জাতীয়তাবাদের পরে, গণতন্ত্রের আগে

siceসিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: আমি বলতে চাচ্ছি, আমাদের এখানে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হয়েছে। সেই আন্দোলন ধারাবাহিকভাবেই হয়েছে। সেই আন্দোলনটার একটা চূড়ান্ত পরিণতি হচ্ছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। এই মুক্তিযুদ্ধ জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষার পরিপূরক। প্রথমে এই আন্দোলনটা ছিল স্বায়ত্তশাসিত। স্বায়ত্তশাসনের দাবিটা যখন ক্রমাগত প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না, তখন আন্দোলন প্রবল হচ্ছে। ফলে স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন শক্তিশালী হলো এবং স্বধীনতার কথাটা এর মধ্যে চলে এলো। তেমনই ১৯৭০ সালে যে নির্বাচন হলো, সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে রায়টা বেরিয়ে এলো, সে রায়টা ছিল স্বাধীনতার পক্ষে। এরপর স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। এর জন্য দায়ী হচ্ছে পাকিস্তানিরা। তারাই প্রথমে আক্রমণ করেছে। তখন বাঙালি প্রস্তুত ছিল না। বাঙালিকে বাধ্য হয়ে যুদ্ধ করতে হয়েছে।

কিন্তু এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতার চেয়েও বড় একটা আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠল। সেই আকাঙ্ক্ষাকে আমরা বলতে পারি মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। অর্থাৎ মুক্তির কথাটা এর আগে আমরা এভাবে বলতে পারিনি সমষ্টিগতভাবে, যেটা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা বলতে পারলাম। এবং এ জন্যই যুদ্ধটাকে মুক্তিযুদ্ধ বলা হয়। দেখা গেল যে জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষাটা ছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। সেই আকাঙ্ক্ষাটা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা এখানে ঔপনিবেশিকের মতো একটা শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিল। সেই শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদী সংগ্রাম চলছিল। কিন্তু এর মধ্যে জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষাটা যখন মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হলো, তখন এই আকাঙ্ক্ষাটা কেবল যে পুরনো শাসকদের বিদায় করে দেওয়া, তা নয়; এই আকাঙ্ক্ষাটা পরিণত হলো মুক্তির আকাঙ্ক্ষায়। এই মুক্তির আকাঙ্ক্ষাটা কী?

রাষ্ট্র ও সমাজকে গণতান্ত্রিক করা। রাষ্ট্র যখন পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, তখন আমরা একে স্বাধীন রাষ্ট্র বলব। কিন্তু সেই রাষ্ট্র যে গণতান্ত্রিক হবে, আপনাআপনি কিংবা স্বাভাবিকভাবে গণতান্ত্রিক হবে, এটা নিশ্চিত ছিল না। নিশ্চিত হওয়ার কথাও ছিল না। জাতীয়তাবাদীদের নেতৃত্বের লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতা অর্জন। তা আমরা করেছি। তবে এই অর্জনকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত করা পরবর্তী দায়িত্ব। আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি যে ব্রিটিশ আমলেও আমরা স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করলাম। সেই স্বাধীনতা পরিণত হলো ১৯৪৭ সালে। আমরা স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র বলে একটা রাষ্ট্র পেলাম। সেই রাষ্ট্রের মধ্যেও আমরা স্বাধীনতা পেলাম না। সে জন্য আমরা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করলাম। কিন্তু রাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে একই রকম রয়ে গেল। রাষ্ট্র পাকিস্তান আমলে যেমন ছিল, বাংলাদেশ আমলেও তেমনই রইল। রাষ্ট্র তারও আগে ব্রিটিশ আমলে যেমন ছিল, তারই ধারাবাহিকতায় প্রবহমান রয়েছে। আমরা অনেক ঘটনার মধ্যে দেখতে পাব যে ব্রিটিশ আমলে যে আইন ছিল, পাকিস্তান আমলে তা বদলায়নি। কিংবা পাকিস্তান আমলে যে আইন ছিল, বাংলাদেশ আমলেও তা বদলায়নি। যে প্রশাসন ব্যবস্থা ছিল, সেটাও বদলায়নি। এমনকি দেখা যাবে যে হাস্যকর হলেও সত্য, পাকিস্তান আমলে যারা আন্দোলন করেছে তাদের বিরুদ্ধে যে মামলা ছিল, আদালত সেই মামলাগুলো স্বাধীনতার পরও চালু রেখেছে।

এটা ছিল রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরও রাষ্ট্রদ্রোহের মামলাগুলো চালু রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ ধারাবাহিকভাবে এই ধারা চলে এসেছে ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বর্তমান বাংলাদেশে। কাজেই স্বাধীনতা যে একটা মৌলিক রাষ্ট্রের মৌলিক পরিবর্তন আনল, তা নয়; রাষ্ট্রের কাঠামো ও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ যে আদর্শ, সে আদর্শ অভিন্ন রয়ে গেল। তার আদর্শটা কী ছিল?

তার আদর্শটা ছিল পুঁজিবাদী আদর্শ। কাঠামোটা ছিল আমলাতান্ত্রিক কাঠামো। কাজেই একটা আমলাতান্ত্রিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র রয়ে গেল। বাংলাদেশে সেটা পরিবর্তন করে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ও বৈষম্যহীন সমাজে পরিণত করার তাগিদ ছিল আমাদের। কিন্তু আমরা সেটা করতে পারিনি। জাতীয়তাবাদী যে আন্দোলন, সেটা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মোটামুটি শেষ হয়ে গেছে। কেননা তারা দেশ স্বাধীন করেছে। এখন পরবর্তী যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, গণতান্ত্রিক রূপান্তরে বিশ্বাস করে রাষ্ট্রে ও সমাজে; তাদের দায়িত্ব ছিল মুক্তির আন্দোলন আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। মুক্তির সংগ্রাম সামনে নিয়ে যাওয়া ও মুক্তি অর্জন করা। এই মুক্তি মানে রাষ্ট্রকে বৈষম্যমুক্ত করা। যদি গণতান্ত্রিক সংজ্ঞার দিকে তাকাই তাহলে দেখব, যদিও নানা সংজ্ঞা রয়েছে- ‘গণতন্ত্র হচ্ছে এই রকমের একটা রাষ্ট্র, যেখানে মানুষে-মানুষে অধিকার ও সুযোগের সাম্য থাকবে।’

এখানে সাম্যটাই হচ্ছে মূলকথা। সে জন্যই ধর্মনিরপেক্ষতা লাগবে। সে জন্যই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রয়োজন। আগে যখন পাকিস্তান ছিল, সেই রাষ্ট্রের ভিত্তি ছিল দ্বিজাতিতত্ত্ব। সেখানে একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ ছিল। সেটাকে প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশ সৃষ্টি হলো। এই জাতীয়তাবাদ হচ্ছে ভাষাভিত্তিক। ভাষা আসলে শ্রেণীও মানে না, ধর্মও মানে না। ভাষা সর্বজনীন। কাজেই এই যে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, এটা প্রতিষ্ঠা করতে হলে কিন্তু সমাজকে রূপান্তর করার দরকার ছিল। রাষ্ট্রকে একেবারে রূপান্তর করার প্রয়োজন ছিল।

কেননা রাষ্ট্রের মধ্যে বৈষম্য ছিল। রাষ্ট্র সামাজিক যে বৈষম্য, সেই বৈষম্যই পাহারা দেয়। এবং সেই বৈষম্যই ধারণ করে। রাষ্ট্র এখনো সেই বৈষম্যই ধারণ করছে। সামাজিক বৈষম্য রয়েই গেছে। বাংলাদেশে আমরা যেটা দেখছি, গত ৪২ বছরে বৈষম্য আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এই বৈষম্য প্রতিষ্ঠিত ও গভীর হয়েছে। বিস্তারের দিক থেকেও বৈষম্য বৃদ্ধি পেয়েছে, গভীরতার দিক থেকেও বৃদ্ধি পেয়েছে। দেখা যায় যে এই বৈষম্য কেবল ধনী ও গরিবের মধ্যে বেড়েছে, তা নয়; ধনী ও গরিবের পার্থক্যটা আরো ব্যাপক হয়ে গেছে। এর প্রমাণ হলো, মধ্যবিত্ত শ্রেণী স্বাধীনতার জন্য আগাগোড়া সংগ্রাম করেছে, নেতৃত্ব দিয়েছে। জনগণ সঙ্গে থাকলেও নেতৃত্ব দিয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকেরা। এখন স্বাধীনতার পর তারা ক্রমাগত ভাগ হয়ে গেছে। একটা ভাগ ওপরে উঠে গেছে তথা ধনী হয়ে গেছে, যার সংখ্যা খুবই সামান্য।

বেশিসংখ্যক মধ্যবিত্ত নিচে নেমে গেছে। ফলে আগের মধ্যবিত্ত এখন আর নেই। মধ্যবিত্ত দ্বিখণ্ডিত হচ্ছে, একটা অংশ উচ্চবিত্ত হয়ে গেল। তারা শাসনক্ষমতা পেল। তারাই শাসকশ্রেণী হলো। আর নিম্নবিত্ত যারা, তারা নিচে নেমে গেল। মধ্যবিত্ত যারা, তারা উচ্চবিত্ত হতে চায়, কিন্তু তাদের অবস্থান এখন নিম্নবিত্ত। এর প্রমাণ আমরা শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে পাই। শিক্ষার যে তিন ধারা, সেটা শ্রেণীবিভাজন প্রমাণ করছে। এই শ্রেণীবিভাজন পাকিস্তান আমলেও ছিল। ব্রিটিশ আমলে এটা শুরু হয়েছে। ব্রিটিশরা তো এটাকে আরো পোক্ত করেছে। কিন্তু এই শ্রেণীবিভাজনটা আরো প্রকট হয়েছে এর প্রমাণ হলো তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা আরো বিস্তৃত হওয়া, আরো গভীর হওয়া।

এই তিন ধারা আগেও ছিল, তবে পার্থক্যটা এত বেশি ছিল না। শ্রেণীবিভাজনটাই এখন প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রেণীবিভাজনের কারণেই শিক্ষাব্যবস্থা এ রকম তিন ধারায় বিভক্ত হয়েছে। এই শিক্ষা তো সব জনগণকে একত্র করবে- সেটা পারছে না। বরং এই বৈষম্য আরো বৃদ্ধি করছে। আমরা যদি ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারি তাহলে আমাদের যে শক্তি সে শক্তি থাকবে না। বাস্তবতা হলো, এখন বিভাজনটা, বৈষম্যটা অনেক বেশি। এখানে আমাদের স্মরণ করতে হবে, পাকিস্তান রাষ্ট্রটা যে ভাঙল তার কারণ ছিল বৈষম্য। তখন দুই পাকিস্তানের মধ্যে বিরাট ভৌগোলিক দূরত্ব ছিল। ভৌগোলিক দূরত্বের চেয়েও বড় সত্য ছিল দুই অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য, আঞ্চলিক বৈষম্য। এই আঞ্চলিক বৈষম্যের কারণেই কিন্তু ভাঙল। এটাই প্রধান কারণ। যে বৈষম্য পূর্ববঙ্গের মানুষ সহ্য করতে পারছিল না।

তারা দেখল, পাকিস্তান হয়েছে, কিন্তু শোষণ চলছে। কারা করছে? পাঞ্জাবিরা। ওই বৈষম্যের বিরুদ্ধে একটা বিদ্রোহ হলো। রাষ্ট্র ভাঙল। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। এখন ওই আঞ্চলিক বৈষম্যটা নেই। এখন বাংলাদেশের ভেতরেই শ্রেণীবিভাজনটা আরো প্রকট হয়ে গেছে। এটিই হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা। এই শ্রেণীবিভাজনটা আমাদের দূর করতে হবে। এটা দূর না করলে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যই হচ্ছে সাম্য চাই। এই সাম্যটা আমরা আনতে পারিনি। সে জন্য জাতীয়তাবাদের পরের যে পদক্ষেপগুলো, সেই পদক্ষেপগুলো হচ্ছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য যে কাজগুলো করা দরকার, সে কাজগুলো আমরা করতে পারিনি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটা কাজ হচ্ছে রাজনৈতিক কাজ। আরেকটি কাজ হচ্ছে আন্দোলনের কাজ। যে আন্দোলন সমগ্র জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে। রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানা প্রতিষ্ঠা করবে। সেটা হয়নি। রাষ্ট্রের ওপর আছে শাসকশ্রেণীর মালিকানা।

কাজেই আমরা দেখছি, রাষ্ট্রের মালিকের বদল হয়েছে, কিন্তু মালিকানার নিয়ম বদল হয়নি। মালিকানার নিয়ম হচ্ছে যারা ধনী, তারা এই রাষ্ট্রের মালিক হবে, তারাই শাসক হবে। বদলটা হলো এই, পাঞ্জাবিদের জায়গায় আমরা বাঙালিদের দেখলাম। কিন্তু জনগণের ভাগ্য পরিবর্তন হলো না। আরেকটা জরুরি ব্যাপার হচ্ছে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে সামাজিক ভিত্তিটা তৈরি করতে হয়, তা আমরা পারিনি। আবার শিক্ষার কথাই বলছি। শিক্ষার ক্ষেত্রে মারাত্মক সত্যটা হচ্ছে, সাধারণ মানুষ যে শিক্ষা নিয়ে থাকে তারা হলো নিম্নবিত্ত ও দারিদ্র্য। তাদের যদি আমরা দেখি তাহলে দেখব, প্রাথমিক পর্যায়ে মাদ্রাসা শিক্ষা আছে একদিকে, প্রাথমিক শিক্ষা আছে একদিকে। এখন অধিকাংশ গ্রামে গেলে দেখা যাবে, সেখানে যদি তিনজন ছাত্রছাত্রী থাকে তাহলে দুজন যাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আর একজন মাদ্রাসায়।

এখন বিপদের জায়গাটা হচ্ছে, মাদ্রাসার ছেলেটা গ্রামে থেকে যাবে। প্রাথমিক শিক্ষা যারা পাচ্ছে তারা হয়তো গ্রামে থাকবে না। তারা হয়তো সুযোগ পাবে, বেরিয়ে আসবে। যে ছেলে মাদ্রাসায় গেছে দারিদ্র্যের কারণে, সে দারিদ্র্যের ওই বৃত্তের মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে। এই আবদ্ধ অবস্থায় দেখা যাবে সে কোনো কাজ পাবে না। কিন্তু সামাজিক পরিবেশ ও সমাজকে প্রভাবিত করবে। এবং ওখানে যদি কোনো জঙ্গি সংগঠন থাকে, তাহলে সেই জঙ্গি সংগঠনে যুক্ত হয়ে যাবে। কাজেই আমরা ওই ভিত্তিভূমিটা তৈরি করতে পারছি না। এর সঙ্গে যুক্ত আরেকটি সমস্যা হচ্ছে বেকারত্ব। এখন কর্মসংস্থানের যদি সুযোগ না হয় তাহলে মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত যে ছাত্র কাজ পাবে না তা নয়, কাজ পাচ্ছে না শিক্ষিত ছেলেও। পরিসংখ্যান নানা রকম পাওয়া যায়। বলা হয় যে শিক্ষিত লোকদের মধ্যে শতকরা ৪২ জন বেকার রয়ে গেছে। এই যুবকরা যদি বেকার থেকে যায় তারা কী করবে?

তারাও হয় হতাশ হবে, বসে পড়বে। তাদের মধ্যেও একটা বিক্ষোভ তৈরি হবে। তাদের মধ্যেও হয়তো অনেকেই জঙ্গি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবে। দুঃখের বিষয় হলো, ব্রিটিশ আমলে জাহাজে করে আমাদের সম্পদ পাচার হয়ে যেত। এরপর পাকিস্তান আমলে দেখলাম সম্পদ চলে যাচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে। এখন এই সম্পদ যাদের কাছে যাচ্ছে, তারা তা দেশে রাখছে না। তারা বিদেশে বাড়িঘর করছে। ছেলেমেয়েদের বিদেশে পড়াচ্ছে। তারা ভবিষ্যতে বিদেশে থাকার ব্যবস্থা করছে। যারা এখানে থাকছে, তারাও এটাকে উৎপাদনের খাতে বিনিয়োগ করছে না। বিনিয়োগ হচ্ছে বিলাসে, আবাসন তৈরিতে, অপচয়ে। শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি লাভ করেছে এটা সত্য।

এখন নারীদের শিক্ষা অভূতপূর্ব। আগে এত মেয়ে বিদ্যালয়ে যেত না। আবার অভ্যন্তরে দেখা যাবে যে নারীরা নিরাপদ নয়। শুধু ধর্ষণ নয়, গণধর্ষণ হচ্ছে। যৌন নির্যাতন হচ্ছে। পরিসংখ্যান বলছে, মেয়েদের ৮০ শতাংশ নানাভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। ঘরে, বাইরে, কর্মক্ষেত্রে। মেয়েরা একদিকে উন্নতি করছে। অনেক ভালো কাজ করছে। গার্মেন্ট শিল্পে তারা অনন্য কাজ করছে। কিন্তু সেখানেও তারা বঞ্চিত হচ্ছে। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, শ্রমিকদের যে অধিকার, সে অধিকার প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না। আবার দেখা যায়, কৃষি উন্নয়ন ও গ্রামীণ যে অর্থনীতি, তার মধ্যেও নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের অবদানও অনেক বড়, কিন্তু মেধার মূল্যায়ন হচ্ছে না। মেধা স্বীকৃতও নয়। কাজেই সমাজে বৈষম্য বাড়ছে।

এর ফলে সমাজে সহিংসতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এ জন্য এখন ছিনতাই, খুন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোও এসব কাজে আইনিভাবে-বেআইনিভাবে নির্যাতন করছে। অনেকে র‌্যাব-পুলিশের পরিচয়ে অন্যায় করছে। কাজেই একটা বিশৃঙ্খলার মধ্যে আছি। এই বিশৃঙ্খলা গণতন্ত্রের জন্য উপযোগী নয়। এই বিশৃঙ্খলাই প্রমাণ করে যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়নি। কাজেই আমরা জাতীয়তাবাদের পরের যে অর্জনটা, গণতন্ত্রের প্রস্তুত করার জন্য যে প্ল্যাটফর্ম, সেটা অর্জন করতে পারিনি। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা তো অনেক দূরের কথা। গণতন্ত্র তো ভোট দিয়ে হবে না। ভোট দিয়ে কোনো কাজই হয় না। এ জন্য দেখা যায় কখনো নির্বাচিত স্বৈরাচার আসে, আবার কখনো অনির্বাচিত স্বৈরাচার আসে। স্বৈরাচার থেকেই যায়। স্বৈরাচার যেখানে আছে, সেখানে তো গণতন্ত্র নেই। এখন আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, যারা দেশপ্রেমিক তাদের জনগণের সঙ্গে মিলে গণতন্ত্রের সংগ্রামে নেমে যেতে হবে। আমাদের কাজ হবে মুক্তির সেই সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

কালের কন্ঠ