গজারিয়ায় স্থগিত ৯ কেন্দ্রে বুধবার পুনঃভোট

upzilalogoনির্বাচনী সহিংসতায় ৩জন নিহত ও অসংখ্য গুলিবিদ্ধের ঘটনায় রক্তাক্ত গজারিয়া উপজেলার স্থগিত ৯টি ভোট কেন্দ্রের পুনঃনির্বাচন আগামী। আর এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গজারিয়ায় থমথমে ভাব বিরাজ করছে। এ পুনঃনির্বাচনে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নেয়া হলেও ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ নেই নির্বাচন নিয়ে।

জেলা রিটার্নিং অফিসার এডিসি জেনারেল মুহাম্মদ সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী জানিয়েছেন, গত ২৩ মার্চ নির্বাচনে বিভিন্ন কেন্দ্রে গোলযোগের কারণে গজারিয়া উপজেলার বালুয়াকান্দি ইউনিয়নের বালুয়াকান্দিস্থ ডা. আব্দুল গাফফার স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ভবেরচর ইউনিয়নের পৈক্ষ্যারপাড় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, লক্ষীপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আলীপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গজারিয়া ইউনিয়নের কাজীপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গজারিয়া পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, ইমামপুর ইউনিয়নের বাগাইয়াকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বাউশিয়া ইউনিয়নের পোড়াচক বাউশিয়া ও গুয়াগাছিয়া ইউনিয়নের শিমুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-এই ৯টি ভোট কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়। স্থগিত ৯টি ভোট কেন্দ্রের মোট ভোটার সংখ্যা ২৫ হাজার ২৮২টি।

নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রেফায়েত উল্লাহ খান তোতা (দোয়াত কলম) ১০ হাজার ৮৩০ ভোট পেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ২২ হাজার ২৮২ ভোট। আর আওয়ামী লীগ প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিরুল ইসলাম (মোটর সাইকেল) ১১ হাজার ৪৫২ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন। ৯ হাজার ৫৩৪ ভোট পেয়ে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী গজারিয়া উপজেলা যুবদলের সভাপতি ও বাউশিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান দেওয়ান মনা (ঘোড়া) তৃতীয়, ৪হাজার ২৪৯ ভোট পেয়ে বিএনপির প্রার্থী মুন্সীগঞ্জ জেলা বিএনপির যুগ্ন-সম্পাদক মজিবুর রহমান (আনারস) চতুর্থ, ১ হাজার ৬৪৯ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত মনছুর আহম্মেদ খান জিন্নাহ (টেলিফোন) পঞ্চম ও ৭৯৯ ভোট পেয়ে জেলা জাতীয় পার্টি সভাপতি আলহাজ কলিমউল্লাহ (কাপ-পিরিচ) ষষ্ঠ অবস্থানে রয়েছেন।

এদিকে, উপজেলার ৪৫টি কেন্দ্রের মধ্যে স্থগিত ৯টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৮টি কেন্দ্রেই প্রার্থী তোতার ভরাডুবির আশঙ্কায় কেন্দ্রগুলোতে অরাজকতা ঘটিয়ে তা স্থগিত করা হয়।

ভাইস চেয়ারম্যান পদে গজারিয়া উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি, যুবদল নেতা আশাদুজ্জামান জামান (তালা) ৬৫৫ ভোট পেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ১৯ হাজার ৯৭০ ভোট। ১৯ হাজার ১৩৫ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছেন টেঙ্গারচর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান উপজেলা বিএনপির যুগ্ন-সম্পাদক ইসহাক আলী (চশমা)। ৬ হাজার ৭৩৮ ভোট পেয়ে বাউশিয়া ইউপি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাংবাদিক মোস্তফা সারোয়ার বিপ্লব (উড়োজাহাজ) তৃতীয় ও ১ হাজার ৪০০ ভোট পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী ওমর আলী পালোয়ান (টিউব ওয়েল) চতুর্থ অবস্থানে রয়েছেন।

মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে বিএনপি সমর্থিত অধ্যাপিকা ফরিদা ইয়াসমিন (কলস) ৭হাজার ৩৬৪ ভোট পেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তিনি পেয়েছেন ২৪ হাজার ৮৮০ ভোট। ১৭ হাজার ৫১৬ ভোট পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী সুরাইয়া সরকার (ফুটবল) দ্বিতীয় ও ৪ হাজার ৪৩৪ ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মুক্তা বেগম (সেলাই মেশিন) তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন।

গজারিয়া উপজেলা নির্বাচনকে ঘিরে এএসআই এমদাদুল হক হাতে উপজেলার সহকারী রিটার্নিং অফিসার ও ইউএনও ড. এটিএম মাহবুব-উল-করীম লাঞ্ছিত, ব্যাপক সহিংসতা ও অনিয়মসহ কয়েকটি কারণে নানাভাবে সমালোচিত মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান হাবিবকে গত ৩রা এপ্রিল ক্লোজড করা হয়েছে। তাকে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের সংযুক্ত অফিসে নেয়া হয়েছে।

এদিকে, মুন্সীগঞ্জ জেলায় চুরি, ডাকাতি ও মাদকের ব্যবহার অতিমাত্রায় বৃদ্ধি, জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় প্রায় অনুপস্থিত, দুর্নীতি, অসদাচরণ, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসের অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকাসহ মুন্সীগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে ২২টি অভিযোগ এনে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল গত ২৭ শে মার্চ মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে গোপনীয় প্রতিবেদন দাখিল করেন। এর প্রেক্ষিতে পুলিশ সুপারকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়।
এর আগে নির্বাচনী সহিংসতা, ভোট জালিয়াতির ঘটনায় গত ২৮ শে মার্চ রাত ১১ টার দিকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গজারিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মামুন-অর রশীদকে ডিআইজি সংযুক্ত অফিসে প্রত্যাহার ও মুন্সীগঞ্জ পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমানকে এক সপ্তাহের জন্য ছুটিতে পাঠানো হয়। পরদিন ২৯ শে মার্চ সকাল থেকে ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপারের দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. জাকির হোসেন মজুমদার।

ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার সুপার মো. জাকির হোসেন মজুমদার বলেন, স্থগিত ৯টি কেন্দ্রের নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য ব্যাপক নিরাপত্তামুলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। মহাসড়কে চেক পোস্ট, নদী পথে নৌটহল, মোবাইল টিম, অবৈধ যানবাহন ও বহিরাগতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কেন্দ্রে কেন্দ্রেসহ উপজেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স মোতায়েন থাকবে। জেলার বাইরে থেকেও এখানে পুলিশ ফোর্স আনা হবে। শতভাগ নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

জানা গেছে, গত ২৩ শে মার্চ গজারিয়া উপজেলা নির্বাচনে বালুয়াকান্দির বড় বায়পাড়া মাধ্যমিক উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী রেফায়েত উল্লাহ খান তোতা গ্রুপ হামলায় ইউপি চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা শামসুদ্দিন প্রধান (৪৫) নিহত হন। নিহত চেয়ারম্যান শামসুদ্দিন চেয়ারম্যান প্রার্থী আমিরুল ইসলামের সমর্থক ছিলেন।

গত ২৩ মার্চ নির্বাচনে ভোট শেষে বিকেল সোয়া ৪ টার দিকে ভোট গণনাকালে বাউশিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোট কেন্দ্রে যৌথবাহিনী প্রবেশ করে ব্যালট বাক্স নিয়ে যাওয়ার সময় গ্রামবাসীর সঙ্গে সংঘর্ষে গুলিতে বিএনপির বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী উপজেলা যুবদলের সভাপতি ও বর্তমান বাউশিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান মনার স্ত্রী লাকি আক্তারসহ বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়। আহত গুলিবিদ্ধ লাকি আক্তার (৩৮) এ্যাপোলো হসপিটালে পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে গত ২৭শে মার্চ বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে মারা যায়।

২৪শে মার্চ সকাল সাড়ে ১০টা উপজেলার বাউশিয়া ইউনিয়নের মধ্যমকান্দি গ্রামে ২ চেয়ারম্যান গ্রুপের সংঘর্ষে উপজেলা ছাত্রলীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক মাহবুব আলম জোটন প্রধান (২৫) গুলিবিদ্ধ হয়ে একই দিন সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়।

এর আগে নির্বাচনের আগের দিন ২২ শে মার্চ বেলা ১১ টার দিকে কুপিয়ে আহত করা হয় গজারিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সোলায়মান দেওয়ান (৫৫) ও মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রফিকুল ইসলাম বীর বিক্রম (৬০)-কে।

উল্লেখ্য, মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক শেখ লুৎফর রহমানের সমর্থন নিয়ে চেয়ারম্যান পদে আমিরুল ইসলাম ও স্থানীয় সংসদ সদস্য, আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির উপ-দপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাসের সমর্থন নিয়ে রেফায়েত উল্লাহ খান তোতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

বার্তা২৪