মধু দা’কে ৫০০ টাকা দেওয়া হলো না

khokaঅাগুনঝরা মার্চ
সাদেক হোসেন খোকা: আজও চোখের সামনে ভাসে ১৯৭১-এর অগি্নঝরা মার্চের দিনগুলো। পাকিস্তানের শোষণ-শাসনের বিরুদ্ধে বাংলার আপামর জনগণ সংগ্রামমুখর। মনে পড়ে ২৪ মার্চের কথা। বিকাল ৪টার দিকে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক আট বছরের সাজাপ্রাপ্ত ছাত্র ইউনিয়ন নেতা রাশেদ খান মেননের সঙ্গে একটি জিপে করে নরসিংদীর শিবপুরে গেলাম। জিপটি আমি নিজেই ড্রাইভ করছিলাম। সেখানে যথারীতি মান্নান ভাইয়ের (বিএনপির সাবেক মহাসচিব প্রয়াত আবদুল মান্নান ভূঁইয়া) সঙ্গে দেখা হলো। সারা রাত কাটালাম শিবপুর আসাদ কলেজে। সাংগঠনিকসহ বিভিন্ন আলাপ-আলোচনা করলাম। পরদিন ২৫ মার্চ। দুপুরে মান্নান ভূঁইয়ার বাড়িতে ভাত খেয়ে ঢাকায় এসে পল্টনের সমাবেশে যোগ দেই। এটি ছিল পাকিস্তান শাসনামলের সর্বশেষ জনসভা। আয়োজন করেছিল কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটি। কাজী জাফর আহমদ, রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনোসহ সবাই উপস্থিত ছিলেন মঞ্চে। সভা শেষে মিছিল নিয়ে শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ করি। এর পর যাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে।

রাত ৮টার দিকে যাই মধুর ক্যান্টিনে। উলি্লখিত নেতৃবর্গ সবাই সঙ্গেই ছিলেন। কিন্তু পুরো বিশ্ববিদ্যালয় তথা ঢাকা শহরজুড়েই ছিল থমথমে ভাব। মধু দা জাফর ভাইয়ের উদ্দেশে বললেন- ভাই ঘন ঘন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও অস্থিতিশীলতার কারণে ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতি কম। ক্যান্টিন ভালো চলছে না। কর্মচারীদের বেতন পর্যন্তও দিতে পারছি না দুই সপ্তাহ ধরে। আমাকে ৫০০ টাকা দিতে হবে। জাফর ভাই টঙ্গীর একটি কারখানার ঠিকানা দিয়ে বললেন- ঠিক তিন দিন পরে বিকাল ৪টায় ওই কারখানার সামনে লোক পাঠিয়ে দিও, আমি ৫০০ টাকা দিয়ে দেব। কিন্তু সেই টাকা আর মধু দা’র নেওয়া হলো না। আর এটিই যে আমাদের সঙ্গে তার শেষ দেখা হবে সেটাই বা কে জানত? রাত সাড়ে ৯টার দিকে গোপীবাগে চলে আসি।

শহরজুড়ে থমথমে ভাব। ঢাকা যেন এক ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত হয়েছে। রাত ১০টার পরপরই শুরু হলো ভয়ানক হামলা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যরা একযোগে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালাল। আর বাঙালি পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা থ্রি নট থ্রি রাইফেল দিয়ে যতটুকু সম্ভব প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করলেন। অনেক পুলিশ ভাই-ই সেদিন শহীদ হলেন। আর আহত হলেন শত শত।

এদিক দিয়ে যারা কোনোমতে আসতে পারল আমরা চেষ্টা করেছি গোপীবাগসহ আশপাশের এলাকার বাড়িঘরে নিয়ে সেবা দিতে। আর তখন এই এলাকায় (গোপীবাগ) সর্বমোট বাড়ির সংখ্যা ছিল মাত্র ২৬টি। তবে গাছপালা ছিল অনেক। আমরা ২৫ মার্চ কালরাতে শহরের রাস্তাঘাটে বিভিন্ন রকমের ব্যারিকেড দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিছু কিছু স্থানে বোমা ফাটিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরিরও চেষ্টা করলাম।

কিন্তু তখন পর্যন্তও আমাদের বন্ধু-বান্ধবদের কারও মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে যুদ্ধ করার কোনো ধারণাই ছিল না। কিন্তু দূর থেকে যখন দেখলাম ভারী ভারী অস্ত্র থেকে গোলা ছুড়ে সবকিছু ছারখার করে দিতে বাধ্য হয়ে তখন পিছু হটলাম। ২৭ মার্চ দুপুরে মাত্র দুই ঘণ্টার জন্য কারফিউ তুলে নিল পাকিস্তানি সরকার। সঙ্গে সঙ্গেই একটি সাইকেল নিয়ে চলে গেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলের মাঠে ২৫ এবং ২৭ জন ছাত্রের লাশ পড়ে থাকতে দেখলাম। তখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে অনার্সের শেষ বর্ষের ছাত্র।

তখনো শামছুন্নাহার হলের নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। রোকেয়া হলে গিয়ে সিঁড়িজুড়ে রক্তের দাগ দেখলাম। বাথরুমে পিতলের জগ হাতে এক পিয়নের মৃতদেহ পড়ে আছে। এর পর গেলাম টিএসসির পেছনে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের কোয়ার্টারে। মধু দা’র বাসার মেঝেতে দেখলাম মধু দা, তার স্ত্রী ও সন্তানাদিসহ পাঁচজনের রক্তাক্ত লাশ পড়ে আছে।

সেখান থেকে হাটখোলা রোডে এসে দেখলাম ইত্তেফাক পত্রিকা অফিস পুড়ে ছাই। নারিন্দার গড়িয়া মঠের সাধুকে কপালের মাঝখানে গুলি করে হত্যা করে চলে যায় পাকিস্তানি বাহিনীর সদস্যরা। শাঁখারীবাজারসহ পুরান ঢাকার অধিকাংশ এলাকাতেই সব কিছু পুড়িয়ে ছারখার করে দেয় হানাদার বাহিনী।

এ বর্বরতা যখন চলতে থাকল তখন সপরিবারে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান গ্রামের বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের রেখে আমি একা আবারও ঢাকায় ফিরে এসে দুই বন্ধু রুহুল আমিন আর মাসুদুর রহমানকে নিয়ে আগরতলা সিকিম অফিসে চলে যাই মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিতে। সেখানে তৎকালীন মেজর হায়দারের নেতৃত্বে প্রশিক্ষণ নেই। প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে শহীদ জননী জাহানারা বেগমের ছেলে রুমীর সঙ্গে একটি ট্র্যাভেল ব্যাগের ওপর দুজনে মাথা রেখে টানা দুই সপ্তাহ ঘুমিয়েছি। কারণ সেখানে কোনো বালিশের সংস্থান ছিল না।

পরে ট্রেনিং শেষে সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে যুদ্ধে অংশ নিই। ক্যাপ্টেন গাফফারের অধীনে কুমিল্লার কসবা এলাকার সালনা নদীর তীরে পাকিস্তানি সেনাদের বাঙ্কারে আক্রমণই ছিল আমাদের গ্রুপের প্রথম অপারেশন। সেখানে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু গোপীবাগের জাকির হানাদার বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। মারাত্দকভাবে আহত হন মোস্তাক। পরে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনিও মারা যান। পরবর্তীতে একটি গ্রুপের কমান্ডার হয়ে ঢাকায় আসি পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপারেশন পরিচালনার জন্য।

লেখক : সাদেক হোসেন খোকা, বীরপ্রতীক- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভাইস চেয়ারম্যান, ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র। অনুলিখনে শফিউল আলম দোলন।

বাংলাদেশ প্রতিদিন