শান্তিনগর থেকে ঢাকা-মাওয়া ফাইওভার; লিঙ্ক প্রকল্পসহ ব্যয় ৩২৮৮ কোটি টাকা

নকশা ও প্রকল্প প্রস্তাবনা নিয়েই এখন প্রশ্ন
সরকার তিন হাজার ২৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে শান্তিনগর থেকে ঢাকা-মাওয়া রোডের ঝিলমিল পর্যন্ত ১৩.৩২ কিলোমিটার ফাইওয়ার নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের প্রস্তাবনা এবং ফাইওভারের নকশা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগ ও মন্ত্রণালয়।

এই ব্যয়ের মধ্যে আবার লিঙ্ক প্রকল্প নামে ৬৪২ কোটি ৯৭ লাখ ২৯ হাজার টাকা ব্যয়ে আরেকটি প্রকল্প রাখার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। শান্তিনগর ও মগবাজার পয়েন্টের সংযোগ স্থাপন এবং ফাইওভারটি ঝিলমিল পর্যন্ত নেয়ার যৌক্তিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে খোদ পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ। এই ফাইওভারটির মগবাজার-মৌচাক ফাইওভারের সাথে যুক্ত করার ব্যাপারে প্রকল্প প্রস্তাবনায় কোনো পরিকল্পনা নেই বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পুরান ঢাকার যানজট নিরসনে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) গোলাপশাহ মাজার সার্কেল (গুলিস্তান) থেকে বাবুবাজার ব্রিজ পর্যন্ত একটি ফাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করে। আর এ জন্য পরামর্শকও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। শান্তিনগর থেকে গোলাপশাহ মাজার-বাবুবাজার হয়ে (বুড়িগঙ্গা নদীর ওপর প্রকল্পের আওতায় প্রস্তাবিত নতুন ৪ নম্বর ব্রিজ হয়ে) ঢাকা-মাওয়া সড়ক পর্যন্ত ফাইওভার নির্মাণের লক্ষ্যে একটি পিপিপি প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সেলে পাঠানো হয়। ২০১৩ সালের ৯ জানুয়ারি পিপিপি প্রস্তাব অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগতভাবে অনুমোদন করে।

মগবাজার ফাইওভারের সাথে সংযোগের বিষয়ে রাজউক জানায়, পিপিপির আওতায় মূল ফাইওভার নির্মাণ প্রকল্পটি অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি থেকে নীতিগত অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বর্তমানে ট্রানজেকশন পরামর্শক নিয়োগের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। এলজিইডি জানায়, এই ফাইওভারটি মগবাজার-মৌচাক ফাইওভারের সাথে যুক্ত করার ব্যাপারে প্রকল্প প্রস্তাবনায় কোনো পরিকল্পনা নেই। প্রকল্পটি বর্তমান পর্যায়ে আসার আগেই কোন উচ্চতায় যুক্ত হবে তা ঠিক করা উচিত ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। শান্তিনগরের কোন পয়েন্টে যুক্ত হবে সে ব্যাপারে এখনই এলজিআরডির সাথে আলোচনা করা উচিত। কারণ এই সংযুক্তির জন্য মগবাজার-মৌচাক ফাইওভারটির নকশায় পরিবর্তন আনতে হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের পক্ষ থেকে এই প্রকল্পের পর্যালোচনা সভায় বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় ১.৬০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। যার বাজারমূল্য অনেক বেশি। এ ছাড়া এর ওপর অনেকের জীবিকা জড়িত। কাজেই জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য একটি অন্যতম কিলার থ্রেট। কাজেই এটি কিভাবে করা হবে তার সুস্পষ্ট কর্ম পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাথমিকভাবে এলাইনমেন্টের ভিত্তিতেই সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ইউটিলিটির স্থানান্তরের ব্যয় প্রাক্কলনসহ অনাপত্তি গ্রহণ করা সমীচীন। কেননা এটি না করা হলে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পাবে। এমনকি প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

আর পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের অভিমত হলো, ফাইওভারটি কেন ঝিলমিল প্রকল্প হতে শুরু করা হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। এ ছাড়া স্থানীয় সম্পদের সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনায় এনে দু’টি প্রকল্প না করে একটি করা উচিত। লিঙ্ক প্রকল্পটি মূল প্রকল্পের সাথে যুক্ত করা দরকার। তাদের মত, যেহেতু ঢাকা শহরে জমি অধিগ্রহণ করতে হবে তাই এখানেই কাজ আগে শুরু করা দরকার। প্রকল্পের প্রস্তাবনা ও ব্যয় এবং বিভিন্ন বিষয় নিয়ে প্রশ্ন ও আপত্তি উত্থাপিত হওয়ায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির সদস্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো থেকে রাখা হবে। তাদের প্রতিবেদনের ওপর পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।

এই প্রকল্পের অধীনে কাজগুলো হলোÑ ফাইওভার ১৩.৩২ কিমি: দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ৯.১০ মিটার (দুই লেন) হতে ১৭ মিটার (চার লেন), চার লেনযুক্ত ফাইওভারের দৈর্ঘ্য ৬.৪৩৮ কিমি: ও দুই লেনযুক্ত ফাইওভারের ৪.২৯৮ কিমি: ফাইওভারটি পল্টন ইন্টারসেকশনে এমআরটি-৬ এবং ফুলবাড়িয়া ইন্টারসেকশনে হানিফ ফাইওভারকে অতিক্রম করবে। বিওটি পদ্ধতিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৬৪৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর সাথে লিঙ্ক প্রকল্পের ব্যয় ৬৪২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা।

উল্লেখ্য, পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো উইং জানায়, ঢাকা শহরের মোট আয়তনের তুলনায় রাস্তার পরিমাণ হলো মাত্র ৮ শতাংশ। যেখানে আন্তর্জাতিক আদর্শ হলো ২৫ শতাংশ। জাইকা কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য শহরে যেমন জাকার্তা, ব্যাংকক বা ম্যানিলার চেয়ে ঢাকার রাস্তা ও নগর এলাকার অনুপাত সবচেয়ে কম। এ কারণেই শহরে নিত্য যানজট লেগেই থাকে। এ জন্য ফাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে বা মেট্রোরেলের মতো গণপরিবহনের প্রয়োজন।

নয়া দিগন্ত

One Response

Write a Comment»
  1. যে কোন প্রকল্প নির্ধারনের আগে তার সময় উপযোগী বাস্তবতা পরীক্ষা জরুরী… তাই আমি আমার ব্যক্তিগত মতামতে ফ্লাইওভারের চাইতে রেল/মেট্রো রেল এর উপযোগীতা বেশী প্রয়োজন মনে করি। শুধু ঢাকা বা কেরানীগঞ্জ নয় এই সংযোগ হতে হবে গোটা বিক্রমপুরের সাথে রাজধানীর… যাতে ঢাকার উপর চাপ কমে আসে…।