আমাদের প্রিয় ‘মধুদা’

maduDaঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক মধুর ক্যান্টিনের সঙ্গে যার নামটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত তিনি হচ্ছেন শহীদ মধুসূদন দত্ত বা সবার প্রিয় মধুদা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সবার চোখে তিনি ছিলেন বন্ধুসুলভ, সাহায্যপ্রবণ, কর্মনিষ্ঠ, সৎ ও বিশ্বাসী মানুষের প্রতিকৃৎ। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়ার আগে এখানে আদিত্য চন্দ নামের এক ব্যবসায়ী খাবারের ব্যবসা করত। আদিত্য চন্দের ছোট ছেলে ছিলেন মধুদা। তিনি ১৯৩৪-৩৫ সাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পিতার ব্যবসায় সাহায্য করতেন। পরে আদিত্য চন্দ একটি ক্যান্টিনের ব্যবসায় শুরু করেন (বর্তমান মধুর ক্যান্টিন)।

মধুদার পিতা একসময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে ক্যান্টিনের দায়িত্ব পড়ে তার ওপর। এ সময় মধুদার বয়স ছিল মাত্র ১২ বছর। দায়িত্ব নেওয়ার অল্পদিনের মধ্যেই বন্ধুসুলভ আচরণ ও আন্তরিকতার কারণে সবার কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন মধুদা। মধুদার সততার জন্য তিনি ছাত্র-শিক্ষকসহ সবার কাছে ছিলেন বিশ্বস্ত। মধুদা ছাত্রদের ‘স্যার’ এবং ছাত্রীদের ‘দিদিমণি’ বা ‘আপামণি’ বলে সম্বোধন করতেন। মধুদাকে কাছে থেকে দেখা একজন ডাকসুর সংগ্রাহক গোপাল দাস। মধুদার জীবদ্দশায় তিনি মধুর ক্যান্টিনে বয় হিসেবে কাজ করতেন। তিনি বলেন, মধুদার স্নেহ ভোলার নয়। তিনি সকালে এসেই আমরা নাস্তা করেছি কিনা খোঁজ নিতেন। তিনি আমাদের পড়াশোনার ব্যবস্থাও করেছিলেন। ছুটির দিনে তিনি আমাদের নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন। নানা গল্প বলে মুগ্ধ করতেন। বৈকালিক বিশ্রামে ক্যান্টিনের সামনে বসে গান করতেন মধুদা।

প্রতিষ্ঠা পর থেকেই মধুর ক্যান্টিনে উঠতি লেখক, নাট্যকার, সংগীতজ্ঞ, ক্রীড়াবিদ, সেরা ছাত্র, ছাত্র আন্দোলনের নেতা-কর্মীদের ভিড় ছিল সব সময়। তৎকালে অনেক ছাত্র অর্থসংকট নিয়ে রাজনীতি করত। তাদের অনেকেই খাবারের দাম মেটাতেন, কেউ কেউ বকেয়া খাতায় লিখে রাখতে বলতেন। মধুদার হিসাবের খাতাটি নিয়েও রঙ্গ-রসিকতার কমতি ছিল না। এমনি একটি খাতার শিরোনাম ছিল ‘না দিয়া উধাও’। ওই খাতায় এককালীন মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, শাহ আজিজ, শামসুর রাহমান, আহমদ ফজলুর রহমানসহ অনেক কৃতী ব্যক্তির নাম ছিল। ষাটের দশকের অনেক রাজনীতিবিদের নাম ছিল ওই খাতায়। তাদের মধ্যে মিজানুর রহমান শেলী, জিয়াউদ্দীন, কাজী জাফর আহমদ, মহীউদ্দীন, আতাউর রহমান কায়সার প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। মধুদা তাদের সবার সহায় হিসেবে কাজ করতেন। কারও বিপদে তিনি বিমুখ হতেন না। অকপটে বাড়িয়ে দিতেন সাহায্যের হাত। বিভিন্ন দল-মতের সংগঠন ও মানুষ থাকলেও মধুদা ছিলেন সবার।

বাংলাদেশ প্রতিদিন