ভাষা আন্দোলনে বিক্রমপুরের সক্রিয় অবদান

21ব্রিটিশ আমলে বিক্রমপুর:
এ উপমহাদেশের ইতিহাসে বিক্রমপুরের অবস্থান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ আমলে ইংরেজ বি্ক্রমপুরে তৎকালীন রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ও স্বদেশী কর্মীদের ভূমিকা ছিল ব্যাপক। বিক্রমপুরের সন্তান দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস একমাত্র বাঙালি যিনি বাংলার গণ্ডি পেরিয়ে সর্বভারতীয় নেতার সম্মান লাভে সক্ষম হয়েছিলেন। নিয়মতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমের ইংরেজদের কবল থেকে দেশ মাতৃকার মুক্তির জন্য তৎকালীন বিক্রমপুরের যুবকরা দলে দলে যোদ দিয়েছিলেন যুগান্তর ও অনুশীলন সমিতিতে। বিক্রমপুরের সর্বত্র গড়ে উঠেছিল বিভিনড়ব আখড়া-ক্লাব। সেখানে ব্রতচারী নৃত্য ও শরীর চর্চা শিক্ষা দানের আড়ালে সশস্ত্র প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ইংরেজদের নাস্তানাবুদ করার কৌশল শিখিয়ে যোগ্য যোদ্ধা ও বিপ−বী তৈরি করা হত।

ইতিহাস খ্যাত বাদল ও দীনেশ বিক্রমপুরের আড়িয়লের বিনোদ-এর অনুপ্রেরণায় বিপ−বী হয়ে উঠেন। শ্রীনগর থানার কেয়টখালির দ্বিজেন গাংগুলি ও লৌহজং থানার কুমারভোগ গ্রামের জিতেন ঘোষ ছিলেন দু’জন প্রখ্যাত বিপ্লবী। শ্রীনগর থানার দোগাছির হাজরা বাড়ি ছিল বিপ্লবীদের একটি অন্যতম আখড়া।


পাকিস্তান আমল (১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনা পর্বে):
১৯৪৭ সালে দ্বিজাতি তত্ত্বের রাজনীতির কাণে ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামক দু’টি রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। অবিভক্ত বাংলার পূর্ব অংশ যা পূর্ববঙ্গ নামে তখন পরিচিত ছিল তা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পূর্ববঙ্গ ও পরে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ নাম ধারণ করে। পাকিস্তান সৃষ্টির পরই রাষ্ট্রভাষা নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠতা মোহাম্মদ আলী জিনড়বাহ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুর পক্ষে অভিমত রাখেন। ঢাকায় তিনি ‘উর্দু রাষ্ট্রভাষা হবে’ বলার সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হয় ছাত্রদের প্রতিবাদ। ১৯৪৮ সালের মার্চের শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন নেতৃস্থানীয় ছাত্ররা বাংলা ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যমে ও কোর্ট কাছারির ভাষা কীভাবে করা যায় সম্বন্ধে চিন্তা-ভাবনা শুরু করেন।

এজন্যে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ২রা মার্চ, ১৯৪৮ বিকেলে ফজলুল হক হলে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতৃবৃন্দ ছাড়াও সে বৈঠকে বেশ কিছু সংখ্যক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মী যোগদান করেন। ভাষার প্রশেড়ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্দেশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত প্রথম সভায় সভাপতিত্ব করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ছাত্র কামরুদ্দীন আহমদ। যিনি শ্রীনগর থানার ষোলঘর গ্রামের বাসিন্দা। বিক্রমপুরের কৃতি সন্তানদের অন্যতম কামরুদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উক্ত সভায় একটি সংগ্রাম পরিষদ গঠন এবং শুধুমাত্র শিক্ষার বাহন বা কোর্ট-কাছারিতে বাংলা ভাষা ব্যবহারের দাবি না করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দানের জন্র দাবি করাই যুক্তিসঙ্গত বলে স্থির করা হয়। রাষ্ট্রভাষার দাবি থেকেই জন্মলাভ করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বীজ এবং এই বীজ বপনের লক্ষ্যে প্র ম যে সভা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ০২-০৩-৪৮ ইং তারিখে অনুষ্ঠিত হয় তাতে সভাপতিত্ব করার বিরল সুযোগ লাভ করেন বিμমপুরের সুসন্তান কামরুদ্দীন আহমদ।


উক্ত সভায় সিদ্ধান্ত মে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয় এবং ৭ই মার্চ ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট ও ১১ মার্চ বাংলার প্রতিটি স্থানে সাধারণ ধর্মঘটে আহ্বান জানানো হয়। এ কর্মসূচি অনুসারে রাষ্ট্রভাষা আন্দোন নেতৃত্ব দিতে গিয়েই ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক ও অলি আহমদসহ অন্যান্য কর্মী গ্রেফতার হন। সংগ্রাম পরিষদের আন্দোলনে ঢাকার রাজপথ ৩৪ দিন মিছিল ও বিক্ষোভে প্রকম্পিত হয়ে উঠে। ১৫‌ই মার্চ পূর্ববঙ্গ সরকার রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের ৮ দফা দাবি বিনা শর্তে মেনে নেন। চুক্তিপত্রে সরকার পক্ষে স্বাক্ষ্রর করেন মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন, সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে স্বাক্ষ্রর করেন কামরুদ্দীন আহমদ।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন পর্বেঃ
১৯৪৮ সালে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে আন্দোলনের যে সূচনা তা ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারিতে বিস্ফোরিত হয়। সে ইতিহাস আমাদের সকলেরই জানা। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির ভাসা আন্দোলনেও বিক্রমপুরের তৎকালিন শিক্ষক-ছাত্র-জনতা মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিতে বিক্রমপুরের যে সকল ছাত্র ঢাকা ১৪৪ ধারা অমান্য করে গ্রেফতার হয়ে কারাবরণ করেছিলেন তাঁদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র এম.এ. রশিদ (ঢাকা কলেজের সাবেক ইংরেজির অধ্যাপক, শ্রীনগর কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ) ও সেন্ট গ্রেগরি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্র শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন (সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী) অন্যতম।

ঢাকা কলেজের তৎকালীন আই. ক্লাসের পরীক্ষার্থী ও আজিমপুর কলোনী ছাত্র সংঘের অন্যতম সংগঠক ডঃ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (খ্যাতনামা অধ্যাপক ও লেখক) ভাষা আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারির মিছিলে বিμমপুরের আরো যারা অংশ নিয়েছিলেন তাঁরা হলেন জিতেন ঘোষ, অনিল মুখার্জী, অজয় রায়, ডাঃ এম.এ. কাদের, অজয় মুখার্জী, আহমেদ বাসেত, মাযহারুল সিদ্দিক ও সফিউদ্দিন আহমদ মফস্বল সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি) এদেরই কয়েকজন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে মুন্সিগঞ্জে এসে আন্দোলন চাঙ্গা করে তোলেন। মুন্সীগঞ্জ মহকুমা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে মহকুমার ৪৬টি হাইস্কুলে আন্দোলনের খবর তাঁরা পৌঁছে দেন এবং সর্বত্র মিছিলে নেতৃত্ব দেন সফিউদ্দিন আহমদ, নিজামউদ্দিন আহমদ (শহীদ সাংবাদিক) জিতেন, ঘোষ, অরুণ ব্যানার্জি, রাধেশ্যাম দাস ও শৈলেন ব্যানির্জ। তাঁদের আন্দোলনের ফলে বিμমপুরের সর্বত্র তখন একটি স্লোগানে মুখরিত ছিল। স্লোগানটি হল ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই − নুরুল আমিনের কল্লা চাই।

মুন্সীগঞ্জ বার লাইব্রেরিতে ভাষার দাবিতে এক সভা হয়। মুসলিম লীগের গুণ্ডারা এ সভায় হামলা চালায়। তাতে নিজামউদ্দিন আহমেদ মারাত্মকভাবে আহত হন। ঐ সভা থেকে ছাত্রনেতা অতীশ মুখার্জি, সফিউদ্দিন আহমদ, জরিহ উদ্দিন মিয়া ও আব্দুর রশিদকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। তাঁদের উপর নির্যাতন চালিয়ে পরে ছেড়ে দেয়া হয়।

সংগ্রহীতমুন্সিগঞ্জটাইমস