অর্থ সঙ্কটে পোশাকপল্লীর কাজ শুরু হচ্ছে না

garments_worksদীর্ঘদিন পর হলেও সরকারের পক্ষ থেকে পোশাক পল্লী স্থাপনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে জমির মূল্য এবং শিল্পপার্কের অবকাঠামো নির্মাণে অর্থসঙ্কটের কারণে নির্মাণকাজ শুরু হচ্ছে না। গার্মেন্টস শিল্পপার্ক স্থাপনের জন্য এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দাবি করে আসছিল পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।

‘স্বপ্নের’ শিল্পপার্ক’ স্থাপনে তহবিল গঠন নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চিয়তা। পাশাপাশি পোশাক মালিকদের অনেকেই কারখানা স্থানান্তর করতে রাজি নন। তাঁরা বলছেন, পোশাক কারখানাগুলো স্থানান্তরের জন্য ৮০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। সরকারের সহযোগিতা পাওয়া না গেলে এসব গার্মেন্টস কারখানা স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। ফলে নির্ধারিত সময়ে আলোর মুখ দেখছে না ‘স্বপ্নের পোশাক পল্লী।’

জানা গেছে, ২০০১ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে গার্মেন্টস শিল্পপার্ক প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। এরপর পার্কটি কোথায় করা হবে তা নিয়ে মতভেদ দেখা দেয় সরকার ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে। প্রথমে রূপগঞ্জ, এরপর টঙ্গী, সবশেষে বন্ধ হওয়া আদমজী জুট মিল এলাকায় এ প্রকল্প করার প্রস্তাব আসে। এর জন্য একই বছর ২০০৬ সালে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার বাউশিয়া মৌজায় ‘গার্মেন্টস শিল্পপার্ক’ স্থাপনের জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়। তারপর স্থানটি সরেজমিন পরিদর্শন করে বিসিক ও বিজিএমইএর প্রতিনিধিদল। প্রতিনিধিদলের স্থানটি পছন্দ হওয়ায় মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক প্রস্তাবিত জমি চিহ্নিত করে জমির দাগ, মৌজা ও সাইট ম্যাপ তৈরি করে। পরে এটি বিনিয়োগ বোর্ডের মাধ্যমে বিসিকের কাছে পাঠানো হয় এবং সে মোতাবেক প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়। ২০০৭ সালে এ বিষয়ে বিসিক ও বিজিএমইএ’র মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সরকারের কোন্ বিভাগ এটি বাস্তবায়ন করবে, অর্থের উৎস কী হবে- এমন অনেক বিষয় নিয়ে বছরের পর বছর বিভিন্ন পর্যায়ে বৈঠক ও দেনদরবার হলেও সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। যদিও এই সময়ের দীর্ঘসূত্রতায় প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এরপর বিসিক, শিল্প মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ফাইল চালাচালি চলে দীর্ঘদিন।

প্রকল্পটির প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, রাজধানী থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া থানার বাউশিয়ায় এ শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠবে। প্রস্তাবিত গার্মেন্টস শিল্পপার্শের ৫৩১ একর জমিতে ৯৭৬টি প্লট হবে। সেখানে ২৫০টি কারখানা স্থাপিত হবে। সেই সঙ্গে পল্লী স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সব স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। এসব প্লটে ডায়িং, ওয়াশিং ও ফিনিশিং কারখানা থাকবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৭৪৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যে জমি অধিগ্রহণ বাবদ ব্যয় ৩৫৩ কোটি ৮ লাখ এবং ভূমি উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হবে ৩৯২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। নির্মাণের মেয়াদকাল ধরা হয় ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত।

জানা গেছে, নিরাপদ কর্মপরিবেশে নির্বিঘ্ন উৎপাদনের উপযোগী একটি পোশাকপল্লী নির্মাণে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার বাউশিয়ায় ৫৩১ একর জমি বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে বিজিএমইএকে জমির বরাদ্দ বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের বাউশিয়ায় পোশাকপল্লী স্থাপনের জন্য চীনের দুটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ১৪শ’ কোটি টাকার সহজ শর্তের ঋণ সহায়তা দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এ ঋণের সুদ হার হতে পারে তিন শতাংশ। চীনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেআরডি ও দাদা এ্যান্ড কোম্পানি এই পল্লী নির্মাণ ও অর্থায়ন করার কথা রয়েছে। এ ছাড়া জমিগুলোকে ১, ৩ ও ৫ বিঘার প্লটে ভাগ করা হয়েছে। ৩০ শতাংশ জমি অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যবহার হওয়ার কথা রয়েছে প্রস্তাবনায়। জমির মূল্য হিসাবে বিঘাপ্রতি আনুমানিক ৬৫ লাখ টাকা পরিশোধ করতে হবে মালিকদের। এ ছাড়া ভূমি উন্নয়ন ও অবকাঠামো খরচ বহন করতে হবে প্লট গ্রহীতাদের। বিজিএমইএ’র দেয়া তথ্যমতে, বর্তমানে তাদের সদস্য সংখ্যা তিন হাজার ২০০। এর মধ্যে ইউডিসহ সমিতির অন্যান্য সুবিধা নেন দুই হাজার ২০০ সদস্য। তাঁদের ৭৫ শতাংশই অর্থাৎ প্রায় এক হাজার ৬৫০ সদস্যই অংশীদারি বা ভাড়াকৃত ভবনে কারখানা করেছেন। আর প্লটের জন্য এখন পর্যন্ত আবেদন করেছেন মাত্র ৮শ’ সদস্য।

পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ বলছে, পোশাক কারখানাগুলো স্থানান্তরের জন্য ৮০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। সরকারের সহযোগিতা পাওয়া না গেলে এসব গার্মেন্টস কারখানা স্থানান্তর করা সম্ভব নয়। সংগঠনটির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, এত টাকা বিনিয়োগ করে প্লট কেনার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না অধিকাংশ কারখানার মালিক। এ প্রসঙ্গে বিজিএমইএ সহ-সভাপতি মোঃ শহিদউল্লাহ আজিম জনকণ্ঠকে বলেন, জমি অধিগ্রহণ এবং পরিকল্পিত শিল্পপার্ক করা অনেক বড় কাজ। তবে আমরা খুব দ্রুত কাজ শুরু করে দিতে পারব বলে আশাবাদী। পোশাক কারখানাগুলো স্থানান্তরের জন্য যে ৮০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে তার জন্য তাঁরা সরকারের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।

পোশাকপল্লী স্থাপনে তহবিল গঠনে দেখা দিয়েছে অনিশ্চিয়তা। পোশাক শিল্প মালিকরা তাকিয়ে আছেন সরকারের দিকে। চীনা কোম্পানির অর্থায়ন দীর্ঘ মেয়াদী প্রক্রিয়ার আওতায় রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। আগামী বাজেটে পল্লী স্থাপন নিয়ে মালিকদের পক্ষ থেকে বরাদ্দের দাবি করা হলেও তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। আবার কারখানা পরিদর্শনে হঠাৎ করে বন্ধ হওয়া শেয়ার্ড বিল্টিংয়ে কাজ না পাওয়ায় আরও বিপাকে পড়েছেন বলে দাবি করছেন পোশাক মালিকরা।

জনকন্ঠ