ফিরে আসা, চলে যাওয়া – পূরবী বসু

‘তুমি কী খাবে? চা, কফি, কোক, হট চকোলেট, অরেঞ্জ জুস, দুধ_ যা চাও সবই আছে ঘরে। কী দেব, বল?’
ও ফিরে এসেছে। সাত সমুদ্দর তেরো নদী পার করে ছুটে এসেছে। ওকে আজ সর্বস্ব দিয়ে দিতে রাজি আমি। তবু যদি আমার ছেলেটা…।
ও হাসে। অবাক হয় না আমার কথা শুনে। অর্ধেক পৃথিবী ঘুরে এসেও, এইখানে এই ঘরে, চারদিকে পরিচিত সব কিছুর যথারীতি সম্ভার দেখে সে বিন্দুমাত্র চমকায় না। এমনটিই তো হবার কথা ছিল! এ বাড়ি না দেখলেও যে তার অতি চেনা! বাইরের ঘরের কোন কোনাটায় মেডিসিন কেবিনেট রয়েছে, কোথায় জরুরি কাগজপত্র রাখার লোহার ফাইল কেবিনেটটি দাঁড় করানো, সবই জানে সে। এই দ্বিতল বাড়ির প্রতিটি ঘরেরই ছবি আছে তার কাছে। বারান্দার লাল ইটগুলোর খানিক অসম আকার ও রঙ যে গঠনগত কোনো ত্রুটির সাক্ষ্য নয়, নান্দনিক দৃষ্টিকোণ থেকে সযত্নে বাছাই করেই সংগ্রহ করা হয়েছে_ অর্থাৎ সবটাই ইচ্ছাকৃত, সে খবরও তার জানা। সে জানত এখানে এলে তার প্রয়োজন হতে পারে তেমন কোনো কিছুরই অভাব হবে না এ ঘরে। রাত্রিতে এ বাড়ির গৃহকর্তা ও গৃহকর্মীর এক গ্গ্নাস গরম দুধ খেয়ে না শুলে যে শুধু ঘুমোতে যেতেই অসুবিধে হয় তাই নয়, পরদিন বাথরুমেও অনেক বেশি সময় কাটাতে হয় দু’জনকেই, এই অতি অন্তরঙ্গ পারিবারিক তথ্যটুকুও তার জানা। কিন্তু সে সব কোনো কিছুই সে বলবে না আজ এই বৃদ্ধ পিতা-মাতাকে।
‘এক গ্গ্নাস ঠাণ্ডা জল কেবল।’
বরফ দেওয়া জলের গ্গ্নাসটি ওর হাতে তুলে দিয়ে মুখোমুখি একটা গদি-দেয়া-মোড়া টেনে বসি। কমল, আমার একমাত্র সন্তানের পিতা, শুতে চলে গেছে অনেকক্ষণ। সে আবার অনেক সকালে ঘুম থেকে ওঠে।
‘প্রমিতের সঙ্গে কখন দেখা হতে পারে আমার?’ ও স্পষ্ট জানতে চায়। কোনো জড়তা নেই কণ্ঠে।
‘কাল দুপুরের আগে নয়। তোমার ব্যাপারে ওকে এখনও কিছু বলিনি। শকটা পুরোপুরি এখনও কাটিয়ে ওঠেনি সে। প্রাথমিকভাবে কীভাবে রিয়েক্ট করবে বুঝতে পারছি না আমরা। সকালে বেশ দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে ও। তারপর ওকে বলার কথা ভাবছি। নার্স বলে দিয়েছে দুপুরের আগে কোনো ভিজিটরকে সেখানে না যাবার জন্য।’
‘ভিজিটর!’ স্বগতোক্তির চেষ্টা থাকলেও শব্দটি অশ্রুত ছিল না।
আমি হাসি। ‘হ্যাঁ, আপাতত তোমাকে ভিজিটরের নিয়ম মেনেই চলতে হবে সেখানে। গত দু’মাসে ওকে তো দেখনি! আমরা প্রায় ওকে হারিয়েই ফেলেছিলাম। আমি আর কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নই।’
কথাটা বলেই মনে হলো, ইংরেজিতে বাক্যালাপ করতে গেলে শব্দ চয়নগুলোও কি রকম বিদঘুটে হয়ে যায়। কেবলই মনে হয়, ঠিক এই কথাটি আমি বলতে চাইনি, অথবা ঠিক এভাবে বলতে চাইনি। আমি কি আসলে আমার অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছি? ওর জীবনযুদ্ধে হৃত অথবা অবহেলায় খোয়ানো রাজ্য এত সহজে ফিরিয়ে দেব না বলে?
মেয়েটি আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট অনেক রাত করে আসে এখানে। ওকে বিমানবন্দর থেকে তুলে এনে সকলে মিলে হাত-পা ধুয়ে খাওয়া-দাওয়া সেরে এই তো সবে বসলাম একটু কথা বলতে। এরই ভেতর রাত সাড়ে বারোটা বেজে গেছে।
কয়েক মিনিট চুপচাপ কেটে যায় আমাদের। কোথা থেকে কি বলে শুরু করব কেউই বোধহয় ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। মাত্র ঘণ্টা দুয়েক আগে জীবনে প্রথম দেখা হলেও আমরা পরস্পরের অপরিচিত ছিলাম না। বহুবার ফোনে কথা হয়েছে। তা ছাড়া ছবি, ভিডিও, ই-মেইল, গ্রিটিং কার্ডের আদান-প্রদান তো ছিলই। আর ছিল প্রমিত, যে আমাদের_ আমার ও আমার স্বামীর যৌথ বেঁচে থাকা, গত সাড়ে তিন বছর ধরে যার সমস্ত হৃদয় ছেয়ে দিয়েছিল এই মেয়েটি।
আমরা, পৃথিবীর দুই প্রান্ত থেকে আসা প্রমিতের জীবনের সবচেয়ে নিকটতম দুই নারী, কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে পরস্পরের মুখের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে থাকি।
জিনসের প্যান্টের ওপর সাদা টি-শার্ট পরা মেয়েটি, যারা বাঁ দিকে সিঁথি করে আঁচড়ানো ঘাড় পর্যন্ত সোনালি চুল দীর্ঘ প্লেন যাত্রায় এখন কিঞ্চিৎ অবিন্যস্ত, আমার চোখের সামনে যে বসে আছে, তাকে দেখে মোটেও উড়নচণ্ডী মনে হয় না। কেমন নিরীহ ও দুঃখী দুঃখী চেহারা।
ও কোনো কথা বলছে না, গভীর কোনো ভাবনায় ডুবে আছে কে জানে! আমি তাই নিজেই শুরু করি কথা। তা না হলে রাত ভোর হয়ে যাবে, কিছুই জানা যাবে না, বলা হবে না।
‘তুমি প্রমিতকে কোনো কিছু না বলে ওভাবে হঠাৎ কেন বা কোথায় চলে গিয়েছিলে, সে সম্পর্কে আমি কিছুই জিজ্ঞেস করব না। শুধু বল আমায়, কেন আবার ফিরে এলে। দু’মাসের মধ্যেই, এত দূরে।’
মেয়েটি একটু চুপ করে থাকে। যে কথাগুলো কেবল তার প্রেমিককে একান্তে বলার জন্য প্রস্তুতি ছিল তার, সেই অতি ব্যক্তিগত কথাগুলো অন্য কারও কাছে প্রকাশ করা বড় সহজ নয়। বিশেষত সেই অন্য কেউ যখন ষাট বছরের এক বঙ্গ ললনা হয়। কিন্তু সে এটাও জানে, এটা বস্টন নয়, খোদ ঢাকা। এখানে নিভৃতি বা ব্যক্তিস্বাধীনতা পারিবারিক কল্যাণের নামে প্রতিমুহূর্তে খণ্ডিত হয়।
‘অনেক মানুষ তো দেখলাম জীবনে। সব দেখেশুনে মনে হলো, গভীরভাবে বুঝলাম, প্রমিতের মতো মানুষ হয় না। সত্যিকারের একজন ‘ডিসেন্ট ম্যান প্রমিত।’
‘একজন ডিসেন্ট ম্যানই কি পার্টনার হওয়ার জন্য যথেষ্ট?’
‘হয়তো নয়। কিন্তু একজন মানুষ ডিসেন্ট আর কম্প্যাশোনেট না হলে তার আর সব গুণ ঢাকা পড়ে যায়। অন্তত আমার চোখে।’
মেয়েটি জানায় তার আগে একবার বিয়ে হয়েছিল। পাঁচ বছরের একটি মেয়েও আছে তার, যা হয়তো আমরা জানি না। কিন্তু প্রমিত জানে। মেয়েটি থাকে তার প্রাক্তন স্বামীর কাছে। নিজের কাছে এনে রাখতে পারে না মেয়েকে যেহেতু সে এখনও ছাত্র এবং সন্তান লালন-পালনের জন্য কোনো রোজগার নেই। তার সেই আগের স্বামী পাগলের মতো ভালোবাসত তাকে। কিন্তু সব সময় এমন করে তাকে দখল করে রাখত যে, তাকে নিঃশ্বাস নেবার জন্যও জায়গা দিত না। তার সম্পূর্ণ সত্তাকে পরিপূর্ণভাবে গ্রাস করে নিয়েছিল সে। নিজের জন্য এক ফোঁটা ফাঁকা জায়গা ছিল না তার। তাই একদিন স্বামী, কন্যা ফেলে পালিয়েছে সে।
‘একটা কথা সরাসরি জিজ্ঞেস করি তোমায়। খোলামেলা ও সত্যিকার জবাব আশা করব।’
বলতেই আমার দেড় মাস আগের সেই তড়িঘড়ি করে আমেরিকা যাত্রার কথা মনে পড়ে। যার একমাত্র পুত্র অতিরিক্ত ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যা করতে ব্যর্থ হয়ে হাসপাতালের বিছানায় অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে আছে, তার পক্ষে এই পরম অনিশ্চয়তার সময় উড়োজাহাজে করে এত দীর্ঘ আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া সত্যিই খুব কষ্টকর, প্রায় অসহনীয়। কী পরিহাস। এত দিন পর যার জন্য ছুটে যাওয়া সেই দেশে, সে তখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করছে। আর তার বাসায় তার বিছানায় শুয়ে আমি তখন একা একা বিনিদ্র রাত কাটাচ্ছি। অবশ্য, আমি ওখানে যাবার দিন তিনেক পরেই ওর জ্ঞান ফিরে আসে। একটু সুস্থ হলেই ছেলেকে নিয়ে ঘরে ফিরব, এই আশায় আমি একটু একটু করে ওর ঘরের জিনিসপত্র গোছগাছ শুরু করি। আর তখনই এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রত্যাহিক জীবনে দরকারি কিছু দ্রব্য থেকে বুঝতে কষ্ট হয় না আমার, এ ঘরে লিজে কেবল প্রমিতের নাম লেখা থাকলে এখানে আরও একজন বাস করত_ অন্তত কিছুকালের জন্য। সেই গৃহসঙ্গীটি নারী_ দেশি শ্বেতকায়া এক নারী আমার পুত্রে ঘনিষ্ঠজন, যার কথা আমি জানি, যার সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে বহুবার। জানতাম না শুধু যে তারা একত্রে বসবাস করছে।
‘আমার ছেলের সঙ্গে বিছানায় তুমি কেমন থাকতে?’
আমি স্পষ্ট দেখি আক্ষরিক অর্থেই মেয়েটির ঠোঁট দুটো সাদা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ওর ছোট ছোট বুদ্ধিদীপ্ত চোখ দুটোর দৃষ্টি ফাঁকা।
‘মানে-আমার_ ‘যৌনতার বিষয়ে কথা বলতে একটি পশ্চিমী মেয়েরও এতটা সংকোচ থাকতে পারে ভাবিনি।’
আমি তখন নিজেই আবার বলি, তোমার কী মনে হতো, যা চেয়েছিলে, আশা করেছিলে, যেভাবে তা আসবে ভেবেছিলে সেভাবে তা ঘটল না? তখন তোমার কি খুব রাগ হতো ওর ওপর? শুধু শুধু ওকে গালমন্দ করতে তুমি?
‘প্রমিত এত কথা বলেছে আপনাকে?’
আমি হাসি।
‘তোমাদের কোনো কথা প্রমিত আমায় বলবে দূরে থাক, ওর সঙ্গে এ ধরনের বিষয়ে কোনোদিন-ই কোনো কথা হয়নি। তুমি জানো বাঙালি পরিবারে ওসব এখনও টাবু। এ পরিবারে তো বটেই।’
‘তাহলে এত কথা আপনি জানলেন কী করে? কিন্তু বিশ্বাস করুন, এই একটি ব্যাপার ছাড়া, হি ইজ জাস্ট পারফেক্ট। কোনো জায়গায় এক ফোঁটা অভিযোগ করার উপায় নেই। তাই তো সব ভেবেচিন্তে আবার ফিরে এলাম ওর কাছেই।’
‘না, তুমি ফিরে আসনি, অন্তত প্রমিত তাই জানবে। তুমি বুঝতে পারছ না, কিন্তু আমি জানি, ওকে তুমি যতই ভালোবাস না কেন, ওর প্রতি যতই অনুভূতি থাকুক না কেন তোমার, এই একটি কারণে বারে বারে তোমার বাইরের দিকে নজর পড়বে। কিন্তু কেন এমন হচ্ছে, বুঝতেও পারবে না সব সময়। কখনও কখনও হয়তো তুমি তোমার এই বাইরে নজর দেবার আগ্রহটাকে প্রশ্রয়ও দেবে না। কিন্তু তখন নিজে নিজে ভেতরে ভেতরে গুমড়ে মরবে।
কিন্তু ও যে সত্যি খুব ভালো মানুষ? এমন খোলা মন, উদার দৃষ্টি, দয়ার শরীর। ওর মতো আর কাউকে আমি পাইনি জীবনে। দোহাই আপনার, আমাকে ওর কাছে যেতে দিন।’
আমি কিন্তু বিন্দুমাত্র হেলে পড়ি না। গলে যাই না। আমি জানি এটা মস্ত বড় এক পরীক্ষা আমার জীবনে।
‘আজ থেকে ত্রিশ বছর পরও তুমি বা তোমরা পরস্পরের প্রতি একই রকম বোধ বজায় রাখতে পার, আর তখন যদি পরিস্থিতি অনুকূল থাকে, তোমরা তখন একত্রিত হয়ো। কিন্তু এখন এটা হয় না। হলেও টিকবে না। প্রমিত অনেক কষ্ট পেয়েছে তোমাকে হারিয়ে, জেনেশুনে ওর কষ্ট আমি আর বাড়াতে দেব না। আমি জানি, ফিরে এলেও তুমি আবার চলে যাবে, না গেলেও প্রমিতের ঘরে প্রমিতের জীবনে থেকেও থাকবে না। জানালা আর ঘুলঘুলি দিয়ে অনবরত বাইরের দিকে তাকাবে। মনের ভেতর কেন এত হাহাকার, কেন এত শূন্যতা, বাইরের আকর্ষণ কেন এত তীব্র বুঝতেও পারবে না সব সময়। তা ছাড়া তুমি সুন্দর, স্বাস্থ্যবতী একটি তরুণী। কারও জন্যই এত বড় স্বার্থ ত্যাগ তুমি করবে না_ আমার ছেলের জন্যও নয়। এটা করা উচিত নয়। জীবন তো একটাই।’
আমি একটু থামি। কাল সকালেই তুমি ফিরে যাও। প্রমিত জানতেই পারবে না তুমি এসেছিলে, যেমন সে আজও জানে না_ বুঝতেও পারে না কেন তুমি ওভাবে চলে গেলে।
ওকে বিমানবন্দরে তুলে দিয়ে ঘরে এসে দেখি, বারান্দায় গোলটেবিলের পাশে একটা চেয়ারে বসে চা খাচ্ছে কমল।
‘ও কোথায়? দেখতে পাচ্ছি না তো!’
‘চলে গেছে।’
‘চলে গেছে? কেন? এই যে বলল অনেক ভেবেচিন্তে ফিরে এসেছে? বলল, প্রমিতই তার পুরুষ বুঝে গেছে সে।’
‘ওটা দয়া। নেহায়েতই মায়া। ভালোবাসা নয়।’
‘দোষ কী তাতে? দয়া আর মায়া তো অনেক বেশি মৌলিক, অনেক বেশি গভীরে প্রোথিত, অনেক বেশি সলিড। দয়া আর মায়াই তো মানুষের সঙ্গে মানুষকে বেঁধে রাখে। ভালোবাসা কি রাখে? নাকি থাকে ভালোবাসা আজীবন?
আমি বলি, ‘আমি জানি না। কিন্তু আর যাই কর, প্রমিতকে ওর ফিরে আসার কথা বলো না কখনও। বারে বারে না গিয়ে একবারে চলে গেছে সে। কেউ যদি হাজারবার মরার আগে একবার ভালো করে বাঁচার চেষ্টা করে, তাকে বাঁচতে কি দেব না আমরা?

সমকাল