শেখ হাসিনার জাপান সফর

pm japanরাহমান মনি: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চারদিনের এক রাষ্ট্রীয় সফরে জাপান এসেছিলেন। তার এই সফর নিয়ে জাপান প্রবাসীদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দেয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে এই চাঞ্চল্যের পরিমাণ ছিল বেশি। তার অন্যতম কারণ ছিল জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের অর্থাৎ জাপান সরকারের আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে তিনি জাপান আসেন। যা ছিল খুবই মর্যাদাবান। এর আগে ২০০৫ সালের জুলাই মাসে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুনইচিরো কোইজুমির আমন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় সফরে জাপান এসেছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সেই সময় তিনি টোকিও শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। এরপর আর কোনো সরকারপ্রধান (বাংলাদেশের) রাষ্ট্রীয় সফরের সুযোগ পাননি।

এর মাত্র একমাস আগে (২৩ এপ্রিল থেকে ২৫ এপ্রিল ২০১৪) জাপানে রাষ্ট্রীয় সফরে এসেছিলেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। সেই সময় প্রবাসীরা প্রত্যক্ষ করেছেন সরকারি সফর কতটা মর্যাদাবান এবং গুরুত্বপূর্ণ। এর আগেও আমাদের প্রধানমন্ত্রী তিনবার জাপান সফর করেছেন। যার মধ্যে দুটি ছিল প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন (১৯৯৭ এবং ২০১০) সময়ে এবং ১৯৯২ সালের সফরটি ছিল বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকাকালীন।

৪৫ জন ব্যবসায়ী প্রতিনিধিসহ ১০৯ সদস্যবিশিষ্ট প্রতিনিধি নিয়ে বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের একটি ভিভিআইপি বিমান ২৫ মে দুপুর ১টায় টোকিওর হানেদা বিমানবন্দরে অবতরণ করলে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপান রাষ্ট্রদূত শিরো সাদোশিমা। বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আকাসাকা প্রাসাদে। প্রাসাদে পৌঁছালে সেখানে তাকে অভ্যর্থনা জানান জাপান পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রটোকল কর্মকর্তা হিরোকি শিজেউকি। আকাসাকা প্রাসাদের রাষ্ট্রীয় অতিথিশালা মোতোআকাসাকায় সফরকালীন সময়টা তিনি অবস্থান করেন।
pm japan
২৫ মে সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী তার হোটেল স্যুটে ১৯৭১ পরবর্তী বাংলাদেশে নিযুক্তকৃত জাপান রাষ্ট্রদূতদের (প্রাক্তন) সঙ্গে এক বৈঠকে মিলিত হন। এই সময় তিনি বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রদূতদের ভূমিকার প্রশংসা করে বলেন, আমি বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে আপনাদের সহযোগিতা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি। শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ও জাপান এবং এই দুই দেশের জনগণের মধ্যকার মধুর সম্পর্ক লালনের জন্য আমাদের উভয়ের দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে জাপানের অবদানের মূল্য কখনো শোধ হবে না। আপনারা আমাদের অকৃত্রিম বন্ধু এবং বাংলাদেশিদের হৃদয়ে স্থায়ী আসনে আসীন।

প্রাক্তন রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের জন্য ভালোবাসা ও সদিচ্ছা থেকে অনেক রাষ্ট্রদূত দায়িত্ব পালন শেষে নিজ দেশে ফিরে দু’দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব সম্প্রীতি জোরদার করতে অব্যাহত প্রয়াস চালিয়ে গেছেন। তিনি নতুন চিন্তাভাবনা ও কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে প্রশংসনীয় প্রয়াস অব্যাহত রাখার অনুরোধ জানান। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জাপানকে পাশে থাকার অনুরোধ জানান।

২৬ মে ছিল দুই নেতার শীর্ষ বৈঠক। বিকেল সাড়ে ৬টায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুই প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় এবং বাংলাদেশকে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি বা ৬শ বিলিয়ন ইয়েন অনুদানে স্বাক্ষর করেন। বিভিন্ন প্রকল্পের যথাযথ ও সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য বিপুল পরিমাণ এই অর্থের সহায়তা দিবে জাপান। দু’দেশের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনার পর শেখ হাসিনা ও শিনজো আবে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন। এছাড়াও আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও গভীর করার লক্ষ্যে সার্বিক অংশীদারিত্ব প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে ঐকমত্য হয়।

সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা বলেন, শীর্ষ বৈঠকে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিআইজিবি) ধারণার বিকাশে তার আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এই প্রতিশ্রুতির জন্য আমি জাপানের প্রধানমন্ত্রী আবে এবং তার সরকারের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নে ৩৫তম ওডিএ ঋণ প্যাকেজ অনুমোদনের জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জাপানের সরকারকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, শিনজো আবের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় তারা অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ দ্বিপক্ষীয় প্রায় সকল বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি জাপানের প্রধানমন্ত্রীকে সস্ত্রীক বাংলাদেশে সফরের আমন্ত্রণ জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ এবং আমার সরকার ঢাকায় আপনাদের স্বাগত জানাতে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

২৭ মে শেখ হাসিনা টোকিওর ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। এ সময় তিনি শিক্ষা খাতে তার সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণের কথা বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, শিক্ষার পাশাপাশি দেশের উন্নয়ন আমার সরকারের একমাত্র লক্ষ্য। দারিদ্র্য বিমোচনের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমি আমার দেশকে একটি দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে দেখতে চাই। আমি সব শিশুর জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে চাই এবং তাদের একটি ভালো আলোকিত জীবন দিতে চাই। এরপর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

২৭ মে মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপান এক্সটারনাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেটরো) সদর দপ্তরে ‘বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও ব্যবসায় সুযোগ-সুবিধা’ বিষয়ক এক সেমিনারে বক্তব্য রাখেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশে অনায়াসে ব্যবসা করার জন্য জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি কার্যকর টাস্কফোর্স গঠনের ঘোষণা দেন।

এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনে (ইপিজেড) শুধু জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য ৪০টি প্লট বরাদ্দ রাখার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জাপানি বিনিয়োগকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেই। তাই আমরা জাপানি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ইতিবাচক আসা করে থাকি। তিনি বলেন, জেটরো নেতৃবৃন্দের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে পেরে আমি খুব খুশি। এর ফলে দু’দেশের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক আরও জোরদার হবে। জেটরো কর্মকর্তাদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, বেসরকারি খাতের নেতা হিসেবে আপনারা ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ, কঠোর পরিশ্রম ও আন্তরিকতা দিয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নে গতি সঞ্চার করেন।

এই দিন বেপজা জোনে জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য প্লট বরাদ্দ বিষয়ে বাংলাদেশ এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন অথরিটিজ (বেপজা) ও জেটরোর মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং জাপানের অর্থ, বাণিজ্য ও শিল্প প্রতিমন্ত্রী মিদোরি মাতসুশিমার উপস্থিতিতে বেপজা চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল হাবিবুর রহমান ও জেটরো প্রতিনিধি কে. কাওয়ানো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেন। জেটরো বৈঠকের পূর্বে তার সম্মানে দেয়া জাপান বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল এন্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন এর মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন।

২৮ মে বুধবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপানের জাতীয় প্রেসক্লাব পরিদর্শনে যান। জাতীয় প্রেসক্লাব পরিদর্শনে গিয়ে দর্শনার্থী খাতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাক্ষর দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

১৯৭৩ সালের ২৯ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু জাপানের জাতীয় প্রেসক্লাব (জেএনপিসি) পরিদর্শন করেন এবং দর্শনার্থী বইতে স্বাক্ষর করেন। স্বাক্ষর বইতে বঙ্গবন্ধু বাংলা ও ইংরেজিতে শুধু নিজের নাম (শেখ মুজিবুর রহমান) লেখেন, কোনো মন্তব্য লেখেননি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দর্শনার্থী বইতে স্বাক্ষর করেন এবং বাংলায় ‘আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা রইলো’ মন্তব্য লিখেন।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক