মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়ার ৪৬ বছর পর মুক্তি

রাহমান মনি: প্রয়োজনে বেশ কয়েকজন গুরুতর অপরাধী বেকসুর ছাড়া পেলেও একজন নিরপরাধী যেন কখনোই সাজা না পায়। ন্যায়বিচারের স্বার্থে বিচার ব্যবস্থার এই অমোঘ বাণীটি প্রমাণ করার জন্যই হয়তো-বা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে দীর্ঘ ৪৮ বছর কারা ভোগ এবং ৪৬ বছর কনডেম সেলে কাটিয়ে জীবন সায়াহ্নে এসে মামলা আবার শুনানি বা পুনর্বিচারের জন্য জাপানের একটি আদালত কর্তৃক মুক্তি পেয়েছেন এক ব্যক্তি। ইতোমধ্যে তিনি মৃত্যুদণ্ডের পরোয়ানা মাথায় নিয়ে দীর্ঘতম সময় ধরে বেঁচে থাকা একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে গিনেস বইয়ে স্থান করে নিয়েছেন। জাপানের একটি আদালত (ঝযরুঁড়শধ উরংঃৎরপঃ ঈড়ঁৎঃ) ২৭ মার্চ ২০১৪ পুনর্বিচারের এই রায় দেন।

৭৮ বছর বয়স্ক ইওয়াও হাকামাদা (ঐধশধসধফধ ওধিড়) ছিলেন একজন সাবেক পেশাদার বক্সার। ১৯৩৬ মার্চ ১০ এই শহরেই জন্ম নেন এবং এই শহরের আলোবাতাসেই বেড়ে ওঠেন। একসময় চাকরি নেন শিজুওকা শহরের একটি সয়াবিন প্রক্রিয়াজাতকরণ কোম্পানিতে। সেখানে জাপানের প্রসিদ্ধ মিসো (বিন্ থেকে এক ধরনের পেস্ট, যা দিয়ে স্যুপ তৈরি করা হয়) উৎপাদন করা হয়ে থাকে।

১৯৬৬ সালে একই কোম্পানির নির্বাহী প্রধান, তার স্ত্রী এবং দুই কন্যাকে হত্যার অভিযোগে জাপান পুলিশ তাকে আটক করে। ৩০ জুন ১৯৬৬ সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে কোম্পানির ডরমেটরি তল্লাশিতে একটি পোশাকে রক্তের ছাপের সূত্র ধরে ১৬ আগস্ট ১৯৬৬ হাকামাদা পুলিশ কর্তৃক আটক হন।

পরবর্তীতে আদালতে তিনি তার দেয়া জবানবন্দী প্রত্যাহারের আবেদনও জানান। আবেদনপত্রে তিনি ২০ দিন রিমান্ডে, শারীরিক, মানসিক এবং অভুক্ত রাখার অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি বলেন, একদিন সর্বোচ্চ ১৭ ঘণ্টা অমানুষিক টর্চারের মাধ্যমে বলপূর্বক তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী নেন যা তিনি জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা এবং শারীরিক নির্যাতনের ভয়ে দিয়েছিলেন।

আদালত তার আবেদন নামঞ্জুর করে ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৬৮ মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। ১২ মে ১৯৭৬ টোকিও হাইকোর্ট রায় বহাল রাখেন এবং ১৯ নভেম্বর ১৯৮০ সর্বোচ্চ আদালত একই রায় বহাল রাখেন। ২৮ নভেম্বর তিনি আপিল করেন। ১২ ডিসেম্বর তা খারিজ হয়ে গেলে মৃত্যুদণ্ডাদেশ চূড়ান্ত হয়ে যায়। তার বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ ছিল। হত্যাকাণ্ড ঘটানো, পরবর্তীতে লুটপাট এবং বাড়িতে আগুন লাগানো। তিনটি অভিযোগই সর্বোচ্চ আদালত আমলে নেন।

২০ এপ্রিল ১৯৮১ তার আইনজীবী দণ্ড মওকুফের আবেদন করলে তাও খারিজ হয়ে যায়।

এরপর ৯ আগস্ট ১৯৯৪ আরেকবার মামলা পরিচালনা পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করা হয়। নিম্ন আদালত খারিজ করে দিলে উচ্চ আদালতে যাওয়া হয়। সেখানেও খারিজ হলে সর্বোচ্চ আদালতে গেলে ১ সেপ্টেম্বর ২০০৪ সালে দেশের সর্বোচ্চ আদালত তা খারিজ করে দিয়ে পূর্বে দেয়া রায় বহাল রাখেন। এভাবে মামলার নিষ্পত্তি করা হয়।

জাপানে মৃত্যুদণ্ড আইনি জটিলতার সূত্রে হাকামাদা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা সম্ভব না হওয়ায় এবং কিছুটা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এই সুযোগ নিয়ে তার আইনজীবী হাকামাদার মৃত্যুদণ্ডাদেশ বন্ধের নির্দেশ চেয়ে পুনরায় আদালতের দ্বারস্থ হন এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থাকেন। হাকামাদার বড় বোন হিদোকো হাকামাদা ৪৮ বছর ধরে তার ভাই নির্দোষ প্রমাণে নিরলস কাজ করে যেতে থাকেন।

হিদোকোর নিরলস প্রচেষ্টায় এবং আইনজীবীদের সহায়তায় মানবতার বিষয়টি আইন প্রণেতাদের দৃষ্টিতে আনতে সক্ষম হন। ২০ এপ্রিল ২০১০ জাপান পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ এবং নিম্নকক্ষের মোট ৫৭ জন সদস্য হাকামাদাকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য একটি টিম গঠন করেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির (উচঔ) উচ্চকক্ষের সদস্য গধশরহড় ঝবরংুঁ (সেইশু মাকিনো) আইন প্রণেতা সাপোর্টিং টিমের নেতৃত্ব দেন।

হাকামাদার সমর্থনে জাপান ফেডারেশন অব বার অ্যাসোসিয়েশন সোচ্চার হয় এবং পুলিশের তদন্ত ও আদালতে কেবল যুক্তির মাধ্যমেই তাকে দোষী প্রমাণ করা হয়েছে। হাকামাদা প্রকৃত খুনি নন এটাই আসল সত্য। তারা হাকামাদার মানসিক এবং শারীরিক অবস্থা মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকরের পরিপন্থী বলে দাবি করেন।

বিভিন্ন দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১১ তৎকালীন আইন ও বিচারমন্ত্রী চিবা কেইকো (কবরশড় ঈযরনধ) হাকামাদাসহ আরও কয়েকজনের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার আদেশ দেন। বিভিন্ন পরীক্ষা শেষে মেডিকেল টিম হাকামাদার স্বাস্থ্য মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকরের উপযুক্ত বলে জানান। সব সমস্যা দূর হয়ে যায় আদেশ কার্যকর করতে।

কিন্তু থেমে থাকেননি তার বোন হিদোকো, আইনজীবী কিংবা সাপোর্টিং দলগুলো। ১৯৬৬ সালে সংঘটিত মামলায় জব্দ করা আলামত (হাকামাদার ব্যবহৃত শার্ট এবং মৃতদের ৫টি বস্ত্র যা পরবর্তীতে একটি ট্রাঙ্ক থেকে উদ্ধার করা হয়ে থাকে) মৃত্যুদণ্ডাদেশের জন্য যথেষ্ট নয় বলে সোচ্চার হতে থাকেন। ১৯৮৫ সালে উঘঅ আবিষ্কার তাদের এই যুক্তির পথ বাতলে দেয়। অত্যাধুনিক উঘঅ পরীক্ষা করার জন্য তারা সোচ্চার হতে থাকেন।

তারই পরিপ্রেক্ষিতে উঘঅ পরীক্ষাতে পোশাকগুলোতে লেগে থাকা রক্ত হাকামাদার উঘঅ এর সঙ্গে মিল নেই বলে ২০১৩ নভেম্বরে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। যা ছিল মামলা পুনর্বিচারের জন্য হিকোদোর বড় অস্ত্র।

২০১১ এপ্রিলে আনা আবেদনে উঘঅ পরীক্ষা করার জন্য জোরালো আবেদন করা হয়েছিল। তারই পরিপ্রেক্ষিতে সিজুওকার একটি আদালতের বিচারক হাকামাদার মামলা পুনর্বিচারের রায় দিয়ে জামিন মঞ্জুর করেন।

শিজুওকা ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট বিচারক হিরোআকি মুরাইয়ামা (গঁৎধুধসধ ঐরৎড়ধশর) আদেশে বলেন, ১৯৬৬ সালে একটি সয়াবিন কারখানায় নৃশংসভাবে ছুরির আঘাতে সপরিবারে নিহত হন কারখানার নির্বাহী প্রধান। আইআরআইবি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাকামাদা ইওয়াও সেই সময় ওই কারখানায় কাজ করতেন। তবে এখন তার আইনজীবীরা আদালতের সামনে এ কথা প্রমাণ করতে পেরেছেন যে, ওই হত্যাকাণ্ডে ঘাতকের পোশাকে যার উঘঅ রয়েছে তিনি হাকামাদা ইওয়াও নন। এসব পোশাক এই মামলার আসামির নয়। এছাড়া তার নির্দোষ থাকার ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হাতে আসায় তাকে আর কারাগারে বন্দী রাখার কোনো যুক্তি নেই। তাই তাকে আপাতত মুক্তি দেয়া গেল।

১৯৬৬ সালে রায় ঘোষণায় ৩ জন বিচারক প্যানেলের জুনিয়র বিচারক কুমামোতো নোরিমিচি (কঁসধসড়ঃড় ঘড়ৎরসরপর) এখনও বেঁচে আছেন। তিনি বলেন, আমি কখনোই সন্দেহাতীতভাবে মানতে পারিনি। বিষয়টি আমার সিনিয়রকে জানাই। কিন্তু তিনি আমাকে ধমক দেন, চুপ থাকতে বলেন। বিষয়টি আমাকে এখনও পীড়া দেয়। আমি হাকামাদা এবং পরিবারের কাছে ক্ষমা চাই।

বিবাদী পক্ষের আইনজীবী নিশিজিমা কাৎসুহিকো (ঘরংযরলরসধ কধঃংঁযরশড়) আদালতের সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে বলেন, এই রায় ঐতিহাসিক এবং প্রত্যাশিত। এই রায়ে সত্যের পথে এক ধাপ এগিয়ে গেল।

যথারীতি বাদী পক্ষ এখনও কোনো মুখ খুলেননি। তবে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, এই রায় দুঃখজনক এবং অপ্রত্যাশিত। তিনি বলেন, প্রসিকিউশন টিম ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী করণীয় স্থির করা হবে। শিজুওকা পুলিশ এ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তারা বলেন, আদালত কী বলেছে এটা সম্পূর্ণই আদালতের ব্যাপার। আমাদের জানা নেই।

এদিকে বিষয়টি আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে। ২৭ মার্চ ২০১৪ হাকামাদা মুক্তি পাওয়ার পর নিহত নির্বাহী প্রধানের পরিবারের বেঁচে যাওয়া একমাত্র সন্তান (কন্যা) হাশিমোতো মাসাকোর ((গধংধশড় ঐধংরসড়ঃড়) মৃত্যু নিয়ে।

২৮ মার্চ ২০১৪ শুক্রবার অর্থাৎ একদিন পর হাশিমোতোর মৃতদেহ তার বাসায় পাওয়া যায়। রায় ঘোষণার পর নিকটাত্মীয় তার বাসায় ফোন করলে তাকে না পেয়ে ২৮ মার্চ সন্ধ্যা ৬টায় তার বাসায় আসলে তাকে মৃতাবস্থায় দেখতে পায়। তিনি স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন, নাকি আত্মহত্যা করেছেন তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন আলামতের ভিত্তিতে তিনি যে খুন হননি তা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এই সময় তার বয়স হয়েছিল ৬৭ বছর।

১৯৬৬ সালের ৩০ জুন যখন নির্বাহী প্রধান স্ত্রী ও এবং আরও ২ সন্তানসহ খুন হন এবং পরে তার বাসা আগুনে জ্বলতে থাকে তখন তার বড় কন্যা সন্তান মাসাকো বাড়িতে ছিলেন এবং তারই আর্তনাদে লোকজন ছুটে এসে আগুন নেভাতে সক্ষম হন। তারই বর্ণনা অনুযায়ী পুলিশ হাকামাদাকে আটক করতে সক্ষম হন এবং পরবর্তীতে হাকামাদার বাসা থেকে মৃতদের রক্তমাখা পোশাক (৫টি) আলামত হিসেবে জব্দ করা হয়। যে ছুরিটি জব্দ করা হয়েছিল তাও চার চারটি খুন করার মতো যথেষ্ট ছিল কিনা সন্দেহ ছিল। কিন্তু জাপান পুলিশ মাসাকোর বর্ণনা (দেখতে ভালো নয়, বক্সার জাতীয়, ৩০ ঊর্ধ্ব এক যুবক বর্ণনা) অনুযায়ী হাকামাদার পেছনে লাগে এবং একপর্যায়ে তার শার্টের রক্তের ছাপ চিহ্ন করে তাকে ধরতে সক্ষম হয়।
জাপানি জনগণ এখন যে প্রশ্নগুলো করছে তা হলো, এতগুলো খুন হলেও মাসাকো একা বেঁচে গেল কিভাবে? বাড়িতে আগুন লাগালো কারা? ভেতরে থেকেও সে কিভাবে অক্ষত ছিল? হাকামাদার বাসায় মৃতদের রক্তমাখা বস্ত্রগুলো গেলই-বা কিভাবে? তবে কি…?

তবে কি যাই হোক না কেন, খুনি হয়ত নিশ্চিত হওয়া যাবে, জাপান পুলিশ হয়ত ভুল স্বীকার করবে। হাকামাদা হয়ত বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ পাবেন। কিন্তু তার জীবনের ৪৮টি বছর কিভাবে ফিরিয়ে দেবে? কে ফিরিয়ে দেবে। ৪৮টি বছর তার জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সুনামি কি পূরণীয়? জাপানিরা তাই সোচ্চার হচ্ছে, মুখ খুলছে জাপান পুলিশ এবং আইনি প্রক্রিয়ার জন্য। তারা বলেন, পুলিশি রিমান্ড নামে পুলিশি নির্যাতনে অনেকেই মিথ্যা বলতে বাধ্য হন। বন্ধ করতে হবে এই ধরনের স্বীকারোক্তি আদায় পদ্ধতি। তাছাড়া অনেক সময় প্রভাবিত হয়েও পুলিশ কাজ করে থাকে।

মিডিয়াগুলোও বেশ সোচ্চার হচ্ছে। সবগুলো মিডিয়াই এখন হাকামাদার পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা বলছে আধুনিক প্রযুক্তিতে উঘঅ পরীক্ষা না করালে হয়ত হাকামাদাকে নির্দোষ হয়েই এই পৃথিবী থেকে চলে যেতে হতো। রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে খুন করা হতো বলা যেতে পারে।

৪৮ বছল বন্দী জীবন কাটানোতে হাকামাদা অনেকটাই শারীরিক এবং মানসিক চাপে রয়েছেন। ২৮ মার্চ টোকিওর হাসপাতালে চেকআপের জন্য তাকে নেয়া হয়। এই সময় চিকিৎসকগণ হাসপাতালে ভর্তি করানোর পরামর্শ দেন। তার দীর্ঘ সময় চিকিৎসা প্রয়োজন বলে চিকিৎসকরা জানান। ডায়াবেটিসজনিত কারণে কিছুটা স্মৃতিভ্রম নিজের ওপর কন্ট্রোল রাখতে না পারা তার দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। নিজ জেলায় গিয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। রায় ঘোষণার পর মুক্ত জীবনে টোকিওতে একটি হোটেলে তিনি একটি রাতযাপন করেন। তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হচ্ছেন বড় বোন হিদোকো এবং আইনজীবীরা। মিডিয়া তো লেগেই আছে। সঙ্গে আছে লাখো কোটি প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর।

রাহমান মনি, জাপান থেকে
rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক