কঠোর অনুশাসন দিয়ে আইজিপিকে চিঠি

policeমন্ত্রণালয়ের বৈধ এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলায় কঠোর অনুশাসন দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পুলিশের আইজিকে চিঠি দেয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকালে এ সংক্রান্ত চিঠি দেয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে মুন্সীগঞ্জে পুলিশের একজন এ এসআইর হাতে ইউএনও লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনায় জেলা প্রশাসন চাইলেও মামলা নেয়নি পুলিশ। এরপর জড়িত পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রশ্নে মামলা নেয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশ সুপারকে মৌখিক ও লিখিতভাবে নির্দেশ দেয়া হয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশ বাস্তবায়ন না করে উল্টো পত্র দিয়ে এ নির্দেশের ব্যাপারে মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। বিষয়টিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করে এবং এরই পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার পুলিশের আইজিকে চিঠি দেয়া হয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব নূর-এ-মাহবুবা জয়া স্বাক্ষরিত এক পাতার চিঠিতে বলা হয়, গত ২২ মার্চ উপজেলা নির্বাচনের দিন মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা এটিএম মাহবুব-উল করিম ও লৌহজং থানার এএসআই মোঃ এমদাদুল হকের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্য ২৪ ও ২৭ মার্চ মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা দিয়ে এসপিকে চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু সরকারি নির্দেশ প্রতিপালনের বিষয়টি উপেক্ষা করে পুলিশ অধিদফতর কর্তৃক ৩ এপ্রিল চিঠি পাঠানো হয়। এতে উল্টো সরকারি নির্দেশের যথার্থতা বা এখতিয়ার সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। বলা হয়, পুলিশের চিঠিতে সচিবালয় নির্দেশিকার অপব্যাখ্যা করে কার্যবিধিমালা ১৯৯৬ ও সচিবালয় নির্দেশমালা ২০০৮-এর সংশ্লিষ্ট বিধিগুলোর অপব্যাখ্যা করে সরকারের কর্তৃত্ব প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। মূলত অধঃস্তন অফিস সরাসরি মন্ত্রণালয়ে পত্র যোগাযোগ করতে পারে না। তবে মন্ত্রণালয় সরাসরি অধঃস্তন অফিসে পত্র যোগাযোগ করতে পারে। উল্লেখিত দুটি বিধিতে বারিত করা হয়নি।

মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়, পুলিশ আইন ১৮৬১-এর ৩ ধারা মতে সরকার দেশের সব অংশের পুলিশ বাহিনীর সব কাজ তত্ত্বাবধান করবে। বোর্ডস মিসিলেনিয়ার্স রুলস ১৯১৮-এর বিধি-৩ অনুযায়ী অধঃস্তন কর্তৃপক্ষের সব ক্ষমতা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আছে। অ্যালোকেশন অব বিজনেস বা কর্মবণ্টন নির্দেশিকার ৪০ নং ক্রমিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট এখতিয়ারে এর অধিন্যস্ত অফিস এবং সংস্থার প্রশাসন ও নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা রয়েছে। এসব নির্দেশনা, আইন ও বিধি অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন অধিদফতরের অংশ হিসেবে জেলা পুলিশের কর্মকাণ্ড তত্ত্বাবধান করা ও ধর্তব্য বা চিহ্নিত অপরাধের অভিযোগে মামলা করার নির্দেশনা প্রদান সরকার তথা মন্ত্রণালয়ের আইনসঙ্গত ও সহজাত এখতিয়ার। এমতাবস্থায় নিয়ন্ত্রণাধীন অধিদফতর কর্তৃক মন্ত্রণালয় তথা বৈধ কর্তৃপক্ষের আইনসঙ্গত আদেশ, অনুশাসন, সরকারি বিধি-বিধান, কার্যবিধিমালা, সচিবালয় নির্দেশমালা ইত্যাদি অমান্য করার এ ধরনের প্রবণতা প্রশাসনিক শৃঙ্খলাবিরোধী এবং সরকারের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে বলে মন্তব্য করা হয় চিঠিতে।

আইজিপির কাছে পাঠানো চিঠিতে আরও বলা হয়, সংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান সম্পর্কে সম্যক ধারণা ছাড়া বিদ্যমান বিধি-বিধানের অপব্যাখ্যা করে সরকারের বৈধ কর্তৃপক্ষের কর্তৃত্বকে অস্বীকারপূর্বক সরকারি আদেশ পালন না করে পত্র পাঠানো অসদাচরণের শামিল, যা সরকারী কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ১৯৮৫-এর ২(এফ) অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এমতাবস্থায় ভবিষ্যতে সরকারের নির্দেশনা যথাযথভাবে পালন এবং সরকারের বিধি-বিধানগুলেঅ অনুসরণ করার জন্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক অনুশাসন দেয়া হল বলেও উল্লেখ করা হয় এই চিঠিতে।

প্রসঙ্গত, সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ১৯৮৫-এর ২(এফ) অনুযায়ী এই বিধিতে ৫টি অপরাধের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে এক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে ঊর্ধ্বতন কর্তকর্তার আইনসঙ্গত আদেশ অমান্য করা ও সরকারের কোনো আদেশ, পরিপত্র এবং নির্দেশাবলী আইনসঙ্গত কারণ ছাড়া অবজ্ঞা করা। আর অসদাচরণের জন্য যে কোনো দণ্ড দেয়ার বিধান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে গুরুদণ্ডের মধ্যে রয়েছে বাধ্যতামূলক অবসরদান, চাকরি হতে অপসারণ ও বরখাস্তকরণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইউএনওকে লাঞ্ছিত করার সময় গত মার্চ মাসে মুন্সীগঞ্জের এসপি ছিলেন মোঃ হাবিবুর রহমান। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জেলা প্রশাসনের মামলা নেয়ার জন্য তাকে নির্দেশনা দেয়া হলেও তিনি মামলা গ্রহণের অনুমতি দেননি। এমনকি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে তিনি ছুটিতে চলে যান। পরবর্তীতে ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকির হোসেন মজুমদারও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ প্রতিপালন করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
লৌহজং থানার এএসআই কর্তৃক মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এটিএম মাহবুব-উল করিমকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে রিপোর্ট জমা দিয়েছে। এতে এএসআই এমদাদুল হককে দায়ী করা হয়।

জানতে চাইলে পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার যুগান্তরকে বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পুলিশের কোনো মতবিরোধ নেই। সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিষয়ে সমন্বয় করে সম্পাদন করা হয়। এর বেশি আর কোনো মন্তব্য করতে চাননি তিনি।
নেপথ্য কারণ : স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পুলিশের এমন দূরত্ব ও নির্দেশ প্রতিপালন না করার বিষয়ে জানতে চাইলে এই মন্ত্রণালয়ে অতীতে দায়িত্ব পালন করেছেন এমন কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, কর্মচারী আচরণবিধি অনুযায়ী ২ লাখ টাকার ওপরে কোনো সম্পত্তি বা সম্পদ কিনতে হলে নিয়ন্ত্রণকারী উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হয়। এ ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত ও প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তের অভাবে পুলিশের অনেক সদস্যের প্রস্তাব মন্ত্রণালয় থেকে নাকচ হয়ে গেছে। দেখা গেছে, ফ্ল্যাট বা প্লট, জমি কেনার ক্ষেত্রে যে মূল্য দেখানো হয়েছে তার সঙ্গে বাস্তব বাজার দরের কোনো মিল নেই।

আবার বিদেশ যাওয়ার ক্ষেত্রেও পুলিশ কর্মকর্তাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও সম্মতি নিতে হয়। কিন্তু অনেক সময় বিধিগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিদেশ সফরের কাক্সিক্ষত প্রস্তাব অনুমোদন করা যায় না। এছাড়া পুলিশের রদবদল কিংবা পদোন্নতি সংক্রান্ত প্রস্তাবের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর পর তা পুলিশের প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে পরিবর্তন হয়ে যায়। এতে করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব অবস্থান ও কর্তৃত্ব নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি এমন একটি ঘটনাও ঘটেছে। তারা বলেন, মূলত এই তিনটি কারণে বেশ কিছুদিন থেকে পুলিশ সদর দফতরের সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এক ধরনের অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তারা মনে করেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উল্লিখিত এখতিয়ার নিয়ে নিয়ে প্রশ্ন তোলার পেছনেও এর যোগসূত্রতা থাকতে পারে। তবে এই প্রেক্ষাপটকে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখতে হবে। নিশ্চয় সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের হস্তক্ষেপে এর সম্মানজনক সুরাহা হবে।

যুগান্তর