ইলিশের টানে মাওয়া ফেরি ঘাটে

Hilsafishঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে বসে চার বন্ধু জয়, ফয়সাল, নাসির, অভি আড্ডা দিচ্ছিলাম। রাত আনুমানিক ১১টা, ৭ জুন ২০১৪। আড্ডার মাঝখানে ফয়সাল বলল, ক্ষুধা লেগেছে, চল সবাই মিলে খেতে যাই। সবাই এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলাম। এখান থেকেই আমাদের নতুন এক ভ্রমণ অভিজ্ঞতার সূচনা।

খাবার প্রসঙ্গ উঠতেই প্রথমেই মনে হলো, কোথায় খাব? অভি বলল, চল পুরান ঢাকায় গিয়ে তেহারি খাই। কিন্তু আমরা রাজি হলাম না। আমি বললাম, তেহারি তো প্রায়ই খাই। তারচেয়ে চল আজ ইলিশ মাছ দিয়ে ভাত খাব। প্রস্তাব দিতেই সঙ্গে সঙ্গে সবাই রাজি হয়ে গেল। হঠাৎ জয় বলল, চল মাওয়া যাই। ওখানে টাটকা ইলিশ পাওয়া যাবে। প্রস্তাব পেতে দেরি, কিন্তু গ্রহণ করতে দেরি হলো না। একসঙ্গে সবাই সায় দিয়ে বললাম, চল যাই। পরক্ষণেই চিন্তা হলো, গিয়ে ফিরে আসতে অনেক রাত হয়ে যাবে। সুতরাং যাব কিনা? কিন্তু একবার যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি তখন আর ফেরায় কে? ইলিশ মাছ ভাঁজির ঘ্রাণ আর রাতে ভ্রমণের উত্তেজনায় আমরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম। মাওয়া যাচ্ছি শুনে দু’জন বড় ভাইও সাগ্রহে সঙ্গী হলো। রাত ১টা ৩৭ মিনিটে মোট ৬জন মোটরবাইকে রওনা হলাম মাওয়ার উদ্দেশ্যে।
mawatour
পথে নতুন এক অভিজ্ঞতা হলো। পুলিশ চেকপোস্ট দেখে থামলাম। এক পুলিশ এগিয়ে এসে জানতে চাইলেন, এতো রাতে কোথায় যাচ্ছেন? আমরা সবাই একসঙ্গে বলে উঠলাম, মাওয়া যাচ্ছি ইলিশ খেতে। শুনে তিনি মৃদু হেসে বললেন, আপনাদের কত শান্তি, ইলিশ খেতে মাওয়া যাচ্ছেন। ওকে, গাড়ির কাগজগুলো দিন। চেক করব।

আমরা সুবোধ বালকের মতো কাগজপত্র তাকে দেখালাম। সব ঠিক থাকায় বাইক সাবধানে চালানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি আমাদের ছেড়ে দিলেন।

আমরা যাত্রা শুরু করলাম। পথে ষোলঘর থামলাম। সেখানে একটা ছোট চায়ের দোকানে বসে সবাই চা পান করে পুনরায় রওনা হলাম। বেশ রাত। পথ প্রায় ফাঁকা। বেশ গরম কিন্তু মালুম হচ্ছে না। কারণ রাতের ঠাণ্ডা বাতাস শরীর স্পর্শ করে সোঁ সোঁ করে ছুটে যাচ্ছে। প্রায় এক ঘণ্টা পর মাওয়া ফেরি ঘাটে এসে পৌঁছালাম।

কিন্তু একি কাণ্ড! বাইক থামিয়ে নামতেই ঘিরে ধরল দোকানিরা। সবারই এক কথা, ভাই আমাদের দোকানে ভালো তাজা ইলিশ আছে, আসেন। কোনোরকমে তাদের হাত থেকে নিস্তার পেয়ে নিজেদের পছন্দ করা একটি দোকানে ঢুকলাম। দোকানের মালিক একটা বড় ঝুড়ি নিয়ে এলেন। ঝুড়িতে সদ্য নদী থেকে তোলা তাজা ইলিশ! আমরা সেখান থেকে দু’টি মাছ পছন্দ করলাম। কিন্তু দাম শুনে চক্ষু চড়কগাছ! কিন্তু কী আর করা, মাছের জন্য যখন এসেছি তখন কিনতে তো হবেই। তেরশ’ টাকায় মাছ দু’টি কিনলাম।
Hilsafish
এবার রান্না শুরু হলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই ভাঁজা ইলিশের মিষ্টি ঘ্রাণ নাকে এসে লাগল। ঘ্রাণেই জিবে জল এসে যাবার উপক্রম। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। রান্না শেষে গরম গরম ইলিশ চলে এলো খাবার টেবিলে। সঙ্গে বেগুন ভাঁজা, মরিচ ভর্তা। আহ! খেতে খেতে কিছু ছবি তুলে নিলাম সবাইকে দেখাব বলে। দোকানির সঙ্গে কথাপ্রসঙ্গে জানতে পারলাম, প্রতিদিন কয়েকশ’ লোক পদ্মার ইলিশ খেতে মাওয়া ঘাটে আসে। কেননা তুলনামূলক অনেক কম দামে সেখানে ইলিশ পাওয়া যায়। খাবার পর নদীর পাড়ে বসে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটালাম। রাতের নদী শান্ত, স্নিগ্ধ। নদীর এই রূপ এর আগে দেখা হয়নি। পদ্মার ইলিশ এবং পদ্মা দু’টোই কম মনোহর নয়। কিন্তু সেই সৌন্দর্য পেছনে ফেলে অনিচ্ছা সত্বেও আমাদের ফেরার জন্য উঠতেই হলো। আমরা সবাই যখন ঢাকা এসে পৌঁছলাম তখন সবেমাত্র পূবের আকাশে সূর্য উঁকি দেবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

রাইজিংবিডি