গার্মেন্ট শিল্পপার্ক স্থাপনের জটিলতা অবশেষে কাটছে

গার্মেন্ট শিল্পপার্ক প্রতিষ্ঠায় সৃষ্ট জটিলতা কাটছে। ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে পোশাক শিল্পের জন্য আলাদা পার্ক স্থাপনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে জমি অধিগ্রহণে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে ৮০০ কোটি টাকার বিনা সুদে ঋণ চেয়ে বিজিএমইএর আবেদন খতিয়ে দেখছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, দিন যত যাচ্ছে, দেশে গার্মেন্টের সংখ্যা ততই বাড়ছে। বর্তমানে গার্মেন্ট কারখানার সংখ্যা সাড়ে ৫ হাজারেরও বেশি। এসব কারখানার বেশ বড় অংশ অবস্থিত রাজধানী ঢাকায়। এই হিসাবে ৪০ লাখেরও বেশি গার্মেন্ট শ্রমিক থাকে রাজধানীতে। ফলে আবাসন সংকট থেকে শুরু করে যানজট এবং বাড়িভাড়া বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। যদিও গার্মেন্ট শ্রমিকদের অধিকাংশই থাকে বস্তি বা নিম্নমানের ঘর-বাড়িতে, তবুও তাদের কারণে দ্রব্যমূল্য থেকে শুরু করে অন্যান্য জিনিসে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে রাজধানীবাসীকে। এছাড়া দেশের গার্মেন্ট কারখানার অধিকাংশই হয়েছে অপরিকল্পিতভাবে, যার মধ্যে পরিকল্পিতভাবে মাত্র ২৫ ভাগ গড়ে উঠেছে। বাকি ৭৫ ভাগের মধ্যে ১৫ শতাংশ আবাসিক এলাকায় এবং ৬০ শতাংশ গড়ে উঠেছে বাণিজ্যিক কর্মকা-ে নিয়োজিত ভবনে। এসব বিষয় সামনে রেখেই আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ২০১২ সালের শেষদিকে ঢাকা থেকে ৩৭ কিলোমিটার দূরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কাছে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার বাউশিয়ায় গার্মেন্ট শিল্পপার্ক স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের ১৭ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালক আবদুল আজিজের সভাপতিত্বে এ সংক্রান্ত একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায় গার্মেন্ট পল্লী স্থাপনের খরচ নেয়া হবে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই। ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। পরে সরকারের পক্ষ থেকে ৫৩০ একর জমি ব্যবহারের অনুমতিও দেয়া হয়। পরে অবশ্য এর পরিমাণ বাড়িয়ে ৫৭০ একরে উন্নীত করা হয়।

সূত্র মতে, সরকারের সঙ্গে করা চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএর সহযোগিতায় সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের নিজস্ব উদ্যোগে শিল্পপার্কের অবকাঠামো গড়ে তোলার কথা থাকলেও তারা বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থায়নের জন্য সহযোগিতা চায়। বিশ্বব্যাংক এবং ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি) এই প্রকল্পে অর্থায়নে এগিয়েও আসে। আগ্রহ প্রকাশ করে চীনভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান হংকং কেআরডি ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ লিমিটেডও। কিন্তু অর্থায়নের জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শর্ত দেয়া হয় সরকারি গ্যারান্টির বিষয়টি। তাদের দাবি, সুদসহ ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব বাংলাদেশ সরকারকেই নিতে হবে। কিন্তু সরকার ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব নিতে অনীহা প্রকাশ করে। এরপর বিজিএমইএর পক্ষ থেকে বিনা সুদে ঋণ দেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানানো হয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ে তারা চিঠি পাঠায় সুদমুক্ত উপায়ে ৮০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়ার জন্য। কিন্তু সুদমুক্ত উপায়ে ঋণ দেয়ার কোনো সুযোগ সরকার বা ব্যাংকগুলোর নেই। তবে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপে কয়েকটি সরকারি ব্যাংকে যৌথভাবে স্বল্প সুদে এই টাকা প্রদানের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রুততম সময়ের মধ্যে গার্মেন্ট শিল্পপার্ক স্থাপনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। গত ৭ এপ্রিল শেখ হাসিনার সঙ্গে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দেখা করেন আন্তর্জাতিক ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট এবং জার্মান কনফেডারেশন অব ট্রেড ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মিশায়েল জোমার। এ সময় তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য আলাদা নগরী গড়ে তোলা হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গার্মেন্ট ভিলেজ তৈরি হলে শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে বিদ্যমান সমস্যাগুলোরও সমাধান হয়ে যাবে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি আতিকুল ইসলাম যায়যায়দিনকে জানান, গার্মেন্ট শিল্পপার্ক প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান পরিস্থিতি মোতাবেক আগামী ৩-৪ বছরের মধ্যে রাজধানী থেকে গার্মেন্ট সরিয়ে নিতে হবে। কারণ, শেয়ার্ড বিল্ডিংয়ে কারখানা পরিচালনার ক্ষেত্রে বায়ারদের আপত্তি রয়েছে।

তিনি আরো বলেন, ‘উদ্যোক্তাদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার গার্মেন্ট শিল্পপার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী, জমি অধিগ্রহণের টাকা সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের দেয়ার কথা থাকলেও সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অধিকাংশ উদ্যোক্তার পক্ষেই একসঙ্গে এত টাকা পরিশোধ করা সম্ভব নয়। তাই সরকারের কাছে সুদমুক্ত ঋণ চেয়েছি। সরকার চাইলে রিজার্ভ থেকেও আর্থিক সহযোগিতা দিতে পারে। তবে শিল্পের স্বার্থে সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।’

আতিকুল ইসলাম জানান, গার্মেন্ট শিল্পপার্ক স্থাপনে কিছু জটিলতা রয়েছে। তবে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। এই শিল্প রক্ষায় দ্রুত গার্মেন্ট শিল্পপার্কের কাজ শুরু করা উচিত। এসব বিষয় সামনে রেখে শিগগিরই অর্থমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে দ্রুততম সময়ের গার্মেন্ট শিল্পপার্ক স্থাপনের কাজ শুরুর ক্ষেত্রে সহযোগিতা চাইবেন।

একই প্রসঙ্গে বিজিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট শাহিদউল্লাহ আজিম যায়যায়দিনকে বলেন, ‘গার্মেন্ট শিল্প জাতীয় সম্পদ। এটিকে রক্ষা করার দায়িত্ব সবার। আমরা কাজ শুরু করার লক্ষ্যে সরকারের কাছে ৮০০ কোটি টাকার বিনা সুদে ঋণ চেয়েছি। তবে বিষয়টির এখনো সুরাহা হয়নি।’

তিনি আরো জানান, এই সেক্টরের ৪০ শতাংশ কারখানা শেয়ার্ড বিল্ডিংয়ে রয়েছে। এসব কারখানায় ১৫ লাখ শ্রমিক কাজ করে। পরিস্থিতিগত কারণে যদি মালিকদের ব্যবসা ছেড়ে দিতে হয়, তাহলে ১৫ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বে। তাই সব দিক বিবেচনা করে গার্মেন্ট শিল্পপার্ক স্থাপনের কাজ শুরু করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

উল্লেখ্য, পরিকল্পনা অনুযায়ী শিল্পপার্ক গড়ে উঠবে ৫৭০ একর জমির ওপর। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ জমি ব্যবহূত হবে অবকাঠামোগত উন্নয়নে। আর অবশিষ্ট জমি থাকবে ফ্যাক্টরি নির্মাণকাজে, যেখানে প্লট থাকবে ১, ৩ ও ৫ বিঘার। প্রতি বিঘার দাম পড়বে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা। ১০০ বিলিয়ন টাকার এই প্রকল্পে অগ্রাধিকার পাবে আশুলিয়ার ঝুঁকিপূর্ণ ও নন-কমপ্লায়েন্স কারখানাগুলো। রাজধানী ঢাকার কারখানাগুলোও এ ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাবে। এছাড়া শিল্পপার্কে পাওয়ার স্টেশন, ফায়ার ব্রিগেড, চাইল্ড কেয়ার, পুলিশ স্টেশন, ব্যাংক, নদীবন্দর, পাম্প হাউস, সলিড ওয়েস্টেজ পাম্প, সিইটিপি (সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) এবং ডাম্পিং ইয়ার্ডের সুযোগ রাখার কথা রয়েছে।

যায় যায় দিন