বিলুপ্তির পথে সিরাজদিখানের ঐতিহ্যবাহী পানসি নৌকা

pansiনদীবেষ্টিত বিক্রমপুরে এক সময়ে যাতায়াতের ভরসাই ছিল ছোট ছোট পানসি নৌকা। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে আজ সে পানসি নৌকা হারিয়ে যেতে বসেছে। এক সময় দূরে কোথাও যাতায়াতে কিংবা নতুন বৌকে বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়ি আনতে পানসি নৌকার বিকল্প ছিল না। সে সময় মাঝি-মালস্নার ভাটিয়ালি আর মুর্শিদী গানে মন কেড়ে নিত সবার। তখন সর্বত্রই চলাচলের মাধ্যম ছিল পানসি নৌকা। কিন্তু আজ কালের বিবর্তনে নদী-খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে চিরচেনা সেই পানসি নৌকা। এখন কোথাও দেখা যায় না চিরচেনা সেই পানসি নৌকা।

এই এলাকার সর্বত্রই দিন বদলের সাথে সাথে এখন পরিবর্তন হয়েছে যোগাযোগের চিরচেনা সেই মাধ্যম পানসি নৌকার। সেই সাথে জীবনমানের চিত্রও। অধিকাংশ এলাকায়ই এখন সড়ক যোগাযোগের উন্নত হয়েছে। যে কারণে ক্রমেই ওইসব এলাকা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে চিরচেনা পানসি নৌকা।
pansi
তালতলা, কাঠালতলী, জৈনসার, মধ্যপাড়া, চিত্রকোট, শেখেরনগর, রাজানগর, নিমতলা, রাজদিয়া, ইছাপুরা এসব এলাকায় নৌকায় যোগাযোগের মাধ্যম ছিল এক সময়। এখনও শেখের নগর ঘাট ও তালতলা ডাকবাংলার ঘাটে সারিবাঁধা নৌকা দেখা যায়।

নিমতলা, ভুইরা, বালুর চর, সাপের চর, রামানন্দ, গয়াতলা ও এর আশপাশের এলাকাসহ বিভিন্ন ইউনিয়নের শতাধিক পরিবারের সদস্যরা পানসি নৌকার মাঝি হিসেবে বাবা-দাদার এ পেশাকে এখনো আঁঁকড়ে ধরে রেখেছেন। বাসাইল গ্রামের খায়ের মাঝি জানান, এখন আর মানুষ যাতায়াতে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে চায় না বলে নৌকার ব্যবহার কমে যাচ্ছে। ফলে বর্তমানে এ পেশায় তাদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। তবুও বাপ-দাদার ঐতিহ্য হিসাবে এ পেশাকে অনেকে ধরে রেখেছেন।

নিমতলার সামসুদ্দিন মোলস্না নৌকা ও বাঁশ ব্যাবসায়ী জানান, আগে এই সময়ে এ অঞ্চলে নৌকা বিক্রির ধুম পড়ে যেত। সারাদিন ধরে কারিগররা নৌকা তৈরিতে ব্যসত্ম সময় কাটাতো। এখন আর আগের মতো নৌকার প্রচলন নেই।

রসূলপুর গ্রামের আলতাফ মাঝি বলেন, আগে ঘাটে প্রতিদিন অসংখ্য নৌকা থাকত এখন বর্ষার সময় কিছু নৌকা চললেও শুকনো মৌসুমে বেশি চলাচল করতে পারেনা। নদী ও খাল শুকিয়ে যাওয়ায় ও কচুরি পানার আধিক্যে নৌকা চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কাঠালতলী গ্রামের অরম্নন মাঝি বলেন, তখনকার সময়ে আমরা দেখেছি এসব নৌকার কদর কত। দূরে কোথাও অনুষ্ঠানে যাওয়ার প্রয়োজন হলে পানসি সাজিয়ে যাওয়া হত। বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও হাটবাজারে পানসির খুব কদর ছিল। কিন্তু আজ আর সে পরিবেশ নেই।

আই এফসি বাংলাদেশ নদী ও পরিবেশ কমিটি মুন্সিগঞ্জ শাখার প্রচার সম্পাদক ইকবাল হোছাইন ইকু বলেন, নদী-নালা, খাল-বিলের বাংলাদেশে এক সময় নৌকা ছাড়া যাতায়াতের কথা চিন্ত্মা করাই যেতো না। বিক্রমপুরের রজত রেখা, কাজল রেখা, পোড়া গঙ্গা, কালিদাস সাগর, ইছামতি, ধলেশ্বরি নদী ও বিভিন্ন শাখা নদীগুলোতে ছোট বড় পানসি নৌকা একসময়ে প্রচুর চলাচল করত। এবং এ সমসত্ম নদীতে মাছ ধরার কাজে পানসি নৌকা প্রচুর ব্যবহার হতো। বর্তমানে এই নদীগুলো মরে যাওয়ায় এখন আর আগের মত পানসি নৌকা দেখা যায়না মাছও ধরেনা। এখনও কিছুটা বেচে থাকা নদীগুলো যদি সরকার খনন কাজ দ্রম্নত হাতে না নেয় তাহলে অদূর ভবিষ্যতে এই এলাকা মরুভূমিতে রুপান্তরিত হবে।

সৈয়দ মাহমুদ হাসান মুকুট: আমারদেশ