর গত রাতেই আমি স্বাক্ষর করে নোটিশ দিয়ে দিয়েছি। তবে নোটিশ দেওয়ার আগে আপনাদের সঙ্গে কথা বলা উচিৎ ছিল। এটা আমার ভাল অথবা খারাপ দিক। যে কয়জনই আপনারা উপস্থিত আছেন আমি কথা বললাম।’

বৈঠকে মুন্নী সাহার কাছে সংবাদকর্মীরা বলেন, ‘আমাদের মে মাসেও ডেকে নিয়ে বলা হল নতুন করে শুরু করছি। আপনারা ১০-১২ জন ভাল ব্যবসায়ী খোঁজেন। যাদের আমরা ফোকাস দিব। এখন মাসের ৫ তারিখে এসে হুট করে আমাদের চলে যেতে বলছেন। আমরা এখন কী করব। সামনে রমযান। মাসের এখন ৫ তারিখ। এখন কে আমাদের নিবে। আপনার কথাই আমরা মানছি। আপনি শুধু বলে দেন এখন আমরা কী করব।’ মুন্নী সাহা বিষয়টি এড়িয়ে যান। কোনো জবাব দেননি।

বিষয়টি নিয়ে দ্য রিপোর্টের পক্ষ থেকে মুন্নী সাহার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘এটিএন টাইমস আমি চালাব। ভাল করে চালাব। আগামী জুলাই থেকে চালাব। নতুন লোকও নিব।’

তিনি জানান, গত এক সপ্তাহ থেকে তিনি এই সংবাদ মাধ্যমটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

সংবাদকর্মীদের বিনা নোটিশে চাকরিচ্যুত করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাদের কারো স্থায়ী নিয়োগপত্র নেই। আর গত জানুয়ারিতে তাদের চলে যেতে বলা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এগুলো সব শুনে নিয়েছি। ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, আমি জানি।’

এটিএন টাইমসের চাকরিচ্যুতদের সূত্রে জানা যায়, প্রচলিত শ্রম আইন বা ওয়েজবোর্ড কোনোটিই মানা হয়নি সংবাদকর্মীদের চাকরিচ্যুত করার ক্ষেত্রে। এমনকি এ ব্যাপারে কোনো পূর্ব ঘোষণা ও ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয়নি বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন।

এ ব্যাপারে এটিএন টাইমসের প্রধান প্রতিবেদক প্রদীপ চৌধুরী দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘মালিকপক্ষ জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠান চালাতে গিয়ে তাদের ব্যবসায়িক লোকসান হচ্ছে। সে জন্য তারা এটা বন্ধ করে দিতে চান।’

প্রদীপ চৌধুরী বলেন, ‘বন্ধ করতে চাইলে মালিকরা তা করতেই পারে। কিন্তু এখানে যারা কাজ করেন তাদের নিয়ম অনুযায়ী কমপক্ষে ৩ মাসের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিন্তু মালিকপক্ষ মাত্র এক মাসের বেতন দিয়ে সবাইকে বিদায় করতে চাচ্ছে।’

জানা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয় এটিএন টাইমস ডটকম। শুরুতেই প্রতিষ্ঠানটিতে বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম, বাংলা নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম, প্রথম আলো ও এবিসি রেডিওসহ বিভিন্ন গণমাধ্যম থেকে প্রায় অর্ধশত সাংবাদিক ও সংবাদকর্মী যোগ দেন। এটি এটিএন মিডিয়া গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান।

জানা যায়, এটিএন টাইমসের চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ রুহুল হক, পরিচালক-১ সৈয়দ সামিউল হক, পরিচালক-২ জয়া আহসান ও পরিচালক-৩ চন্দন সিনহাকে নিয়ে একটি পরিচালনা পর্ষদ গঠন করা হয়। তবে সর্বশেষ তথ্য অনুয়ায়ী, সাংবাদিক মুন্নী সাহাও এটিএন টাইমসের একজন পরিচালক।

দ্য রিপোর্ট