পদ্মার ইলিশ আর কলকাতার জামাই ষষ্ঠী সমাচার

Hilsa1বুধবার ছিল জামাইষষ্ঠী। কলকাতার জামাইবাবুদের মহা আনন্দের দিন। এই দিনে মেয়ে-জামাইকে বিশেষ আদর যত্ন করেন পশ্চিমবঙ্গের শাশুড়িরা। খাবার টেবিলে মেলে নানা ব্যঞ্জনের সমারোহ। কেউ কেউ আবার জামাইকে খাওয়ান নামিদামি হোটেলে নিয়ে গিয়ে। সব মিলিয়ে কলকাতায় মহা-জামাইরাজ। অবশ্য এই আনন্দে এবারও পানি ঢেলেছে পদ্মার ইলিশ, যা ছাড়া মোটেই পরিপূর্ণ হয় না পশ্চিমবঙ্গের জামাইষষ্ঠীর আদর। এর জন্য একদিকে যেমন দায়ী গত প্রায় ৩ বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে ভারতে ইলিশ রফতানি বন্ধ থাকা, তেমনি বর্তমানে দেশে চলমান ইলিশের সংকট। আগে যেখানে চোরাইপথে হলেও কিছু ইলিশ যেত জামাইষষ্ঠীর এই সময়ে, সেখানে সংকটের কারণে বলতে গেলে বন্ধ সবকিছু। বাংলাদেশের নদী কিংবা সাগর মোহনার কোথাও মিলছে না ইলিশ। পরিস্থিতি সামাল দিতে মিয়ানমার থেকে ইলিশ নেয়ার চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে কলকাতার। কলকাতার নাকতলা এলাকার বাসিন্দা স্বপন বন্দোপাধ্যায়। মোবাইল ফোনে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘পদ্মার ইলিশ হচ্ছে দুই বাংলার ভালোবাসার মেলবন্ধন। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। জামাইষষ্ঠীতে যে পদ্মার ইলিশ খাওয়াতেই হবে তেমন বিধান নেই। কিন্তু তারপরও যেন ওই ইলিশ ছাড়া পুরো হয় না জামাইয়ের সম্মান। যুগ যুগ ধরে জামাইষষ্ঠীতে পদ্মার ইলিশ খাওয়াচ্ছে এখানকার শাশুড়িরা। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে জামাইষষ্ঠীতে মিলছে না পদ্মার ইলিশ।’

পশ্চিমবঙ্গ হিলশা ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অতুল চন্দ্র দাস বলেন, ‘২০০৮ সালে হঠাৎ করেই ইলিশের রফতানি মূল্য কেজিপ্রতি ৬ ডলার বেঁধে দেয় বাংলাদেশ সরকার। তারপরও পদ্মার ইলিশ আনছিলাম আমরা। বাংলাদেশের ইলিশেই হয় এখানকার জামাইষষ্ঠী। কিন্তু গত ক’বছর ধরে ইলিশ রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে বাংলাদেশ। ফলে পদ্মার ইলিশ পাচ্ছি না আমরা। পরিস্থিতি সামলাতে মিয়ানমার থেকে কিছু ইলিশ আনা হয়েছিল। কিন্তু তা নেয়নি কলকাতার ক্রেতারা। এখানে বসেই তারা আলাদা করতে পারে কোনটা পদ্মার আর কোনটা অন্য জায়গার। ফলে ব্যর্থ হয়েছে আমাদের সেই চেষ্টা। গচ্চা গেছে মোটা অংকের গাঁটের কড়ি।’ কলকাতার মিউনিসিপ্যাল স্ট্রিটে থাকা আত্মীয় বাড়িতে বেড়ানো শেষে মঙ্গলবার পশ্চিমবঙ্গ থেকে বরিশালে ফিরেছেন এখানকার ব্যবসায়ী নিতাই সাহা। চিকিৎসাসহ নানা কারণে প্রায় ২০ দিন তিনি কলকাতায় ছিলেন। জামাইষষ্ঠী আর পদ্মার ইলিশ নিয়ে সেখানে চলমান সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি মানতে পারছে না কলকাতার অনেক পরিবার।

অন্যান্য বছর বাড়ির পাশাপাশি নামিদামি হোটেলগুলোতেও চলত জামাইষষ্ঠীর আয়োজন। ইলিশের নানা পদ রেধে পসরা সাজাতেন ব্যবসায়ীরা। জামাই নিয়ে সেসব হোটেলে যেতেন ধনাঢ্য শাশুড়িরা। কিন্তু গত ২-৩ বছর ধরে বিশাল শূন্যতা। জামাইয়ের কাছে মান রক্ষাই যেন কঠিন হয়ে পড়েছে। কলকাতায় পদ্মার ইলিশের এই চাহিদা চোখে না দেখলে বিশ্বাস হবে না। সর্বত্রই বাংলার ইলিশের জন্য ছিল ব্যাকুল হাহাকার। এ যেন কেবল পদ্মার ইলিশ নয়, উৎসব আয়োজনে পুরো বাংলাদেশকেই পশ্চিমবঙ্গের কাছে পাওয়া।’ বাংলাদেশ হিলশা ফিশ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (অহিমায়িত) নেতা মৎস্য ব্যবসায়ী ইউসুফ সিকদার বলেন, ‘জামাইষষ্ঠী সামনে রেখে প্রয়োজনে ৭ থেকে ১০ ডলার কেজি রেটেও ইলিশ নিতে রাজি ছিল পশ্চিমবঙ্গের ব্যবসায়ীরা। কিন্তু রফতানিই যেখানে বন্ধ সেখানে তো আর কিছু করার নেই।’

বরগুনা ট্রলার মালিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, ‘সাগরে বর্তমানে ইলিশ মিলছে না। অভ্যন্তর ভাগের নদী ও মোহনা থেকে কিছু ইলিশ ধরছে স্থানীয় জেলেরা।

তবে এর পরিমাণ এত কম যে বরগুনার বাইরে তা পাঠানো যাচ্ছে না। প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে হাজার/১২শ’ টাকায়। মৌসুম শুরু হওয়ার পরও ইলিশ না মেলায় চরম বিপাকে ট্রলার মালিক, জেলে এবং বরফকল মালিকসহ এই পেশার সঙ্গে জড়িত কয়েক লাখ মানুষ। তাদের অনেকের এখন নুন আনতে পান্তা ফুরানোর দশা। উপকূলের বাজার আর মৎস্য আড়তগুলোতে খাঁ খাঁ শূন্যতা। কবে শেষ হবে এই দুর্দিন তা কেউ জানে না।’

আমাদের সময়