পদ্মা সেতুর ওয়ারেন্টি নিয়ে প্রশ্ন

padma2পদ্মা সেতুর আয়ুষ্কাল ধরা হয়েছে ১০০ বছর। এর বিপরীতে কার্যাদেশ পাওয়া চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি সেতুটির নির্মাণ-পরবর্তী ওয়ারেন্টি দিচ্ছে মাত্র এক বছর। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ওয়ারেন্টি পিরিয়ড কমপক্ষে দুই বছর। কখনও কখনও তা তিন বছরও দেয়া হয়।

বীমা নিরাপত্তা না দেয়ার শর্তে চায়না মেজর ব্রিজকে পদ্মা সেতু নির্মাণে ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এখন নির্মাণকালের জন্য এ গ্যারান্টি দেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি। ওদিকে কার্যাদেশ দেয়ার চার সপ্তাহের মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পারফরমেন্স গ্যারান্টি জমা দিতে হয়। তবে চায়না মেজর ব্রিজ এক সপ্তাহের মধ্যে এ গ্যারান্টি জমা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছে। পারফরমেন্স গ্যারান্টি যাচাই-বাছাই শেষে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হবে। এক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ১৮ই জুন চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। এরপর অক্টোবর-নভেম্বরে সেতুর নির্মাণকাজ শুরুর পরিকল্পনা করছে চায়না ব্রিজ।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে পদ্মা সেতুর মেইন ব্রিজের প্রস্তাবটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। আলোচনায় বলা হয়, কাজ শুরুর দিন থেকে চার বছরের মধ্যে সেতু নির্মাণ সম্পন্ন করার অঙ্গীকার করেছে চায়না মেজর ব্রিজ। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেতুটির নির্মাণ-পরবর্তী এক বছরের দায়িত্ব (ওয়ারেন্টি) নেবে। এরপর সেতুতে কোন সমস্যা হলে তার দায় বাংলাদেশ সরকারের। চায়না মেজর ব্রিজের আর কোন দায়দায়িত্ব থাকবে না। যদিও বঙ্গবন্ধু (যমুনা) সেতুর ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই কোম্পানি দুই বছরের ওয়ারেন্টি দিয়েছিল।

পদ্মা সেতুর ওয়ারেন্টির বিষয়ে জানতে চাইলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, চায়না মেজর ব্রিজ সেতুটির ওয়ারেন্টি দিচ্ছে এক বছরের। এ সময়ে কোন সমস্যা হলে দায়দায়িত্ব প্রতিষ্ঠানটির।

তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব পদ্মা সেতুর জন্য কিছুটা ঝুঁকিপূর্ণ জানিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক অধ্যাপক ও ইঞ্জিনিয়ার ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের সভাপতি ড. এম শামিম জেড বসুনিয়া জানান, পদ্মা সেতু হবে স্টিল স্ট্রাকচারের, বাংলাদেশে যা নতুন। তাই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সময়ের চেয়ে কম ওয়ারেন্টি গ্রহণ করা ঠিক হয়নি।

সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতু নির্মাণে ১২ হাজার ১৩৩ কোটি টাকার দর প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে শুধু মূল সেতুর জন্য চায়না মেজর ব্রিজ ব্যয় ধরেছে ৯৯৬১ কোটি টাকা। বাকি ২১৭২ কোটি টাকা রাখা হয়েছে ডলার ও উপকরণের মূল্যের তারতম্যের কারণে। মূল সেতুর ব্যয়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ লাগবে সুপার স্ট্রাকচার (উপরিভাগ) নির্মাণে। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪০২ কোটি টাকা। আর সাবস্ট্রাকচার (পাইল, পিয়ার ইত্যাদি) নির্মাণে ৩০৪৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। মাওয়া অংশে সড়কের সঙ্গে সেতুর সংযোগস্থলের সাবস্ট্রাকচার নির্মাণে ১৫৫ কোটি ও সুপার স্ট্রাকচার নির্মাণে ৮২ কোটি ও জাজিরা প্রান্তে সড়কের সঙ্গে সেতুর সংযোগস্থলের সাবস্ট্রাকচার নির্মাণে ১৭৮ কোটি ও সুপার স্ট্রাকচার নির্মাণে ৯২ কোটি টাকা ব্যয় হবে। এছাড়া প্রাথমিক ও সাধারণ অন্যান্য কাজে ২৫৮৮ কোটি, টেলিফোন, বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ অন্য আনুষঙ্গিক সংযোগ ব্যবস্থা স্থাপনে ২৭৯ কোটি, মাটি পরীক্ষায় ৭৯ কোটি, সাইট ক্লিয়ারেন্স, মাটি খনন ও পুনরায় মাটি দেয়ায় ৪ কোটি টাকা। মাওয়া প্রান্তে রেলওয়ের সংযোগস্থলে সাবস্ট্রাকচার ও সুপার স্ট্রাকচার নির্মাণে ২৫ কোটি টাকা এবং জাজিরা প্রান্তে রেলওয়ের সংযোগস্থলে সাবস্ট্রাকচার ও সুপার স্ট্রাকচার নির্মাণে ২৭ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রস্তাবিত দরের ১০ শতাংশ (এক হাজার ২১৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা) পারফরমেন্স গ্যারান্টি দিচ্ছে চায়না মেজর ব্রিজ। সেতু বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, চুক্তির আগে অনেক খুঁটিনাটি বিষয়ে সমঝোতার প্রয়োজন হয়। এ জন্য সেতু বিভাগ ও চায়না মেজর ব্রিজের মধ্যে আলোচনা চলছে। এছাড়া পারফরমেন্স গ্যারান্টি পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই শেষে চলতি মাসেই চুক্তি করা হবে। উল্লেখ্য, ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু অত্যাধুনিক স্টিল দিয়ে নির্মাণ করা হবে। এর একটি প্রান্ত থাকবে মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায়; অন্য প্রান্ত শরীয়তপুরের জাজিরায়। এরই মধ্যে উভয় দিকের সংযোগ সড়কের কাজ শুরু করেছে।

বাংলাপোষ্ট২৪