হুমায়ুন আজাদের কবিতা: স্বপ্ন ও সৌন্দর্যের যুগলবন্দি

ha4রাকিবুল রকি: হুমায়ুন আজাদ_ বহুমাত্রিক অভিধায় অভিষিক্ত। একাধারে তিনি কবি, ঔপন্যাসিক, ভাষাবিজ্ঞানী, সমালোচক, রাজনৈতিক ভাষ্যকার, কিশোর সাহিত্যিক। তাঁর রচনার পরিমাণ বিপুল কিন্তু সেই তুলনায় কাব্যগ্রন্থ মাত্র সাতটি। এ সম্পর্কে হুমায়ুন আজাদের স্ব-উক্তি, ‘অজস্র অসংখ্য কবিতা লেখার মনোরম দেশে আমি কবিতা লিখেছি কমই।’ হুমায়ুন আজাদ ষাটের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে সাহিত্য-মঞ্চে আবির্ভূত হন কবি হিসেবে। কবিতা তাঁর কাছে ‘সৌন্দর্যের বিরামহীন বিস্তার, ইন্দ্রিয়ের অনন্ত আলোড়ন, জীবাশ্মের মতো নির্মোহ, মহর্ষির প্রাজ্ঞতা, ধ্যানের অবিচল উৎসারণ, জীবনের আদিম উচ্ছল উৎসব, প্রতীক, চিত্রকল্পের নির্বাণহীন অঙ্গার।’ তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অলৌকিক ইস্টিমার’ (১৯৭৩) থেকে শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘পেরুনোর কিছু নেই’ (২০০৪) পর্যন্ত তিনি কবিতায় স্বপ্ন ও সৌন্দর্য সৃষ্টি করে গেছেন নিরন্তর। হুমায়ুন আজাদের কবিতায় আছে আবেগের তীব্রতা কিন্তু তা ভাবালুতায় পূর্ণ নয়, যুক্তি দ্বারা শাসিত। আবার তাঁর কবিতা শুধু যুক্তির নাগপাশে বন্দি থেকে দম বন্ধ হয়ে মারা যায় নি, কারণ কল্পনার ডানা তাঁর কবিতাকে নিয়ে গেছে শিল্পের নিবিড় নীলিমার কাছে। তাঁর কবিতায় আবেগ, যুক্তি ও স্বপ্ন এ তিন ধারার সংমিশ্রণ ঘটেছে। ‘অলৌকিক ইস্টিমার’ কাব্যগ্রন্থে হুমায়ুন আজাদ অবক্ষয়ী, মলভা-ে পরিণত হওয়া লৌকিক পৃথিবীতে অলৌকিক শিল্পের জলে স্নান করে শুদ্ধ হতে চেয়েছেন। কিন্তু হুমায়ুন আজাদ শুধু শিল্পের জন্য শিল্প তৈরি করেন নি। তিনি কলাকৈবল্যবাদীদের দলে নন। আবার সমাজ-সংসারের কথা বলতে গিয়ে, অধঃপতনের চিত্র আঁকতে গিয়ে, আদর্শ প্রচার করতে গিয়ে তিনি সৌন্দর্যহীন শব্দ-সম্ভারকে কবিতা বলে চালিয়ে দেন নি, এবং প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত এ দুয়ের যুগলবন্দি আমরা তাঁর কবিতায় লক্ষ্য করি। তিনি যেমন বলেন,

জ্যোৎস্না আমাকে ঠেলে ফেলে দিলো ফুটপাতে
ল্যাম্পপোস্টে সবগুলো গাছের চুড়োয়
এই রাতে।
(জ্যোৎস্নার অত্যাচার)

কিংবা,

আমি দৌড়ে ছুটে যাচ্ছি সোনালি জেটিতে
তেমনি সজীব ওই নেমে আসছে
জ্যোৎস্না
রোদ
স্বপ্ন
ব্যর্থতা
রোদন
দৌড়ে যাচ্ছি আমি ওদের সবার সঙ্গে আলিঙ্গন করতেই হবে।
(অলৌকিক ইস্টিামার)

তেমি্ন এর পাশাপাশি বলতে শুনি,
আমার বাবার
স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়েছিল আমার জীবনে।
আমার স্বাধীনতা কী রকম হবে আমার সন্তানের জীবনে?
নাকি তাকেও বলতে হবে আমার মতোই কোনদিন,
‘এতো দিনে স্বাধীন হলাম।’
(হুমায়ুন আজাদ)

প্রথম দুটি উদাহরণে শুধু মাত্র সৌন্দর্য চেতনা প্রকাশ পেলেও শেষেরটিতে তাঁর তীব্র রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। হুমায়ুন আজাদের কবিতায় এরকম উদাহরণ অপ্রতুল নয়।

হুমায়ুন আজাদকে ‘প্রথাবিরোধী’ বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়। তিনি ভাষ্যে, গদ্যে কী কবিতায় সব ক্ষেত্রেই প্রচলিত রীতিনীতি, গতানুগতিক বিশ্বাস, সমাজ ও রাষ্ট্রের অনিয়ম, অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন নির্ভীকভাবে। রাষ্ট্রশক্তির রক্তচক্ষু কিংবা স্বার্থবাদী সমাজ-সংস্কারকদের ভ্রু-কুটিকে তিনি পাত্তা দেন না। এসবের বিরুদ্ধে ছিল তাঁর ঋজু উচ্চারণ_

মানি কি না মানি
পাঁচ হাজার বছর ধরে পৃথিবীর সমস্ত
হোয়াইট হাউজ, ত্রেমলিন, দশ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিট, আর বঙ্গভবন
দখল করে আছে মাফিয়ার সদস্যবাই_
পৃথিবীর প্রতিটি রাষ্ট্রপ্রধান মাফিয়ার সক্রিয় সদস্য।
(পৃথিবীতে একটিও বন্দুক থাকবে না)

তিনি মনে করেন, অযোগ্য, ভ-, চাটুকারদের কারণে বর্তমান সমাজের এত অবক্ষয়, অধঃপতন। এখানে ভ-রাই মহৎ, সমাজপতি, সকলের নমস্য। মূল্যায়ন নেই মেধাবীদের, কদর নেই যোগ্যব্যক্তিদের। প্রতিভাবানদের, জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের, যাঁরা দেশকে প্রতিষ্ঠিত করেছে বিশ্বদরবারে, তাঁদের কোন মূল্যায়ন নেই এখানে। হুমায়ুন আজাদ তাই তীব্র ক্ষোভ থেকে ব্যঙ্গোক্তি করে বলেন,

আজকাল আমি কোন প্রতিভাকে ঈর্ষা করি না।
মধুসূদন রবীন্দ্রনাথ এমনকি সামপ্রতিক ছোটখাটো
শামসুর রাহমানকেও ঈর্ষাযোগ্য ব’লে গণ্য
করি না; বরং করুণাই করি। বড় বেশি ঈর্ষা
করি গরু ও গাধাকে;_ মানুষের কোনো পর্বে গরু
ও গাধারা এত বেশি প্রতিষ্ঠিত, আর এত বেশি
সম্মানিত হয় নি কখনো।
(গরু ও গাধা)

স্তাবক ও চামচারাই সমাজের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত। কৃষক, দিনমজুর, শ্রমিকরা অবহেলিত। অবহেলিত জাতির মেধাবী সন্তান। এখানে মগজশূন্য, হৃদপি-হীন, পেশীওয়ালা, লিঙ্গধারীরাই সকলের আইডল, প্রতিভান বলে বিবেচিত। তাই ‘হুমায়ুন আজাদ, হতাশ ব্যর্থ শ্রান্ত অন্ধকারমুখি; উৎফুল্ল হয় না কিছুতে।’ কারণ ‘এ-আঁধারে উন্মাদ ও অন্ধরাই শুধু আশাবাদী। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’ (১৯৮৫), ‘আমি বেঁচে ছিলাম অন্যদের সময়ে’ (১৯৯০), ‘কাফনে মোড়া অশ্রুবিন্দু’ (১৯৯৮)-এর নামকরণের পিছনেও এই হতাশা বোধ কাজ করেছে। তবে হুমায়ুন আজাদ শুধু হতাশাবাদী, সব কিছুতেই নেতিবাচকতা দেখতে পান বললে ভুল বলা হবে। তিনি গভীর ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী বলেই শব্দে শব্দে সমাজের, রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা পুঁজ, দূষণের চিত্র ফুটিয়ে তোলেন। আশাবাদী বলেই দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ করেন,

না, পৃথিবীতে আর একটি বন্দুক থাকবে না।

হুমায়ুন আজাদের কবিতায় স্বদেশ, সমাজ ও রাজনীতির ছাড়াও রয়েছে প্রেম, নারী ও নিসর্গ। প্রেম তাঁর কবিতার বড় একটা অংশ জুড়ে আছে। প্রেমের জন্য তাঁর মন বড় তৃষ্ণাকাতর। প্রেমিকার অন্যনমস্ক আঙুলের ছোঁয়া তাঁর হৃৎপি-কে জোহান্সবার্গের সোনার খনির থেকেও গভীর ব্যাপক জোহান্সবার্গ করে তুলেছে। তিনি শহরের সমস্ত সড়ক সোনায় মুড়ে দিতে চেয়েছেন কারণ প্রিয়তমা সেই পথ দিয়ে স্যান্ডেলের শব্দ তুলতে তুলতে হেঁটে যাবে। তাঁর কাছে প্রিয়ার দু’দিনের অনুপস্থিতি দুবছরের চেয়েও দীর্ঘ। প্রিয়ার শূন্যতার চেয়ে বীভৎস মৃত্যু বেশি কাঙ্ক্ষিত। শুদ্ধগদ্য, পাদটীকাসহ সন্দর্ভপুস্তক রচনা করার চেয়ে প্রেমে পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘোরা তাঁর কাছে শ্রেয় মনে হয়েছে। হুমায়ুন আজাদের প্রেম ভাবনা বিকশিত হয়েছে দেহকে কেন্দ্র করে। নারী দেহ তাঁর প্রেমের আধার। সুন্দর মনের চেয়ে অনেক বেশি আকর্ষণীয় নারীর সুন্দর শরীর তাঁর কাছে_

মেয়ে, তোমার সুন্দর মনের থেকে
অনেক আকর্ষণীয়
তোমার সুন্দর শরীর।
নারীর কাছে তাঁর প্রার্থনা_
ওষ্ঠ বাড়িয়ে দাও গোলাপ ফোটাবো,
বঙ্কিম গ্রীবা মেলো ঝরনা ছোটাবো।
যুগল পাহাড়ে পাবো অমৃতের স্বাদ,
জ্ব’লে যাবে দুই ঠোঁটে এক জোড়া চাঁদ।
(গোলাপ ফোটাবো)

নারীর দেহ হুমায়ুন আজাদের এতই প্রিয় যে সেখানে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘামকে তাঁর হৃদয় বলে অভিহিত করেছেন। কখনো কখনো এই দেহজ প্রেম দেহাতীত প্রেমে উত্তীর্ণ হয়েছে। তবে প্রেম দেহজ কিংবা দেহাতীত যাই হোক তা হুমায়ুন আজাদকে সুখি করে তোলে, করে আলোড়িত, কখনো কখনো করে ব্যথিত। যে ব্যথার বেদনা তাকে দিয়ে ঝিনুকের মতো শিল্পের মুক্তো ফলিয়ে নেয়। এছাড়া স্বদেশ, সমাজের অধঃপতন, বিপন্নতা তাকে নিয়ে গেছে নারীর কাছে, প্রেমের কাছে। নারী বা প্রেম তাঁর আশ্রয়। তবে হুমায়ুন আজাদ পলায়নবাদী ছিলেন না। প্রেম তাঁর কাছে শুধু আশ্রয় নয়, প্রতিবাদেরও ভাষা:

কী আর করতে পারতে তুমি, কী-বা করতে পারতাম আমিই তখন?
চারদিকে ছড়ানো সন্ধ্যা আর হিংস্র নীতিমালা;
একটা মুমূর্ষু পাখি থেকে থেকে চিৎকার করছিল তীক্ষ্ন সাইরেনে।
নিষেধ রাস্তায় নামা, বাইরে চোখ ফেলা; তুমি-আমি, সে-সন্ধ্যায়,
কী আর করতে পারতাম পরস্পরের দিকে চেয়ে থাকা ছাড়া?
(সান্ধ্য আইন)

অথবা,

আমরা দুজনে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হয়ে এক দুপুরেই এমনভাবে ভাঙতে পারি
সামরিক বিধি ও বিধান যে বাঙলায় আর কখনো সামরিক
অভ্যুত্থানের সম্ভাবনা থাকবে না।
( সামরিক আইন ভাঙার পাঁচ রকম পদ্ধতি)

হুমায়ুন আজাদের জন্ম বিক্রমপুরের রাড়িখালে। রাড়িখাল_ রাড়িখালের প্রকৃতি তাঁর কবিতায় এমনকি গদ্যেও বারবার ফিরে ফিরে এসেছে। হুমায়ুন আজাদ নাগরিক কবি হলেও নিসর্গ তাঁর ভিতরে, তাঁর সাহিত্যে ফেলেছে গভীর প্রভাব। পল্লীর প্রতি রয়েছে তাঁর নাড়ীর টান। তাঁর কবিতায় প্রকৃতি- রাড়িখালিরই প্রকৃতি। নগরের বসবাস করলেও প্রবীণ অশথ, প্রজাপতি, জাতসাত, পদ্মার ইলিশ ছিল তাঁর প্রকৃত পাড়াপ্রতিবেশী, যথার্থ বাল্যবন্ধু।

হুমায়ুন আজাদ শব্দ-নিষাদ। শব্দকে ইচ্ছে মতো ঘুরিয়ে বাঁকিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন তাঁর অভীষ্ট রাস্তায়। শব্দ তাঁর হাতে বেজে উঠতো সপ্ত-ব্যঞ্জনায়। হোক সমাজ, স্বদেশ, রাজনীতি, নারী কিংবা নিসর্গ_ বিষয় যা-ই হোক, সবকিছুকে তিনি মুড়িয়ে দিতে পারতেন শিল্পের ভূষণে। হয়তো তাঁর কিছু কবিতা উদ্দেশ্য প্রণোদিত, হয়তো তাঁর কিছু কবিতাকে করা যাবে অস্বীকার। তবে তিনি চেয়েছিলেন ‘সুন্দর, আর সৌন্দর্যকে, আর শিল্পকলাকে, জীবনের চেয়েও যা শাশ্বত ও মূল্যবান।’ তাঁর ‘দয়িতা ছিলো বিমানবিক সুন্দর, যা নেই নারীতে, রৌদ্রে, মেঘে, জলে, পাখিতে, পশুতে, পুষ্পে। আছে শুধু শিল্পে, শাশ্বত শিল্পকলায়।’ কবিতাই হুমায়ুন আজাদের সেই শাশ্বত শিল্পকলার আধার। যে কবিতা আনন্দ যোগাবে বাঙালি সহৃদয় হৃদয়সংবাদী পাঠকের মনে।

সংবাদ