টঙ্গীবাড়ীতে স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তা নির্মাণ

জেলার টঙ্গীবাড়ি উপজেলার আপরকাঠি-শালিকেরপাড়-তৌলকাই সড়ক নির্মাণ হচ্ছে স্বেচ্ছাশ্রমে। এই রাস্তা নির্মাণে কাজ করছে বিভিন্ন বয়সী মানুষ। অনেক গ্রামবাসী শ্রমের পাশাপাশি অর্থ দিয়েও রাস্তা নির্মাণে সাহায্য করছে। বর্ষায় গ্রামবাসীরা পানিবন্দী হয়ে পড়ে, নৌকাই হয় একমাত্র বাহন।

বর্ষায় এখানকার দু’টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালযের শিক্ষা কার্যক্রমও ব্যাহত হয় মারাত্মকভাবে। সব মিলিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে এখানকার উৎপাদিত ফসলাদি বাজারজাত করতেও হিমশিম খেতে হয়। তাই সরকারের আশায় না থেকে ভাগ্যোন্নয়নে গ্রামবাসীরাই নেমেছেন রাস্তা নির্মাণের কাজে।

বুধবার সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, মাটি কেটে রাস্তা ভরাট করছে গ্রামবাসীরা। ধনি-দরিদ্র, শিশু, যুবক, পৌড় সকলে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। অনেকে শ্রমের পাশাপাশি অর্থও দিচ্ছে রাস্তা নির্মাণে। অপেক্ষায় না থেকে নিজেরাই এই মহৎ কাজে নেমেছেন। এই রাস্তা নির্মাণ হলে অন্তত ৮ হাজার মানুষ উপকৃত হবে। বদলে যাবে তিন গ্রামের আর্থ-সামাজিক অবস্থা। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ছাড়াও হাসি ফুটবে কৃষকের মুখে। উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাতে সহায়ক হবে এই রাস্তা। স্কুলে যাওয়ার চেষ্টায় সাঁকো থেকে পড়ে মৃত্যুর ঘটনাও বন্ধ হবে। বর্ষায় পানি বন্দী থাকতে হবে না গ্রামবাসীদের।

আপরকাঠি ও শালিকরে পাড় গ্রাম নিয়ে গঠিত ৬নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুস ছাত্তার দেওয়ান জানান, এই রাস্তাটি করার দায়িত্ব ছিল ইউনিয়ন পরিষদ তথা সরকারের কিন্তু বরাদ্দের অভাবে আমরা এটি এখনও করতে পারিনি। তবে গ্রামবাসীরা যে উদ্যোগটি গ্রহণ করেছে তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।

তিনি বলেন, আড়িয়াল বাজার থেকে আপরকাঠি পর্যন্ত এক কিলোমিটার রাস্তা হয়েছে সরকারিভাবে। এখন আপরকাঠি থেকে শালিকরে পাড় হয়ে তৌলকাই পর্যন্ত ঢাকা-বালিগাঁও প্রধান সড়কে মিলে এই তিন গ্রামের চেহারা পাল্টে যাবে।

৪র্থ শ্রেণীর ছাত্র মোখলেছ ও ৫ম শ্রেণীর আব্বাস মিয়াও অংশ নিচ্ছেন স্বেচ্ছাশ্রমে। এর আগে রমজান মিয়া নামের প্রথম শ্রেণীর এক ছাত্র ছাত্র সাঁকো থেকে পড়ে পানিতে ডুবে মারা যায়। এসব নানা কারণে শিশুদের স্কুলে পাঠাতেও অভিভাবকরা থাকেন আতঙ্কে।

আপরকঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সালাম জানান, বর্ষায় শিশুরা বিদ্যালয়ে আসে না। পানিবন্দী থাকার কারণেই সমস্যা এই অঞ্চলে। তবে স্বেচ্ছাশ্রমে রাস্তাটি হয়ে গেলে হয়তো আগামী বর্ষায় এই সমস্যা থাকবে না।

পার্শ¦বর্তী বালিগাঁও উচ্চ বিদল্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র তৌছিফ হালদার ও রাজিয়া সুলতানা। তাদের পিতা রুহুল আমিন হালদার জানান, বর্ষায় প্রায় ৬ মাস আমার ছেলে মেয়ে স্কুলে যেতে পারে না। এমন অবস্থা অন্যান্য পরিবারেও। তাই রাস্তা নির্মাণের জন্য জমি কিনে প্রায় ৫ লাখ টাকার জমি দান করেছেন এই রাস্তায়। এছাড়া স্বেচ্ছাশ্রম আর পুকুরপাড়ে গাইড ওয়ালসহ খরচাদি করছেন। এমন অনেকেই রাস্তার জন্য টাকা দিচ্ছেন।

সত্তর বছর বয়সী মোজাফফর মাল বলেন, ‘বাবা বর্ষায় পানিতে বন্দী থাকি আমরা। রাস্তা ছাড়া মুক্তির উপায় নাই, তাই রাস্তা বানাছি হগলে মিল্লা।’

বৃদ্ধ আব্দুল জলিল খান বলেন, রাস্তা খালি আমাগো চলাচলে সুবিধাই না, আলুসহ অন্য ফসল হিমাগারে ও বাজারে নিতেও সুবিধা হইবো। এতে আমাগো গ্রামের চেহারা পাল্টাইয়া যাইবো।

হাজী আব্দুল আজিজ খান বলেন, ‘রাস্তা না থাকায় গ্রামের ছেলে মেয়েদের পড়াশুনার ক্ষতি ছাড়াও অনেক অসুস্থ হয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে নেয়া কঠিন হয়ে যায়। এতে চিকিৎসা ছাড়া অনেকে রাস্তায়ই মারা যায়। এসব কষ্ট সহ্য করা যায় নাই। তাই নিজেরাই রাস্তা করছি।’ সেচ্ছাশ্রমে অংশ নিচ্ছেন যুবক আরিফ, মিজানুর, সোহেল, কামাল, আলী আহম্মেদসহ অনেকই।

নির্মাণাধীন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলেন নবম শ্রেণীর ছাত্রী ইশিতা আক্তার, সুমাইয়া আক্তার ও ফারজানা আক্তার। তারা জানান, রাস্তাটি যে আমাদের কত বেশী প্রয়োজন তা আমরা বোঝাতে পারবো না।

নিজেদের জমিতে তৈরী করা প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়ক নির্মাণ কাজ দ্রুত এগিয়ে চললেও শুধু একটি পরিবারের কারণে তা বিঘ্নিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ গ্রামবাসীদের। পরিবারটি এই নিয়ে থানা-পুলিশে পর্যন্ত গিয়েছেন।

তবে অভিযুক্ত পরিবারের কর্ণধার জয়নাল খান জানালেন, তার বাড়ির পাশের পুকুর পাড় দিয়ে রাস্তা দিতে তার বাধা নেই। কিন্তু এর আগে প্রতিবেশীর সঙ্গে তাদের সীমানা নির্ধারণ করে দিতে হবে নতুবা তিনি রাস্তা করতে দিবেন না।

মুন্সীগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল বলেন, ‘যত জটিলতাই হউক না কেন, এই মহৎ উদ্যোগ বিনষ্ট করা যাবে না। প্রয়োজনেও আমিও গ্রামবাসীদের সাথে স্বেচ্ছাশ্রমে শরিক হবো। ’

ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মো. জাকির হোসেন মজুমদার বলেন, ‘স্বেচ্ছাশ্রমের রাস্তাটি সম্পন্ন করতে পুলিশের পক্ষ থেকে সব রকমের সহায়ার প্রদান করা হবে। অনেক সময় ভালোকাজেও মতবিরোধ থাকে। তা সমধানে পুলিশ সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিবে।’

বাসস