নববর্ষ নতুন হোক সকলের হোক

sicসিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
বাংলা নববর্ষ আসে, চলে যায়। যখন আসে তখন চুপি চুপি আসে না, কারচুপিও করে না, প্রচণ্ডভাবে আসে। চৈত্রেই তার পদধ্বনি শোনা যায়, বৈশাখকে চিনতে কোনো ভুল হয় না। সে তুলনায় ইংরেজি নববর্ষ আসে শান্তভাবে। সে হচ্ছে শীতে এবং শীত আমাদের প্রধান ঋতু নয়, গ্রীষ্মই প্রধান। আর সেই গ্রীষ্ম কেবলই তপ্ত হচ্ছে। তাই তাকে কেউ কেউ হয়তো নতুনভাবে পায়, কিন্তু অধিকাংশই দেখে তেমন কোনো পরিবর্তন আসছে না।

পরিবর্তন অবশ্য আসে কিন্তু যেমনটা আশা করা যায় তেমনটা ঘটে না। সেই পরিবর্তনকেই আমরা পরিবর্তন বলি, যেটা আমাদের পছন্দের। কিন্তু সেই পছন্দের পরিবর্তনটা পাই না। বরং এ আশংকা হয় সামনের বছর বুঝি গত বছরের চেয়ে খারাপ হবে।

এই আশংকার সঙ্গে বিশ্ব পরিস্থিতির যোগ আছে। বিশ্ব পরিস্থিতি খারাপ। তার তাপেই আমাদের গ্রীষ্মপ্রধান দেশের গ্রীষ্মকে ক্রমাগত উত্তপ্ত করে চলেছে। তারা জ্বালানি জালায়, সারা পৃথিবী জ্বলে আমাদের বৈশাখ গ্রীষ্ম হয়ে ওঠে। কারণ হচ্ছে, পুঁজিবাদের দৌরাত্ম্য। পুঁজিবাদ প্রকৃতির শত্র“, মানুষের শত্র“ তো অবশ্যই। পুঁজিবাদ বৈষম্য তৈরি করে, যার ফলে তপ্ত বৈশাখও সর্বজনীন হয় না। উচ্চবিত্তরা বৈশাখের বাইরে থাকে, তাদের জীবনে পহেলা জানুয়ারি অনেক বেশি সত্য পহেলা বৈশাখের চেয়ে। মধ্যবিত্ত প্রকৃতিকে ভালোবাসে। বৈশাখকেও পছন্দ করে আপন বলে ভাবতে চায়। দরিদ্র মানুষেরা বৈশাখে দগ্ধ হয়। পুঁজিবাদের নিয়মই যে, কারও যদি পৌষ মাস হয় তাহলে অন্যদের হবে সর্বনাশ। বাংলাদেশেও তা-ই হচ্ছে। পৌষ নিজেই এখানে কোণঠাসা। আর সর্বনাশের নানা ধরনের তৎপরতা জনজীবনে চলছে। মধ্যবিত্ত নিুমধ্যবিত্ত ও গরিব মানুষেরা যার ভুক্তভোগী।

কিন্তু প্রতিবার কী? কি করে নববর্ষকে সবার জীবনে তাৎপর্যপূর্ণ করা যায়? কীভাবে পহেলা বৈশাখ সব মানুষের জীবনে পরিবর্তনের শুভ সংবাদ বয়ে আনতে পারে। উপায় হচ্ছে বৈষম্য দূর করা।

বিজ্ঞজনেরা বলেন দরিদ্রের যে অন্যায় তাকে দূর করতে হবে। তারা বোঝেন না, বুঝেও বুঝতে চান না, যখন বোঝেন তখনও প্রচার করতে চান না এই সত্যটা যে, দরিদ্র বৈষম্যের সৃষ্টি। দরিদ্র বৈষম্যের সৃষ্টি করে না, বৈষম্যই দারিদ্র্যের সৃষ্টি করে।

পৃথিবীতে সম্পদের অভাব নেই, সম্পদ সৃষ্টির সম্ভাবনা অপরিসীম। তবু কেন বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র থাকে? তার কারণ ওই বৈষম্য বিজ্ঞজনেরা দারিদ্র্যের সত্য দিয়ে বৈষম্যের সত্যকে ঢেকে দেয়ার চেষ্টা করে। খবরের কাগজে দেখা যায় দুঃসংবাদ প্রাণহানি দুর্ঘটনা আÍহত্যা দুর্নীতি প্রতিনিয়ত বাড়ছে। যে জন্য সংবাদপত্র পাঠ এখন একটা দুঃসহ অভিজ্ঞতা। এই বাস্তবতাকে ঢেকে ফেলার চেষ্টা করা হয় বিজ্ঞাপনের রং দিয়ে। বিনোদনের রং-ঢঙের ছবি প্রচুর পরিমাণে থাকে। সত্য খবর পাওয়া যায় না, মিথ্যার ছড়াছড়ি। সে জন্য সংবাদপত্রের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সংবাদপত্রের পাঠক তেমন বাড়ছে না।

অনেকেই কাগজ কেনেন অভ্যাসবশত, আনন্দের সঙ্গে কেনেন না। সংবাদপত্রের ওপর তাদের আস্থা নেই; আলোকিত মানুষেরাই নানা কথা বলেন, অনেক বক্তব্য পাওয়া যায় কিন্তু আসল কথাটা বলেন না; সেটা হল পুঁজিবাদের দৌরাত্ম্য। চেষ্টাটা চলছে ক্ষুদ্রতে চোখ আটকে রেখে বৃহৎকে অবজ্ঞা করা। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র দ্বন্দ্বগুলোকে আলোচনায় এনে বড় যে প্রধান দ্বন্দ্ব যেটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের দ্বন্দ্ব সেটিকে আড়াল করে রাখা। যেমন ক্ষুদ্র ঋণে মানুষকে আটকে রেখে আশা দেয়া হয় যে তাদের মুক্তি আসছে। অথচ ঋণগ্রহীতার সবটা সময় কাটে সুদ মেটানোর উদ্বেগের মধ্যে। এর বাইরে চোখ তুলে তাকানোর সে সময় পায় না। তথ্যসন্ত্রাস বাড়ছে, পৃথিবীটা বড় হচ্ছে কিন্তু প্রত্যেকের জন্য পৃথিবীটা আবার ছোট হয়ে আসছে। তারা ব্যস্ত থাকছে প্রতিদিনের জীবনযাপনের সমস্যা নিয়ে। তার বাইরে অবকাশ যদি পায়, তবে কাটে কম্পিউটার, টেলিভিশন ও ফেসবুকের ছোট পর্দায় আটক অবস্থায়। আগের দিনে ছেলেমেয়েরা পরীক্ষায় ৬০-৭০ পাওয়ার জন্য অস্থির থাকত, এখন তাদের উচ্চাশা ৩.৯ থেকে ৫ পর্যন্ত পৌঁছানো। দৃষ্টিটাকে ছোট করে আনা হচ্ছে। ওদিকে আবার বাংলা বানানের ক্ষেত্রে দেখছি যতি ‘ ী’ আছে সকলকে ‘ি ’ করার চেষ্টা। হ্রস্ব করণের অপরিসীম আগ্রহ। এই কাজে যারা নিয়োজিত তারা জানেন কিনা জানি না কিন্তু আমাদের তো মনে হয় আমাদের দৈর্ঘ্য কমানোর সার্বিক প্রচেষ্টারই একটি অংশ।

২.
আমাদের রাষ্ট্রীয় জীবনে পহেলা জানুয়ারি অনেক বেশি প্রভাবশালী পহেলা বৈশাখের তুলনায়। পহেলা বৈশাখের সঙ্গে পহেলা জানুয়ারির পার্থক্যটা একেবারে মৌলিক। পহেলা বৈশাখ আমাদের নিজস্ব, পহেলা জানুয়ারি বিদেশী। বৈশাখ কেবল যে বাঙালির ঋতু তা নয়, এটি উপমহাদেশের এবং উপমহাদেশের বাইরের অনেক দেশেরই ঋতু বটে। বৈশাখী উৎসব অন্যরাও করে থাকেন। বৈশাখ তা আমাদেরকে কেবল নিজস্ব করে না, প্রতিবেশীদের সঙ্গে যুক্ত করে। আমরা নিজেদের স্বাতন্ত্রকে এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে সংযোগকে সংকুচিত করে ফেলি পহেলা জানুয়ারির কাছে আত্মসমর্পণ করে।

পহেলা জানুয়ারির সঙ্গে পহেলা বৈশাখের পার্থক্যটা কেবল যে শীত গ্রীষ্মের তা নয়, দিবা-রাত্রিরও। পহেলা বৈশাখ প্রত্যুষে শুরু হয়। পহেলা জানুয়ারির সূত্রপাত ৩১ নাইটে অন্ধকার। কিন্তু এই অন্ধকারকেই আলোকিত করে তোলা হয় এবং অন্ধকারকেই আমরা আলো বলে মানি। একুশে ফেব্র“য়ারি সকালেই শুরু হতো প্রভাতফেরি দিয়ে। স্বাধীনতার পর দেখা যাচ্ছে একুশের সূচনা মধ্যরাত্রিতে ঘটে। এই পরিবর্তনটা তাৎপর্যহীন নয়, বোঝা যাচ্ছে বাঙালির নিজস্বতা পরাভূত হচ্ছে পুঁজিবাদী বিশ্বের আধিপত্যের কাছে। তাদের দিবস উদযাপনের রীতি আমরা মেনে নিচ্ছি। অথচ একুশে ফেব্র“য়ারি আমরা বলি বাঙালির নিজস্ব দিন। পুঁজিবাদের বিস্তার যে কেমন দুরন্ত ও অপ্রতিরুদ্ধ তা বলে শেষ করা যাবে না।

প্রশ্ন থাকে, এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের ভূমিকা কি? রাষ্ট্রই তো প্রধান। সমাজের ওপর রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব এখন আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। রাষ্ট্রকে পুঁজিবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে তার প্রমাণ ও লক্ষণ অন্য সচিত্র যেমন রয়েছে তেমনি পাওয়া যাবে পহেলা বৈশাখের অবমূল্যায়নে। রাষ্ট্রের কাছে জানুয়ারিই প্রধান। জানুয়ারি রাষ্ট্রের, বৈশাখ জনগণের। রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের এই দূরত্ব ক্রমবর্ধমান। অর্থনৈতিক জীবনে রাষ্ট্র মানুষকে নিরাপত্তা দিচ্ছে না। বেকারের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। দ্রব্যমূল্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেই। মৌলিক মানবিক অধিকারগুলো পদে পদে লাঞ্ছিত হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবেও রাষ্ট্রের ওপর জনগণের কোনো আস্থা নেই। রাষ্ট্রকে যে মিত্র হিসেবে দেখে না, দেখার কোনো কারণও নেই। রাষ্ট্র শাসিত হয় অল্প কিছু মানুষের দ্বারা, যে মানুষেরা ধনী তো বটেই, জনগণের পক্ষেও কাজ করে না। গণতন্ত্রের কথা বলা হয় কিন্তু বাংলাদেশের তথাকথিত গণতন্ত্রের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ দেশ শাসন করে না, শাসন অর্থাৎ শোষণ করে সংখ্যালঘিষ্ঠ কতিপয় মানুষ। আগে নিয়ম ছিল এই শাসনের জন্য তারা পাঁচ বছর পর পর জনগণের কাজ থেকে সম্মতি আদায় করবে। এখন দেখা যাচ্ছে সেই সম্মতির আর কোনো প্রয়োজন নেই। কলাকৌশল প্রয়োগের মধ্য দিয়ে ভোট না নিয়েও শাসণ অর্থাৎ শোষণ অব্যাহত রাখা যায়। সরকারের হাতে বল প্রয়োগের সব প্রতিষ্ঠান ও বাহিনী থাকে এবং তারা তাদের কাজে লাগায়। জনগণ অসহায় তাকিয়ে থাকে। রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা বৃদ্ধির কোনো কারণ নেই। মিডিয়া জনগণকে সাহায্য করে না, মিডিয়ার কাজ প্রত্যক্ষভাবে হল রাষ্ট্রের পুঁজিবাদী আদর্শের পক্ষে কাজ করা। মিডিয়া পুঁজিবাদীদের হাতের অস্ত্র বটে।

তা হলে কি করতে হবে? কর্তব্য হল ব্যবস্থাটার পরিবর্তন করা। পহেলা বৈশাখকে প্রধান করে তোলা পহেলা জানুয়ারির তুলনায়। সেটা কিছুতেই সম্ভব হবে না সব ব্যবস্থাটাকে বদলে না ফেললে। কাজটা রাজনৈতিক কিন্তু এই কাজটা দক্ষিণপন্থিরা করবে না, কারণ তারা সবাই পুঁজিবাদের দীক্ষিত। চরম দক্ষিণপন্থি দল হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী ও ধর্মীয় জাণ্ডারা। তারপরে আসে আওয়ামী লীগ এবং গা-ঘেঁষে অবস্থান করে বিএনপি। পার্থক্য আছে, তবে সেটা পরিমাণগত, গুণগত নয়। দক্ষিণপন্থি এই দলগুলোর কোনোটাই ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাস করে না এবং সবাই রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে ইসলামকে মেনে নিয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসারে এরা একে অপরের প্রতিযোগী। সমাজতন্ত্রে তো আস্থা রাখেনই না বরং তাকে বিপজ্জনক বলে জ্ঞান করে। এদের মধ্যে পারস্পরিক শত্র“তা রয়েছে, পারলে একে অন্যকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে। কিন্তু এদের সবার শত্র“ একটাই- সমাজতন্ত্রীরা। সমাজতন্ত্রীদের মোকাবিলায় এরা সবাই একাট্টা।

পুঁজিবাদী ব্যবস্থার পরিবর্তন আনা সমাজতান্ত্রিকদেরই কাজ। কেননা পুঁজিবাদকে তারা সঠিকভাবে চেনে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে অক্ষুন্ন রেখে যে মানুষের মুক্তি নেই এটা সমাজতান্ত্রিকরা জানে। ব্যবস্থা পরিবর্তনের দায়িত্ব তাই বামপন্থিদেরই।

ব্যবস্থা বদলের কাজটা সহজ নয় কিন্তু এর কোনো বিকল্প নেই। বিদ্ধমান ব্যবস্থায় আমাদের নদীগুলো যেমন শুকিয়ে যাচ্ছে মানুষের ভেতরের সংবদেনশীলতাও তেমনি উবে যাওয়ার উপক্রম। বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে। মৈত্রীর জায়গায় শত্র“তা প্রধান সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় পহেলা বৈশাখও আমাদের জীবনে কোনো পরিবর্তন আনবেই না বরং বছরে বছরে দুঃসংবাদ বহন করে আনবে। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে পরিবর্তনের জন্য একটা নতুন পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে সেটা হল, পহেলা বৈশাখ থেকে অর্থবছরের বর্ণনা শুরু করা। হালখাতার মাধ্যমে। অর্থবছর একেক রাষ্ট্রে একেক রকম, পহেলা বৈশাখকে যদি আমরা অর্থবছরের সূচনা হিসেবে ধরি তা হলে আমাদের নিজস্বতা রক্ষা করার ক্ষেত্রে একটা পদক্ষেপ নিতে তো পারবই উপরন্তু আমাদের প্রতিবেশীদের কাছে একটা দৃষ্টান্ত তুলে ধরা হবে। কিন্তু এ বিষয়ে আমরা একেবারেই নিশ্চিন্ত যে এই কাজটা সম্ভব হবে না। কারণ করতে গেলে যে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার আমরা অধীনে আছি তার সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা বিঘ্নের সৃষ্টি হবে। শুক্রবারকে ছুটির দিন ঘোষণা করা যত সম্ভব পহেলা বৈশাখকে অর্থবছরের শুরু হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ততটাই কঠিন। রাষ্ট্রব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তন না আনলে কোনো তাৎপর্যপূর্ণ বা উপকারী পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না।

পহেলা বৈশাখকে আমাদের নিজস্ব করা, তাকে সব সংবাদের বার্তা বাহক করে তোলা কোনো তাত্ত্বিক প্রশ্ন নয়, এটা আসলে আমাদের বেঁচে থাকার সঙ্গে জড়িত। তাই পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামটা একেবারেই অনিবার্য। এটা না করলে আমরা স্বাভাবিকভাবে বাঁচতেই পারব না।

ক্ষুদ্র দোকানদারেরা দেখা যায় বারে বারে ও ঘন ঘন কত আয় হল তার হিসাব নেয়। তার জানা আছে এই আয়ের উপরেই তার পরিবার নির্ভলশীল। আমাদের পক্ষে কর্তব্য পুঁজিবাদবিরোধী সংগ্রামে কতটা এগোতে পারছি প্রতিনিয়ত তার হিসাব করা। কারণ আমাদের ভবিষ্যৎ ওই আয়ের উপরেই নির্ভরশীল। অন্য আয় যেমন-তেমন, এই আয়টার ওপরই আমাদের প্রকৃত ভরসা।

যুগান্তর