অসীম সাহসী ছিলেন হুমায়ুন আজাদ

ha1হুমায়ুন আজাদকে সার্বিকভাবে মূল্যায়নের সময় এখনও আসেনি। তাকে প্রথাবিরোধী লেখক বলা হলেও তিনি সর্বক্ষেত্রে প্রথাবিরোধী ছিলেন না। তবে প্রচলিত প্রথাকে তিনি তার লেখায়, চিন্তায়, কথায় আক্রমন করেছেন। মূলত অসীম সাহসী একজন মানুষ ছিলেন হুমায়ুন আজাদ। তিনি কখনও তার জীবনের পথ চলায় পরিণামের কথা ভেবে থেমে থাকেননি।

ভাষাবিজ্ঞানি, লেখক, কবি ও শিক্ষক হুমায়ুন আজাদের স্মরণে এক আলোচনা সভায় এ ভাবেই কথাগুলো বলছিলেন ভারতের পদ্মভূষণ পদক প্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব ও ঢাকা বিশ্মবিদ্যালযের অ্যামেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান।

সোমবার বিকেলে পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে ‘চেতনায় হুমায়ুন আজাদ’ সংগঠনের আয়োজনে তার জীবন-কর্ম নিয়ে আলোচনা ও স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এতে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ছাড়াও হুমায়ুন আজাদের জীবন, দর্শন, কর্মের ওপর আরো আলোচনা করেন, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক, কবি অসীম সাহা, আয়োজক সংগঠনের আহ্বায়ক সুলতানা আজিম প্রমুখ।

এ সময় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আরো বলেন, হুমায়ুন আজাদকে প্রথাবিরোধী বলা হলেও তিনি সার্বিকভাবে প্রথাবিরোধী ছিলেন না। লেখক, কবি, ভাষাবিজ্ঞানির পরিচায়ের বাইরে তিনি ছিলেন একজন পিতা, একজন শিক্ষক। তিনি দেশ-বিদেশ থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। প্রথাবিরোধী হলে এমনটা সম্ভব ছিলো না।

তিনি বলেন, ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি হুমায়ুনকে যারা আক্রমন করেছিল তারা ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে আক্রমন করেনি। যারা বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধীতা করেছিল, যারা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল তারাই হুমায়ুনকে আঘাত করেছে। হুমায়ন আজাদের লেখা তাদের আঘাত করেছিলেন বলেই তারা তাকে শারিরিকভাবে আক্রমন করেছে।

হুমায়ুন আজাদের লেখার গভীরতা সব সময়ই স্বীকার করতে হবে, উপলব্ধি করতে হবে। তবেই তার চাওয়া অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, মুক্তচিন্তার বাংলাদেশ গড়া সম্ভব বলে আলোচনায় মন্তব্য করেন আনিসুজ্জামান।

এ সময় শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, যে কোনো স্বপ্নের বাস্তবায়ন সহজ নয়। এর জন্য অনেক অশুভকে মোকাবেলা করতে হয়। অনেক কঠিন বাস্তবতাকে প্রতিহত করে স্বপ্নের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। হুমায়ুন আজাদ যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন, সে বাংলাদেশ গড়ে তোলা কঠিন কাজ। কিন্তু কঠিনের ভয়ে হুমায়ুন আজাদ যেমন থেমে থাকেননি, আমরাও থেমে নেই।

মন্ত্রী আরো বলেন, স্বাধীনতার চার দশক পরেও এ বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। হুমায়ুন আজাদ যাদের এ আমলে আক্রান্ত হয়েছিলেন তাদের প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ, মদদে উগ্র মৌলবাদী গোষ্ঠী এখনও সক্রিয়। মানবতাবিরোধী দর্শনের লালনকারী উগ্র মৌলবাদীরা হুমায়ুন আজাদকে সহ্য করতে পারেনি।

তিনি বলেন, গত বছরেও তাদের কালো ধাবা জাতি লক্ষ্য করেছে। কেননা তারা গত বছর বিভিন্ন কায়দায় তারা মানুষকে হত্যা করেছে। এসব প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ শত্রুকে কঠোরভাবে প্রতিহত করে হুমায়ুন আজাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে হবে এই আমাদেরই।

আলোচনা ও স্মরণ সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিক বলেন, হুমায়ুন আজাদ সত্যভাষী, স্পষ্টভাষী একজন মানুষ ছিলেন। বিভিন্ন লেখায় তার সে সত্যভাষণের প্রকাশ ঘটেছে। তরুণদের প্রতি তার ছিল অবিচল আস্থা। তরুণরাও তাকে গ্রহণ করেছে।

উপাচার্য এ সময় হুমায়ুন আজাদের ওপর আক্রমণকারী গোষ্ঠীর বিচার দাবি করেন।

এ সময় কবি অসীম সাহা বলেন, হুমায়ুন আজাদ আমাদের চেতনার অনিবার্য একটি নাম। দূষিত রাজনীতির বিরুদ্ধে হুমায়ুন আজাদ তার লেখনিতে যেমন সোচ্চার ছিলেন, তেমনি সোচ্চার ছিলেন ব্যক্তি জীবনেও। আপত দৃষ্টিতে হুমায়ুন আজাদকে একজন নেতিবাচক লেখক মনে হলেও মূলত তিনি ছিলেন আপদমস্তক একজন ইতিবাচক লেখক ও কবি।

স্মরণ সভায় আরো আলোচনা করেন, লেখক, গবেষক রতন তনু ঘোষ, লেখক, সাংবাদিক আবু বকর সিদ্দিক, এসএম মিলন।

এ স্মরণ সভায় দাবি তুলে বলা হয়, বাংলা একাডেমির সামনের সড়কটি হুমায়ুন আজাদ নামে নামকরণসহ ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি দুর্বৃত্তরা যেখানে হুমায়ুন আজাদকে আক্রমন করেছিল সে জায়গাটি চিহ্নিত করে সেখানে তার ভাস্কর্য নির্মাণ করতে হবে।

উল্লেখ্য, অনুষ্ঠানের শুরুতেই আয়োজকদের পক্ষ থেকে বলা হয় এই আলোচনা ও স্মরণ সভায় কেউ সভাপতিত্ব করবেন না, এমনকি অনুষ্ঠানে কেই প্রধান অতিথি বা বিশেষ অতিথি নন। সবাই আলোচক।

বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর