নিজের ভাগ্যের খবর রাখেন না তারা

hatdekhaঅন্যের ভাগ্যরেখা গণনা তাদের পেশা। কেউ হাত দেখে বলে দেন ভবিষ্যৎ। কেউ বা পাখির ঠোঁটে দেখেন অন্যের ভাগ্য। কেউ বা ভাগ্য গণনায় ব্যবহার করেন অন্য প্রাণী। অন্যের ভাগ্য নিয়ে যাদের ব্যবসা তারা নিজেরা জানেন না তাদের ভাগ্যে কি আছে। শুধু জানেন না যে তা নয়। বছরের পর বছর মানুষের ভাগ্য নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেলেও বদলাতে পারেননি নিজেদের ভাগ্য। তারা জৌতিষ, হস্তরেখাবিদ। প্রাতিষ্ঠানিক কোন শিক্ষা তাদের নেই। স্কুল-কলেজের গ-ি পেরোতে পারেননি তাদের অনেকে। নিজেকে পরিচয় দেন জোতিষী, হস্তরেখাবিদ, তাৎক্ষণিক রাশি বিচারকারী ও মনোবিজ্ঞানী হিসেবে। তারা বসেন রাস্তার পাশে বিভিন্ন ফুটপাতে।

আজ এখানে তো কাল ওখানে। কারও কারও সঙ্গে থাকে ভিজিটিং কার্ড। তাতে লেখা ‘যে কোন সহজ সমস্যা জৌতিষ শাস্ত্রীয় পরামর্শ ও গ্রহের রত্ন নির্বাচনে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার আলোকে পরামর্শ দিয়ে থাকি।’ সফলতা ইনশাল্লাহ। এসব জোতিষীরা টাকার বিনিময়ে বিচার করেন বিভিন্ন বয়সী নারী ও পুরুষের কুষ্টি, ঠিকুজি, যোটক বিচার ও সংখ্যাতত্ত্ব। রাজধানীর জিপিও, মহানগর নাট্যমঞ্চ, গোলাপশাহ মাজার, বঙ্গবাজার, গুলিস্তান চত্বর, শাহবাগ, ফার্মগেটসহ নানা জায়গায় এসব ভবিষ্যৎ বক্তাদের দেখা মেলে। প্রেমে ব্যর্থতা, মনের মানুষকে বশে আনা, বিদেশ গমন, বিয়ে, সংসারে অশান্তি, আর্থিক দুরবস্থা, শিক্ষা অর্জন, গুরুতর অসুস্থতা এমন কোন বিষয় নেই যার সমাধান তাদের জানা নেই।

সমস্যার ভবিষ্যদ্বাণী ও সমাধান দেন এক নিমিষে। সমস্যার সমাধানে দেন বাহারি রঙ ও ডিজাইনের পাথর। গুলিস্তান পার্কের ফুটপাতে প্রতিদিন ছোট একটা চৌকি নিয়ে বসেন জয়নাল আহমেদ। চৌকিতে সাজানো নানা রকমের জোতিষ শাস্ত্র ও বিদ্যার বই। সিলেটের বিয়ানীবাজারের উজানঢাকী গ্রামের জয়নাল নিজেকে পরিচয় দেন জোতিষী ও হস্তরেখাবিদ জে. আহমেদ নামে। কলেজের গ-ি না পেরোনো জয়নাল আহমেদ ফুটপাতে বসে প্রতিদিন অন্তত ৫ থেকে ১০ জনের হাতের রেখা দেখে ভবিষ্যদ্বাণী করেন। ম্যাগনিফ্লাইং গ্লাস (আতশী কাচ) দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ডান ও বাম হাতের রেখা দেখে বলে দেন ক্লায়েন্টের (তাদের ভাষায়) ভূত-ভবিষ্যৎ। এ জন্য ১০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ টাকা ফি নেন তিনি।

জটিল হতাশাগ্রস্তদের কাউকে কাউকে দেন নীলা, গোমেদ, পান্না, প্রবাল, পোখরাজ, ক্যাটস আই, আকিক নামের বাহারি পাথর। একেকটি পাথরের মূল্য রাখেন সর্বনিম্ন ৩০০ টাকা। কথা বললে জয়নাল আহমেদ জানান, গত ৭ বছর ধরে এই পেশায় আছেন তিনি। প্রতিদিন আয় হয় ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। লালবাগ এলাকায় স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে থাকেন ৮০০০ টাকায় ভাড়া করা বাসায়। লন্ডন থেকে চাচাতো ভাই প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা পাঠান। শুধুমাত্র হাত দেখা ও পাথর বিক্রির আয় দিয়ে চলা সম্ভব নয়। নিজের ভবিষ্যৎ কি? এমন প্রশ্নে বিব্রত জয়নাল বলেন, জীবনে আমার কোন চাওয়া-পাওয়া নেই। যেভাবে চলে যাচ্ছি এভাবেই চলে যাবো। সব আল্লার হাতে ছেড়ে দিয়েছি।
hatdekha
গুলিস্তান চত্বরের সামনের ফুটপাতে প্রতিদিন দু’টি টিয়া পাখি নিয়ে বসেন পঞ্চাশোর্ধ সাইফুল ইসলাম। সঙ্গে সোলেমানি খোয়াবনামা। ঢাকার অদূরে বিক্রমপুর (বর্তমান মুন্সীগঞ্জ) থেকে ২৫ বছর আগে ঢাকায় এসে এ পেশা শুরু করেছিলেন তিনি। প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন হস্তরেখাবিদ এক ফুফাতো ভাইয়ের কাছ থেকে। ভবিষ্যৎ বলার আগে মক্কেলের নাম, বয়স, জন্ম তারিখ, পেশা, শুভ রঙ, শুভ সংখ্যা যাচাই-বাছাই করেন। পোষা টিয়াকে আদেশ করেন মেঝেতে বিছানো রঙিন খাম তুলে নিতে। টিয়া কথা শুনে সাইফুল ইসলামের। বাঁকানো ঠোটে খাম তুলে ধরিয়ে দেয় তার হাতে। খাম খুলে সাইফুল ইসলাম মানুষের রাশি দেখেন। বলে দেন হতাশাগ্রস্ত মানুষের ভূত-ভবিষ্যৎ।

সাইফুল বলেন, মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ আমরা করি না। মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করেন সৃষ্টিকর্তা আর তার কর্ম। আমরা মক্কেলদের সেটিই বলি। তবুও তারা আসে। কেন আসে সেটা তারাই ভাল বোঝে। অ্যাস্ট্রোলজির বিভিন্ন বই দেখে টাকার বিনিময়ে আমরা মানুষের ভবিষ্যৎ বলি। ফুটপাতের একাধিক জোতিষী জানিয়েছেন, সব বয়স, শ্রেণী, পেশার মানুষেরা তাদের কাছে আসেন। তবে খুব হতাশাগ্রস্ত ও শৌখিন মক্কেলরা বেশি আসেন। কেউ কেউ আসেন বিনোদনের খোরাক নিতে। ভবিষ্যতে দুঃসময়ের কথা শোনালে অনেকেই মনে কষ্ট পান। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা শুনলে তারা আনন্দে উদ্বেলিত হন। খুশি হয়ে নির্ধারিত ফি’র বেশি বকশিশও দিয়ে যান।

তাই তারা সবসময় চেষ্টা করেন হাতের রেখা দেখে ভাল ভাল কথা শোনাতে। অনেকেই এসব বিশ্বাস করেন না। তারপরও তারা আসেন। হাত দেখান। ভবিষ্যৎ ও করণীয় নিয়ে জোতিষীর সঙ্গে পরামর্শ করেন বলে জানালেন জোতিষী শামসুল ইসলাম ওরফে এস ইসলাম। মহানগর নাট্যমঞ্চের সামনের ফুটপাতে বসেন শ্মশ্রূম-িত হস্তরেখাবিদ আতিকুর রহমান (৫৫)। গত ২০ বছর ধরে মানুষের হাত দেখে ভবিষ্যৎ বলছেন। কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎ এখনও পরিবর্তন হয়নি। আগে যেমন ছিলেন এখনও তাই আছে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন মানিকনগরে।

প্রতিদিন আয় হয় ২০০-৩০০ টাকা। কোনমতে বেঁচে আছেন। এই পেশায় তার গুরু রাজকুমার নামে এক জোতিষী ও হস্তরেখাবিশারদ। ক্লায়েন্টের নাম, বংশ, জন্ম তারিখ বলার সঙ্গে সঙ্গে আতিকুরের হাতের কাঠির শেষ প্রান্তে বসে পোষা মদনা পাখি। মেঝেতে রাখা খাম তুলে দেয় তার হাতে। খাম খুলে বিজ্ঞের মতো পড়ে যান আতিকুর। বলে দেন ক্লায়েন্টের জীবন যৌবনের সব খবর, করণীয় কি তা-ও। এ জন্য নেন ১০ টাকা। আতিকুরের কাছে থাকা বাহারি রঙের একটি খাম খুলে দেখা যায় তাতে লেখা ‘মনে দুঃখ রেখো না, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভ করো, যা ইহকাল ও পরকালে মঙ্গলের কারণ। অসহায় ও অনাথদের তত্ত্বাবধান করো। আল্লাহ তোমার ইচ্ছা পূরণ করবেন।’

আতিক জানান, অ্যাস্ট্রোলজির বই পড়ে তিনি শিখেছেন, হাতের বিভিন্ন রেখা শারীরিক সমস্যা, সম্পদ প্রাপ্তি নির্দেশ করে। মানুষের ভাগ্যও নির্ধারণ করে। এ ধরনের কাজ প্রতারণা কিনা এমন প্রশ্নে লজ্জিত আতিকুর বলেন, ভাগ্য পরিবর্তনের মালিক উপরওয়ালা। রিজিকের মালিকও তিনি। মানুষকে বলি আল্লার ওপর বিশ্বাস রাখতে। সৎ কর্ম করতে। দান করতে। ইহকাল ও পরকালের চিন্তা করতে। জীবনে যা করতে হবে তাই লেখা থাকে কাগজে। আমরা তো সত্য কথাই বলি। এতে প্রতারণার তো কিছু নেই।

মানবজমিন