পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা করাতে ব্যর্থ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

Policeইউএনওকে মারধর
নির্বাচন কমিশন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশের পরও পুলিশের একজন সহকারী উপপরিদর্শকের (এএসআই) বিরুদ্ধে মামলা নিচ্ছে না মুন্সিগঞ্জের পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান।

২৩ মার্চ উপজেলা নির্বাচনের দিন মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা এ টি এম মাহবুব-উল করিমকে ‘শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত, গালিগালাজ ও পিস্তল দেখিয়ে মেরে ফেলার হুমকি’ দেন লৌহজং থানার এএসআই মো. এমদাদ। তাঁর বিরুদ্ধে ‘সরকারি কাজে বাধা ও নির্বাচনী মালামালসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নষ্ট’ করার অভিযোগও আনা হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে গজারিয়া থানায়।

নির্বাচন কমিশন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসকের মধ্যে বিনিময় করা কয়েকটি চিঠিতে দেখা যায়, ইউএনওকে লাঞ্ছিত করার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো নির্দেশই মানেননি পুলিশ সপার। এএসআইয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ২৩ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পুলিশ) নাজিম উদ্দিন চৌধুরী পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেন। ২৪ মার্চ মন্ত্রণালয় চিঠি দিয়ে বিকেলের মধ্যে মামলা করে মন্ত্রণালয়কে জানানোর নির্দেশ দেয়। ২৫ মার্চ দুপুরে স্বরাষ্ট্র সচিবের একান্ত সচিব ফিরোজ সরকার মামলা গ্রহণের বিষয়ে পুনরায় কথা বলেন। ২৭ মার্চ মন্ত্রণালয় আবার পুলিশ সুপারকে চিঠি দেন মামলা নিতে। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো মামলা গ্রহণ করা হয়নি।

২৭ মার্চের চিঠিতে এসপিকে বলা হয়, ‘২৩ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পুলিশ) আপনাকে নির্দেশ দিয়েছেন। ২৫ মার্চ দুপুরে স্বরাষ্ট্রসচিবের একান্ত সচিব পুনরায় কথা বলেন। অদ্যাবধি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কিছুই অবহিত নয়।’

চিঠিতে বলা হয়, এ (ইউএনওর ওপর হামলা) ঘটনাটি ‘সরকারি কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনে বাধাদানসহ আঘাত করা ফৌজদারি অপরাধসংশ্লিষ্ট। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট আইনের প্রতিকার পাওয়ার অধিকারী বিধায় ঘটনাটির বিষয়ে মামলা রুজু হওয়া আবশ্যক’।

২৭ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো গোপন প্রতিবেদনে মুন্সিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাইফুল হাসান মামলা না নেওয়ার ঘটনাকে গুরুতর অসদাচরণ এবং সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে উল্লেখ করেন। চিঠিতে বলা হয়, উপজেলা নির্বাচনের মালামাল কেন্দ্রে পাঠানোর সময় এএসআই এমদাদ তাঁর পছন্দমতো গাড়ি না পেয়ে ইউএনওকে লাঞ্ছিত করেন। এর মূলে রয়েছে এসপি হাবিবুর রহমানের অদক্ষতা, দুর্বল প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রতি বিরূপ মনোভাব। এ কারণে কনিষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তারা বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে উৎসাহিত হচ্ছেন। তাঁর এমন মনোভাব ও কর্মকাণ্ড ভবিষ্যতে জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে প্রভাবক এবং সামাজিক নিরাপত্তা ও শান্তিশৃঙ্খলায় বিঘ্ন ঘটাতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে।

জেলা প্রশাসকের চিঠিতে এসপির বিরুদ্ধে ২০টি অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। বলা হয়, ২৩ মার্চ গজারিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বাউনিয়া ও বালুয়াকান্দি ইউনিয়নে নির্বাচনের (ইউপি) দিন, নির্বাচনের আগে ও পরে পুলিশি নজরদারি বাড়াতে পুলিশ সুপারকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কিন্তু তাঁর উদাসীনতা, অদক্ষতা ও দায়িত্বে অবহেলার কারণে বালুয়াকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান সামসুদ্দিন প্রধান সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হন। এর ফলে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হিসেবে এসপির এ ধরনের ধৃষ্টতা, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ অসদাচরণ হিসেবে শাস্তিযোগ্য অপরাধ’।

লাঞ্ছিত ইউএনও এম মাহবুব-উল করিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘শতাধিক লোকের সামনে আমার গায়ে হাতে তুলেছেন ওই এএসআই। আমি এর বিচার চাই। কিন্তু মামলা নিচ্ছে না।’

এএসআই মো. এমদাদ বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে কিসের ভিত্তিতে মামলা দেবে? পুলিশের তদন্তে আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘ইউএনও স্যারের সাথে আমার কিছুই হয়নি, সে আমাকে পরিচয় দেয়নি, তাই আমি চিনতে পারিনি।’

পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান গতকালই সাত দিনের ছুটিতে গেছেন। তাঁর দপ্তরের ও ব্যক্তিগত নম্বরে বারবার যোগাযোগ করা হলেও অভিযোগের বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে দায়িত্বপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জাকির হোসেন মজুমদার প্রথম আলোকে বলেন, তিনি সবেমাত্র এসপির দায়িত্ব নিয়েছেন। তাই পুরো বিষয়টি জানেন না। তবে তিনি নিশ্চিত করেন, ওই এএসআইয়ের বিরুদ্ধে এখনো মামলা হয়নি।

প্রথম আলো