মেঘনায় লঞ্চডুবির দুর্ঘটনার বিষয়ে ২৬ মে রাজধানীর সদরঘাটে গণশুনানি

Miraz161আগামী ২৬ মে এমভি মিরাজ-৪ লঞ্চ দুর্ঘটনার বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির গণশুনানি রাজধানীর সদরঘাটে বেলা ১১টায় অনুষ্ঠিত হবে। বৃহস্পতিবার তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও সদস্য (অর্থ) বিআইডব্লিউটিএ মনিরুজ্জামান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, ‘মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার দৌলতপুরে মেঘনা নদীতে এমভি মিরাজ-৪ লঞ্চটি দুর্ঘটনার শিকার হয়। এ ঘটনায় বিআইডব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটি আগামী ২৬ মে বেলা ১১টায় রাজধানীর সদরঘাট, ঢাকা নদী বন্দরের টার্মিনাল ভবনের দ্বিতীয় তলায় গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে।’

এ গণশুনানিতে দুর্ঘটনা কবলিত লঞ্চের ক্রু ও স্টাফ, বেঁচে যাওয়া যাত্রী, যাত্রীদের আত্মীয়-স্বজন এবং আগ্রহী ব্যক্তিদের স্বাক্ষ্য দেয়ার জন্য কমিটির পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে।

এদিকে সম্প্রতি দুর্ঘটনা কবলিত এমভি মিরাজ-৪ এবং এমভি শাতিল-১ নামের যাত্রীবাহী দুটি লঞ্চেরই অবকাঠামোগতভাবে ত্রুটি ছিল। অনুমোদিত নকশা ও নৌযান দুটির প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে ব্যাপক অমিল রয়েছে। দুটি নৌযানের মাস্টার (চালক) ছিলেন অদক্ষ। এছাড়া মিরাজ লঞ্চটি চালাচ্ছিলেন অননুমোদিত একজন মাস্টার। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্র ও তদন্ত কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলাপ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। লঞ্চটি উদ্ধারে দীর্ঘ সময় লাগা নিয়েও ব্যাপক প্রশ্ন ওঠেছে।’

এসব ঘটনায় ইতোমধ্যে এমভি শাতিলের ফিটনেস প্রদানকারী কর্মকর্তা সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তরের (ডস) বরিশাল অফিসের প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারক মুঈনউদ্দিন জুলফিকারকে কর্মস্থল থেকে প্রত্যাহার করে ঢাকায় প্রধান কার্যালয়ে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হলেও এমভি মিরাজ-৪ এর ফিটনসে প্রদানকারী ঢাকা অফিসের প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারকের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘বার্ষিক সার্ভে (ফিটনেস) এবং চালকদের মাস্টারশিপ সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায়িত্বশীল ও সতর্ক হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি অনেকাংশেই এড়ানো সম্ভব। পরিবেশ ও নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ বিষয়ক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ত্রুটিপূর্ণ নৌযানের ফিটনেস এবং অদক্ষ ব্যক্তিদের মাস্টারশিপ সনদ দেয়ার কারণেই নৌপথে দুর্ঘটনায় প্রাণ ও সম্পদহানি ঘটছে।’

গত ১৫ মে দুপুরে ঢাকার সদরঘাট থেকে তিন শতাধিক যাত্রী নিয়ে শরীয়তপুরের সুরেশ্বরের উদ্দেশে ছেড়ে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদীতে নিমজ্জ্বিত হয় এমভি মিরাজ-৪।
দুর্ঘটনার সময় পেছনে থাকা অপর একটি লঞ্চ থেকে নদীতে ফেলা বয়া ও লাইফ জ্যাকেটের সহায়তায় ৪৫-৫০ জন যাত্রী জীবিত অবস্থায় তীরে ওঠেন। আর তিন দিনে উদ্ধার করা হয় মোট ৫৬টি লাশ। বাকি দুশতাধিক যাত্রী নিখোঁজ আছে বলে তাদের স্বজনরা দাবি করছেন।

এ ঘটনার ১১ দিন আগে ৩ মে পটুয়াখালীর গলাচিপায় রামদাবাদ নদীতে নিমজ্জ্বিত হয় এমভি শাতিল-১। এ দুর্ঘটনায় ২০ জনের লাশ উদ্ধার হলেও লঞ্চযাত্রীদের স্বজনেরা দাবি করেছেন, অন্তত ১০ জন নিখোঁজ রয়েছেন। দুটি দুর্ঘটনারই দৃশ্যমান কারণ আকস্মিক কালবৈশাখী ঝড়।

তবে বেঁচে যাওয়া অনেক যাত্রীর অভিযোগ, মাস্টার সতর্ক হলে দুর্ঘটনা এড়ানো যেতো। যাত্রীদের অনুরোধ উপেক্ষা করেই মাস্টার ঝড়ের মধ্যেই লঞ্চ চালিয়েছেন। এছাড়া সামান্য ঝড়ের কবলে পড়েই অল্প সময়ের মধ্যে লঞ্চ দুটি পানিতে তলিয়ে যায় বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও ওই লঞ্চের যাত্রীরা জানান।

ত্রুটিপূর্ণ লঞ্চকে ফিটনেস প্রদান: কালবৈশাখী ঝড়ের আঘাতে লঞ্চ ডুবির কথা বলা হলেও প্রকৃত অর্থে নৌযান দুটি ছিল যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ। চলাচলের অনুপযুক্ত সত্ত্বেও সেগুলো ফিটনেস সনদ দেয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক মাস আগে হাল্কা দুর্ঘটনাকবলিত লঞ্চ এমভি মিরাজ-৪ কে ২০০৬ সালেই ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে ত্রুটি সংশোধনের জন্য লঞ্চটির তলদেশে সলিড ব্যালাস্ট (পাথরকুচি ও সিমেন্টের মিশ্রণ) স্থাপন করে গভীরতা বৃদ্ধির পরামর্শ দিয়েছিল সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তর। কিন্তু যে ওজনের সলিড ব্যালাস্ট স্থাপন করতে বলা হয়েছিল তার চেয়ে প্রায় তিনটন কম ব্যালাস্ট স্থাপন করেন মালিক। এছাড়া লঞ্চটির ছাদে নকশা বহির্ভূতভাবে আটটি কেবিন নির্মাণ করা হয়।

সবকিছু জেনেও অধিদপ্তরের সদরঘাট (ঢাকা) অফিসের প্রকৌশলী ও জাহাজ জরিপকারক মির্জা সাইফুর রহমান ত্রুটিপূর্ণ নৌযানটিকে ফিটনেস সনদ দিয়ে চলাচলের সুযোগ করে দেন। ফলে সামান্য ঝড়েই ভারসাম্য হারিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে ডুবে যায় লঞ্চটি। এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির এক সদস্য এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত সার্ভেয়ার মির্জা সাইফুর রহমান গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।

একই অবস্থা ঘটেছে এমভি শাতিল-১ এর ক্ষেত্রেও। লঞ্চটি গত ২৭ জানুয়ারি পটুয়াখালী-গলাচিপা রুটে দুর্ঘটনাকবলিত হওয়ার পর সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তর এক পত্রাদেশে ওই লঞ্চের চলাচল বন্ধ করে দেয়। এরপর বরিশাল অফিসের সার্ভেয়ার মুঈনউদ্দিন জুলফিকার এক চিঠির মাধ্যমে অধিদপ্তরকে জানান, নৌযানটি চলাচলের সম্পূর্ণ উপযোগী। একই চিঠিতে তিনি নৌযানটিকে চলাচলের অনুমতি দেয়ার সুপারিশ করেন। তার সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে পুনরায় চলাচলের অনুমতি দেয়া হলে গত ৩ মে দুর্ঘটনায় পড়ে লঞ্চটি।

প্রাথমিক অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি নিশ্চিত হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সার্ভেয়ারের চিঠি এবং তার দেয়া ফিটনেস সনদে এমভি শাতিল-১ এর তলদেশের গভীরতা দেখানো হয়েছে এক দশমিক ৬৮ মিটার। কিন্তু বাস্তবে পাওয়া গেছে মাত্র শূন্য দশমিক ৯ মিটার। আয়তনের তুলনায় তলদেশের গভীরতা অনেক কম হওয়ায় সামান্য ঝড়েই ভারসাম্য হারিয়ে লঞ্চটি ডুবে যায় বলে তদন্ত কমিটির একজন সদস্য জানিয়েছেন।

এ অভিযোগে নৌ পরিবহণ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সার্ভেয়ার মুঈনউদ্দিন জুলফিকারকে ওএসডি করে প্রধান কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে বলে অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী একেএম ফখরুল ইসলাম জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুঈনউদ্দিন জুলফিকার বলেন, ‘তদন্তাধীন বিষয়ে আমি কোনো মন্তব্য করবো না। আশা করি সঠিক তদন্তে প্রকৃত কারণ উদঘাটিত হবে।’

অদক্ষরা পাচ্ছেন মাস্টারশিপ সনদ: সম্প্রতি দুর্ঘটনাকবলিত দুটি লঞ্চের মাস্টারই অনভিজ্ঞ ও অদক্ষ ছিলেন। তাদের অদক্ষতা ও গোয়ার্তুমির কারণেই লঞ্চ দুটি নিমজ্জ্বিত হয় এবং ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে বলে লঞ্চযাত্রী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।

তাদের অভিযোগ, আকাশে ঝড়ের পূর্বাভাস লক্ষ্য করেও নিকটবর্তী তীরে না ভিড়ে মাঝ নদী দিয়ে চালিয়ে গেছেন মাস্টাররা।

মাস্টারদের এমন গোয়ার্তুমি ও অদক্ষতা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট অনেকেই বলছেন, সমুদ্র পরিবহণ অধিদপ্তরে মাস্টারশিপ পরীক্ষায় সনদ দেয়ার ক্ষেত্রে মেধা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা যাচাই করা হয় না। তদবিরের মাধ্যমে এখানে অদক্ষরা সনদ পেয়ে থাকেন। দীর্ঘদিন ধরে অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়ে আসলেও কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে দৃশ্যত উদাসীন।

এ ক্ষেত্রে মাস্টারশিপ পরীক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ও অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত চিফ নটিক্যাল সার্ভেয়ার (সিএনএস) কেএম জসিমউদ্দীন সরকারকে দায়ী করেছেন তারা।

এ বিষয়ে জসিমউদ্দীন সরকারের সঙ্গে কথা বলতে তার কার্যালযে গেলে সেখান থেকে বলা হয়, তিনি বর্তমানে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন।

বিশেষজ্ঞরা যা বলেন: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নৌযান ও নৌযন্ত্র কৌশল বিভাগের প্রাক্তন অধ্যাপক ড. আব্দুর রহিম বলেন, ‘দুর্ঘটনার অন্যতম দুটি প্রধান কারণ হচ্ছে- নৌযানের অবকাঠামোগত ত্রুটি এবং পরিচালনায় অদক্ষতা। দুর্ঘটনা এড়াতে নৌযানের ফিটনেস প্রদানের আগে অনুমোদিত নকশা ও সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধানগুলো যথাযথভাবে অনুসরণ এবং দক্ষ মাস্টার নিয়োগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ।’

জল-পরিবেশ ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী ইনামুল হক বলেন, ‘অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে ত্রুটিপূর্ণ নৌযানের ফিটনেস এবং অদক্ষ ব্যক্তিদের মাস্টারশিপ সনদ দেয়ার কারণেই নৌপথে দুর্ঘটনায় প্রাণ ও সম্পদহানি ঘটছে।’

ফিটনেস এবং চালকদের মাস্টারশিপ সনদ প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা দায়িত্বশীল ও সতর্ক হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ও ব্যাপক প্রাণহানি এড়ানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ যাত্রী অধিকার কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ও সিটিজেনস রাইটস মুভমেন্টের (সিআরএম) মহাসচিব তুসার রেহমান বলেন, ‘যেখানে নৌযানের ফিটনেস সনদ ও মাস্টারশিপ পাসের লাখ টাকায় কেনাবেচা হয় সেখানে নৌ-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবাস্তব। জননিরাপত্তার স্বার্থে এসব দপ্তরের অনিয়ম-দুর্নীতি কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। যাদের কারণে এতোগুলো মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে সেই দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়ার মুঈনউদ্দিন জুলফিকার ও মির্জা সাইফুর রহমান এবং মাস্টারশিপ পরীক্ষা গ্রহণকারী তথা টাকার বিনিময় অদক্ষদের কাছে সনদ বিক্রিকারী জসিমউদ্দিন সরকারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন নাগরিক আন্দোলনের নেতা তুসার রেহমান।

বর্তমানকন্ঠ