আলু নিয়ে বিপাকে কৃষকরা

potato5মাঠ পর্যায়ে পাইকারের অভাবে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ার আলুচাষিরা। যথাসময়ে মৌসুমী ক্রেতা মাঠে না নামায় সুযোগ বুঝে কম দাম হাঁকছেন সুবিধাভোগী মধ্য স্বত্বভোগীরা। স্বচ্ছল কৃষকরা নিজেদের আলু হিমাগারে পাঠিয়ে দিলেও বিপদে পড়েছেন ঋণগ্রস্ত দরিদ্র কৃষক। পচনের আশঙ্কায় উৎপাদন খরচের চেয়ে কম মূল্যে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে। তবে এখনও জমিতে আলুর স্তুপ নিয়ে ভালো দামের অপেক্ষায় রয়েছেন কয়েক হাজার চাষি।

মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের তথ্যানুযায়ী, রোপন থেকে উত্তোলন পর্যন্ত এক বিঘা জমিতে আলুর উৎপাদন প্রায় ২৭ হাজার টাকা। বিঘাপ্রতি আলুর ফলন হয়েছে গড়ে ৭০ থেকে ৮০ মণ। উত্তোলন মৌসুমে প্রতিমণের বাজার দর পাওয়া গেছে ২৬০ টাকা। এই দামে আলু বিক্রি করলে বিঘাপ্রতি লোকসান হয় প্রায় ৭ হাজার টাকা।

গতবারের চেয়ে এবার আলুর ফলন কিছুটা কম হয়েছে উল্লেখ করে গজারিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শামসুল আলম জানান, এবার বিঘাপ্রতি গড়ে ৭০ থেকে ৭৫ মণ আলু উৎপাদিত হয়েছে। ভালো ফলন হলে বিঘাপ্রতি ১০০ মণ হয়। কৃষি অফিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, উপজেলায় মোট আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার ৯শ’ হেক্টর। চলতি বছর আলু উৎপাদন করা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৬শ’ হেক্টর (২০ হাজার বিঘা) জমিতে।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিঘাপ্রতি ৪০ বস্তা (৮০ মণ) আলু উৎপাদন হলে এবার গজারিয়ায় মোট উৎপাদন হয়েছে ৮ লাখ (১৬ লাখ মণ) বস্তা আলু। এদিকে গজারিয়ায় আলু সংরক্ষণের জন্য দুইটি হিমাগারে জায়গা রয়েছে মাত্র ১ লাখ ৯১ হাজার বস্তার।

এদিকে ব্যাংক থেকে স্বল্প মেয়াদি ঋণ নিয়ে কিংবা মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে অথবা মানুষের কাছে ধার-কর্য করে যেসব চাষি আলু উৎপাদন করেছেন, তারা ঋণের বোঝা থেকে মুক্তি পেতে জমিতেই আলু বিক্রি করে থাকেন। কারণ হিমাগারে আলু রাখতে গেলে বিঘাপ্রতি আরও ২৫ হাজার টাকা খরচ বেড়ে যায়। যা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। ফলে আশানুরূপ বাজার দর না পেলেও পচনের ভয়ে দ্রুত জমিতেই আলু বিক্রি করে দেয়াই তারা ভালো মনে করেন। নয়ত লোকসানের পরিমাণ আরও বেড়ে যেতে পারে।

ইমামপুর গ্রামের আলু চাষি মো. কবির নেকী বলেন, আলুতে এখন আর লাভ নাই। প্রতি বিঘা জমি এক বছরের জন্য নিতে লাগে ৫ হাজার টাকা, বিঘা প্রতি চাষে খরচ ৩ হাজার টাকা, বীজে ৮ হাজার, রোপনে সাড়ে ৩ হাজার, ওষুধ ও সেচে ২ হাজার, নিরানীতে যায় ২ হাজার এবং উত্তোলনে খরচ প্রায় দেড় হাজার টাকা। সবমিলে গড়ে বিঘা প্রতি আলুতে খরচ দাঁড়ায় প্রায় ২৫ হাজার টাকা। এবার বিক্রিয় মূল্য হিসেবে বিঘা প্রতি লোকসান হবে অন্তত ৬ হাজার টাকা। কবির জানান, তিনি ২৮ বিঘা আলু চাষ করেছেন। টাকার প্রয়োজনে ১০ বিঘার আলু প্রায় ৯০ হাজার টাকা লোকসানে বিক্রি করেছেন। ১৮ বিঘার আলু হিমাগারে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

একই অবস্থা বড়ভাটের চরের আলুচাষি মজনু, আলী হোসেন এবং আলী মিয়ার। তারা যথাক্রমে ১৮, ১২ এবং ১২ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। প্রায় লাখ টাকার লোকসানে পড়েছেন তারা।

এদিকে এখনও গজারিয়ার হিমাগার দুটিতে পর্যাপ্ত আলু এসে পৌঁছায়নি। বোগদাদিয়া কোল্ডস্টোরেজের ব্যবস্থাপক মো. আবদুল হাফিজ জানান, হিমাগারটিতে প্রায় ৭৬ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করা যায়। এবার প্রতি বস্তায় ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬০ টাকা। মেঘনা মাল্টিপারপাস হিমাগারের ব্যবস্থাপক জাবের মিয়াজী জানান, তাদের ধারণ ক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার বস্তা। ভাড়া বস্তা প্রতি ৩৬০ টাকা। এখনও কোটা পূরণ না হলেও শীঘ্রই পূরণ হয়ে যাবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন উভয় ব্যবস্থাপক।

সরকার ধানের মতো আলু কেনার উদ্যোগ গ্রহণ করলে দরিদ্র চাষিরা এই দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পাবে বলে মন্তব্য করেছেন সুশীল সমাজ। এ বিষয়ে সরকারকে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন অনেকে।

সংবাদ