বিক্রমপুরের হারিয়ে যাওয়া রাজপ্রাসাদ

rajprashad1ফাহিম ফিরোজ: মহারাজা রাজবল্লভের বিক্রমপুরের হারিয়ে যাওয়া রাজপ্রাসাদ। ২৭৮ বছর পর আবার তা খোঁজে পাওয়া গেল। এত দিন পর্যন্ত কেউ জানতো না এটি কোন মহারাজার। তার নাম ছিল মহারাজা রাজবল্লভ সেন। জন্ম: মুন্সিগঞ্জের বিক্রমপুরের লৌহজং থানার বেজগাঁও গ্রামে ১৬৯৮ সালে। মৃত্যু : ১৭৬৩/ ১৭৬৪। পিতার নাম ছিল কৃষ্ণ জীবন মজুমদার। কর্পদ শূন্য মানুষ ছিলেন। তবে কখনো কখনো বড়লোকি ভাব নিয়ে চলতে চেষ্টা করতেন। রাজবল্লভ যখন কয়েক মাসের শিশু, তখন বেজগাঁও বাড়ি ত্যাগ করে পিতার সাথে কয়েক মাইল উত্তরে, মালখানগরে চলে যান। সেখানে কয়েক বছর পড়াশোনার পর আবার চলে যান ঠকুরদাদা রামগোবিন্দ সেনের বাড়ি লৌহজংয়ের দক্ষিনে, পদ্মার ওপারে বিলদাওনিয়া নামের একটি গ্রামে। যা ভেঙে গেছে ১৮৫৯ সালে।
rajprashad1
রাজবল্লভের বয়স যখন আনুমানিক ১২/১৩ তখন তার পিতা হঠাৎ চিরতরে নিঁখোজ হন। অসহায় এই শিশুর শিক্ষার ভার গ্রহন করেন বেজগাঁও থেকে ছুটে গিয়ে প্রানকৃষ্ণ নামের এক পন্ডিত। যার ভিটা এখনও রয়েছে রাজপ্রাসাদের সন্নিকটে পূর্ব-দক্ষিনে।

পিতার প্রভূ মালখানগরের জমিদার, দেবীদাস বসুর সহায়তায় নবাবের অধিনে, রাজবল্লভ মুর্শিদাবাদে প্রথমে ছোট চাকরি নেন। তারপর ১৭২৮ সালে ঢাকায় বদলি হন। ১৭৩৪ সালে রাজবল্লভ ক্ষমতার জোরে প্রজাদের উপর অর্থের জন্য ভয়াবহ র্নিযাতন করেন এবং লুণ্ঠণ ও র্দূনীতি করে প্রচুর র্অথের মালিক হন। এসময় তিনি প্রথম রাজবাড়ী র্নিমান করেন বেজগাঁওতে, পিতার বাড়ি ঘেসে পশ্চিমে। এ বাড়িতে তিন বার তিনি এসে ছিলেন এবং দরবার গৃহে রাত যাপন করে ছিলেন। মহারাজা পরে আরেকটি রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন কয়েক মাইল দক্ষিণ-পূর্বে, পদ্মার ওপারে বিলদাওনিয়ায়। যা ‘রাজনগর প্রাসাদ’ নামে সুপরিচিত ছিল।
rajprashad2
১৭৫৭ সালে প্রজাবিদ্রোহে রাজবাড়ির রাজবল্লভের ১২/১৩ জন স্বল্প বয়েসি নাতি নিহত হন। নবাব সিরাজের খালা ঘসেটি বেগম ৭ দিন এখানে ছিলেন, পলাশি যুদ্ধের সামান্য আগে। বাংলাকে বেনিয়া ইংরেজদের হাতে তুলে দেবার এক জঘন্ন ষড়যন্তে লিপ্ত ছিলেন তারা। এ জন্য মানুষ তাদের আজও ঘৃনা করে। তবে বিধবা বিবাহ প্রচলনের প্রয়াস, খাল কাটা, পুকুর-দীঘি খনন, মন্দির-মূর্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাসে এক শ্রেনীর মানুষের কাছে রাজবল্লভ আজও অমর হয়ে আছেন। সিরাজ নবাব হবার কিছু কাল আগে, এই রাজবাড়ির অর্ন্তভুক্ত দক্ষিনের ‘আন্ধিপুকুরের’ পশ্চিমে কিছুক্ষণ আবস্থান করে ছিলেন। ১৭৬৩/১৭৬৪ সালে রাজা বিহারে নিহত হলে তার ২/১ জন পুত্র এখানে বাস করতে থাকেন।
rajprashad3
এদের মধ্যে ৩য় পুত্র ছিলেন রাজ গঙ্গা দাস এবং ৫ম জন রায় রাধা মোহন। বাড়িতে অনেক ধন-সমপত্তি ছিল। বাড়িটি দেখতে ছিল অর্পূব, নান্দনিক। তার বিচিত্র নকসা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। দেশী-বিদেশী বহু মানুষ তাই এই বাড়ি দর্শণ করতে আসে এবংমুগ্ধ হয়। এখানে ছিল মহারাজার দরবার ঘর, নাচেরঘর, কতোয়াল ঘর, প্রহরীঘর, পুজার ঘর এবং বিশাল প্রমোদ খানা। বাড়ির জন্য সেই সময় কাটানো হয়ে ছিল চারদিকে ৪টি দিঘী। যা এখনও বিদ্যমান। রাজার মৃত্যুর পর তার তৃতীয় পুত্ত রাজা গঙ্গাদাশ এখানে বাস করতে থাকেন। তবে সব সময় বাস করতেন না। তার সময় বর্তমান পাশের থানা শ্রীগরের জমিদার লালা কৃর্তীনারায়নকে কোন এক কাজে খুশি হয়ে রাজবল্লভ এই প্রাসাদ দান করে দেন। লালা আনুমানিক ২২ বার এই বাড়িতে আসলেও গঙ্গাদাশের ভয়ে শেষ র্পযন্ত তার দাবি ছেড়ে দেন।
rajprashad4
আনুমানিক ১৭৯২ সালে নবকুমার মুখোপাধ্যায় নামে বাইরের এক ব্যাক্তি এ প্রাসাদের মালিক হন। তার পূত্র ছিলেন গোলকা বা গোপাল মুখোপাধ্যায়। তার পূত্ররা ছিল খুব শিক্ষিত। যেমন ব্যারিস্টার কামিনী কুমার মুখোপ্যায়, যামিনী কুমার মুখোপ্যায়। বেজগাও অধিবাসীদের কাছে এখনও তারা সুপরিচিত। ১৯৪৭ সালের কিছু আগে গনেশ চক্রর্বতী নামে এক জমিদার এখানে বাস করে শেষে ভারতে চলে যান। মানুষ এতদিন জেনে ছিল এটা কামিনীদেরই বাড়ি বা সন্তোষ জমিদারের বাড়ি। ১৯৪৭ সালের পর র্দীঘ দিন এটি জঙ্গলে আবৃত এবং বন্য জন্তুতে পরিপূর্ণ ছিল। বহু দিন ধরে এ বাড়িতে বাস করে আসছেন অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ শিক্ষক ওয়াদুদ মাস্টার। এখন এটি তার বাড়ি নামেই খ্যাত। বর্তমানে রাজবাড়ির ১৬ ভাগের মধ্যে ১২ ভাগই ধ্বংস হয়ে গেছে। গ্রামের দক্ষিনের দরবার ঘর অনেক আগেই বিলীন। সেখানে এখন মাস্টারের টিনের ঘর। উত্তরের প্রমদ খানার মাত্র কয়েকটি দেয়াল এখন ভগ্ন রুপে স্থির। উত্তর-পুর্ব দিকে একসময় মাটির নিচে অনুচ্চ একটি বন্দিঘর ছিল।

বর্তমানে সেটি মাটির নিচে হারিয়ে গেছে। প্রাসাদের পূর্ব দিকের প্রধান গেট অর্ধেক আজ নেই বললেই চলে। উত্তরের মোগল নকশায় র্নিমিত সিংহ গেট কোনরকম টিকে আছে। পশ্চিমের টা অস্তিত্ব বিহীন। নেই দক্ষিনের দরবার ঘরের নিচে সেই অন্ধকুটিরও। যেখানে মানুষ বন্দি করে, হত্যা করে আনুমানিক ৪ হাত দুরে আন্ধি পুকুরে নিক্ষেপ করা হত। পুকুরটি কালেরসাক্ষী হয়ে এখনও দৃশ্যমান। বর্তমানে যে বাথরুম রয়েছে, মনে হয় তা পরবতী কালের। পূর্ব দিকে যে টালিছাদের হাওয়াখানা ছিল, কয় বছরআগেও তা দেখেছি, এখন উধাও। ইতিহাস প্রেমীদের মতে এটি রাজবল্লভ উত্তর সময়ের।

২০০৪ থেকে ২০০১৩ পর্যন্ত আক্লান্ত পরিশ্রমের পর শেষে খোঁজে পাওয় গেল রাজবল্লভের হারিয়ে যাওয়া সেই প্রথম রাজপ্রাসাদ। বিক্রমপুর সীমায় বর্তমানে অতীতের রাজাদের এই একটি প্রাসাদই ভগ্নরুপে টিকে আছে। এই প্রাসাদটি চিহ্নিত করার পুরো কৃতিত্ব ‘বিক্রমপুর ইতিহাস পরিষদ’ এর। রাজবাড়িটি এতদিন খোঁজে না পাবার কারন ছিল, রাজবল্লভ সময়ের প্রায় সকল অধিবাসী প্রজাহামলার ভয়ে এখান থেকে পালিয়ে গিয়ে ছিল। যে ২/৪ ঘর বসতি ছিল, ঘৃণা ও প্রজা ভয়ে তারা রাজবল্লভ সংক্রান্ত সব বিষয়ে ছিল নিরব। বলা যায়, ৪০ বছর গ্রাম ছিল মানুষ শুন্য। নতুন বসতিরা তাই রাজার বিষয়ে তেমন তথ্য জানতেন না। যারা কিছু জানতেন, তাদের কাছ থেকে কিছু তথ্য নিয়ে জানা যায়, প্রায় ১০০ বছর পূর্বে ‘‘বেজগাঁও ইতিকথা’’ নামক একটি গ্রন্থ রচনা করে ছিলেন অবিনশ্বররাম চন্দ্র চক্রবতী। ফলে তার পক্ষেও রাজবল্লভ কে নিয়ে সঠিক ইতিহাস লেখা র্নিভুল ছিল না। কারন একটাই, প্রকৃত তথ্য দাতারা তখন কেউ এখানে ছিলেন না। ছিলেন না রাজপরিবারের কোনো সদস্যও। মহারাজের মৃত্যুর অনুমানিক ৫০ বছর পরে লেখকের র্পূব পুরুষরা এখানে বসতি র্নিমান করেন। বর্তমানে একটি মহল রাজবাড়িটি গ্রাসের জন্য তৎপর রয়েছে।

কবি ফাহিম ফিরোজ: সভাপতি বিক্রমপুর ইতিহাস পরিষদ, লৌহজং।

কারেন্ট-ওয়াল্ড