আওয়ামী লীগ দেশের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলেছে: খোকা

khokaমুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধুয়া তুলে আওয়ামী লীগ তথা বর্তমান অবৈধ সরকার দেশের অ¯িত্মত্বকেই বিপন্ন করে তুলেছে বলে মত্মব্য করেছেন বিএনপি নেতা ও ঢাকার সাবেক মেয়র বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা। টেলিফোনে সাপ্তাহিক আজকাল প্রতিনিধির সঙ্গে একাšত্ম আলাপচারিতায় তিনি আরও বলেন, এটা সত্যি যে, রাজনৈতিক দল হিসাবে আওয়ামী লীগ ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিল। কিন্তু আরেকটি দুঃখজনক সত্যি হলো, স্বাধীন বাংলাদেশে এই দলটির ভূমিকা বরাবরই অত্যšত্ম গণবিরোধী এবং স্বাধীনতার প্রকৃত চেতনার পরিপন্থী। পরমতের প্রতি কেবল অসহিষ্ণুতাই নয়, বরং যে কোনো উপায়ে হলে ভিন্নমতকে দমন করাই দলটির নীতি। এ রকম একটি দল আর যাই হোক, গণতন্ত্রের বন্ধু হতে পারে না। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান চেতনা ছিল দেশে অবাধ গণতন্ত্র ও মত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা। আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে তিনটি লক্ষ্য অর্জনের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো হলো ১. সাম্য, ২. মানবিক মর্যাদা এবং ৩. সামাজিক সুবিচার। কার্যত: এগুলোই হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, যা সংবিধানে সন্নিবেশিত রয়েছে। কিন্তু আজ এ বিষয়গুলোকে আড়ালে ঠেলে দিয়ে ব্যক্তি ও মহল বিশেষের ইচ্ছা-আকাঙ্খাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হিসাবে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা সমাজে এক ভয়ংকর বিদ্বেষপূর্ণ বিভক্তি সৃষ্টির নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে বর্তমানে যে সংঘাত-সহিসংতাপূর্ণ পরিবেশ এবং নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে, সে জন্য আওয়ামী লীগের এমন স্বৈরতান্ত্রিক নীতিই দায়ী।

বিএনপির ঢাকা মহানগরী শাখার আহবায়ক ও কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা বলেন, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক মতভিন্নতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকতেই পারে। কিন্তু কোনো ধরনের বিদ্বেষ কখনো গণতান্ত্রিক রাজনীতির উপাদান হতে পারে না। মহান মুক্তিযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষের জীবন ও অগণিত মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা যে বাংলাদেশ অর্জন করেছি, সেখানে বিদ্বেষ বা দমনের রাজনীতি কেউ আশা করেনি। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীনতার পর থেকেই আওয়ামী লীগ এদেশে তাদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। এ জন্য তখনকার সরকার সব ধরণের ভিন্নমতের প্রতি আক্রমণাত্বক ভূমিকা গ্রহণ করে। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় অসংখ্য বিরোধী নেতা-কর্মীকে। এক পর্যায়ে বাকশাল কায়েমের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে সরাসরি খুন করা হয়। নিষিদ্ধ হয়ে যায় অন্য সকল রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। সরকার সমর্থক চারটি পত্রিকা রেখে বাকি সকল সংবাদপত্র বন্ধ করে দেওয়ার মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কবর রচনা করা হয়। এসবই ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে চরম অপ্রত্যাশিত এক নির্মম বা¯ত্মবতা। নতুন প্রজন্মকে সেই ইতিহাস আজ আর জানতে দেওয়া হচ্ছে না। সর্বত্র বানোয়াট ইতিহাসের প্রপাগান্ডা চলছে। অত্যšত্ম পরিকল্পিতভাবে নতুন প্রজন্মকে বিভ্রাšত্ম করার অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে। কিন্তু সত্য কখনো চাপা থাকে না। আওয়ামী লীগের হšত্মারক চেহারা অতীতের মতোই আজও দেশবাসীর কাছে সম্পূর্ণরূপে পরিষ্কার। যে কারণে দেশের মানুষ আর এক মুহূর্তও এই দখলদার সরকারকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিএনপির সাফল্য-ব্যর্থতার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে সাদেক হোসেন খোকা বলেন, এদেশে বিএনপির আবির্ভাব ঘটেছে মূলত জনগণের আকাঙ্খার ফল হিসাবে। জাতির ঘোর অন্ধকারাচ্ছন্ন এক দুর্দিনে সিপাহী-জনতার মিলিত অভ্যূত্থানে নেতৃত্বের আসনে আসীন হয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। নিজের কোনো উচ্চাভিলাষ চরিতার্থ করার জন্য নয়, বরং দিশাহীন জাতিকে সঠিক পথে এগিয়ে নেওয়ার জন্যই সেদিন তিনি নেতৃত্ব গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে জনআকাঙ্খার ভিত্তিতে দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্লাটফরম হিসাবে জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসাবে বিএনপির আত্মপ্রকাশ ঘটে। তারপর থেকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে বিএনপিই এদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। এটা কেবল মুখের কথা নয়, অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে সেটার প্রমাণ মিলেছে। ষড়যন্ত্র ও কারচুপি ছাড়া কোনো সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনে বিএনপিকে হারানো অসম্ভব, এটা আজ প্রমাণিত সত্য। ১৯৯৬ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপিকে হারানো হয়েছে স্তুল কারচুপির মাধ্যমে। এই দুটি নির্বাচনে নানা ধরনের ষড়যন্ত্র ও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল। এসব অভিজ্ঞতার কারণে আওয়ামী লীগ ভাল করেই জানে যে, সুষ্ঠু ও স্বাভাবিক নির্বাচন হলে ক্ষমতায় যাওয়া দূরের কথা, তাদের অ¯িত্মত্বই বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। সে কারণেই তারা এখন ক্ষমতা জবরদখলের পথ বেছে নিয়েছে।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রশ্নে সাদেক হোসেন খোকা বলেন, বা¯ত্মবতা হলো গত ৫ জানুয়ারী দেশে কোনো নির্বাচন হয়নি। নিজেদের পাতানো একটি ষড়যন্ত্রমূলক প্রহসনকে তারা নির্বাচন হিসাবে দেখিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা ডাকাতি করেছে মাত্র। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটা অকল্পনীয় একটি ব্যাপার। বিরোধী দলের হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে হত্যা ও গুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ নেতাকে কারারূদ্ধ করে এবং লাখ লাখ মানুষকে মামলার জালে অবরূদ্ধ রেখে তারা এই নাটক মঞ্চস্থ করে। তাদের এই নির্লজ্জ ক্ষমতা জবরদখল গোটা দুনিয়ার কাছে এখন পরিষ্কার। এ কারণে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী প্রতিটি দেশ ও সংস্থা অবিলম্বে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ কোনোকিছুতেই কর্ণপাত করছে না। তারা নোংরা দলীয়করণের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূর্ণরূপে নিজেদের কব্জায় নিয়েছে। এতে রাষ্ট্রযন্ত্রের স্বাভাবিক আচরণ ধ্বংস হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বাত্মভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে একটি অবৈধ সরারকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার কাজে। এটা করতে গিয়ে সরকার এতোটাই বেপরোয়া ও ভয়ঙ্কর চেহারায় আবির্ভূত হয়েছে, যা অনেক ক্ষেত্রে অতীতের অনির্বাচিত স্বৈরাচারদেরও হার মানিয়েছে।

সরকার-বিরোধী আন্দোলনে বিএনপি তথা ১৯ দলীয় জোটের ব্যর্থতার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, এই আন্দোলনের কোনো ব্যর্থতা নেই। সরকারই তার অপকৌশলের অংশ হিসাবে এমন প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে দিচ্ছে। বা¯ত্মবতা হলো, বাংলাদেশের ইতিহাসে এতবড় গণআন্দোলন আর কখনো হয়নি। অবৈধ সরকারের বিদায়ের দাবিতে জনগণ গোটা দেশ দিনের পর দিন অচল করে রেখেছিল। কিন্তু দেখা গেছে যে, সরকার অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করে নিরীহ জনসাধারণের ওপর বৃষ্টির মতো গুলি ছুঁড়েছে। তাতে অসংখ্য মানুষ নিহত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আহত হয়ে এখনো হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। সরকার একদিকে মানুষকে রাজপথে নামতে উষ্কানি দিয়েছে। অন্যদিকে রা¯ত্মায় নামার পর মিছিলের ওপর গুলি চালিয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দল এমন ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, তা সভ্য দুনিয়ায় কল্পনা করাও মুশকিল। অথচ তারাই এখন অপপ্রচার করছে যে, বিরোধী দলের আন্দোলন ব্যর্থ হয়েছে। এই অপকৌশলের মাধ্যমে তারা বিএনপি ও ১৯ দলীয় জোটের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে চায়। কিন্তু তাদের এই অপপ্রায়স সফল হবে না।

সাদেক হোসেন খোকা প্রশ্ন রেখে বলেন, জনগণের আন্দোলন কি কখানো সশস্ত্র হয় ? নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ হিসাবে বিএনপি তথা ১৯ দলীয় জোট বরবারই শাšিত্মপূর্ণ কর্মসূচি পালন করেছে। অথচ সরকার নিরস্ত্র জনগণের ওপর যুদ্ধাংদেহী কায়দায় সশস্ত্র হামলা চালিয়ে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছে। এরপর সেই হত্যাকান্ড নিয়ে হাসি-ঠাট্টা করছে। এসবের মাধ্যমে সরকার গৃহযুদ্ধের উষ্কানী দিচ্ছে কি না, সেটাই আজ বড় প্রশ্ন। সরকারের হত্যাকান্ডের জবাবে বিরোধী দল বা জনগণ তো পাল্টা হত্যার খেলায় মেতে উঠতে পারে না। বিএনপি একটি শাšিত্মপ্রিয় রাজনৈতিক দল হিসাবে বরাবরই শাšিত্মপূর্ণ উপায়ে আন্দোলন করেছে। এখানেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির মৌলিক পার্থক্য। তারা ক্ষমতায় গেলে যেমন আক্রমণাত্মক, তেমনি বিরোধী দলে থাকলেও ধ্বংসাত্মক। বিএনপি যদি আওয়ামী লীগের মতো ধ্বংসাত্মক রাজনীতির পথে পা বাড়ায়, তা হলে তো দুই দলের মধ্যে আদর্শগত ও নীতিগত কোনো পার্থক্য থাকবে না।

বর্তমান সরকারকে হঠাতে বিএনপির আন্দোলনের পরবর্তী কৌশল কি হবে, জানতে চাইলে অতীতের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের অন্যতম পুরোধা এই রাজনীতিক বলেন, এই সরকারকে বিদায় করতে বিরোধী দলের কোনো কৌশল তৈরীর প্রয়োজন হবে না। সরকার নিজেই নিজের করুণ বিদায়ের পথ রচনা করে চলেছে। চলমান উপজেলা নির্বাচনে সরকারের দানবীয় চেহারা আরেকবার দেখা গেছে। প্রতিটি উপজেলায় নিজেদের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে সরকার প্রকাশ্যে ভোট ডাকাতি করেছে। তারপরও বেশির ভাগ আসনে তাদের প্রার্থী হেরে গেছে। স্বাভাবিক নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা আদৌ কোনো উপজেলায় বিজয়ী হতো কিনা সেটা দেখার বিষয় ছিল। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ এখন অবৈধ সরকারের পতন চায়। সুতরাং এত মানুষের অসšেত্মাষের মুখে একটি অবৈধ সরকার যত চেষ্টাই করুক, টিকতে পারবে না। দেশের সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসাবে বিএনপির নেতৃত্বেই সরকার বিরোধী সফল গণঅভ্যূত্থান সৃষ্টি হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আজকাল