যেমন দেখেছি বাবাকে – অরুণ কুমার দে

maduDaএকাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে মধুদা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে সপরিবারে নিহত হন। সে দিন মধুর ক্যান্টিনের উপরও চালানো হয় ধ্বংসযজ্ঞ। কামানের গোলার আঘাতে জর্জরিত মধুর ক্যান্টিন পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে মধুদার পুত্র অরুণ কুমার দে পুনরায় মধুর ক্যান্টিনকে গতিময় করেন। পিতার মতো মানুষ সেবার নীতি ধারণ করে তিনি বর্তমানে এই ক্যান্টিন পরিচালনা করছেন।

পিতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, আবার পিতা আর দশজন পিতার মতো নয়। তিনি ছিলেন অনন্য সাধারণ একজন অভিভাবক। বাবা প্রতিদিন সকালে বড়দাকে (রনজিৎ) নিয়ে কলাভবন হয়ে ক্যান্টিনে আসতেন। পূজা-পার্বণ শেষে বসতেন ক্যাশ কাউন্টারে। অরুণ কুমার বলেন, ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি তিনি (মধুদা) সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন।

তৎকালে শাসক শ্রেণীর রোষানলের কারণে নেতারা আত্দগোপনে গেলে একমাত্র বাবাই জানতেন তাদের খবর। তিনি গোপন স্থানে খাবার পেঁৗছে দিতেন, নেতারা তাকে চিরকুট দিয়ে আন্দোলনের করণীয় নির্ধারণ করতেন। বাবার সঙ্গে রাজনীতিবিদদের ভালো সম্পর্ক এবং মধুর ক্যান্টিন তৎকালীন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় পাকিস্তানি বাহিনী এখানে হামলা চালায়। ২৫ মার্চ কালরাতে কামানের গোলায় দেয়ালগুলো ধসে পড়ে এবং টিনে শত শত ছিদ্র হয়ে যায়। তিনি বলেন, সে দিন ভোর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিববাড়ী আবাসিক এলাকায় আক্রমণ করা হয় আমাদের পরিবারের ওপর।maduDa

একে একে খুন করা হয় নব বিবাহিত বড়দা (মধুদার বড় ছেলে) রনজিৎ কুমার, বউদি (পুত্রবধূ) রিনা রানী এবং মাকে (মধুদার স্ত্রী যোগ মায়াদি)। এক ঘণ্টা পর তাকে (মধুদা) আহত অবস্থায় জগন্নাথ হলের মাঠে নিয়ে যায় পাকিস্তানি বাহিনী। সেখানে আর.সি দেবসহ অনেককে তার (মধুদা) সঙ্গে ব্রাশফায়ার করে পাকিস্তানিরা। পরে জগন্নাথ হলের গণকবরে সমাহিত করা হয় তাকে। তিনি বলেন, বাবা শহীদ হওয়ার সময় আমার বয়স ছিল মাত্র ১১ বছর। ছোটবেলায় চঞ্চলতার জন্য বাবা আমার সঙ্গে প্রায় রাগ করত। কিছুক্ষণ পর আবার আদর করে বুকে টেনে নিতেন।

৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের দিন আমি ক্যান্টিনে বাবার পাশে বসা ছিলাম। বাবাকে না বলে আমি হঠাৎ বেরিয়ে যাই। সে দিন ক্যাম্পাসে ছিল মানুষের ভিড়। বাবা আমাকে খুঁজতে চারদিকে লোক পাঠায়। অনেকক্ষণ পর তারা আমাকে নিয়ে আসে। এরপর বাবা আমাকে বকাঝকা করলে আমি হাউমাউ করে কান্নাকাটি শুরু করি। পরক্ষণেই তিনি আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন_ ‘কোথাও যেতে হলে বলে যেতে হয়।’

বাংলাদেশ প্রতিদিন

Leave a Reply