এ্যাপ্রোচ রোড, নদী শাসন, তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ আরম্ভ

padmaWমাওয়ায় পদ্মা সেতু নিয়ে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। সেতুর এ্যাপ্রোজ রোড, তীর রক্ষা বাঁধ ও নদী শাসনসহ সব কাজেই যেন নতুন বিশেষ গতি পেয়েছে। তাই দ্রুত এগিয়ে চলছে সব কিছু। সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে মাওয়া ঘাট পার্শ্ববর্তী শিমুলিয়ার স্থানান্তরের কাজও শুরু হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে মাওয়ায় এক নতুন কর্মব্যস্ততা চলছে সেতু ঘিরে। সেনাবাহিনীর ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেডের তত্ত্বাবধানে নিখুঁতভাবে পরিচালিত হচ্ছে পদ্মা সেতুর প্রকল্প কাজ। এর আগে পুনর্বাসন, কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড, জমি অধিগ্রহণসহ অনেক কাজই সম্পন্ন হয়ে গেছে। কাজের অগ্রগতির কারণেই জুনের প্রথম সপ্তাহে মূল সেতুর কার্যাদেশ দেয়া হচ্ছে। তাই স্বপ্নের সেতুর বাস্তবতার চিত্র দেখে খুশি পদ্মাপারের লাখো মানুষ।

সেনাবাহিনীর ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শাহ্ নূর জিলানী (পিএসসি) জানান, পদ্মা সেতু এলাকার মাওয়ায় ব্যাপক ভাঙ্গন ঠেকাতে ও এ অঞ্চলের বাড়িঘর রক্ষা করে মানুষগুলোকে পদ্মার রাহু গ্রাস থেকে রক্ষা করে জরুরী আপদকালীন প্রতিরক্ষা বাঁধের কাজ হাতে নেয়া হয়েছে। প্রায় ১শ’ ২০ কোটি টাকা ব্যয়ের পানি উন্নয়ন বোর্ডের নক্সা অনুযায়ী ১৩শ’ মিটার দৈর্ঘ্যরে এ প্রকল্পের কাজ সেনাবাহিনী প্রায় শেষ করে এনেছে। কাজের মান বজায় রাখতে ও মনিটরিং করতে সেনাবাহিনী এখানে বালুর মান নির্ণয়নের জন্য বসিয়েছে বিশেষ যন্ত্র। এ যন্ত্রের মাধ্যমে বালুর মান পরীক্ষা করে বস্তায় ভরে নদীতে ফেলা হচ্ছে। তাছাড়া ভিডিও রেকডিংয়ের মাধ্যমে কাজের মনিটরিং করা হচ্ছে। ১৪ লাখ জিওব্যাগ ভর্তি বালু নদীতে ফেলার কাজ ৮৫ ভাগের বেশি শেষ হয়েছে। মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রাথমিক ও জরুরী ভিত্তিতে এ তীর রক্ষা বাঁধ দিয়ে পদ্মা সেতুর এ এলাকাকে নদী ভাঙ্গার হাত থেকে রক্ষা করা হচ্ছে। তাছাড়া মাওয়া ঘাটকে শিমুলিয়ায় স্থানান্তরের কাজও সেনাবাহিনী শুরু করেছে। এ প্রকল্পের আওতায় সেনাবাহিনী প্রায় আড়াই কিমি. রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। তবে রাস্তাটি পদ্মা সেতুর কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড অংশে কিছুটা থাকায়, রাস্তার ওই অংশে নক্সায় কিছুটা পরিবর্তন আসবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এখন নদী শাসনের জন্য পদ্মা সেতু প্রকল্পের অওতায় আরও ৭ হাজার কোটি টাকার টেন্ডার আহ্বান করা হচ্ছে। পদ্মা সেতুর প্রকল্পের নদী শাসনের কাজকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এ জন্য আগামী ২৯ মে প্রকল্পের নদী শাসনের কাজের আর্থিক প্রস্তাব দাখিল করবে ৪টি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে- চায়নার সিনো হাইড্রো, কোরিয়ার হোন্দাই ইঞ্জিনিয়ারিং এ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি, বেলজিয়ামের জান্ডিনোল এবং নেদারল্যান্ডসের ভ্যানওড। মাওয়া থেকে বাবুবাজার ব্রিজ পর্যন্ত মহাসড়ককে চার লেনে উন্নত করার ডিপিপি প্রণয়নয়ের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। মাওয়া থেকে কেরানীগঞ্জের ইকোরিয়া পর্যন্ত ৩০ কিমি. রাস্তার জন্য কোন জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন নেই। তবে ইকোরিয়া থেকে বাবুবাজার ব্রিজ পর্যন্ত কিমি. রাস্তার জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। সেতুর কাজ শুরু হওয়ার পরই শুরু হবে চার লেন বৃদ্ধি করা কাজ। এ ছাড়া রেললাইন স্থাপন নিয়েও চলছে কর্মতৎপরতা। পদ্মা সেতুর কাছাকাছি এলাকায় রেললাইনের জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

যোগাযোগমন্ত্রী, পরিকল্পনামন্ত্রী, নৌমন্ত্রী, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা প্রশাসকসহ শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সরেজমিন ঘন ঘন তদারকি কাজের গুণগতমান এবং গতি দুটোই বৃদ্ধি পেয়েছে। যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খান ও স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বৃহস্পতিবার মাওয়ায় আসছেন। শিমুলিয়া ঘাট তৈরি কাজের অগ্রগতি এবং অন্য অংশগুলোর খোঁজ খবর করবেন। স্থানীয় সাংসদ অধ্যাপক সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি বলেন, ‘পদ্মা সেতু নির্মিত হলে দক্ষিণাঞ্চল ও মুন্সীগঞ্জ শুধু নয় গোটার দেশের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। সেতুটির গুরুত্বপূর্ণ অংশ মুন্সীগঞ্জের আমার নির্বাচনী এলাকার হওয়ায় আমার সৌভাগ্য। সঠিকভাবে বোঝানো গেছে বলে মানুষ জমি দেয়াসহ সব ক্ষেত্রেই সহযোগিতা করছে। সেতুটি সুষ্ঠু ও সুচারু রূপে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং সঠিক নেতৃত্বের কারণে প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান।’

জেলা প্রশাসক সাইফুল হাসান বাদল জানান, পদ্মা সেতুর কাজ যাতে নির্বিঘেœ সম্পন্ন করা যায় সে ব্যাপারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিককল্পে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ জনগণের আন্তরিক সহযোগিতা কমনা করেন। সকলের আন্তরিক সহযোগিকার কারণে কাজ দ্রুত এগোচ্ছে।

পদ্মা সেতুকে ঘিরে মাওয়া-জাজিরা সেনানিবাস হচ্ছে। এখানে কর্মরত সেনাবাহিনীর ৯৯ কম্পোজিট ব্রিগেড ইতোমধ্যেই কাজ শুরু হচ্ছে। এই ব্রিগেডে আওতায় দুই হাজার সেনাসদস্য কাজ করছে। এই সেনাসদস্যরা আপাতত পুনর্বাসন কেন্দ্রে উঠেছে। এই ব্রিগেডের কর্মযজ্ঞ এখানে বিশেষ মাত্র যুক্ত হয়েছে।

পদ্মাপারের ইকবাল হাসেন হোসেন বলেন, ‘পদ্মা সেতুর বিশাল কাজ দেইখ্যা ভাল লাগতাছে। এই চোটে কোন ষড়যন্ত্রই আটকাইতে পারব না। সেতুর সঙ্গে রেল, সেনানিবাস সবই হচ্ছে, আমাগো থেইক্যা ভাগ্যবান আর কারা জমি কিছু গেলেও আমাগো সুভাগ্য।’

পদ্মা সেতুর মূল কাজ শুরু হবে মাওয়া চৌরাস্তা বরাবর বর্তমান ঘাট এলাকা দিয়ে। যেহেতু দ্রুতই পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হচ্ছে, তাই বর্তমান মাওয়া ঘাটকে জরুরী ভিত্তিতে দেড় কিমি. পশ্চিমে কুমারভোগের শিমুলিয়া বাজারের কাছে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি ও জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুল হাসান বাদলে দক্ষ নেতৃত্বে জনপ্রতিনিধি ও সব মহলের সহযোগিতায় নির্বিঘেœ মাওয়া ঘাট স্থানান্তর প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে। সেনাবাহিনী ইতোমধ্যে ঘাট স্থানান্তরের জন্য ২ কিমি. নতুন রাস্তা নির্মাণের কাজ শুরু করেছে। পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হওয়ার পূর্বে এ কাজ দ্রুতই শেষ করা হবে। তবে মাওয়া ঘাটকে স্থায়ীভাবে বর্তমান ঘাট হতে আরও পূর্বদিকে কান্দিপাড়ায় সরিয়ে নেয়া হবে। এ স্থায়ী ঘাট নির্মাণ করতে প্রায় ১ বছর সময় লাগবে। যেহেতু পদ্মা সেতুর কাজ দ্রুত শুরু করতে হবে, তাই জরুরী ভিত্তিতে মাওয়া ঘাটকে শিমুলিয়ায় স্থানান্তর করতে হচ্ছে। তাছাড়া মাওয়া চৌরাস্তা হতে দোগাছি পর্যন্ত প্রায় দুই কিমি. এ্যাপ্রোজ রোডের কাজও দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। সেতুর কাজ শুরুর আগেই এ কাজ শেষে করা যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

জনকন্ঠ