তপ্ত যৌবনের দগ্ধ জীবন – ব. ম শামীম

আষাঢ়ের সকাল। পুড়ো আকাশ জুড়ে মেঘদের তর্জন গর্জন। প্রায় ১ সপ্তাহ ধরে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। মাঝে মধ্যে মেঘমালার সাথে যুদ্ধ করে আকাশের বুক চিরে একরাশ সূর্যরাশ্মি বের হলেও কিছুক্ষণ পরেই আবার তা স্লান হয়ে যাচ্ছে মেঘমালার মধ্যে। কখোনাবা ঘারো অন্ধকারে সাজছে প্রকৃতি কখনো বা সূর্যালোকের মধ্যে আকাশের বুক থেকে থেমে থেমে বৃষ্টি ঝরছে।

ছোট জানালার পাশে বসে প্রিয়া কখোনো গভির আকাশের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টির ঝরে পড়া দেখে কখনো বা মেঘের গর্জনে জানালা বন্ধকরে দিয়ে চুপটি করে শুয়ে থাকে। আবার কখোনোবা জানালার ফাঁক দিয়ে দুহাত বাহির করে বৃষ্টির পানির স্পর্শ নেয়। বৃষ্টির মধ্যে কয়দিন যাবৎ বন্ধি জীবন কাটছে তার। মাঝে মাঝে বৃষ্টিগুলোকে বেশ ভৎসনা করছে সে। চঞ্চল প্রিয়ার মনের মধ্যে বানটা যেন প্রকৃতির চেয়ে বেশ বেশি বয়ে যাচ্ছে।

আজ একেবারে মুখ ভারী করে প্রকৃতির চেয়ে রুদ্ধভাব নিয়ে একরাশ বই কোলের মধ্যে রেখে. আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে আছে সে। সকালে মেঘদের কোল হতে একরাশ সূর্যের অভয়চ্ছটা দেখে দির্ঘদিন পর প্রিয়ার মনের কোনেও একরাশ সুর্যের আলোর মতোই হাসির ছটা বয়ে গিয়েছিলো ।

ঘুম থেকে উঠেই হাত মুখ ধুয়ে গোসল করে খেয়ে ধেয়ে একাবারে পরিপাটি সেজে বই নিয়ে ঘর হতে যেই বের হওয়া তেমনি দক্ষিনা বাতাসের শো শো শব্দ নিয়ে আকাশ হতে ঝনঝন শব্দে ধেয়ে চলে আসলো বৃষ্টি । প্রিয়া এক দৌড়ে কোন রকম ঘরে ঢুকে বৃষ্টির হাত হতে রক্ষা পেলো। গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে কলেজ যাওয়া হয়না ওর। বন্ধু-বান্ধবিদের সাথে দেখা নেই । নেই চুকিয়ে আড্ডা । বিছানার সাথে শুয়ে শুয়ে বালিশের সাথে আড্ডা মারতে মারতে জীবনটা তার সার হয়ে গেছে।

এই বৃষ্টির মধ্যে বসে থাকতে থাকতে নানা ভাবনায় প্রিয়াকে গ্রাস করে । মনে পরে ছোটবেলার চঞ্চল জীবন। সামনের নদীটির পারে ঘুরে ঘুরে বেড়ে উঠা তার। তারপর মনে হয় বর্তমান। হিসাবের গন্ডিটা একে একে মিলাতে থাকে সে। ছোট বেলার জীবনের চঞ্চলতার দৃশ্যগুলো মনের মধ্যে শিহরণ জাগে, আর বর্তমানকে নিয়ে ভাবতেই মনের মধ্যে হতে একটি দির্ঘশ্বাস বাহির হয়ে আসে তার। মনে পড়ে একরাশ শকুনের দৃষ্টি আজেবাজে কথার বকবকানি আর সমাজের শত নিয়মের রেখা রেখাপাত করে যায় এই কিশোরীর মনে। গত কয়দিন ধরে বাড়ির পাশের কনফেকশনারী দোকানের ছেলেটা সজল কলেজে যাওয়ার সময় প্রিয়ার দিকে একদৃষ্টি তাকিয়ে থাকে মুচকী হাসে।

সে দিন খুব ক্লান্ত হয়ে হেটে কলেজ হতে বাড়ি ফিরছিলো প্রিয়া। সজল ছেলেটা প্রিয়াকে ডেকে ফ্রিজ হতে একটি ঠান্ডা সেভেন আপ বের করে দিয়ে বলে নাও খাও প্রিয়া। তোমার মোখটা একেবারে শুকিয়ে গেছে। প্রিয়া বলে না আমার কাছে টাকা নেই তাছাড়া আমি এখোন বাড়িতে এসে পড়েছি. ভাত খাব আমি অন্য কিছু খাবনা। সজল বলে টাকা লাগবেনা।

যখন তোমার যা খুশি দোকান হতে নিয়ে যেও টাকা দেওয়া লাগবেনা বলেই আড়চোখে তাকায় প্রিয়ার দিকে। প্রিয়া আর কোন কথায় না বলে চলে যায় মুখটি ভার করে। তারপর হতে দেখলেই ইশারায় ডাকে প্রিয়াকে। মাঝে মধ্যে দোকান হতে খাবার হাতে নিয়ে দূর থেকে তাকে ডাকে। তারপর হতে প্রিয়া ওর দোকনের দিকে না তাকিয়েই ওকে এড়িয়ে অন্যদিক দিয়ে চলার চেষ্টা করে । কিন্তু সজল মাঝে মধ্যে ওর পথের মধ্যে দাড়িয়ে পথরুদ্ধ করে মুচকী হাসে। এ লোকটি কেনো যে ওকে বিরক্ত করে কেনইবা হাসে এর কোন কারন খুঁেজ পায়না প্রিয়া।

মাঝে মাঝে ভাবে মা বাবাকে খুলে বলে সব, কিন্ত কয়দিন আগে তার বান্ধবি স্বপ্নাকে এক ছেলে এমন বিরক্ত করত। স্বপ্না তার মা বাবাকে সব খুলে বলার পর ওর মা বাবা তার লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়েছে। তাই ভয় হয় প্রিয়ার। চুপটি করে থাকে । সেদিন প্রিয়া মাকে জিজ্ঞাস করেছেলো। সে রাস্তায় বেরুলেই তার দিকে সবাই এমোন আর চোখে তাকিয়ে মুচকী হাসে কেন । মা শুধু মুচকী হেসে বলেছিলো আমাদের প্রিয়ামনি দেখতে যে খুব সুন্দর তাই। এরপর মা আবার কড়া কন্ঠে বলে উঠলো, যখন তখন বাহিরে যাওয়া যাবেনা। বাহিরে গেলে অবশ্যই বরকা পড়ে যেতে হবে। মায়ের রুদ্ধ কন্ঠ শুনে প্রিয়া ভাবনার অতল তলে ডুবে গিয়েছিলো।

অন্তহীন একটা ভাবনা তার মনের মধ্যে সব সময় তাকে নাড়া দিয়ে যায়। সে সুন্দর বলে মানুষ তার দিকে চেয়ে মুচকী হাসে কেনো। মাঝে মধ্যে যুবক ছেলেগুলো আড় চোখে চেয়ে আজে বাজে কথাও বলে। আয়নার সামনে দাড়িয়ে নিজ মুখটিকে দেখে প্রিয়া আর ভাবে সুন্দর না হয়ে কুৎসিত হলেই ভালো হতো। রাস্তায় বেরুলে মনে হয় এতো তিক্ততা সহ্য করতে হতোনা। মনে পড়ে ছোট বেলার কথা, তখন রাস্তায় বেরুলেই সবাই কেমন আদর করতো প্রিয়াকে। বড় বৃদ্ধ মানুষেরা খুকি বলে ডাকতো । মাথায় হাত দিয়ে আদর করতো।

নাম, বাবার নাম, বাড়ি কোথায় জানতে চাইতো? কাছে বসিয়ে গল্প করতো বেশ ভালো লাগতো প্রিয়ার। আর এখোন ৮০ বছরের বৃদ্ধারা দেখলেও কেমন আড় চোখে তাকিয়ে দেখে ওকে। মাঝে মধ্যে খুব বিরক্ত মনে তার মনে হয় যদি এমোন কোন স্থান পাওয়া যেতো যেখানে সব ছোট ছোট বাচ্চারা থাকবে ঠিক এই নদীটির মতো একটি নদী আর তার মা বাবা আর ছোট ভাই শিশির। তাহলে বেশ ভালো হতো। না কিছু ভাবতে ভালো লাগেনা তার। তারপর ওঠে গিয়ে দাড়ায় সামনের আয়নাটির দিকে । বেশ লক্ষ্য করে তাকায় তার শরীরের দিকে। ছোট বেলার থেকে বর্তমান শরীরে কি এমন ঘটে গিয়েছে যার জন্য মানুষের এই লেলুপ দৃষ্টি।

আড়চোখে নিজ শরীরের সব অঙ্গগুলো বেশ ভালো করে দেখে। তার হাত পা দেহটা আগের চেয়ে বেশ বড় হয়ে গেছে। চুলগুলোও বড় হয়ে একেবারে পড়েছে হাটুর নিচেঁ। আর বুকের মধ্যের দুইটি স্থানে একরাশ মাংস পিন্ডি গজিঁয়েছে নতুন করে। এছাড়া ছোট বেলার হাতপা দেহটা একই আছে।

অঙ্গপ্রতঙ্গগুলো শুধু বড় হয়েছে। আর তাতেই মানুষের মায়াভরা তারপ্রতি ছোট বেলার ভালোবাসার দৃষ্টিটা এখোন শকুনের মতো তিক্ষè হিংস্র দৃষ্টিতে পরিনত হয়েছে। তার চারপাশের বেশির ভাগ দৃষ্টিই তার এখোন রাক্ষুসে দৃষ্টি মনে হয়। মনে হয় তাকে গিলে খেয়ে ফেলতে পারলেই ওই দৃষ্টিগুলোর তৃপ্ত হয়।

কয়েকদিন বৃষ্টির পর ক্লান্ত আকাশটায় একরাশ রোদের অভয়ছটা। আজ সারাদিন যদিও বৃষ্টি হয়নি তবে আকাশ জুড়ে আলো আধারের খেলা চলছে পুড়ো দিন। আজ কলেজ ছুটির দিন। বাড়ির মধ্যেই সারাদিন এদিক সেদিক পায়চারী করেই কাটলো প্রিয়ার। পরন্ত বিকেলে আকাশের উদার বুক চিরে উদারতা নিয়ে সূর্য রাশ্মী ধেয়ে আসলো পৃথিবীর বুকে। এদিকে প্রিয়ের মনের মধ্যেও একছটা আলোর রশ্মি বয়ে গেলো। আপন মনে বিড় বিড় করে গান গাইতে গাইতে সোজা নদীটির পারে এসে দাড়ালো সে। বহুদিন পর মেঘমুক্ত আকাশের নিচে দাড়িয়ে গভীর ধ্যানে তাকিয়ে রইলো সে নদীটির বুকে। পরন্ত বিকেলে অসংখ্য ছোট ছোট নৌকা ট্রলার দেখতো পেলো সে। এদের মধ্যে বেশ কিছু পালয়ালা নৌকা। অনেকগুলো নৌকা এবং নৌকার মাঝি তার বেশ পরিচিত।

কিন্তু এতোগুলো পরিচিত নৌকা একসাথে কোথায় যাচ্ছে। বাড়ির পাশের মানিক চাচা তার নৌকটি নিয়ে ও কোথায় যেন যাচ্ছে। সে প্রিয়াকে দেখে ডাকলো খুকি ও খুকি নদীর পারে একা কি করছিস যাবি আমার সাথে। না চাচা সন্ধা হয়ে আসছে মা বকবে। তুই যেভাবে দাড়িয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে আছিস আমিতো ভাবছিলাম কোথায়ও যাবি তুই। প্রিয়া মুচকি হেসে বললো কাকা তুমি কোথায় যাচছ? আর আজ এতো পালয়ালা নৌকাগুলো একসাথে কোথায় যাচ্ছে? আরে খুকি দেখলিনা কয়দিন যাবৎ খুব বৃষ্টি গেলো । অনেকদিন বৃষ্টির পর আজ একটু সূর্য উঠায় সবাই বেরিয়ে পরেছে নদীর ওপার হতে গরুর জন্য ঘাস আনতে।

গরুগুলো এতোদিন অদাহারে অনাহারে রয়েছে। তাছাড়া কাল সকালে যদি আবার বৃষ্টি শুরু হয় সে ভয়ে সূর্য উঠতেই সব বেরিয়ে পরেছে ঘাস সংগ্রহের কাজে। প্রিয়া তাইতো কাকা আমি আগে বুঝতে পারিনি। কথা বলতে বলতে মানিক চাচার পাল দেওয়া নৌকাটা গভীর নদীর মধ্যে চলে গেলো। একটু পরে নৌকা নিয়ে মানিক চাচা হারিয়ে গেলো আসিম শূন্যতার মাঝে। একদৃষ্টিতে মানিক চাচার নৌকাটি যাওয়ার দৃশ্য দেখছিলো প্রিয়া এমন সময় গানের তিক্ষè শব্দ আর ট্রলারের আওয়াজে মানিক চাচার নৌকা হতে দৃষ্টিটি ফিরেয়ে তাকাতেই দেখে ১০-১২ জন ছেলে একটি ট্রলারে সাউন বক্র নিয়ে গান বাজাচ্ছে আর নদীর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে ।

প্রিয়া সে দিক হতে দৃষ্টি সড়িয়ে নদীটির পথটি ধরে এগুতেই দেখে পিছন দিয়ে ট্রলারটি তার দিকে ধেয়ে আসছে। তার কাছাকাছি ট্রলারটি পৌছাতেই ছেলেগুলোর চেচাঁমেচি উন্মুক্ত নাচানাচি এই সুন্দরী চলো আমাদের সাথে বলে আজে বাজে কথার একরাশ ঝাঝালো বকবকানি। প্রিয়া এমোন একটি ভাব করে হেটে চললো যেন কিছুই শুনতে পাচ্ছেনা সে। প্রিয়ার কোন সাড়া না পেয়ে ট্রলার হতে খালি বোতল, বিভিন্ন খাবার সামগ্রী ছুড়ে মারল প্রিয়ার উপরে এর কতগুলো প্রিয়ার শরীরের উপরে কতগুলো পড়লো তার চারপাশে।

হতভম্বের মতো দাড়িয়ে রইলো সে, আর মনে মনে ভাবলো কি তার অপরাধ। একটি দির্ঘশ্বাস ছেড়ে দাড়িয়ে রইলো প্রিয়া নদীটির পারে। এমোন সময় দৌড়ে এসে দুটি বাচ্চা মেয়ে প্রিয়ার চারদিকে নিক্ষেপ করা বোতল এবং ছুড়া বিস্কেট সহ বিভিন্ন খাবারগুলো কুড়াতে লাগলো। তারা ভয়ে ভয়ে প্রিয়ার দিকে তাকাচ্ছিলো। ঠিক প্রিয়ার পায়ের উপড়ে পড়েছিলো দুটি খালি বোতল। প্রিয়ার সামনে এসে দাড়িয়ে রইলো মেয়ে-দুটি বোতল নেওয়ার সাহস পাচ্ছিলো না। প্রিয়া রাগে ক্ষোভে অগ্নিমূর্তি মুখটি দেখে কেমন ফ্যালফ্যাল চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে বাচ্চা দুটি।

তাদের চাওনির দৃষ্টি দেখে বেশ মায়া হলো প্রিয়ার। রাগ ও ক্ষোভ কিছুটা কমে এলো তার। কি খুকিরা বোতল নিবে। মাথা নেড়ে বাচ্চা দুটি হ্যা বললো। প্রিয়া বোতল দুটি হাতে তুলে দুজনকে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলো বোতল দিয়ে কি করবে? খেলুম। কোথায় খেলবে? ইশারা দিয়ে দেখিয়ে দিলো একটু দুরেই তাদের ধানের খড় দিয়ে তৈরী ছোট ঘরটি। আমাকে তোমাদের সাথে খেলতে নিবে। হে বলে হেসে উঠলো একটি মেয়ে।

তাহলে চলো আমিও খেলবো তোমাদের সাথে বলে এগিয়ে চললো প্রিয়া বাচ্চা দুটির সাথে। এরপর তাদের মাটি দিয়ে গড়া চূলা আর বিভিন্ন খেলনা সমগ্রী নিয়ে খেলা করে কেটে গেলো প্রিয়ার বেশ কিছু সময়। হঠৎ করে একটি শক্ত হাত প্রিয়ার মাথার উপরে পরলো। মাথার ঝুলে পড়া চুলগুলো নেড়ে এখানে কি করছো প্রিয়া কণ্ঠস্বরটি ভেসে আসলো প্রিয়ার কানে। প্রিয়া চমকে উঠে পিছনে তাকাতেই দেখে সজল নামের সেই দোকানদার লোকটি। প্রিয়া হতভম্বের মতো দাড়িয়ে রইলো কিছু সময়। ক্ষোভে শরীর ফেটে যাচ্ছে তার। কি করবে সে ভেবে পাচ্ছিলো না। অদুরে দাড়িয়ে মুচকী হাসছিলো সজল ।

অগ্নিমূর্তি হয়ে দাড়িয়ে রইলো প্রিয়া। সে যেন কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। এমোন সময় সজল প্রিয়ার হাত ধরে টান মেরে বলে চলো বাড়ি ফিরে যাই সন্ধা হয়ে আসছে। প্রিয়া একটি চিৎকার মেরে হাতটি টান দিয়ে সড়িয়ে নিলো। প্রিয়ার চিৎকার শুনে কিছুটা ভয় পেলো সজল। আশেপাশের কেউ তাদের দেখছে কিনা তা ভালোভাবে দেখে নিলো সজল তারপর চুপচাপ হয়ে দাড়িয়ে রইলো সে। প্রিয়া বাচ্চা দুটিকে বললো চলো খুকিরা আমরা আজ আর খেলবোনা বলে বাচ্চা দুটিকে নিয়ে রওনা হলো প্রিয়া তার বাসার দিকে। বাড়ি ফিরে ভাবছিলো বিষয়টি তার মাকে খুলে বলে প্রিয়া। কিন্তুু ভয় হয় তার মা শুনলে আর কোনদিন নদীর পাড়ে যেতে দিবে না তাকে। এরপর হতেই নদীর পাড় যেতে মনে চাইলেই কিছুদুর এগিয়ে ফিরে আসতো প্রিয়া। সজল নামের ছেলেটির নদীর পারেই আড্ডা । প্রিয়া শুনেছে সারাদিন ছেলে পেলে নিয়ে গাঁজা খাওয়া আর তাস খেলায় তার মূল কাজ। মাঝে মাঝে ফিরে দোকানে। কর্মচারীর কাছ হতে টাকা পয়সা নিয়ে আবার নদীর পারে বসে জুয়া খেলা চলে ।

তারপর হতে বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে নদীর পারে যাওয়া হয়নি প্রিয়ার । একইতো সজলের ভয় অন্যদিকে পরিক্ষাও সামনে এসে পড়েছে তার । তাই লেখা-পড়া নিয়েই ব্যাস্ত সময় কাটছে তার। এখোন একটু সকালেই সজল দোকান খোলার আগেই বাড়ি হতে বেরিয়ে যায় প্রিয়া। আর বাড়ি ফেরার সময় সজলের দোকানে আছে কিনা এটা ভালোভেবে জেনে নেয় সে। যেদিন সজল কলেজে ফেরার সময় দোকানে থাকে প্রায় হাফ কিলোমিটার রাস্তা ঘুরে বাড়ির পেঁছন দিক দিয়ে বাড়ি ফিরে সে। তবে এই রুটিন মাফিক জীবন তাকে বেশ ক্লান্ত করে তুলে। মাঝে মধ্যে নদীটির পারে যেয়ে একটু মুক্ত আলোর স্পন্দনে গা ভাসতে মনে চায় তার।

কিন্ত বাড়ি হতে বের হলেই মনে হয় সজলের দৃষ্টি আর হিস্র মানুষের বর্বরতার কথা নদীর পারে যাওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলে প্রিয়া। এদিকে বেশ কিছু দিন যাবৎ প্রিয়াকে না দেখতে পেয়ে সেদিন প্রিয়াদের বাড়িতে আসে সজল। প্রিয়ার মায়ের সাথে অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে কথাবার্তা করতেছিলো। আর এদিক সেদিক তাকাচ্ছিলো সে। প্রিয় সজলের কন্ঠস্বর শুনে দরজা বন্ধ করে দিয়ে চুপচাপ বসে রইলো পড়ার টেবিলে। বখাটে সজল প্রিয়াকে না দেখতে পেয়ে নিরাশ হয়েই ফিরতে হলো বেচারাকে।

প্রিয়ার সাথে দেখা না করতে পেরে বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে সজল। বন্ধুদের নিয়ে আলাপ করে কি করা যায়। বাড়ির পাশের মইন ঘটককে ডেকে প্রিয়ার বাবা বাড়ি আসলে তার কাছে বিয়ের প্রস্তাব দিতে বলে। ঘটক মঙ্গন সজলের কথা শুনে চমকে উঠে। মঙ্গন জানে সজল আগেও একটি বিয়ে করেছে । সে ঘরে তার একটি বাচ্চাও রয়েছে । সারদিন নেশা-পানি খায় বিধায় বৌ সংসার ছেড়ে বাবার বাড়িই থাকে। তাই ঘটক আমতা আমতা করতে থাকে। সজল একটি ধমক মারে ঘটককে তারপর বেশ কিছু টাকা গুজে দেয় পকেটে। যা বেটা যা করছি তাই কর। কাল ছুটির দিন প্রিয়ার বাবা নিশ্চয় বাড়ি আসবে। প্রস্তাবটা দিয়েই কি কয় আমারে জানাবি। তানাহলে তর……।

তারপর দিন বিকালে মইন ঘটক মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে রওনা হয় প্রিয়াদের বাড়িতে। এমনি প্রিয়ার বাবার সাথে বেশ ভালো সম্পর্ক তার। বাড়িতে যেতেই প্রিয়ার মা বেশ আদর করে বসতে দিলো তাকে। প্রিয়ার বাব ঘর হতে বের হয়েই বেশ কুশলাদী বিনিময় করলো। তারপর বেশ কিছুক্ষন আলাপ চারিতার পর মইন ভাবতেছিলো কি করে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। সে প্রিয়াকে নিজ মেয়ের মতোই জানে।

জেনে শুনে ঐ বখাটে ছেলের জন্য প্রস্তাব দিতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল তার। তাছাড়া প্রিয়ার বাবাই কি ভাবে ভাবতেই বিয়ের প্রস্তাব না দিয়েই বাড়ি ফিরছিলো সে। বাড়ির গেটে আসতেই আবার মনে পড়লো সজলের কথা। নদীর পাড়েইতো বসে আছে তারা গেলেইতো জানতে চাইবো। তাই গেটেই দাড়িয়ে গেলো মঙ্গন ঘটক। পিছন হতে প্রিয়ার বাবা দাড়িয়ে রইলেন কেন? কিছু বলবেন। হ্যা ভাই বলছিলাম কি প্রিয়ার বিয়ে সাধি দিবেন কিনা এটা জানতে চেয়েছিলাম। একটা প্রস্তাবও দিয়েছিলো একজন কেমনে যে বলি। না ভাই সাহেব প্রিয়ার কয়দিন পর পরিক্ষা কতো প্রস্তাবইতো আসে। তা যাই হোক আপনার কাছে কে প্রস্তাব পাঠিয়েছিলো।

মইন আমতা আমতা করে বলে সজল । কোন সজল? ওযে আপনাদের বাড়ির সামনের দোকানদার ছেলেটি। কার জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছিলো। ঘটক তার নিজের জন্য। শুনে প্রিয়ার বাবা অগ্নিমূর্তি হয়ে উঠলো। ভাবলো ঘটককে কিছু বলে। কিন্তু আবার ভাবলো ঘটকের কি দোষ। তাকে পাঠিয়েছে বিধায় সে আসতে বাধ্য হয়েছে। প্রিয়ার বাবার অগ্নিমূর্তি ভাব দেখে নিশ্চুপ হয়ে বাড়ি হতে বের হয়ে গেলো ঘটক।

গেট হতে বেরুতেই দেখা হলো সজলের সাথ্।ে সজল আরো ৩ জন বন্ধু তারা ঘটককে নিয়ে চলে আসলো সোজা নদীর পারে। তারপর জানতে চাইলো প্রিয়ার বাবা কি বললো তা। ঘটক প্রিয়ার সামনে পরিক্ষা তাই ওকে এখোন বিয়া দিবোনা। আচ্ছা অহন না দেয় যহন দেয় তহনই করমু । কালকা আবার যাইয়া কইবা ।

মইন ঘটক না আমি আর ওই বাইতে যাইতে পারমু না।

সজল- ক্যান জাইতে পারবানা মাইনসে টাকা দেয় আমিও দিমু।

মইন- না টাকা দিলেও বাবা যেখানে সেখানে প্রস্তাব দিলেইতো আর বিয়ে করা যায়না। তুমি কেন বুঝনা। প্রিয়া লেখাপড়া জানা সুন্দর একটি আধুনিক যুগের মেয়ে। তার অনেক ভালো যায়গা হতে বিয়ের প্রস্তাব আসতাছে সেখানে বিয়ে দেয় না। আর তুমি এর আগেও একটি বিয়ে করেছো। তোমার বৌ পোলা আছে তোমার সাথে কি বিয়া দিবো।

সজল- এক ধমক দিয়ে চুপ কর শালা ঘটক। আমার কালকের টাকা ফিরাইয়া দে বলেই ঘটকের পকেট ছিড়ে যা ছিলো নিয়ে নিলো সে। তারপর বললো বিয়া কি কইরা করতে হয় তা আমার ভালো জানা আছে। বলেই রওনা হলো দুই বন্ধুকে নিয়ে। পাশের ইউনিয়নের কাজী তার দুর সম্পর্কের আপ্তিয়। তাকে দিয়ে পটিয়ে একটি ভূয়া কাবিন নামা তৈরী করলো সে। কিন্তু কাবিন করতে হলেতো ছবি প্রয়োজন। এলাকার সবকটি ইস্টেডিও খুঁজে কিছু ছবিও যোগার করে নিলু সে।

তারপর শুরু হলো সজল ও তার বন্ধুদের প্রচরণা। এককান দুকান হতে হতে বিষয়টি একদিন প্রিয়াদের পরিবারের লোকজনের কানে পৌছালো। কথা শুনে প্রিয়ার বাবা মা হতভম্ব হয়ে গেলো । সেদিন ঢাকা হতে ফিরে মেয়েকে ডেকে প্রিয়ার কাছে জানতে চাইলো। প্রিয়া বাবার কথা শুনে বাবা মায়ের অসহায় মুখের অবস্থা দেখে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো। সে বাবা মায়ের কাছে খুলে বললো সজল যে তাকে বিরক্ত করতো তা। এরপর সজলের বাবা বাড়ির পাশের মড়লকে ডেকে শালিশী বসালো।

শালিশীতে ডাকা হলো সজল ও তার বন্ধুদের তার ভূয়া কাবিন নামাটি দেখিয়ে বললো তার আর প্রিয়ার বিয়ে হয়েছে। ডকুমেন্ট সবই আছে। প্রিয়াকে ডাকা হলো প্রিয়া অস্বিকার করে সজল যে তাকে বিরক্ত করতো তা খুলে বললো। সজল বললো প্রিয়া ও তার বাবা তার কাছ হতে অনেক টাকা নিয়ে প্রিয়াকে তার কাছে বিয়ে দিয়েছে। তার ডিট ডকোমেন্ট সবই আছে এর বেশি তার আর কিছু বলার নেই। নিজের বৌকে কি করে ঘরে নিয়ে যেতে হয় তা সে ভালোই জানে সে বলে চলে গেলো সজল।

এরপর হতে পুড়ো এলাকা জুড়ে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হলো। চায়ের দোকান হতে শুরু করে আলোচনা টি ছড়িয়ে পরলো সর্বত্র। কেউ বলে প্রিয়ার বাবা এমোন একটি কাজ করলো টাকার জন্য এই মাইডারে। আচ্ছা কাগজটা না হয় ভূয়া বানাইছে কিন্তু প্রিয়ার ছবিটা পাইলো কই। এ কথায় অনেকের কাছেই বিষয়টি স্যায় মিললো। না নিশ্চয় কিছু একটা হইছে নাইলে সরকারী রেজেষ্ট্রি বিয়া একাবারে সিল সাপ্পর মারা ।

এনিয়ে কথার কানাঘুসা বেরেই চললো। প্রিয়ার বাবা আবার ফিরে গেলো গ্রাম্য মোড়লদের কাছে। বিয়ে সঠিক কিংবা বে-সঠিক সেটা প্রমান করার ক্ষমত্বা গ্রাম্য মাদবরদের নাই। তাই তারা প্রিয়ার বাবাকে আদালতে মামলা করার জন্য বললো। প্রিয়ার বাবা প্রিয়াকে নিয়ে আদালতে মামলা দায়ের করলো। আদালত উক্ত মামলায় সজলের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী করলো। সজলকে গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করা হলো। এদিকে কথাগুলো ছড়িয়ে গেলো প্রিয়াদের কলেজেও। কলেজে গেলেই নানা ভৎসনা আর গঞ্জনা শুনতে হতো প্রিয়াকে। এদিকে প্রিয়ার বাবা ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান ছেড়ে বাড়িতে মেয়ে পরিবার নিয়েই ব্যাস্ত সময় কাটছিলো তার। রাস্তায় বেরুলেই মানুষের আজে বাজে কথা শুনতে হতো তার। তাই মানুষের কথায় ত্যাক্ত হয়ে মেয়ের কলেজে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে সে।

এদিক দিয়ে প্রায় মাস খানেক হয়ে গেছে সজল জেলে। সজলের পরিবারের লোকজন কলেজের প্রিন্সিপলকে পটিয়ে সজল যে প্রিয়াকে কোন উত্যক্ত করতো না। উত্যাক্ত করার কোন অভিযোগ তাদের কাছে নেই এ ধরনের একটি সার্টিফিকেট নিয়ে আদালতে দাখিল করে জামিন নেই সজলের। জামিনে আসার পর সজল আরো বেশ জোড়ে-সোড়ে প্রচার করতে থাকে তার কাবিননামা সঠিক প্রমানিত হওয়াই তাকে ছেড়ে দিয়েছে আদালত। এইতো মামলাটি শেষ হলেই প্রিয়াকে নিয়ে ঘরে উঠাবে সে। তখন দেখবে প্রিয়ার বাবা কোথায় যায়। তার কথায় এলাকায়ও বেস সায় মিললো। আর দু-চার জন নিন্দুককে দোকান হতে বাকিতে বেশ কিছু মালামাল দিয়ে বেশ ভক্ত বানিয়ে ফেললো সে। বাড়ি হতে বেরুলেই নিন্দুকেরা প্রিয়ার বাবাকে বলতে লাগলো কি মিয়া মাইয়ারে বিয়াই যেহেতু দিছো সেহেতু ঘর তুইল্লা দিতে লজ্জা কোথায়।

পুরুষ মানুষ না হয় বিয়া আরেকটা করছে তাতে কি? এসব কেইচ মামলা কইরা কি আর অইবো মাইডারে সয়-সন্মানে তুইলা দেও। কথাশুনে স্তম্ভিত হয়ে উঠে প্রিয়ার বাবা আশে পাশের এতো লোকজনরে কি করে বুঝায় সে। ত্ইা ত্যাক্ত হয়ে একদিন নিজ ঘর দুটোকে বিক্রি করে দিলো সে। না আর থাকবোনা এই নদীর পারে। এ নদীই কেড়ে নিয়েছে তার সব। এই বয়সে পাঁচবার নদীতে বাড়িঘর ভাঙ্গার পরেও এই নদীটিকে ভালোবেসে তার পারেই বসতি স্থাপন করেছিলো সে।

এক সময় শত বিঘা জমি ছিলো গ্রামে মাতব্বরী ছিলো তাদের। তাদের পরিবারের দিকে কেউ চোখ বাঁকা করে তাকাতে সাহস পায়নি। আর আজ তার স্বজনরা নদী ভাঙ্গনে বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ায় তার পরিবারের উপর এই কলঙ্কের রেখা। আপ্তিয় স্বজনরা তাকে বার বার বলেছিলো তাদের পাশে বসতি স্থাপন করতে। বড় ভাই নদী ভাঙ্গনের পর গাজিপুরে বসতি স্থাপন করে। অন্য ভাই আপ্তিয় স্বজনেরাও অনেকে সেখানে বসতি স্থাপন করছে। বড়ভ্ইা নিজ বাড়ির অর্ধেকাংশ পর্যন্ত লিখে দিতে চেয়েছিলো কিন্তু এই নদীটির পার হতে কিছুতেই যেতে চায়নি প্রিয়া।

এখান হতে চলে যাওয়ার কথা হচ্ছিল। সে সময়ের ৮ বছরের প্রিয়া খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়ে স্কুল যাওয়াও বন্ধ করে দিলো সে। বাবা ঢাকা হতে ফিরে প্রিয়ার মুখখানি দেখে তারবুকও শুকিয়ে সার। কিরে মা তোর অবস্থা এমনকে জানতে চাইতেই প্রিয়া ফ্যাল ফ্যাল করে বাবার দিকে তাকিয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পরে বলে বাবা আমরা এখান হতে যাবনা। এখানেই থাকবো। মেয়ের কান্না দেখে কেঁদে ফেলে প্রিয়ার বাবাও। ও আচ্ছা এ কথা । আচ্ছা ঠিক আছে প্রিয়ামনি না গেলে আমরা কি করে যাই আচ্ছা আমরা যাবনা। প্রিয়া সেদিন কি খুশি। বাড়ির পাশের বান্ধবীদের ডেকে নদীর পারে নিয়ে গাজিপুরে যাওয়া হচ্ছেনা বিধায় সবাইকে লজেন্স কিনে খাওয়ায়। ছোট বেলা হতে এ নদীটির সাথে বেশ সাখ্যতা প্রিয়ার। স্কুল ছুটির পরে নদীর পারে খেলা করে সন্ধের আগে বাড়ি ফিরে আসতো প্রিয়া।

কখনো কখনো সন্ধা গড়িয়ে রাত হয়ে যেতো। তারপরও প্রিয়ার বাড়ি ফিরার খবর নেই। এদিকে মা ঘরের মধ্যে বাতি জ্বালিয়ে মেয়ের জন্য উদ্বিগ্ন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকতো। প্রিয়া কখনো কখনো ভিজা শরীরে বই কাদেঁ নিয়ে মায়ের বকুনি এড়াতে পিছনের দরজা দিয়ে বাড়ি ফিরে পড়ার টেবেলে মায়ের বকুনি হতে বাচাঁর জন্য উচ্চস্বরে পড়া শুরু করতো। এদিকে মা প্রিয়ার কন্ঠশুনে বেশ জোড়ে বকাঝকা শুরু করতো। বকাঝকা শুনে প্রিয়ার পড়ার শব্দ আরো বেড়ে যেতো। এদিকে প্রিয়ার বাবা তার মাকে বলতো ছোট মেয়ে নদীর পারে ঘুরতে যাওয়া ছাড়া ওরতো আর কোন বায়না নাই। তাছাাড়া ও এখোন পরছে। তুমি একটু চুপ করোতো। পড়তে দাও ওকে। প্রিয়ার মা তোমার আস্কারা পেয়েইত্ োআজ ওর এই অবস্থা। এক সময় রাগ কমে আসতো প্রিয়ার মায়ের। থালা ভর্তি ভাত তরকারী নিয়ে রাগান্বিত মুখে রেখে আসতো প্রিয়ার টেবিলে। প্রিয়া মা চলে আসতেই বই খাতা বন্ধ করে সারাদিনে ক্ষুর্দাত শরীরে খেয়ে ক্লান্ত প্রিয়া ঘুমিয়ে পড়তো নিজ রুমে।

যাই হোক আগামী কালই চলে যাবে প্রিয়ারা গাজিপুরে। এটা চুরান্ত। প্রিয়ার বাবা তার বড় ভাইকে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছে তারা স্ব-পরিবারে গাজিপুরে চলে আসছে। হঠাৎ করে প্রিয়ার বাবার দেশ ছেড়ে চলে আসার সিন্ধান্ত শুনে একবারে চমকে উঠছে প্রিয়ার চাচা। জানতে চাইছিলো কিছু হয়েছে কিনা? এ অবস্থার কথা বলতে সাহস পায়নি প্রিয়ার বাবা। শুধু বলেছে এসেই বলবে এখানে আর এক মূহুর্ত সে থাকবেনা। যাই হোক এতোদিনে তোর শুভ বুদ্ধির উধাও হয়েছে। কোন সমস্যা নেই চলে আয় আমি তোদের থাকার সব ব্যাবস্থা করে রাখছি বলছে প্রিয়ার বড় চাচা। গাজিপুরে চলে যাওয়ার কথা শুনে প্রিয়ার মন বেশ খারাপ।

কিন্তু কোন আপত্তি করার সাহস হয়নি তার। আর আপত্তি করেই কি হবে নদীর পারে যাওয়া মুক্ত পথে ঘুরাতো তার বন্ধ হয়ে গিয়েছে। ভাবছিলো বাড়ি থেকে যাওয়ার আগে আজ বিকেলে শেষ বারের মতো নদীপারে একটু ঘুরতে যাবে সে। গেটের সামনে দাড়াতেই দেখে সজল দোকানে বসে আছে। দেখেই তার পুড়ো শরীরটি হিম হয়ে গেছে। যাওয়া হয়নি তার। বিকেল বেলা চুপ করে উঠানের এক কোনে বসে ছিলো সে।

মনে হচ্ছিলো কে যেন তাকে ডাকছে। তার কোন স্বজন যেন তার জন্য অপেক্ষা করছে। ভাবতে ভাবতে সন্ধা ঘনিয়ে আসে নিজ রুমে আলো জ্বেলে বসে আছে প্রিয়া। হাতে পড়ার দু-একটি বই নিয়ে নাড়াচাড়া করছে সে। না কোন পড়াই বের হচ্ছেনা মুখ থেকে। চুপটি করে বসে রইলো সে। তারপর ছোট ভাই শিশির ডেকে নিয়ে গেলো খাবার টেবিলে। খেতে বসে বাবা জানিয়ে দিলো কাল সকালেই চলে যাচ্ছে তারা। প্রিয়ার সব কিছু গুছিয়ে নিতে। প্রিয়া শুধু মুখটি নিচু করে হ্যা সুচক মাথা নাড়লো। খেয়ে চলে আসলো নিজ রুমে।

এপিঠ ওপিঠ করে অনেক সময় কেটে গেলো ঘুম আসছিলো না তার। নিজ কক্ষে শুয়ে ভাবছে প্রিয়া আজই দেশে তাদের শেষ রাত। এ ঘরটা বেচেঁ দিয়েছে বাবা। কাল তারা গাজিপুর চলে যাওয়ার পরেই ঘরটি ভেঙ্গে নিয়ে যাবে ওরা। এ ঘরে আর কোনদিন সোয়া হবেনা তার। ঝিঝি পোকার ডাক শুনা হবেনা। শহরের গাড়ির শো শো শব্দ আর হর্নের বিকট শব্দটি শুনা যাবে কাল থেকে। নদীর ঢেউয়ের ঝাপটার শব্দটি কানে ভেসে আসে তার। মনে পরে তার ছোট বেলার জীবন। তারপর নদীর ভাঙ্গা গড়ার মধ্যে বিভিন্নস্থানে বসতি। বিভিন্ন মানুষের সাথে সখ্যতা আর সর্বশেয়ে মনে পরে এ স্থানের কিছু মানুষের নিষ্ঠুরতা। ভাবতে ভাবতে গভীর রাত হয়ে এলো। দূরে ঝিঝি পোকার শব্দগুলো আর বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠলো।

একটু আগেও মেঘের ঘনঘোটা ছিলো। এখোনো আকাশ জুড়ে উড়ে বেরাচ্ছে মেঘগুলো। সামনের নদীটির তীরে শনশন বাতাসের ধ্বনি। নদীটির কূলে কূলে পানির ঝাপটার শব্দ শুনতে বেশ ভালো লাগে প্রিয়ার। তাই জানালার পাশে কানপেতে অদূরের নদীটির পানির কলকল ছলছল শব্দ শুনতে শুনতে চোখ চলে গেছে তার সূদূর আকাশে। তখন মধ্যে আকাশে তার পুড়ো দেহ নিয়ে চাদঁটি যেন চেয়ে আছে প্রিয়ার দিকে। মাঝে মাঝে চাদেঁর দৃষ্টিটি কোথায় হতে যেন একরাশ মেঘ এসে কেড়ে নিয়ে যায় প্রিয়ার মুখের উপর হতে। প্রিয়া তাকিয়ে দেখে পালকহীন মেঘগুলোর উড়ে যাওয়ার দৃশ্যটা। দেখতে বেশ ভালো লাগে ওর।

কিছুক্ষন পরে মেঘের অন্তরাল হতে চাঁদটি ভেসে উঠে। মেঘের কোল হতে চাঁদটি যেন প্রিয়াকে দেখে হেসে উঠে। এ যেন ছোট বেলার লোকচুরীর খেলার মতোই মনে হয় তার। কিছুক্ষন পড়ে মেঘগুলো আকাশ হতে সড়ে গিয়ে একেবারে পূর্ণ তিথিতে ভেসে উঠলো চাদঁটি। দিনের মতোই আলোকিত হয়ে উঠলো মায়াবী চাঁদের আলোয় পুড়ো পৃথিবী। প্রিয়ার আপন মনে ঘর হতে বের হয়ে এলো উন্মক্ত আকাশের নিচে দাড়িয়ে পাশের নদীটির শনশন শব্দগুলো শুনে প্রিয়া ছুটে চললো মনের অজান্তে নদীটির পাড়ে। আপন মনে দাড়ালো গিয়ে একাবারে নদীটির কূলে। নদীটির পাশে দাড়িয়ে হাত দুটি মেলে ধরে নদীটির বয়ে চলা ঢেউয়ের মতো হেটে চললো সে।

কিছুদূর এগুতেই দেখে তার শরীরে ওড়না নেয়। চমকে উঠলো সে। দু-হাত দিয়ে বুকটিকে চেপে ধরে আড়চোখে আশে-পাশে তাকাচ্ছে প্রিয়া। না কোথায়ও কেউ নেই। কেউ তার দিকে আড় চোখে তাকাচ্ছেনা। ভাবতেই নিজেকে বেশ স্বাধিন মনে হলো তার। দু-হাত বুক থেকে সড়িয়ে আবার হাত দুটি মেলে ধরে ছুটে চললো সে গন্তব্যহীন পথে। বাতাসে চুলগুলো তার এলোমেলো হয়ে উড়ছে। কোথায়ও কেউ নেই। কেউ তাকে বকাঝকা করেছেনা আর চোখে তাকাচ্ছেনা তাকে দেখে মুচকী হাসছে না। কেউ আঁেজবাজে কথাও বলছে না । ভাবতেই সে নিজেকে বেশ স্বাধিন মনে করতে লাগলো। আপন মনে গান গাইতে গাইতে ছুটে চললো সে। কোথায়ও আমার হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা। গান গাইতে গাইতে ঝরনার মতো চপল পায়ে ছুটে চললো সে।

এক সময় ক্লান্তি এলো তার। বেশ জোড়ে শ্বাস প্রশ্বাস নিতে শুরু করলো সে। শরীর দিয়ে ঘাম ঝড়তে শুরু করছে । একস্থানে দাড়িয়ে গেলো সে। না বেশ গরম লাগছে। ঘামে মুখ মন্ডল ভিজে গেছে। নদীটির পার হতে নেমে নদীর পানিতে মুখ ধুতে শুরু করলো। না পুড়ো শরীর ভিজে গেছে তার । পানির মধ্যে রুপালি চাদেঁর আলো পড়ে জ্বলজ্বল করছে। মনে হলো রুপালি আলোগুলো প্রিয়াকে ডাকছে। প্রিয়া এক লাফ দিয়ে পড়লো নদীটির বুকে। তারপর সাতরাতে লাগলো নদীর বুকজুড়ে।

একসময় সাতরাতে সাতরাতে বেশ মাঝ নদীতে চলে গেলো সে। শরীর ক্লান্ত হয়ে এলো তার । হাত পা নেড়ে সাতরাতে আর শক্তি পাচ্ছিলোনা শরীরে । নদীর স্রোতের অনুকূলেই গাঁ ভাসিয়ে দিলোসে। ভাদ্রের তিব্র স্রোতে নদীর বুকে ভেষে গেলো সে না ফেরার দেশে। যে নদীর আলো বাতাসে যার জলে তৃষ্ণা নিবারণ করে যার বুকে খেলা করে ছোট শিশু প্রিয়া যৌবন পেয়েছিলো। আজ নব যৌবনে মেতে উঠা ক্ষরতস্রোতা নদীর বুকে নিজ যৌবন নিয়ে হারিয়ে গেলো সে।

এ পৃথিবীর সকল কালির রেখা ধুয়ে দেয় পানি। যেই যৌবন প্রিয়ার জীবনে কালো কলঙ্কের রেখা হয়ে দাড়িয়েছিলো সেই কলঙ্ক ধুতেই হয়তো পদ্মা তাকে গ্রাস করেছে নিজ বুকে। এই পদ্মার পাড়েই প্রতিনিয়তই জন্ম নিচ্ছে অসংখ্য প্রিয়ারা। পদ্মার ঘোলা জল অংগে মেখে তার আলো বাতাসে খেলা করে বেড়ে উঠে তারা। হয়তো এই পদ্মা মায়ের কোনো কুটিরে আবার জন্ম নিবে প্রিয়া। এই পদ্মায়ই শস্য শ্যামল ফসল ফলিয়ে বড় করে তুলবে প্রিয়াদের । প্রিয়াদের নিবিঘেœ চলার পথটা সুগম করার জন্যই এই পৃথিবীকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ভরে দেখানের জন্যই হয়তো পদ্মা প্রিয়াকে গ্রাস করেছে।

পৃথিবীকে দেখানের জন্য যে শস্য শ্যামলে আমি ফসল ফলাই যে শস্য খেয়ে তোমরা বড় হয়ে উঠো যেই আলো বাতাসে আমি তোমার সেবা দেই প্রতিনিয়ত। সুন্দর পৃথিবীকে সুন্দর করে সাজাই। সুন্দর করি তোমাদের দেহ মন ও শরীর । সেই সুন্দরকে সুন্দর করে যন্ত নিতে হয় তানাহলে সুন্দর হারিয়ে যায় অসুন্দরের ছায়ায়।