গৌরবান্বিত্ব বিক্রমপুর

bikrampurএ্যাডভোকেট ফারহানা মির্জা: ইতিহাসের কিংবদন্তী গর্বিত ভূ-ভাগ বিক্রমপুর আজকের মুন্সীগঞ্জ। এই ভূ-ভাগ সুপ্রাচীন চন্দ্ররাজাদের তাম্রশাসনের অঞ্জলি থেকে শুরু করে পাল, সেন, মোঘল, বার ভূইঁয়াদের কীর্তিতে সমুজ্জ্বল হয়ে একটি স্বাধীন বঙ্গ রাজ্যের রাজধানী বিক্রমপুরের কীর্তিময় অংশ। বাঙালি মাত্রই তাই এই অংশের ইতিহাসে গর্ব বোধ করে।

এই গর্বিত বরেণ্য ভূমি বিক্রমপুরে ৯৮০ খ্রিস্টাব্দে জন্মেছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের মহাপুরুষ শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর। যাঁর জ্ঞানের বিচ্ছুরিত আলো বাংলা ভারত ছাড়িয়ে নেপাল, ভুটান, চীন, থাইল্যান্ডকেও আলোকিত করেছে। এই বিক্রমপুরেরই বিজ্ঞানাচার্য স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু, অঙ্কশাস্ত্রবীদ মহাপন্ডিত সোমেশ বসু, অধ্যাপক রাজকুমার সেন, মেঘনাদ সাহা, সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ, সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন আহম্মেদ, বাংলাদেশ সরকাররের উপদেষ্টা প্রফেসর মফিজুল ইসলাম চৌধুরী, হৃদয়বান রাজনীতিবিদ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, ছয় বারের ইংলিশ চ্যানেল বিজয়ী বিখ্যাত সাঁতারু ব্রজেন দাস, সাহিত্যক বুদ্ধদেব বসু, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, সুনির্মল বসু, মো. নাসির আলী, রণেশ দাশগুপ্ত, সত্যেন সেন, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, চারু বন্দ্যোপাধ্যায়, কালী প্রসন্ন সিংহ, সৈয়দ এমদাদ আলী, ইব্রাহিম খলিল, কথা সাহিত্যক ইমদাদুল হক মিলন, রাবেয়া খাতুন, অবিভক্ত বাংলার প্রধান বিচারপতি স্যার চন্দ্রমাধব ঘোষ, শিক্ষাবীদ আশুতোষ গঙ্গুলী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শেখ মজিবুর রহমান, ড. আনোয়ারা বেগম, ড. আব্দুল মমিন চৌধুরী, ড. মিজানুর রহমান শেলী, ড. হুমায়ুন আজাদ, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, ড. আউয়াল, ড. কিউ এ আই এম নূরুদ্দিন, ড. এ কিউ এম বি করিম, ড. এ কে এম রফিকুল্লাহ, ড. আনোয়ারুর রহমান খান, সাবেক প্রধান বিচারপতি খোন্দকার মাহমুদ-উল হাসান, শান্তি নিকেতনের উপাচার্য ক্ষিতিস মোহন সেন, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দেলনের পুরোধা জিতেন ঘোষ, বিনয়, বাদল, দিনেশ, গ্রীস চন্দ্র সেন, পশ্চিম বাংলার সাবেক মূখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থ শংকর রায়, জমিদার রায় বাহাদুর শ্রীনাথ রায়, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি ড. এফ কে এম মুনীম, জাতীয় স্মৃতি সৌধের নক্সাকারী সৈয়দ মইনুল হোসেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর মুসফিক-উল সালেহিন, এটনী জেনারেল মাহবুবে আলমসহ আরও অনেকে।

আর কবি-সাহিত্যক-রাজনীতিক সরোজিনী নাইডুর ইতিহাসতো সকলেরই জানা। ভারতীয় উপমহাদেশের সচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী মহিলা নেতা ছিলেন বিক্রমপুরের এই নারী। জেলার লৌহজং উপজেলার ব্রাম্মনগাঁও গ্রামে ১৮৭৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেয়া সরোজনী নাইডু নারী জাগরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে যান। আজও তা অম্লাণ।

এমন অসংখ্য গুনী নারী পুরুষের পূণ্যভূমি বিক্রমপুর। বিক্রমপুরে ঐতিহ্যের কথা ব্যাপক। ইতিহাসের সমৃদ্ধপূর্ণ এই জনপদের ঐতিহ্য সংরক্ষনে তৎপরতা কম। ইতিহাসের চিহ্ন হিসাবে দাড়িয়ে থাকা প্রাচীন স্থাপনাগুলো ধ্বংসের পথে। পর্যটকদের হাতিছানি দিয়ে ডাকার সব সম্ভবনাই আছে। নেই তেমন আয়োজন। প্রাচীন বাংলার রাজধানী রামপালের রঘুরাম পুরে সদ্য আবিস্কৃত হয়েছে বৌদ্ধবিহার। শহরের ইদ্রাকপুর কেল্লাকে সংক্ষণ করে পাশে বিক্রমপুর জাদুঘর করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।

তাই নতুনভাবে আশার আলো দেখছে এই অঞ্চলের মানুষ। বিশেষ করে একটি পর্যটন জোনে রূপান্তরের উজ্জ্বল সম্ভনা রয়েছে এখানে। পাল শাসনামলের রঘুরামপুরের বৌদ্ধ বিহারের কাছেই এই মোঘল আমলের এই ইদ্রাকপুরের কেল্লা। আরও কাছে সুলতানী আমলের কাজী কসবাস্থ বাবা আদমের মসজিদ। কিছু দূরে পুলঘাটায় মোঘল আমলের ইটের পুল। কিছু পশ্চিম দিক্ষিণে বৃশিট আমলের সোনারংয়ের জোড় মঠ। তাই পাল, মোঘল, সুলতানী আর বৃটিশ আমলের স্থাপনার পাশাপাশি খুব কাছাকাছি রয়েছে রাজা বল্লাল সেনের দিঘিও বাড়ি, কোদাল ধোয়ার দিঘি, কাচকির দরজা, হরিশ রাজার দিঘি, জ্ঞান তাপস অতীশ দিপঙ্করের পৈত্রিকভিটা, কেওয়ারের বার আউলিয়ার মাজার এবং নাটেশ্বরে দেউল। যেখানে আরেকটি বৌদ্ধ বিহার আবিস্কারের সম্ভভনা দেখা দিয়েছে।

এত কাছাকাছি এত ঐতিহ্যমন্ডিত এলাকা বিরল। অনেকেরই মনে পড়বে- রঘুরামপুরের হরিশ রাজার দিঘি। যা মাঘি পূর্নিমার দিঘি হিসাবে স্থানীয়ভাবে পরিচিত। মাঘি পূর্ণিমার দিনে এই দিঘির সব দাম ফুবে গিয়ে টলমলে পানিতে টৈ টম্পুর থাকতো। অথচ আসপাশের পুকুর-নদনদীর পানি থাকতো স্বভাবাবিক। কিন্তু জোয়ার ভাটার কোন খালের সংযোগ না থাক সত্বেও এই দিঘির পানি আকস্মিক বেড়ে যাওয়ায় কৌতুহল নিয়ে দেশী বিদেশী পর্যটকের ভিড় পড়তো।

কিন্তু আশির দশকে পুরাকীর্তি আইন লঙঘন করে অতিলোভী একটি চক্র জনশ্রুতি অনুযায়ী দিঘিতে থাকা মূলবান হাড়িপাতিল ও স্বর্ণের শিকলের খোঁজের নামে দাম কেটে এটির পানি সরানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। কিছুই না পায়না। কিন্তু বিনষ্ট করা হয় মূল্যবান কৃর্তিটি। এর পর থেকে মাঘিপূর্ণিমায় সেই বিস্ময়কর দৃশ্যের দেখা মিলে না। তবে এখনও পুরাকীর্তি অধিদপ্তরের অধীনেই রয়েছে দিঘিটি। সহারাজ হরিবর্মার খনন করা হরিচন্দ্র রাজার দিঘিটি (১০৪৫-১০৯৭খ্রীঃ) অনেক কিছুরই স্বাক্ষী এখন। রাজা বল্লাল সেনের বাড়ির পাশের রামপাল দীঘির দৈর্ঘ আধা কিলোমিটার প্রায়।

এছড়া কোদাল ধোয়া, সানের দীঘি, দামারন দীঘি ও মেখের দিঘি রয়েছে। রামপালের দিঘির উত্তর পশে বল্লাল সেনের হাতি বাধার গজারি গাছটির অবশিষ্টাংশ এখনও রয়েছে। ৪/৫ ফুট এই মৃত গাছের গোড়ায় এখনও সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজা-অর্চনা করছেন। একদা মুন্সীগঞ্জ “বিক্রমপুর” নামে ভারতবর্ষে পরিচিত ছিল। তৎকালীন বিক্রমপুর ছিল এক বিশাল এলাকার নাম। ঢাকার দক্ষিন থেকে বরিশালের উত্তর পর্যন্ত উত্তর দক্ষিনে বিস্তৃত ছিল।

পশ্চিমে পদ্মা থেকে পূর্বে মেঘনা ব্রক্ষ্মপুত্র জলরাশি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। গুপ্ত বংশ, চন্দ্র বংশ, বর্ম বংশ, পাল বংশ, সেন বংশীয় রাজাদের রাজধানী ছিল বিক্রমপুরে। রাজনগর নামে ছিল এক মনমুগ্ধকর জনপদও। পদ্মার গতি পরিবর্তন ও ব্রিটিশ প্রশাসন বিক্রমপুরকে মুন্সীগঞ্জ, শ্রীনগর, রাজবাড়ী ও মূলফতগঞ্জকে থানা করে প্রশাসনিক কাঠামো গঠন করে। ১৮৬৯ সালে চাঁদ রায় ও কেদার রায়ের স্মৃতি বিজড়িত রাজবাড়ি থানা সম্পূর্ন পদ্মা গ্রাস করে। বাংলার প্রাচীন রাজধানী বিক্রমপুরের সেই জৌলোস এখন আর নেই।

তবে ইতিহাস এখনো বিক্রমপুরের কথা মনে করিয়ে দেয়। মুন্সীগঞ্জের বড় কেওয়ার গ্রামে রাজা ন্যায় পালের শাসনামলের একটি উচ্চ বৌদ্ধ শিক্ষালয়ের কথা জানতে পারা যায়। এই বৌদ্ধ শিক্ষালয়ের নাম কৃহোরী। ৯১০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত বিদ্যালয়টির অবস্থান পরিলক্ষিত হয়। কেউ কেউ ৯৮৮ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত বিদ্যালয়টির বিদ্যমানের কথা বলেন। কেওয়ার দেউল থেকে কৃহোরী নামের একটি বিষ্ণু মূর্তি পাওয়া গেছে। তার পাদপীঠে অয়মানুষমেয়েন সযোগাঙ্গভূবা বিভূঃবঙ্গোকেন কৃতোবিষনু বিষনু সালোক্য- কামায়া বরেন্দ্রী তটকীনের শান্ডিল্যকুলজন্মানা পিতার হস্য.পৌত্রেন প্রনত্রাশৌরিশর্ম্মণ নামক চার লাইনের অশুদ্ধ সংস্কজৃত ভাষায় লিপি সংযুক্ত রয়েছে।

বিক্রমপুরে সুপ্রাচীন কাল থেকেই মুসলমানদের আগমন পরিলক্ষিত হয়েছে। রাজা জাতবর্মার শাসনামলে ১৫৫২ খ্রীস্টাব্দে বাংলাদেশের বিক্রমপুরে ইসলাম প্রচারে আসেন হাফেজ শেখদ্বার হোসাইনী (রহঃ)। তিনি মুন্সীগঞ্জ সদরের কেওযার গামে এসে সপরিবারে ইসলাম প্রচার করেন। বাইশ হাত লম্বা মাজার হিসাবে খ্যাত শেখদ্বার হোসাইনীর মাজারে পর পর তিনজনকে সমাহিত করা হয়। শ্রীচন্দ্রদেবের শাসনামলেই (৯৩০-৯৭৫) বর্তমান মুন্সীগঞ্জ উপজেলার বড় কেওয়ার গ্রামে মুসলমানদের আগমন ঘটে। ৪২১ হিজরীতে শাহ সুলতান হোসাইনী (রহঃ) তার ১২ জন আরবীয় সঙ্গী নিয়ে বঙ্গ সমতটের কেওয়ার গ্রামে বসতি স্থাপন করে।

১৯৭৪ সালে একটি মাজার সংস্কার করার সময় আরবী ভাষায় একটি শিলালিপি পাওয়া যায়। সেখানে বারজন অলির নাম সারিবদ্ধভাবে রয়েছে। এখানে ১২টি মাজারও শিলালিপি অনুসারে রয়েছে। যা মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্যতম প্রাচীন মুসলিম ইতিহ্স হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। রাজা বল্লাল সেনের সঙ্গে ১১৭৮ সালের ২০শে সেপ্টেম্বর ধর্মযুদ্ধে শহীদ হন আরবীয় মুসলিম সাধক বাবা আদম (রহঃ)। মুন্সীগঞ্জের দরগা বাড়িতে তার সমাধি এখনো বিদ্যমান। বিক্রমপরি মুন্সীগঞ্জ অঞ্চলের মধ্যযুগীয় মুসলিম নির্দশন ফাতশাহ্ শাসনামলের ছয় গম্বুজ মসজিদ।

১৪৮৩ খ্রীস্টাব্দে বাবা আদমের মাজার সংলগ্ন এই মসজিদ মালিক শাহ নির্মান করেন। রাজা চাদঁ রায় ও কেদার রায় ১৬০৯ থেকে ১৬১০ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত ১ বছর মুসলামানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। অতঃপর ১৬১১ সালে পদ্মা, ধলেশ্বরীও ইছামতির সঙ্গম স্থলে যুদ্ধের বার ভূইয়াদের অন্যতম চাদঁ রায়-কেদার রায়ের রাজবাড়ি (১৫৭৬-১৬১১ খ্রী:) ও মঠ অন্যতম নির্দশন ছিল (বর্তমানে পদ্মায় বিলুপ্ত)।

তালতলার শিব মন্দির শিব লিঙ্গ সতের শতকের প্রথম দিকে রাজা বল্লাল সেন নির্মাণ করেন। উপমহাদেশের সর্ব্বোচ্চ মঠ হর শ্রীনগর উপজেলার শ্যামসিদ্ধিতে। সুবিশাল এই মঠের উচ্চতা ২৪২ ফুট। মঠের মূল দরজার ঠিক উপরে মার্বেল পাথরের নাম ফলকে লেখা রয়েছে “ ‘ শম্ভুনাথে বাসাধর্দ মঠ’ শতাব্দ-১৭৫৮ সন-১২৪৩ ”। শম্ভুনাথ মজুমদার মহাশয় এই মঠ নির্মান করেন। রাঢ়ীখালে রয়েছে বিজ্ঞানী স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর পৈত্রিক বাড়ি। মুন্সীগঞ্জে সুরেমার করবানীর শাসনামলে ১৫৬৯ খ্রীস্টাব্দে রিকাবীবাজার নামক স্থানে মালিক আব্দুল্লাহ নামক এক কাজী একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। এছাড়া সম্রাট আকবরের শাসনামলে কাজী মোহাম্মদ কর্তৃক বিক্রমপুরে কাজীর মসজিদ নির্মান করা হয়।

আরঙ্গজেবের সভাসদ ওমরাহ মোহাম্মদ আনোয়ার কর্তৃক ১১০২ হিজরীতে সিরাজদিখানের পাথরঘাটেএকটি মসজিদ নির্মান করা হয়, যা পাথর ঘাটার মসজিদ নামে খ্যাত। জনশ্রতি অনুযায়ী সদর উপজেলার কালীর আটপাড়ায় রয়েছে প্রাচীন শতীদাহ মন্দির। এটিও বিলুপ্তির পথে। প্রাচীন মঠ ও মান্দিরে এখনও ভরপুর বিক্রপুর। যেখানে যাবেন প্রাচীন নিদর্শন চোখে কমবেশী পড়বেই। স্থাপনা দাড়িয়ে আছে কালের সাক্ষী হয়ে। ২০১৩ সালের ২৩ মার্চ আবিস্কৃত হয় সদর উপজেলার রঘুনাথপুরে বিক্রমপুর বৌদ্ধ বিহার এবং ২০১৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি টঙ্গীবাড়ি উপজেলার নাটেশ্বরে আবিস্কৃত হয় হাজার বছরের পুরোনো বৌদ্ধ মন্দিরসহ প্রাচীন বহু স্থাপত্য নিদর্শণ।

পাশাপাশি সমূহ সম্ভবনা দেখা দিয়েছে নাটেশ্বরে বৌদ্ধবিহার আবিস্কাসহ সাজানো গোছানো প্রাচীন বিক্রমপুর নগর আবিস্কারের। এতে সভ্যতার জনপদ বিক্রমপুরের ইতিহাসকে আরও বেশী সমৃদ্ধ করেছে। এছাড়া ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও বীরত্বগাঁথা নানা স্মৃতি চিহ্ন রয়েছে। রয়েছে বহু বধ্যভূমি। এছাড়াও রয়েছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য আমাদের প্রাচীন ইতিহাস সংরক্ষনে এসব ঐতিহ্য সংরক্ষন মানব সভ্যতার জন্যই জরুরি।

এব্যাপারে মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল জানান, ইদ্রাকপুর কেল্লা সুরক্ষাসহ জাদুঘরের কাজ শুরু হয়েছে। অন্যান্য পুরাকীর্তি সুরক্ষায়ও পদক্ষেপ গ্রহন করা হয়েছে। সাধ্য অনুযায়ী এগুলো রক্ষার প্রচেষ্টা চলছে। নামকরণ ঃ এক কালের বিক্রমপুর পরগনার উত্তর ভুভাগ নিয়ে গঠিত বর্তমান বিক্রমপুরের সরকারী বা প্রশাসনিক নাম মুন্সীগঞ্জ। এক সময় মুন্সীগঞ্জ ছিল একটি গ্রামের নাম। তারও পূর্বে এই মুন্সীগঞ্জ গ্রামটি ইদ্রাকপুর নামে অভিহিত ছিল। এই ইদ্রাকপুর গ্রামে মোগল শাসনামলে ‘মুন্সী হায়দার’ নামে একজন ফৌজদার বাস করতেন।

অত্যন্ত সজ্জন ফৌজদার মুন্সী হায়দারের নামে পরবর্তীকালে ইদ্রাকপুর গ্রামের নাম হয় মুন্সীগঞ্জ। ১৮৪৫ সালে ব্রিটিশ ভারতের নামটিকেই প্রশাসনিক নথিকে ‘মুন্সীগঞ্জ মহকুমা’ হিসেবে রেকর্ড করা হয়। মুন্সীগঞ্জ মহকুমার প্রথম মহকুমা কর্মকর্তা ও বিচারক হয়ে আসেন মি. জন ফ্রেঞ্চ ১৯৮৪ সালে। ঐ একই নামে মুন্সীগঞ্জ মহকুমা জেলায় রূপান্তরিত হয়। অবশ্য এ অঞ্চলের জনগণ মুন্সীগঞ্জকে বিক্রমপুর নামেই জানতে, বলতে দেখতে ভালোবাসে। ৯৫৪.৯৬ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে প্রশাসনিকভাবে ১৯৮৪ সালের ১লা মার্চ মুন্সীগঞ্জ মহকুমাকে জেলায় রূপান্তরিত করা হয়। ৬টি উপজেলা, ২টি পৌরসভা, ৬৭টি ইউনিয়ন আর ৯৫৭ টি গ্রাম নিয়ে গঠিত এই মুন্সীগঞ্জ জেলা।

পদ্মা, ধলেশ্বরী ও ইছামতি নদী বেষ্টিত মুন্সীগঞ্জ সদর,টঙ্গীবাড়ী, সিরাজদিখান, শ্রীনগর ও লৌহজং থানার মানুষ এখনো বিক্রমপুর নামটিকে সযতেœ বক্ষে ধারণ করে আছে। ১৬০৩ খ্রিস্টাব্দে মোঘল সেনাপতি মানসিংহের সাথে যুদ্ধে নিহত হলে কেদার রায়ের রাজ্য বিক্রমপুর পরগনাকে চারটি ভাগে বিভক্ত করে রঘুনন্দন চৌধুরীকে বিক্রমপুরের জমিদারী, কমলশরণ ও শেখ কালুকে কার্ত্তিকপুরের জমিদারী এবং কালিদাস ঢালী রামরাজা সর্দারকে যথাক্রমে দেওভোগ ও মূলপাড়ার তালুক প্রদান করা হয়। এই ভাবেই বিক্রমপুর রাজ্য খন্ড বিখন্ড হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে সরকারী নথিপত্রের বাইরে চলে আসে।

সরকারী নথি পত্রে না থাকা সত্ত্বেও বিক্রমপুর নামটিকে এ জেলার মানুষ লালণ করছে গভীর মমতায়। ভূমির আকৃতিঃ মুন্সীগঞ্জ সমতল এলাকা নয়। জেলার কিছু কিছু অঞ্চল যথেষ্ট উঁচু যদিও আবার কোথাও কোথাও একেবারেই নি¤œভূমি। বর্ষার পানিতে জেলার অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। অবস্থানঃ মুন্সীগঞ্জ জেলাটি ২৩০২র্৯ থেকে ২৩০৪র্৫ উত্তর অক্ষাংশ ও ৯০০১র্০ থেকে ৯০০৪র্৩ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। জলবায়ুঃ মুন্সীগঞ্জের জলবায়ু সমভাবাপন্ন। তবে এখানকার জলবায়ু ঋতু বিশেষ পরিবর্তনশীল। মুন্সীগঞ্জ বর্ষা প্রধান হলেও গ্রীষ্মকালে অনেক জায়গা পানি শূন্য হয়ে পড়ে। শীতকালে শীতের তীব্রতা দেশের অন্যান্য স্থানে মত তত প্রবল নয়।

এলাকাটি নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলভুক্ত। সীমানাঃ পূর্বে কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি ও হোমনা উপজেলা, চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলা যা মুন্সীগঞ্জের সাথে প্রবাহিত মেঘনা নদীর দ্বারা বিভাজিত। পশ্চিমে শরিয়তপুর ও মাদারীপুর জেলাকে পদ্মা নদী বিভাজিত করেছে। উত্তরে ঢাকা জেলার কেরাণীগঞ্জ ও দোহার উপজেলা এবং নারায়নগঞ্জ জেলার বন্দর উপজেলা। দক্ষিণে পদ্মা নদী যার অপর পার্শ্বে শরিয়তপুর জেলা। মুন্সীগঞ্জ জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদনদী ঃ পদ্মা, মেঘনা, ছোট ব্রহ্মপুত্র, ধলেশ্বরী, ইছামতি, রজতরেখা, কাজল রেখা, কালীদাস।

মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলাঃ মুন্সীগঞ্জের নামকরণ মুন্সীগঞ্জের পূর্বের নাম ছিল ইদ্রাকপুর। কথিত আছে, যে মোঘল শাসন আমলে এই ইদ্রাকপুর গ্রামে মুন্সী হায়দার হোসেন নামে একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি মোঘল শাসকদের দ্বারা ফৌজদার নিযুক্ত হয়েছিলেন। অত্যন্ত সজ্জন ও প্রজা হিতৈষী মুন্সী হায়দার হোসেনের নামে ইদ্রাকপুরের নাম হয় মুন্সীগঞ্জ। ১৮৪৫ সালে বৃটিশ ভারতের প্রশাসনিক সুবিধার্থে মুন্সীগঞ্জ থানা ও পরে মহকুমা হিসেবে উন্নীত হয়।

টঙ্গীবাড়ীর উপজেলাঃ টঙ্গীবাড়ী উপজেরার নামকরনের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ভাবে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এলাকার গণ্যামান্য ও বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের তথ্য মতে, প্রাচীনকাল থেকেই এ এলাকার ভৌগলিক অবস্থান নীচু। আগে প্রায় সারা বছরই উপজেলার অধিকাংশ স্থানে পানি থাকতো। তখন যোগাযোগের মাধ্যমে ছিল নৌপথ। নিচু এলাকায় লোকজন মাটি কেটে ক্ষুদ্রাকার দ্বীপের মত বানিয়ে বাড়ি নির্মান করতো। অনেকটা টং দোকানের মত। টং সদৃশ্য স্থানে বাড়ি নির্মিত হওয়ায় কালক্রমে এ স্থানের নামকরণ হয় টঙ্গীবাড়ী।

শ্রীনগর উপজেলাঃ ঐতিহ্যদীপ্ত শ্রীনগরের প্রাচীন নাম রায়েসবর। নবাব মীর কাসিম কর্তৃক নিযুক্ত বাংলা বিহার উড়িশ্যার গভর্নর লালা কীর্তিনারায়ণ বসু রায়েসবরের শ্রীবৃদ্ধি করে এর নামকরণ করেন শ্রীনগর। তিনি শ্রীনগর তথা বিক্রমপুরে একটি মনোরম প্রাসাদ নির্মাণ করেন যা বর্তমানে শ্রীনগর পাইলট স্কুল ভবন হিসেবে পরিচিত। শ্রীনগর উপজেলা প্রতিষ্ঠিত হয় ১২ আগষ্ট ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে।

সিরাজদিখান উপজেলাঃ সিরাজদিখান নামের উৎপত্তি নিয়ে নানা মত আছে। কথিত আছে যে নবাব সিরাজদ্দৌলা তাঁর পিতাকে নেয়ার জন্য পাথরঘাটা এলাকা দিয়ে বিক্রমপুর এসেছিলেন। তাঁর নাম অনুসারে সিরাজদিখান নামকরণ করা হয়। সিরাজদিখানের পাশের রাজদিয়া গ্রামে খান বংশের আদি পুরুষ সুজাত আলী খান সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্ব কালে শাহী ফরমান অনুযায়ী পূর্ববংগে আরাকানী জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করার কাজে নিযুক্ত ছিলেন।

সে সময় ইছামতি নদীর দক্ষিণে রাজদিয়া গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। এই খান বংশের ৪র্থ পুরুষ সিরাজ উদ্দিন খান ছিলেন স্বাধীন চেতা ও খোদাভক্ত মানুষ। এক সময় তিনি বিবাগী হয়ে দেশ ত্যাগ করেন এবং ৩০ বছর পরে ইছামতি নদীর তীরে জঙ্গলে ৪ সঙ্গী নিয়ে আস্তানা গড়ে তোলেন এবং আল্লাহর এবাদতে মশগুল থাকতেন। এই সাধক পুরুষের মৃত্যুর পর এলাকাটির নাম রাখা হয় সিরাজদিখান। সিরাজদিখান উপজেলা ১৯৮২ সালের ১৫ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয়।

লৌহজং উপজেলাঃ লৌহজংয়ের দিঘলী বাজারে এক সময় কলকাতা হতে নৌপথে লৌহসামগ্রী আমদানি হতো। এখানে লৌহজাত সামগ্রীর ব্যবসা এতই প্রসার লাভ করেছিল যে, এই অঞ্চল লোহালক্কড় ব্যবসা জংশনে পরিণত হয়েছিল বলে জানা যায়। লৌহ ও জংশন শব্দ দুটির সংযোগে লৌহজং শব্দটির উৎপত্তি বলে অধিকাংশের ধারনা। ১৯৮৩ সালে লৌহজং উপজেলায় উন্নতি হয়।

গজারিয়া উপজেলাঃ জনশ্রুতি আছে ঔপনিবেশিক যুগে এটা ছিল চর অঞ্চল। পর্তুগীজ নাবিকরা এখানে পাখি শিকারের জন্য আসতেন। মাঝে মধ্যে এ এলাকার জমিদারদের মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ ঘটত। এমনি এক যুদ্ধের পর একজন ওলন্দাজ ক্যাপ্টেন ও তার কিছু অনুচর পাখি শিকারর জন্য নদীর পার দিয়ে বেড়াচ্ছিল। এমন সময় তাদের নজরে পড়ে ভাসমান একটি হাতির উপর এক বিরাট পাখি যা বর্তমানে এখন বিলুপ্ত।

নদীমাতৃক অঞ্চল বিধায় শীতকালে প্রচুর অতিথি পাখির সমাবেশ ঘটত। গজ শব্দের অর্থ হাতি আর রিয়া শব্দের অর্থ পাখি। হাতির উপরে থাকা পাখি ক্যাপ্টেন তার অনুচরদের মাধ্যমে শিকার করতে পেরে আনন্দ চিত্তে উক্ত এলাকার নামকরন করেছিলেন ‘গজারিয়া’। তখন থেকে জনশ্রুতির মাধ্যমে এ এলাকার নাম করন হয়েছে গজারিয়া।

লেখকঃ (১৯৯৬ ব্যাচের ছাত্রী) বর্তমানে একাডেমিক কো-অর্ডিনেটর ও প্রভাষক, প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ, মুন্সীগঞ্জ

মুন্সিগঞ্জেরকাগজ