জন্ম শতবর্ষে সত্যেন দা স্মরণে

satten-senরণেশ মৈত্র: সেকালে কারাগার ছিল বামপন্থি রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের প্রায় স্থায়ী আবাসস্থল। সেই সূত্রে কারাগারগুলো, বিশেষ করে তৎকালীন ঢাকা ও রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগার দুটি পরিণত হয়েছিল মার্কসবাদীদের ব্যাপক মিলন কেন্দ্রে। আর সেই সুবাদে ওই দুটি কেন্দ্রীয় কারাগারে গড়ে উঠেছিল সমৃদ্ধ-পাঠাগার, দেশে আরও গোটা দুয়েক কেন্দ্রীয় কারাগার ছিল বটে কিন্তু সেগুলো সম্পর্কে কোন প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা না থাকায় তা নিয়ে কোন আলোচনার সুযোগ নেই।

আমি যে ৮/১০ দফায় কারারুদ্ধ হয়েছি তারই এক পর্যায়ে পাবনা জেলা কারাগার থেকে আমাকে প্রথমে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে এবং পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। দুবার এমনটি ঘটেছিল অর্থাৎ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে যাওয়ার সুযোগ ঘটেছিল। এরই এক দফায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ২৬ সেলে আমার পরিচয় ঘটে কমরেড সত্যেন সেনের সঙ্গে। সেটা ষাটের দশকের কথা। সত্যেন দার কথা তার আগেও শুনেছি। তার দু-একখানা বইও হাতে এসেছে কিন্তু সাক্ষাৎ পরিচয়ের সুযোগ তার আগে কদাপি পাইনি।

কিন্তু সাক্ষাৎ বা পরিচয় হলে কি হবে? বেশি কথাবার্তা বলা বা আলাপ-আলোচনা করায় তার সুযোগ কোথায়? ২৬ সেলের একটি সেলে সত্যেন দা থাকতেন। আমি অপর এক সেলে মতিন ভাইসহ (ভাষা মতিন) থাকতাম। সন্ধ্যায় লকআপ ভোরে খুলে দেয়া হতো। ভোরে ঘুম থেকে ওঠে হাত মুখ ধুয়ে কিছুটা হাঁটাহাঁটি করে স্নানাদি সেরে প্রাতঃরাশ সমাপ্তির পর নতুন সংবাদপত্রের অপেক্ষা। সংবাদপত্র বেশ অনেকগুলোই আসতথ তবে রীতিমতো ঈবহংড়ৎবফ হয়ে। অর্থাৎ কারা কর্তৃপক্ষ যে খবরগুলো রাজবন্দীদের জন্য আপত্তিকর মনে করতেন সেগুলো ঘন কালি দিয়ে লেপটে দিয়ে তবে পাঠাতেন। ওই সেন্সর প্রক্রিয়ার জন্য জেল গেটে দেরি হতোথ আমরা তাই পত্রিকা পেতে পেতে প্রায় দুপুরে বা তাড়াতাড়ি হলে এগারটার দিকে পেতাম। পত্রিকাগুলো পড়ার পর যার যার নিজস্ব লেখাপড়া বৈঠক, আলাপ-আলোচনা প্রভৃতি নানা ধরনের কাজে লিপ্ত হওয়া ছিল দৈনন্দিত কর্মসূচি। এভাবেই বছরের পর বছর জেল জীবন কাটাতে রাজবন্দীরা অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিলাম। এক নাগাড়ে পাঁচ বছর জেলে কাটানো অনেকের সঙ্গেই, পরিচয়ের সুযোগ ঘটেছে। এরা সবাই ইংরেজ আমলের বিপ্লবী। সত্যেন দা তাদেরই দলে।

২৬ সেলে আর যারা আমার আগে থেকেই আটক ছিলেনথ তাদের মধ্যে নগেন সরকার, অজয় রায় প্রমুখের কথা মনে আছে। কমিউনিটি বন্দীদের কাছে ষাটের দশকের ওই সময়টা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তখন চীন-রাশিয়ায় মতাদর্শীগত দ্বন্দ্ব তুঙ্গে উঠেছে পৃথিবীব্যাপী। পূর্ববঙ্গ তা থেকে বাদ থাকতে পারেনি। এখানে তোয়াহাশরদিন্দু দস্তিদারের নেতৃত্বে বাস্তত্মবাদী চিন্তা-ভাবনা সমর্থন করে এদেশের কমিউনিস্ট পার্টিরও তার প্রতি সমর্থন দেয়ার দাবি জানিয়ে একটা থিসিস প্রথমে কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির কাছে পাঠায়। কেন্দ্রীয় কমিটিতে আলোচনার পর অধিকাংশ ভোটে ওই থিসিস প্রত্যাখ্যাত হয় এবং রুল পার্টির লাইন গৃহীত হয়। তখন চীনপন্থিরা পার্টির সাধারণ সস্যদের মধ্যে বিলি করেন কিন্তু সেখানেও অধিকাংশ সমর্থন রুশপন্থার প্রতিই ছিল যদিও তরুণদের একটা বড় অংশ চীন পন্থায় আকৃষ্ট হয়ে পরে নকশাল সন্ত্রাসবাদী পথ বেছে নিয়ে অনেকেই মৃত্যুর কবলে পতিত হন।

সকালে ঘুম থেকে উঠেই হাত-মুখ ধুয়ে ছোট একটা টেবিল ও একটি চেয়ার কিছু কাগজ ও একটি কলম নিয়ে সত্যেন দা বসতেন লিখতে। অতিশয় হালকা পাতলা গড়ন, চোখে হাই পাওয়ার ভারী কাচের চশমা পরনে সাধারণ একটা ধুতি ও ফুল শার্ট আবার কখনও বা একটি পায়জামা ও ফুলশার্ট থাকত তার পরনে। অক্টোবর বিপ্লব দিবস, নববর্ষ ২১ ফেব্র“য়ারি প্রভৃতি বিশেষ দিনগুলোতে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা ছাড়া তাকে বড় একটা কোন অনুষ্ঠানে বৈঠকে বা আড্ডায় পাওয়া যেত না। তিনি শুধুই বসে লিখতেনথ যেন মুখস্থ কিছু লিখে চলেছেন অবিরাম। বাকস্বল্পতা ছিল সত্যেন দার বিশেষ বৈশিষ্ট্য।

কারাগারের বাইরের জীবনে সত্যেন দার কথা স্মরণে আনতে পারছি না। বস্তুত কোথাও আর তার সঙ্গে দেখা হয়নি। তার লেখা বেশ কয়েকটি আমার ব্যক্তিগত পাঠাগারকে সমৃদ্ধ করেছিল কিন্তু বই-পুস্তকের চিরশত্রু উই ও ইঁদুরের উৎপাতে এবং নানা সময়ের দীর্ঘ কারাগারের কারণে আরও বহু মূল্যবান বই-পুস্তকের সঙ্গে সেগুলোকে হারিয়েছি।

জীবনের এত হিসাবে সত্যেন সেন গ্রহণ করেছিলেন দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা এবং তার জন্য শ্রমিক-কৃষক মধ্যবিত্ত অধ্যুষিত এই দেশে যে ব্যাপক গণজাগরণের প্রয়োজনীয়তা তা তিনি মার্কসবাদ থেকে সম্যক ধারণা অর্জন করেন। বাস্তবে সেই গণজাগরণ সৃষ্টির লক্ষ্যে বহুমুখী কাজে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। তার লিখিত বিপুলসংখ্যক গ্রন্থে সেই জাগরণী বক্তব্যই তিনি বিপুল নৈপুণ্যের সঙ্গে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। সত্যেন দা তার লেখনীর মাধ্যমে শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়ে, সেই একাত্মতার অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়ে তাদের জীবনের দুঃখ, বেদনা, হাসি-কান্নার বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছেন। ঘরে বসে কল্পনা প্রসূত কোন ছবি আঁকতে দেখা যায়নি তাকে।

সত্যেন দার পৈতৃক বাড়ি ছিল সে কালের বিপুল ঐতিহ্যবাহী এবং ইতিহাসখ্যাত বিক্রমপুর যা আগে ছিল ঢাকা জেলার অন্তর্গত এবং এখন মুন্সীগঞ্জ জেলা হিসেবে পরিচিত। তবে বিক্রমপুরের একটা বড় অংশ পদ্মার ভাঙনে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। সেখানে ১৯০৭ সালের ২৮ মার্চ সত্যেন দা জন্মগ্রহণ করেন একটি অতি সম্ভ্রান্ত পরিবারে। তার পরিবারই ছিল প্রাথমিকভাবে তার সাহিত্যপ্রীতির প্রেরণা। আর রাজনীতিতে নামার প্রথম প্রেরণা তিনি পেয়েছিলেন ১৪ বছর বয়সে ১৯২১ সালে কংগ্রেসের একটি জনসভা থেকে। সেই থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী মনোভাব তার মধ্যে সক্রিয়ভাবে দানা বাঁধে।

পরবর্তীতে কৃষক আন্দোলন এবং কৃষক সমিতিতে যোগদান করেন সত্যেন সেন। ত্রিশের দশকে এসে তৎকালীন গোপন বিপ্লবী দল ‘যুগান্তর’ এর সঙ্গে যুক্ত হন এবং ১৯৩১ সালে ঘটে তার প্রথম কারাবরণ। তারই প্রেরণায় সত্যেন দার অনুরাগী স্কুলছাত্রী লীলা রায়ও ওই বিপ্লবী দলে যোগ দেন। এই বিপ্লবী মহিলা সত্যেন দার জীবনে বিশেষ স্থান দখল করেছিলেন। ওই সময়ে সত্যেন সেন ছিলেন কলেজের ছাত্র। আবার গ্রেফতার হন ১৯৩৩ সালে। এই দফায় একটানা ছয় বছর কারাবাসের পর ১৯৩৮ সালে মুক্তি লাভ করেন। এই দফায় যে দীর্ঘ সময় তিনি কারাজীবন ভোগ করলেন তার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেছিলেন সেখানে আরও বহুসংখ্যক প্রবীণ মার্কসবাদীর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা এবং মার্কসীয় তত্ত্ব আত্মস্থ করার কাজে পড়াশোনার আত্মনিয়োগের মাধ্যমে। মুক্তির পর ফিরে যান গ্রামে। সেখানে কৃষক সমিতি গড়ার কাজে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত হন। একই সঙ্গে ঢাকায়, নারায়ণগঞ্জের নানা কলকারখানায় শ্রমিকদেরও ট্রেড ইউনিয়নে সংগঠিত করার কাজে উদ্যোগী হন। বেছে নেন কঠোর বাস্তবতার জীবন সব আরাম-আয়েশ পরিত্যাগ করে। ইতোমধ্যেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছেন এবং পার্টি গঠনের লক্ষ্য নিয়ে শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন সংগঠনে অংশ নিয়েছেন।

এলো ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ যা পঞ্চাশের স্বল্পস্তর বলে ইতিহাসে পরিচিত। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ তখনও চলছিল। ইংরেজ শাসকদের কারসাজিতে ওই দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয় ৩০ থেকে ৫০ লাখ বাঙালি নরনারী-শিশু অনাহারে মৃত্যুবরণ করেন। এই দুর্ভিক্ষবিরোধী সংগ্রাম এবং ত্রাণ কাজেও সত্যেন দা নেমে পড়েন।

সম্ভবত মানুষের বেদনার এই চরম মুহূর্তে আরও বেশি বেশি করে জাগরণী গান, সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে তোলার আকুতি সত্যেন দার মনে গীভরভাবে দানা বেঁধেছিল। তাই তিনি সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও নেমে পড়েনথ গান সংস্কৃতির চেতনায় সমৃদ্ধ হয়ে। অনেক গান এই সময়ে তিনি রচনা করেন।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়তে থাকেথ একই সময়ে ভারত বর্ষজুড়ে স্বাধীনতা সংগ্রামও নতুন মাত্রা অর্জন করে। আর এই স্বাধীনতার লড়াইকে ছুরি মারার জন্য ওই সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটিশ শাসক, তাদের তাঁবেদার চরম প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের একটি ক্ষুদ্র সাম্প্রদায়িক অংশ ষড়যন্ত্র করে ভারতের বহু স্থানে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টি করে। তার বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াতে হয় সত্যেন দাকে।

দানা বাঁধল পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার। এ দাবি মুসলিম লীগের কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার যে উগ্র আবহ দাঙ্গা প্রভৃতির মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে তার পরিণতিতে বাংলার মুসলিম জনগোষ্ঠী ১৯৪৬-এর নির্বাচনে একবাক্যে মুসলিম লীগকে বিপুলভাবে বিজয়ী করে পাকিস্তানের পক্ষে রায় দেন। ব্যাপকভাবে দেশত্যাগ করতে শুরু করেন হিন্দুরা। বিক্রমপুর হিন্দু প্রধান বর্ধিষ্ণু এলাকা ছিলথ তাই দেশত্যাগের অভিঘাত বিক্রমপুরকেও আঘাত হানে। শুরু হয় কমিউনিস্ট নেতাকর্মীদের গ্রেফতার অভিযান। ১৯৪৯ এ পুনরায় গ্রেফতার হন সত্যেন দা বের হন ১৯৫৩ সালে ভাষা আন্দোলনের যথেষ্ট পরে। ভাষা আন্দোলন সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ব্যাপক আঘাত হানে দেশত্যাগও অতঃপর কিছুটা কমতে থাকে। কিন্তু সত্যেন দা বেরিয়ে দেখেন তার পরিবারের কেউ কেউ গ্রামের বহুসংখ্যক হিন্দু অধিবাসী চলে গেছেন দেশ ছেড়ে। ফলে তার বন্ধু কমরেড, বহু কর্মীকে হারিয়ে তিনি গভীর বেদনা অনুভব করেন। অনেকে তাকেও দেশত্যাগের পরামর্শ দিলে তিনি তাতে অসম্মতি জানিয়ে দেশে থেকেই শোষণ মুক্তির আন্দোলনে নানাভাবে আত্মনিয়োগের সাহস নেন নতুন করে।

সত্যেন দা এ সময়ে সাহিত্যকর্মে অনেক বেশি বেশি করে আত্মনিয়োগ করেন। কি বাইরে কি কারাগারে সর্বত্র তিনি অক্লান্ত সাহিত্য কর্মী, শুধু তাই ননথ তিনি দৈনিক সংবাদের একজন সহকারী সম্পাদকও। সেই সুবাদেও সাহিত্যসৃজন তার দৈনন্দিনই নয় শুধু প্রায় সার্বক্ষণিক কাজে পরিণত হয়। চোখের অবস্থা তার ছিল অত্যন্ত খারাপথ কিন্তু সত্যেন দা তাতে দমে থাকার লোক ছিলেন না। ফলে দৃষ্টিশক্তির হানিই ঘটেছে প্রতিদিন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সত্যেন দা তার অন্যতম সংগঠক হিসেবে ভারতে পাড়ি জমাতে বাধ্য হন। সেখানেও কর্মব্যস্ততা ছিল প্রচ-। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পরে পুনরায় দেশে ফিরে আসেন বিজয়ীরবেশে। এর আগেই ১৯৬৮ সালে সত্যেন দা গড়ে তোলেন তার দীর্ঘদিনের স্বপ্নের বিপ্লবী সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। এটা কোন শৌখিন বিনোদনমূলক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নয় বরং সুদীর্ঘ এবং ধারাবাহিক গণসংগ্রাম যা ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এ দেশের কর্মীরা তরুণ-তরুণীরা গড়ে তুলেছিল তার মর্মবাণীতে ধারণ করে তার সঙ্গে কৃষক-শ্রমিককে যুক্ত করে বিপ্লবী চেতনায় সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে শোষণমুক্ত কোটি সমাজব্যবস্থা, অসাম্প্রদায়িক ও সব সংকীর্ণতা-পশ্চাৎপদমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকারকে ধারণ করে তাকে অগ্রসর করে নেয়ার লক্ষ্যে গড়ে তুললেন উদীচী। মার্কসীয় সাহিত্যিক রণেশ দাশগুপ্ত তার সঙ্গী হন। সত্যেন দা উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। বিস্ময়কর ঘটনাটি হলো অচিরেই দেশের প্রতিটি জেলায় উদীচীর নানা শাখা-প্রশাখার বিস্তার ঘটে এবং উদীচী একটি জাতীয়ভিত্তিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের রূপ ধারণ করে।

আমার এখন মনে পড়ে পাবনার উদীচীর জন্মের ইতিকথা। বহুদিন থেকেই সংগঠনটি পাবনাতে গড়ে তোলার কথা ভাবছিলাম কিন্তু রাজনৈতিক কর্মকা-জনিত অত্যধিক ব্যস্ততা এবং বারবার কারাবরণ করতে হওয়ায় তা যেন কিছুতেই সম্ভব হয়ে উঠছিল না। দেশটা স্বাধীন হওয়ার পর ভেবেছিলামথ আর যাই হোক, জেলে যাওয়ার ব্যাপারটার ইতি ঘটল অতঃপর। কিন্তু না। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট আবার সেই পাকিস্তানি রাজনীতির ধারা ফিরিয়ে আনল সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকা-ের পরবর্তীতে। তাই স্রেফ একুশে ফেব্র“য়ারির ভোরে শহীদ মিনারে পুষ্পার্ঘ্য দেয়ার পর পরই ১৯৭৬ সালে আবার গ্রেফতার। ১৯৭৭-এর সেপ্টেম্বরে মুক্তি পেলাম। মুক্তির পর দেখি সংগীতশিল্পী নজরুল ইসলাম বুলবুল পাবনাতে বদলি হয়ে এসেছেন এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিতি অর্জন করেছেন। তার বাড়ি কোথায়, কি চাকরি করেন জানতাম না, পূর্বে পরিচয়ও ছিল না। একদিন কোথায় এক অনুষ্ঠানে পরিচয় এবং জানলাম তিনি উদীচী করতেন। বললাম, সুবিধামতো বাসায় দেখা করবেন। এলেন। কথাবার্তা হলো পাবনার উদীচীর শাখা গড়ে তোলা হবে। সমমনায় শিশু ও সংগঠকদের ডেকে ঠিকই তা গড়ে তোলা হলো। নজরুলকেই সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছিল। অল্পদিনের মধ্যেই উদীচী পাবনায় রীতিমতো নাম-ডাকওয়ালা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলো। সালটা ১৯৭৭ বলেই মনে পড়ে। অবশ্য নজরুল থাকতেই সংগঠনটির অভ্যস্ত যে, একটি বিরোধী গ্র“পের নানা চক্রান্ত শুরু হয় এবং কয়েক বছরের মধ্যেই তার ফলে উদীচী পাবনাতে তার গৌরবও হারিয়ে ফেলে। সেই দুঃখজনক অধ্যায়ের আজও পরিসমাপ্তি ঘটেনি বরং তার অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে পাবনাতে তার প্রায় অবলুপ্তিই ঘটে গেছে। পাবনার মানুষ এখন আর উদীচীর অস্তিত্বের ন্যূনতম সম্মানও পায় না। সত্যেন দার কাছে, বিপ্লবী আদর্শের কাছে ক্ষমা চাইতেই হয়থ আমরা তার গড়া সংগঠনটিকে পাবনায় সাজাতে ব্যর্থ হয়েছি। কিন্তু উদীচী অবশ্যই আবার নতুন উদ্যমে একদিন ভালো সংগঠকদের হাতে গড়ে উঠবেথ এ বিশ্বাস দৃঢ়ভাবেই মনে পোষণ করি।

যা হোক, সম্ভবত উদীচীই সত্যেন দার শ্রেষ্ঠতম কীর্তি। প্রগতির ধারা আজ বিশ্বব্যাপীই ক্ষীণ স্রোতে প্রভাবিত একদিন তাতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হবে পুনরায় সমাজতন্ত্রের জয়গানে বিশ্বের তরুণ সমাজ উদ্বুদ্ধ হবে সত্যেন দা সেদিন নতুন করে আমাদের চোখে ধরা দেবেন। সেটাই প্রত্যাশা।

বিপ্লবী সত্যেন সেনের জন্ম শতবার্ষিকী শুরু হলো। দেশব্যাপী বছরজুড়ে তা পালিত হোক-বিপ্লবের সুর সর্বত্র ধ্বনিত হোকথ এই কামনা এই-আকাক্সক্ষা রেখে নিবন্ধটির ইতি টানছি।

গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি সত্যেন দার অমর আত্মার প্রতি তার সৃষ্টি ও সৃজনশীলতার প্রতি।

সংবাদ