বাড়ছে রাত, আসছে লাশ

Miraz153৩৬ লাশ উদ্ধার
মেঘনা নদীতে ডুবে যাওয়া লঞ্চের উদ্ধার অভিযান দ্বিতীয় রাতে গড়িয়েছে। রাত যত রাড়ছে ততই বেড়ে দাঁড়াচ্ছে লাশের সংখ্যা। যেন রাতের সাথেই পাল্লা দিয়ে ভেসে উঠছে এক একটি লাশ।

শুক্রবার দিনগত রাত ১১টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত আরো ৭টি লাশ উদ্ধার করা হয়। এ নিয়ে মোট লাশের সংখ্যা দাঁড়ালো ৩৬টিতে।

এর আগে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ২৯টি লাশ উদ্ধার করে ডুবুরিরা। এছাড়া অর্ধশতাধিক জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে আগেই। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ‍শতাধিক

এদিকে মেঘনা নদীতে ডুবে যাওয়া লঞ্চটি ২৬ ঘণ্টা পর শুক্রবার বিকেলে দৃশ্যমান হলেও রাত সাড়ে ৩টা পর্যন্ত উদ্ধার তৎপরতা চলছে।

যদিও উদ্ধারের নামে কালক্ষেপন চলছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা। এছাড়া যে সব লাশ উদ্ধার করা হচ্ছে তাদের পেট বা দেহের বিভিন্ন অংশ কেটে ফেলা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। স্বজনদের দাবি যাতে লাশ দৃশ্যমান না হয় সেজন্য পানির নীচ থেকে লাশ কেটে দেওয়া হচ্ছে।

নিখোঁজ হওয়া আহসানউল্লাহ কবিরাজ (৫৫) এর পুত্র গোলাম মোস্তফা বাংলানিউজকে আক্ষেপ করে বলেন, ‘লাশ গুম করার জন্য লাশের বিভিন্ন অঙ্গ কেটে ফেলা হচ্ছে। এতে করে স্বজনের লাশ শনাক্ত করতে সমস্যা হচ্ছে। শুক্রবার রাতে যে ৩টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে প্রতিটিরই পেট, হাত-পা কাটা।

শরিয়তপুর জেলার সখিপুর থানার কচিকাটা ইউনিয়নের দুলার চর গ্রামের বাসিন্দা গোলাম মোস্তফা আরও জানান, ‘আমার বাবা অগ্রণী ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় চাকরি করতেন। কাল ১টার দিকে লঞ্চে উঠে সর্বশেষ ফোন করে জানান আমি লঞ্চে উঠেছি। তারপর যখন শুনলাম লঞ্চ ডুবেছে খবর পেয়ে চলে আসি বন্ধুদের নিয়ে। কিন্তু এতো সময় পার হলেও আমার বাবার লাশটা পর্যন্ত দেখতে পেলাম না। জানি না লাশ পাব কি না। আমরা লাশ চাই।

এর আগে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান ড. শামছুদ্দোহা খন্দকার বাংলানিউজকে জানিয়েছিলেন মধ্য রাতে লঞ্চটি উদ্ধার করা সম্ভব হবে। কিন্তু দেড়টা পর্যন্ত উদ্ধারের কোনো আলামত লক্ষ্য করা যায়নি।

বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান ড. শামছুদ্দোহা খন্দকার জানিয়েছিলেন, মেঘনার তলদেশে স্রোত, দমকা হাওয়া এবং দৃষ্টির কারণে উদ্ধার কাজ কিছুটা ব্যহত হচ্ছে। যদিও আগে মনে করা হয়েছিলো সন্ধ্যা নাগাদ উদ্ধার কাজ শেষ করা যাবে, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে শেষ হতে মধ্যরাত পর্যন্ত লাগতে পারে।

তিনি আরও জানান, উদ্ধারকারী দলের ডুবুরিরা প্রথমে লঞ্চটি থেকে মালামাল সরিয়ে কিছুটা হালকা করবে। এতে উদ্ধার কাজ অনেকটা সহজ হবে।

উদ্ধারকারী জাহাজ ‘প্রত্যয়’ লঞ্চটিকে টেনে মেঘনা তীরের কাছাকাছি নিয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ’র উদ্ধারকারী দলের নেতৃত্বদানকারী ফিরোজ আহমেদ এর আগে বাংলানিউজকে জানিয়েছিলেন, ডুবে যাওয়া লঞ্চটি ধীরে ধীরে তীরের দিকে টেনে আনা হচ্ছে। লঞ্চটির ওজন প্রায় ১২৭ টন। উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয়ের ধারণ ক্ষমতা ২৫০ টন।

তিনি এর আগে জানিয়েছিলেন, একঘণ্টার মধ্যে লঞ্চটিকে তীরে নিয়ে পুরোদমে উদ্ধারকাজ শুরু করা হবে। পুরোদমে এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে উদ্ধার কাজ শেষ করতে সবাই প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান তিনি।

এর আগে বিআইডব্লিউটিএ’র চেয়ারম্যান শাসছুদ্দোহা বাংলানিউজকে জানিয়েছেন, লঞ্চটি তীরে নিয়ে আসা হলে যাতে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না হয়, সেজন্য স্থানীয় প্রশাসনকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যদি ভেতরে কোনো লাশ থাকে সেগুলোকে অক্ষত অবস্থায় স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দিতে খুব ধীর ধীরে টেনে আনা হচ্ছে।

তিনি আরো জানান, লঞ্চটি একবারেই উল্টে রয়েছে। নিচের দিকের অংশটি এখন দৃশ্যমান হয়েছে।

উদ্ধার হওয়া ৩৬ লাশের মধ্যে ২৮ জনের লাশ শনাক্ত শেষে তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দু’জনের লাশ হাসপাতালের মর্গে ও অপর ৪ জনের লাশ উদ্ধার করে মেঘনা পাড়ে রাখা হয়েছে। লাশের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জেলা পুলিশের নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে বাংলানিউজকে এসব তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে গজারিয়া উপজেলার দৌলতপুর গ্রাম সংলগ্ন মেঘনা নদীতে এ লঞ্চডুবির ঘটনা ঘটে।

নিহতরা হলেন- জুলহাস হোসেন (৩৪), মোশারফ দেওয়ান (৩৫), জামাল শিকদার (৫০) ও তার ছেলে আবির (১১), সেতারা বেগম (৫৫), টুম্পা বেগম (২৬), শিশু মাহি, শিশু সুমনা, জলিল মালত (৫০), মানিক (১৪), আব্দুল্লাহ আল রেদওয়ান (৪০), রাফিয়া বেগম (৬০), খোরশেদ আলম খোন্দকার (৭৫), ওসমান গণি মোল্লা (৭০), ইসমাইল ফকির (৬০), কৃষ্ণ কমল দাস ৫০, আব্দুল জলিল (৫৫), তাসলিমা আক্তার রিয়া (২৫), রাশিদা বেগম (৫৬), লাইলী বেগম (৫৫), ঋতু (২৪), আব্দুল মান্নান দেওয়ান (৬৫), লক্ষ্মী দাস (৮৫), রজিয়া (৩২), শিশু রুমান, আব্দুল জলিল খান (৭০), মিন্টু সুখানী (৪০), মাসুম (৩৮), রিমা আক্তারসহ (৩২) ও অজ্ঞাতনামা তিনজনসহ মোট ৩৪ জন।

এদের সবারই বাড়ি শরীয়তপুরের বিভিন্ন এলাকায়। তবে অধিকাংশই ওই জেলার নড়িয়া থানার বাসিন্দা।

শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে ঘটনাস্থলে যায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) উদ্ধারকারী জাহাজ ‘প্রত্যয়’।

শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ডুবন্ত লঞ্চের দুই মাথায় ক্রেনের সাহায্যে রশি বাধা হয়। পরে টেনে তোলার চেষ্টা করার একপর্যায়ে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে একপাশের রশি ছিড়ে লঞ্চটি আবার সম্পূর্ণ তলিয়ে যায়।

এর ফলে লঞ্চ উদ্ধার চেষ্টা কিছু সময় বন্ধ রাখা হয়। পুনরায় লঞ্চের গায়ে ক্রেনের সাহায্যে রশি বাঁধতে দু’তিন ঘণ্টা সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন উদ্ধারকারী কর্মকর্তারা।

তবে একাধিক উদ্ধারকারী কর্মকর্তারা জানান, ডুবন্ত লঞ্চে আটকা পড়া লাশ ও মালামালের কারণে লঞ্চের জানালা-দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। তাই টেনে তুলতে সমস্যা হচ্ছে।

এ লঞ্চটি এর আগেও দুইবার দুর্ঘটনার কবলে পড়েছিল বলে জানা গেছে।

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর