গ্যারি জে. বাসের অসাধারণ গ্রন্থ

মফিদুল হক: সত্য বড় নিষ্ঠুর নির্মম এ আমরা জানি। অমোঘ সত্য বাক্যটিও আমরা প্রায়শ উচ্চারণ করে থাকি। কিন্তু সত্যের অমোঘ রূপ যে আমরা সবসময়ে নগদ লাভ করি সেটাও তো নয়। সত্য নিয়ে অনেক খেলা খেলতে পারেন ক্ষমতাবানরা, সত্য গোপন রাখতে তাদের পারঙ্গমতারও অন্ত নেই। একান্ত গোপন যদি না রাখা যায় তাহলে সত্যকে বিকৃত করা যায়, অর্ধসত্য দিয়ে আড়াল করা যায় আসল সত্য, এমনি কত পথই না রয়েছে সত্যের পথভ্রষ্টি ঘটাবার। তবে সত্যে আস্থা স্থাপন ছাড়া আমাদের তো আর কোন বিকল্প নেই। স্মরণ করতে হয় আব্রাহাম লিংকনের সেই উক্তি, ‘কিছু মানুষকে কিছু সময়ের জন্য বোকা বানানো যায়, তবে সকল মানুষকে সকল সময়ের জন্য বোকা করে রাখা যায় না।’ কিন্তু সেটা নিশ্চিত করতে সত্য-প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রামেরও প্রয়োজন হয়। কয়েক দশক কিংবা শতকও অনেক সময় লেগে যায়, তারপরও দেখা যায় সত্যের প্রতিষ্ঠা কোনভাবেই ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। যায় যে না, সেটা খুব ভালভাবে বোঝা গেল সম্প্রতি তথা ২০১৩ সালের শেষাশেষি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত গ্যারি জে. বাস প্রণীত গ্রন্থ ‘দি ব্লাড টেলিগ্রাম’ হাতে পেয়ে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ঘিরে প্রণীত এই গ্রন্থ যে আমেরিকার অগ্রণী প্রকাশনা-সংস্থা এ্যালফ্রেড নফ্ থেকে প্রকাশিত হয়েছে এর এক তাৎপর্য রয়েছে। আরও বড় কথা এই বইয়ের উপজীব্য একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হলেও এখানে মূলত আলোকপাত করা হয়েছে বাংলাদেশে গণহত্যা ও পাইকারি হারে নৃশংসতা চলাকালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তথা নিক্সন-কিসিঞ্জারের ভূমিকার ওপর। সেদিক দিয়ে বইয়ের উপ-শিরোনাম তাৎপর্যপূর্ণ, – ‘নিক্সন, কিসিঞ্জার, এ্যান্ড এ ফরগটেন জেনোসাইড।’

লেখক গ্যারি বাস অবশ্য মনে করেন, বাংলাদেশের গণহত্যা পশ্চিম দুনিয়ার জন্য হয়ে উঠেছে বিস্মৃত জেনোসাইড, কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের জন্য এটা ভুলে যাওয়া কষ্টকর। একাত্তরের চার দশকেরও পর বাংলাদেশের গণহত্যাকে ‘ফরগটেন জেনোসাইড’ বলার মধ্য দিয়ে বাস্তবতার স্বীকৃতি মিলছে। আবার এটাও লক্ষণীয়, কোন গণহত্যাকে যখন বলা হচ্ছে বিস্মৃত এবং মেলে ধরা হচ্ছে তার স্বরূপ তখন সেই গণহত্যা আর বিস্মৃত থাকছে না। বলা হয়ে থাকে যে, যখন কোন কিছু একবার জানা হয়ে যায় তখন তা আর বিস্মৃত থাকে না। বাংলাদেশের বিস্মৃত গণহত্যা নিয়ে গ্যারি জে. বাসের বইটিও সেই ভূমিকা পালন করবে। এই গ্রন্থ বিস্মৃত গণহত্যাকে ইতিহাসের কাতারে বিবেচিত গণহত্যায় পরিবর্তিত করতে ভূমিকা পালন করবে। এটা লক্ষণীয়, আর্চার ব্লাডের স্মৃতিচারণ গ্রন্থ ‘দি ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ’ প্রকাশিত হয়েছিল ২০০১ সালে ঢাকা থেকে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড কর্তৃক। কিন্তু সেই বই আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ কল্কে পায়নি হয়ত ঢাকার প্রকাশনা বলেই। আশা করা যায় নিউইয়র্কের নতুন প্রকাশনা ব্লাডের অতীত দুর্গতি দূর করবে।

বইয়ের শিরোনামায় যে ব্লাড টেলিগ্রামের উল্লেখ রয়েছে বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই ব্লাড কোন অপরিচিত ব্যক্তি নন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অঙ্গাঙ্গি অংশ এই মানুষটি, আর্চার কে. ব্লাড, ছিলেন ঢাকায় মার্কিন কনসাল জেনারেল এবং পাকিস্তানের রাজনীতি ও বাংলাদেশের মানুষের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত অধিকার অর্জনের আন্দোলন সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। একাত্তরের পঁচিশে মার্চ পাক-বাহিনীর নৃশংস হত্যাভিযানের একেবারে গোড়াতেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যা ঘটছে সেটা বর্বরতম জেনোসাইড, একটি জাতিগোষ্ঠীকে চিরতরে দমনে যথেচ্ছ সামরিক শক্তির ব্যবহার এবং জাতির মধ্যেকার হিন্দু জনগোষ্ঠী হয়েছে এই নিশ্চিহ্নকরণ অভিযানের বিশেষ লক্ষ্য। তিনি একের পর এক টেলিগ্রাম পাঠিয়ে মার্কিন প্রশাসনকে বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন করতে চেষ্টা করেন। ২৯ মার্চ ১৯৭১ ঢাকায় কূটনৈতিক দফতর ও মার্কিন উন্নয়ন সংস্থার কর্মীদের সম্মিলিত টেলিগ্রাম বার্তার শিরোনাম তিনি দেন ‘সিলেক্টিভ জেনোসাইড’ এবং নয় মাসের পাক-বর্বরতার জেনোসাইডাল স্বরূপের সেটাই প্রথম উল্লেখ। এর আরও দুই তাৎপর্যময় উল্লেখের মধ্যে রয়েছে জুন মাসে বিলেতের সানডে টাইমস পত্রিকার পুরো দুই পাতা জুড়ে প্রকাশিত এ্যান্থনি ম্যাসকারেনহাসের রিপোর্টের শিরোনাম ‘জেনোসাইড’, আর আগস্ট মাসে মুক্তিপ্রাপ্ত জহির রায়হানের অনন্য প্রামাণ্যচিত্রের নাম ‘স্টপ জেনোসাইড।’ আন্তর্জাতিক আইনে কোন ধরনের নৃশংসতা জেনোসাইড, কোনটি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ এবং কোনটি যুদ্ধাপরাধ তার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞায়ন রয়েছে। আগে আমরা সাধারণভাবে ‘যুদ্ধাপরাধ’ কথাটি ব্যবহার করতাম। এখন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচার-প্রক্রিয়ার সুবাদে, আমাদের গণমাধ্যম ও গণ-ব্যবহারে, গণহত্যা ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ অভিধার যথাযথ প্রয়োগ আমরা দেখি, পেশাদার কূটনীতিক হিসেবে ইতিহাস-সচেতন ছিলেন আর্চার কে. ব্লাড। তাই শব্দ-প্রয়োগে তাঁর ছিল কাক্সিক্ষত সচেতনতা এবং প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য প্রেরিত জরুরী ও গোপন তারবার্তায় এই সচেতনতা ছিল আরও প্রখর। তদুপরি এমনি অবস্থান গ্রহণ ছিল বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ। ব্লাড কূটনীতিক হিসেবে যে জায়গায় পৌঁছেছিলেন তাতে রাষ্ট্রদূত হিসেবে তাঁর পদোন্নতি প্রাপ্তি বিশেষ দূরবর্তী ছিল না। পেশাদার কূটনীতিকদের জন্য এটা বহু কাক্সিক্ষত পদ, অন্য দেশে নিজ রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করা। আর তাই পেশাগত জীবনে নিরাপদে চলার স্বাভাবিক প্রবণতা কোন দূষণীয় কিছু নয়। কিন্তু আর্চার কে. ব্লাড ঝুঁকি নিয়েছিলেন, নিয়েছিলেন বিবেকতাড়িত নৈতিক অবস্থান এবং যে গণহত্যা সূচিত হয়েছিল বাংলাদেশে সেই বাস্তবতা মেলে ধরে পাক সামরিক সরকারের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের নীতির পরিবর্তন তিনি চেয়েছিলেন।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন এবং তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার সেইসব বার্তার প্রতি কর্ণপাত করেননি। কী তাঁরা করেছিলেন তার সবিস্তার বিচার-বিবেচনা মিলবে গ্যারি বাসের গ্রন্থে। আরও মিলবে কেন নিক্সন-কিসিঞ্জার এমন আচরণ করেছিলেন সেই ভাষ্য। এর একদিকে রয়েছে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, চীনের সঙ্গে গোপন দূতিয়ালিতে প্রায় সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে যাওয়া কিসিঞ্জারের অধীরতা ও অস্থিরতা। সেই সঙ্গে রিচার্ড নিক্সনের পাকিস্তান-প্রীতি ও ভারত নিয়ে অসোয়াস্তি। তদুপরি গ্রন্থের যা বিশেষ পাওয়া তা হচ্ছে নয় মাসব্যাপী বাংলাদেশ সঙ্কতটকালে হেনরি কিসিঞ্জারের ব্যক্তিগত আচরণ ও অবস্থান। বিপুলায়তন তথ্য-ভা-ার নিয়ে কাজ করেছেন প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এই অধ্যাপক। প্রকাশিত বিভিন্ন বই বা জার্নাল তো রয়েছেই, তদুপরি তিনি দেখেছেন মার্কিন ও ভারতীয় বিভিন্ন আর্কাইভে সংগৃহীত সরকারী দলিল-দস্তাবেজ, ব্যক্তিগত কাগজপত্রের ফাইল ইত্যাদি। এর মধ্যে রিচার্ড নিক্সন ও হেনরি কিসিঞ্জারের ব্যক্তিগত কাগজপত্র ছাড়াও দেখার কিংবা বলা যায় শোনার সুযোগ করে নিয়েছেন তাদের কথোপকথনের টেপ। আরও দেখেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা পি. এন. হাকসারের ব্যক্তিগত নথিপত্র।

এই পরিশ্রমী ও অনুসন্ধানী তৎপরতার ফসল গ্যারি বাসের গ্রন্থ বাংলাদেশে বহুলভাবে পঠিত ও আলোচিত হওয়া দরকার। কেননা এই গ্রন্থ ইতিহাসের অনেক অজানা তথ্য-উদঘাটন করেছে, আর সেই ভিত্তিতে ঐতিহাসিক ঘটনার বিচার-বিশ্লেষণ ও পুনর্পাঠও হাজির করেছেন লেখক। তাঁর কতক উপলব্ধি বেশ আগ্রহোদ্দীপক। তিনি হেনরি কিসিঞ্জারের সাক্ষাতকার গ্রহণের জন্য বারংবার চেষ্টা করেছেন। এই অনুরোধে মার্কিন কূটনীতিক জগতের তথাকথিত প্রবাদপুরুষ কোন সাড়া দেননি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারী কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত নথিপত্র সংরক্ষণ বিশেষ গুরুত্ব পেলেও এবং সে দেশে তথ্য জানার অধিকার অতি পবিত্র হিসেবে গণ্য হলেও হেনরি কিসিঞ্জার লাইব্রেরি অব কংগ্রেসকে এমন চুক্তিতে আসতে বাধ্য করেছেন যে তাঁর ব্যবহৃত অনেক কাগজ তাঁর অনুমতি ছাড়া কাউকে দেখান যাবে না, তাঁর মৃত্যুর পাঁচ বছর পর এসব নথি উন্মুক্ত করা যেতে পারে। তাছাড়া হোয়াইট হাউস টেপের অনেক অংশ তাঁর নির্দেশে মুছে ফেলা হয়েছে। গ্যারি বাস এটাও লক্ষ্য করেছেন যে, কূটনীতিক জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে বিশালাকার বিভিন্ন গ্রন্থ লিখেছেন হেনরি কিসিঞ্জার, কিন্তু কোথাও তিনি বাংলাদেশের গণহত্যা ও তৎকালীন মার্কিন প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বিশেষ আলোচনা করেননি। কেন এই রাখঢাক তা বুঝতে সহায়ক হবে গ্যারি বাসের গ্রন্থ। শেষ বিচারে তিনি গণহত্যার দোসর হিসেবে ইতিহাসের কাঠগড়ার দিকে নিয়ে যেতে চেয়েছেন হেনরি কিসিঞ্জারকে। আর আমরা তো জানি, আন্তর্জাতিক অপরাধ আইনের সংজ্ঞানুযায়ী গণহত্যাকারী ও গণহত্যায় সহায়তাকারী উভয়ে সমভাবে অপরাধী এবং সমদ- তাঁদের প্রাপ্য।

সত্যের শক্তি ও ইতিহাসের বিচার মেলে ধরেছে গ্যারি বাসের গ্রন্থ। বাংলাদেশের মানুষের অভিবাদন তাঁর প্রাপ্য।

জনকন্ঠ