জাপানে বাংলা সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা : মঞ্চ মাতালেন নাট্যকেন্দ্র ঢাকা

moniJapan3eরাহমান মনি
দীর্ঘ প্রায় দুই যুগ পরে জাপান প্রবাসীরা মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা উপভোগ করল। এই সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার মূল আকর্ষণ ছিল মঞ্চ নাটক। মঞ্চ নাটক পরিবেশন করে নাট্যকেন্দ্র ঢাকা।

২ মার্চ রোববার রাজধানী টোকিওর সন্নিকটে সাইতামার ওরাবি শিমিন কাইকানে বাংলাদেশ কমিউনিটি জাপান-এর উদ্যোগে আয়োজিত বাংলা সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন, দূতাবাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ, সর্বস্তরের প্রবাসী নাগরিকবৃন্দ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন বিপুলসংখ্যক স্থানীয় জাপানি নাগরিকবৃন্দ, উপস্থিত ছিলেন ওকিনাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ইতায়া তোরু। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া সত্ত্বেও ওরাবি শিমিন কাইকান ছিল দর্শক পরিপূর্ণ। এই দিন সারাদিন বৃষ্টির পাশাপাশি সাইতামার কিছু কিছু এলাকায় তুষারপাত হয়।
moniJapan3e
শুভেচ্ছা বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত বিন মোমেন বলেন, জাপানে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, আঞ্চলিক এমনকি শিশু সংগঠনের মতো সংগঠন রয়েছে। কিন্তু কোনো নাট্যদল নেই। আমি যখন ইতালিতে ছিলাম তখন একটি নাট্যদল আত্মপ্রকাশ করে। বর্তমানে দুটি নাট্যদল রয়েছে সেখানে। জাপানেও আপনারা যদি কোনো নাট্যদল গঠন করেন তাহলে দূতাবাস সব ধরনের সহযোগিতা করবে। এ ছাড়াও শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বাংলা সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা আয়োজনের মূল সমন্বয়কারী মান্না চৌধুরী। উপস্থাপনায় ছিলেন কায়ো ইতো এবং নিয়াজ আহমেদ জুয়েল।

সংক্ষিপ্ত শুভেচ্ছা বক্তব্য শেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানকে দুইটি ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথম ভাগে ছিল বাংলা গান ও নাচ। নাট্যকেন্দ্র ঢাকার সদস্য ইউসুফ হাসান অর্ক, মনামী ইসলাম, সংগীতা চৌধুরী এবং সাদিকা ইয়াসমীন শান্তনা। বাদ্যযন্ত্রে ছিলেন স্থানীয় উত্তরণের মান্না চৌধুরী, জাহিদ চৌধুরী, যেরোম গোমেজ এবং বাচ্চু দত্ত।

একপর্যায়ে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয় নাট্যকেন্দ্র ঢাকা’র অন্যতম সদস্য, প্রযোজনা অধিকর্তা ঝুনা চৌধুরীকে। ঝুনা চৌধুরী আয়োজক সংশ্লিষ্ট, কলা-কুশলী এবং আগত দর্শক শ্রোতাদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানান এ সময়ের ছোট পর্দার অত্যন্ত ব্যস্ততম এবং দর্শকনন্দিত অভিনেতা মোশাররফ করিমকে। এ সময় বিপুল করতালির মাধ্যমে দর্শকরা মোশাররফ করিমকে স্বাগত জানান। মোশাররফ করিম তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিমায় দর্শকদের ভালোবাসার জবাব দেন।

মোশাররফ করিম নাট্যকেন্দ্রের সদস্য হয়ে প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সফরে এলেও মঞ্চ নাটকে অংশ না নিয়ে গান গেয়ে শোনান। জাপান প্রবাসী দর্শকরা এই দিন অভিনেতা মোশাররফকে গায়ক মোশাররফ হিসেবে আবিষ্কার করেন। দর্শকরা অবশ্য তার কাছ থেকে বিভিন্ন নাটকের সংলাপ শুনতে চেয়ে বারবার ব্যর্থ হয়েছেন।

মোশাররফ করিম পর্বের পর শুরু হয় মূল আকর্ষণ। মঞ্চ নাটক। ঢাকা থেকে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন নাট্যকেন্দ্র ঢাকা। যার নেতৃত্বে ছিলেন তারিক আনাম খান এবং ঝুনা চৌধুরীর মতো নাট্য ব্যক্তিত্ব। প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলেন মোশাররফ করিম, আরিক আনাম খান, লুসি তৃপ্তি গোমেজ, সাদিকা ইয়াসমীন শান্তনা, সাইফ আহমেদ, শরীফ হোসেন ইমন, ইউসুফ হাসান অর্ক, সংগীতা চৌধুরী, হাবীব মাসুদ, মনামী ইসলাম কনক, শহিদুল্লাহ সবুজ, রাকিবুল ইসলাম সোহাগ প্রমুখ।

ইতালীয় নাট্যকার কার্লো গোলদোনি রচিত ‘সার্ভেন্ট অব টু মাস্টার্স’ কমেডি নাটকটি অবলম্বনে নির্মিত ‘দুই যে ছিল এক চাকর’ নাটকটি মঞ্চস্থ হয় জাপানের ওরাবি শিমিন কাইকান মঞ্চে।

নাটকটির রূপান্তর ও নির্দেশনা দিয়েছেন বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের অগ্রদূত তারিক আনাম খান। নাটকটি কানাডার ওয়ান্ডারবোল্ট সার্কাস প্রোডাকশনের সম্পাদিত পাণ্ডুলিপি থেকে বাংলায় রূপান্তর করা হয়। এক যে ছিল দুই চাকর একটি কমেডি নাটক।

নাটক শেষে তারিক আনাম প্রতিনিধি দলের সব সদস্যকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় দর্শক গ্যালারি থেকে বাংলা সংস্কৃতিতে ভারতীয় আগ্রাসন সংক্রান্ত এক প্রশ্নের উত্তরে দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, বাংলাদেশ আমাদের, এই সংস্কৃতিও আমাদের, আমরাই তা রক্ষা করব। দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধ করে আমরা এ দেশ স্বাধীন করেছি। আমি নিজেও যুদ্ধ করেছি। মুক্তিযুদ্ধের ৯ নাম্বার সেক্টরে আমি যোদ্ধা ছিলাম। আমি জানি কিভাবে আমরা স্বাধীনতা এনেছি। ভারতীয় সংস্কৃতির কাছে বিকিয়ে দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

উল্লেখ্য, জাপান প্রবাসীদের প্রিয় ঝুনা চৌধুরী এবং তারিক আনাম খানের নেতৃত্বে জাপান প্রবাসী কমিউনিটির আমন্ত্রণে নাট্যকেন্দ্র ঢাকা ১৪ সদস্যবিশিষ্ট এক প্রতিনিধি দল ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত জাপান সফর করেন। এই সময় তারা মঞ্চ নাটক ছাড়াও জাপানের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান এবং প্রবাসী সংগঠনসমূহের দেয়া বিভিন্ন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। সার্বিক সমন্বয়ে ছিলেন ঝুনা চৌধুরীর অনুজ মান্না চৌধুরী।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক