একজন প্রবাসীর সুখ দুঃখ – রাহমান মনি

moni19 আমি একজন প্রবাসী। প্রবাসীদের নিয়ে বিভিন্ন জনের বিভিন্ন ধারনা। নানান মুনীর নানান মত। কারোর কাছে প্রবাসীরা হচ্ছে টাকার গাছ, ঝুকি দিলেই পড়ার কথা। অথবা প্রবাসে টাকা উড়ে বেজায়, আর প্রবাসীরা তা বস্তায় ভরে। তাই, কারী কারী টাকার মালিক। হাওলাত চাইলেই দিতে বাধ্য, হাওলাত চাওয়ার পরিমাণ কম হলেও লাখ লাখ, না পেলে সম্পর্ক নষ্ট। কারোও কাছে আবার সোনার ডিম পাড়া হাঁস, আত্মীয় স্বজন বা পরিবারের সদস্যদের কাছে এমনটি প্রযোজ্য।

আবার কেহবা মনে করেন প্রবাস জীবন মানেই অড জব করা। হোটেলে পিঁয়াজ রসুন কাটা, কিংবা পরিচ্ছন্ন কর্মী। আড়ালে আবডালে তারা নাক সিটকান।

সুখ দুঃখ নিয়েই মানুষের জীবন। কারোর বা সুখানুভুতির পাল্লাভারী, আবার কারোর বা কষ্টেরটা। প্রবাসীরাও যেহেতু মানুষ, তাই তাদেরও সুখ দুঃখের অনুভুতি আছে, থাকে মনকষ্ট।

মানুষ যেহেতু আশাজাগনিয়া, তাই একজন প্রবাসী হিসেবে প্রথমেই আমার সুখ বা ভালো লাগা দিক গুলি নিয়ে পাঠকদের সাথে ভাগ করে নিতে চাই।

অনেক কষ্টের মাঝেও প্রবাস জীবন মানেই নিরাপত্তাবলয়ে আবদ্ধ এক জীবন। এখানে স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি আছে। গুম বা বেওয়ারিশ লাশ হয়ে পড়ে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীন। দু’একটি ব্যাতিক্রম ছাড়া। অযথা শ্রম ঘণ্টা নষ্ট হয়ে যায়না যানজটের কবলে পড়ে। দেশে কিছু পাঠাতে পারলে মনে প্রশান্তি লাগে। কিছু দিনের জন্য নিজ দেশে বেড়াতে গেলে জামাই আদর পাওয়া যায় সবখানেই। এমনকি নিজ পরিবারেও।

আর সবচেয়ে বড় কষ্টের হল, একজন প্রবাসী উভয় দেশেই পরবাসী। বসবাসরত দেশে পরদেশীতো বটেই (নাগরিকত্ব পেলেও), এমনকি নিজ দেশেও পরবাসী (নাগরিকত্ব থাকা সত্ত্বেও)। অনেক সময় নামের আগে বসবাসরত দেশের নামটিও জুড়ে যায় বিশেষণ হিসেবে। এই যেমন আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্মে অনেকেই আমাকে জাপানী আংকেল বলে ডাকে।
moni19
একজন প্রবাসী দেশে কিছু পাঠাতে পারলে সবচেয়ে বেশী খুশী হয়। কষ্টার্জিত অর্থ সাধারণত বাবা বা ভাইদের নামেই পাঠানো হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই তা অপব্যবহার বা অনউৎপাদনশীল খাতে খরচ হয়ে থাকে। কোন কোন পিতা বা ভাই নিজ নামে স্থাবর সম্পত্তি করে থাকেন। পরবর্তীতে সে সম্পত্তিতে প্রবাসীর কোন কতৃর্ত্ব থাকেনা। অংশ চাইতে গেলে বরং জীবন হুমকীর সম্মুখীন হতে হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে বেঘোরে প্রান হারাতে হয় স্বজনদের হাতে। কেহবা কোন মতে পালিয়ে আবার প্রবাস জীবনকেই বেছে নেন। অথবা ধুকে ধুকে যন্ত্রনাময় জীবন যাপন করেন।

কোন কোন সময় স্থাবর সম্পত্তি কিনতে গেলে, প্রবাসে থাকা হয় তাই কাগজপত্র বিরম্বনার কথা চিন্তা করে বাবা কিংবা বড় ভাইএর নামে তা করা হয় দেশে যাওয়া মাত্র বুঝিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে। দেশে গেলে বুঝিয়ে দেওয়া হয় ঠিকই তবে সম্পত্তি নয়, বোকামীর খেসারত। এনিয়ে বিচার চাইতে গেলে তা প্রবাসীর বিপরীতেই যায়। থানা-পুলিশ কিছু কামানোর ধান্ধায় থাকে। আর আত্মীয় স্বজন পাড়াপড়শীরা বলেন, আল্লাহ্‌ তো তোমাকে অনেক দিয়েছেন। তাদের তো কিছু নেই তাই…………

দেশে কিছু পাঠানো পর প্রবাসীকেই খোঁজ নিয়ে জানতে হয় ঠিকমত পৌছালো কিনা। কারণ, সে যেহেতু পাঠিয়েছে তাই তার দায়িত্বটাই বেশী। পাওয়ার পর নিজ উদ্যোগে জানানো গরজ তাদের নেই।

দেশ থেকে কিছু চেয়ে পাঠালে বিভিন্ন অজুহাতে বিলম্ব হয়। হরতাল যানজট, ব্যাস্ততা তার অন্যতম প্রধান কারণ। তাই সময় মতো পাওয়া ভিসা পাওয়ার চেয়েও কঠিন হয়ে যায়। কিন্তু যদি কারোর মাধ্যমে অর্থ পাঠানো যায়, তাহলে হরতাল যানজট, ব্যস্ততা কোন কিছুই তখন আর বাধা হয়ে দাঁড়ায় না দ্রুত সংগ্রহে।

সুখানুভুতির অভিজ্ঞতায় বলেছিলাম যে, কিছুদিনের জন্য দেশে বেড়াতে গেলে জামাই আদর পাওয়া যায় সবখানেই, এমনকি নিজ বাড়ীতেও। আবার সেই প্রবাসী যখন প্রবাস জীবন পাঠ শেষ করে স্থায়ী ভাবে দেশে ফেরেন তখন হয়ে যান ভিলেন। এমনকি নিজ পরিবারেও। কারণটা স্পষ্ট, এতোদিন সোনার ডিম পাড়া হাঁস থেকে ডিম পাওয়া তো দুরের কথা উল্টো সে-ই এখন থেকে সব কিছুতেই ভাগীদার।

একজন প্রবাসী যখন দেশে ফিরে যায়, তখন আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব সবাই সম্ভাবনার দ্বার দেখিয়ে সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত করে এগিয়ে আসে যৌথভাবে অর্থ লগ্নীতে। কারণ দেশে থাকেন বিধায় তারা অভিজ্ঞতা ভারে ভারাক্রান্ত। আর প্রবাসীরা থাকেন বস্তাভরা অর্থের ভারে ভারাক্রান্ত। কিন্তু কিছুদিন পর সব খুইয়ে প্রবাসী হন অভিজ্ঞতার ভারে নুহ্যমান আর পরামর্শকারী হন অর্থভারে উদীয়মান।

যেহেতু জাপানে থাকি, তাই জাপানের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি, জাপানী পাশপোর্ট নিতে গেলে বাংলাদেশী পাশপোর্ট ত্যাগ করতে হয়। কারণ দ্বৈত নাগরিকত্ব বিধান জাপানে নেই। সবকিছু ত্যাগ করে জাপানী পাশপোর্ট নেওয়ার পর সেই গলায় ঝুলিয়ে রাস্তায় হাঁটলেও সাধারণ জনগণ বিদেশী বলে সম্বোধন করবে, জাপানী হিসেবে নয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ছাড়া। এরচেয়ে কষ্ট কিই বা হতে পারে।

সব কিছুর পর আমি একজন প্রবাসী, এইটাই বাস্তবতা, এইটাই চরম সত্য।