নূর হোসেনের আসল নেতা মৃণাল কান্তি দাস

NoorMrinalগজারিয়া আ.লীগ সাধারণ সম্পাদকের অভিযোগ
মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের শিল্প ও বাণিজ্য বিষয়ক সম্পাদক এবং গজারিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম দ্য রিপোর্টকে বলেছেন, নারায়ণগঞ্জের আলোচিত নূর হোসেন কাউন্সিলরের আসল বড় নেতা মৃণাল কান্তি দাস এমপি।

তিনি বলেন, মুন্সীগঞ্জবাসীর আক্ষেপ, নারায়ণগঞ্জের সাত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে নূর হোসেনকে ঘিরে মিডিয়ায় এত খবর আসে কিন্তু তার আসল নেতা মৃণাল কান্তি দাসের নামে কেউ লেখে না।

আওয়ামী লীগের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, মৃণাল কান্তি দাসের কারণেই দলের সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়েও নূর হোসেনের ছিল অবাধ প্রবেশাধিকার। অফিসের একটি সূত্র দ্য রিপোর্টকে জানান, নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত অপহরণের পর লাশ উদ্ধার হওয়ার আগের দুইদিন সেখানে নিজের লোকজন নিয়ে আড্ডা দেন নূর হোসেন।

এই বিষয়ে মৃণাল কান্তি দাসের কাছে জানতে চাইলে তিনি দ্য রিপোর্টকে বলেন, এ সব সর্বৈব মিথ্যা, বানোয়াট।

-আপনার ‘স্নেহদৃষ্টির’ কারণেই নূর হোসেন স্থানীয় প্রশাসনসহ কাউকেই পরোয়া করত না বলে অভিযোগ…

জবাবে মৃণাল কান্তি বলেন, সবই বানোয়াট।

-এ সব যদি বানোয়াট হয় তাহলে গজারিয়া উপজেলা নির্বাচনে নূর হোসেনের ক্যাডার বাহিনী তাণ্ডব চালালো কার নির্দেশে? আপনার সংসদীয় আসনের গজারিয়া উপজেলায় আমিরুল ইসলাম দলীয় সমর্থন পাওয়ার পরও আপনি কেন্দ্র থেকে রেফায়েত উল্লাহ তোতার পক্ষে চিঠি নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এগুলো অনেক বিষয় ভাই সব কিছু মোবাইলে বলা যায় না।

-এই বিষয়টা যদি একটু বলতেন…

আপনি সময় করে একবার আমার কাছে আসেন। কথা বলা যাবে। মোবাইলে এত কথা বলাও যায় না। অনেক সময় ভুল বুঝাবুঝি হয়।
NoorMrinal
এরপর মৃণাল কান্তি দাস আর মোবাইলে কথা বলতে চাননি।

অন্যদিকে আমিরুল ইসলাম বলেন, আমার উপজেলা নির্বাচনে যাতে সমস্যা না করে সে জন্য নূর হোসেনের কাছে গিয়েছিলাম। তাকে মানাতে না পেরে শামীম ওসমানের কাছেও যাই। এই কথা জেনে নূর হোসেন আমাকে বলেন, আমার (নূর হোসেন) নেতা মৃণাল কান্তি দাস। শামীম ওসমানের কাছে গিয়ে কোনো লাভ নেই। আমি যখন এত বছর ইন্ডিয়ায় থাকছি (গত বিএনপি শাসনামলে) তখন শামীম ওসমান কিছু করে নাই। কিন্তু দাদা (মৃণাল কান্তি দাস) আমার থাকার বাসা থেকে শুরু করে সব কিছুর ব্যবস্থা করে দিয়েছেন কলকাতায়। দাদা যা বলেন আমি তাই করি।

স্থানীয় এই আওয়ামী লীগ নেতা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপ-দফতর সম্পাদক ও মুন্সীগঞ্জ-৩ আসনের এমপি মৃণাল কান্তি দাসের প্রতি আরও অভিযোগ করে বলেন, নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সেভেন মার্ডারের পর মিডিয়াতে দেখছি নূর হোসেনের গডফাদার হিসেবে নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় কিছু নেতার নাম আসছে। কিন্তু তার (নূর হোসেনের) আসল নেতা যে মৃণাল কান্তি দাস এটা অনেকেই জানে না। বা জানলেও অনেকেই লিখছেন না। আমি চাই মানুষ এই বিষয়টা জানুক।

তার বিরুদ্ধে এখন এভাবে কেন অভিযোগ করছেন, নূর হোসেন থাকতে কেন করেননি? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেকবার অভিযোগ করেছি। মিডিয়াতে মৃণাল কান্তির নামে কেউ লেখে না। আপনারাও লিখবেন কিনা জানি না।

-আপনার এলাকার এমপি যদি নূর হোসেনের গডফাদার হয় তাহলে এটা তো আপনাদেরও লজ্জা! উত্তরে এই নেতা বলেন, এই লজ্জা রাখার জায়গা আমাদের নেই।

মৃণাল কান্তি দাস তো আপনার দলেরই কেন্দ্রীয় নেতা। আপনি দলীয় ফোরামে কি এই অভিযোগ করেছেন? জবাবে আমিরুল ইসলাম বলেন, গত মাসে মুন্সীগঞ্জ জেলার মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়ও বিষয়টি আমি উত্থাপন করেছি। গত ১৩ মে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভাতেও বিষয়টি তুলেছি।

গত উপজেলা নির্বাচনে গজারিয়া উপজেলায় দলীয় সমর্থনপ্রাপ্ত আমিরুল ইসলাম মৃণাল কান্তি দাসের চক্রান্তের কাছে হেরে গেছেন বলে দাবি করে দ্য রিপোর্টকে বলেন, গত ২৩ মার্চ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। স্বয়ং দলীয় প্রধান (শেখ হাসিনা) আমাকে গজারিয়া উপজেলায় দলীয়ভাবে নির্বাচনের নির্দেশ দেন। স্থানীয় দলীয় ২২৭ ভোটের মধ্যে ২০৭ ভোট পেয়ে আমি দলীয় প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হই। কিন্তু ঐ সময়ে কয়েকদিনের জন্য প্রধানমন্ত্রী দেশের বাইরে গেলে মৃণাল কান্তি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী রেফায়েত উল্লাহ খান তোতার নামে কেন্দ্র থেকে চিঠি নিয়ে আসে। এরপর প্রধানমন্ত্রী দেশে আসার পর আবারও আমাকে দলীয় সমর্থন দেওয়া হয়। তারপরও মৃণাল কান্তি নূর হোসেন ও প্রশাসনের অবৈধ শক্তি দিয়ে আমাকে ফেল করায়। কয়েকজন সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়। এই বিচার গজারিয়াবাসী পায়নি।

-নূর হোসেন আপনার বিরুদ্ধে কাজ করবে কেন? তার এলাকা তো নারায়ণগঞ্জ, তাই না? এমন প্রশ্নের জবাবে আমিরুল ইসলাম বলেন, এটাই তো সাংবাদিকরা জানে না। নূর হোসেনের সঙ্গে মৃণাল কান্তির সম্পর্ক অনেক দিনের। আমার সঙ্গে নূর হোসেন কিংবা মৃণাল কান্তি কারও কোনো বিরোধ নেই। মূলত মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতির ইক্যুয়েশনে আমার প্রতি বিরক্ত মৃণাল কান্তি। তার কাছের লোক হলেন রেফায়েত উল্লাহ তোতা। তিনি বিনা ভোটে এমপি হয়ে পুরো জেলার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে রাখতে চান। তার কথায় যেন মুন্সীগঞ্জের আওয়ামী লীগ উঠে-বসে তিনি সেটা চান। কিন্তু আমি তো তার ব্যক্তি রাজনীতি করি না। বঙ্গবন্ধুর দল করি। শেখ হাসিনার নেতৃত্ব মানি। সাংগঠনিক ধারায় চলি। কারও পকেটে থাকতে চাই না। ক্যাডার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। কোনো গডফাদারের কাছে ধর্না দিতে হয় না। এ সব কারণেই এই কেন্দ্রীয় নেতা আমাকে দেখতে পারেন না।

আমিরুল ইসলাম আরও বলেন, এই মৃণাল কান্তির কারণেই নূর হোসেন গত উপজেলা নির্বাচনে তার শত শত ক্যাডার বাহিনী দিয়ে গজারিয়া উপজেলাকে তটস্থ করে রাখে। তার (মৃণাল কান্তি দাস) নির্দেশে র‌্যাবের লোকজন আমার বাড়িতে পর্যন্ত আক্রমণ করেছে। আমি আওয়ামী লীগের জেলা নেতা। উপজেলার সাধারণ সম্পাদক। আমি কি সন্ত্রাসী? আমার বাড়িতে র‌্যাব গিয়ে মানুষ মারবে কেন?

-আপনি কি নূর হোসেন ও র‌্যাবের কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কেন তারা আপনার বিরুদ্ধে কাজ করছে? উত্তরে আমিরুল ইসলাম বলেন, আমি তিনবার নূর হোসেনের কাছে গিয়েছি। একাধিকবার শামীম ওসমান ও র‌্যাবের কর্মকর্তার কাছেও গিয়েছি। কোনো ফল পাইনি।

-নূর হোসেন কি বলেছিল?

নূর হোসেন আমাকে বলে, ভাই আমি হইলাম জল্লাদ। আমার উস্তাদ (মৃণাল কান্তি দাস) আমাকে যা বলে আমি তাই করব। আপনি মৃণাল দা’র কাছে যান। তাকে ম্যানেজ করে আসেন। আমার কোনো সমস্যা নাই।

এরপর আমি একাধিকবার মৃণাল কান্তির কাছে যাই। বলেছি, দাদা আমি তো আওয়ামী লীগ করি, আমাকে সমর্থন দিতে আপনার সমস্যা কোথায়? তিনি আমাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী আমাকে তোমার পক্ষে কাজ করতে বলছেন। কিন্তু আমি সেটা করব না। তোতাই (রেফায়েত উল্লাহ খান) গজারিয়ার চেয়ারম্যান হবে (হয়েছেও তাই)।

আমিরুল ইসলাম বলেন, নির্বাচনের সময় ক্যাডারদের দিয়ে বাউলাকান্দি ইউনিয়নের শামসুদ্দিন চেয়ারম্যানকে কুপিয়ে হত্যা করে নূর হোসেন তার জল্লাদির পরিচয় দিয়েছেন। কারণ শামসুদ্দিন চেয়ারম্যান আত্মীয়তার সম্পর্কে নূর হোসেনের বেয়াই।

এ ছাড়া র‌্যাবের মেজর আরিফের (বর্তমানে জেলে) সঙ্গেও আমার কথা হয়েছে। সে আমাকে বলেছে র‌্যাব ও নূর হোসেন যা করেছে তার সবকিছুই হচ্ছে উপরের নির্দেশে। অর্থাৎ মৃণাল কান্তি দাসের নির্দেশে। মেজর আরিফ আমাকে বলেছিলেন আমি কেন র‌্যাবের সিও তারেক সাহেবের (র‌্যাব-১১’র সাবেক সিও, বর্তমানে জেলে) কাছে যাইনি। তার কথা শুনে তারেক সাইদের কাছে ফোন করেছিলাম। কিন্তু তিনি আমার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হননি।

– তারেক সাইদ আপনার সঙ্গে কেন দেখা করেননি বলে মনে হয় আপনার?

মৃণাল কান্তি দাসসহ দলের কেন্দ্রীয় একটি গ্রুপ তারেক সাইদকে বলে দিয়েছিল আমাকে যেন সহযোগিতা না করে। এই গ্রুপ অনেক বড়দের। তাদের বিষয়ে বলতে চাই না।

স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মহিউদ্দিনের সঙ্গে আমিরুল ইসলামের রাজনৈতিক সম্পর্ক ভালো থাকায় মৃণাল কান্তি দাস আমিরুল ইসলামকে স্থানীয় রাজনীতিতে সুযোগ দিতে চান না।

অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শামীম ওসমানের শিষ্য হিসেবে উত্থান হওয়া নূর হোসেন ক্রমেই উপরের সিঁড়ি ধরছিলেন। শামীম ওসমানের গণ্ডির বাইরে মৃণাল কান্তি দাস ছাড়াও আরও উপরের স্তরে তার রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল। বিষয়টি গত সরকারের সময়ে নূর হোসেনকে প্রশাসক বানানোর জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বরাবর এইচটি ইমামের চিঠির মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে।

এই বিষয়ে আমিরুল ইসলাম বলেন, আমার উপজেলা নির্বাচনে নূর হোসেনের অত্যাচারের প্রতিকারের জন্য শামীম ওসমানের কাছে গিয়েছিলাম। তিনি আমাকে বলেছিলেন, নূর হোসেন এখন আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। সে উপরের লেভেলে সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। আমার কাছে বলে কোনো লাভ নেই।

তবে এই বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ (সিদ্ধিরগঞ্জ-ফতুল্লা) আসনের এমপি শামীম ওসমানের কাছে জানতে চাইলে তিনি দ্য রিপোর্টকে বলেন, আমিরুল ইসলাম একবার আমার কাছে দুই মিনিটের জন্য এসেছিল। তাকে কি বলেছিলাম আমার মনে নেই।

দ্য রিপোট