নয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সেবায় ইতিবাচক পরিবর্তন

ngশেখ মো. রতন: মুন্সীগঞ্জ শহরের উপকন্ঠ নয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সার্বিক সহযোগিতায় বিদ্যালয়ের সেবার মান ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। আজ সোমবার শহরের উপকন্ঠ নয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠ প্রাঙ্গণে সনাক-টিআইবি কর্তৃক পরিচালিত সিটিজেন রিপোর্ট কার্ড শীর্ষক জরিপের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে।

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক), মুন্সিগঞ্জ ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর যৌথ উদ্যোগে এবং জরিপটি নয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা ও সেবার অবস্থার ওপর গবেষণার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরার পাশাপাশি সেবার মানোন্নয়নে কিছু সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলার সহকারি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা জনাব সাকিনা বেগম। সনাকের সভাপতি খালেদা খানমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন টিআইবি’র রিসার্চ এ- পলিসি বিভাগের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. মনিরুল ইসলাম জাহিদ এবং গবেষণার উদ্দেশ্য ও প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন টিআইবি-র প্রোগ্রাম ম্যানেজার মো. রেজাউল করিম।

এ সময় অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন পঞ্চসার ইউনিয়নের সংরক্ষিত আসনের সদস্য লাভলী আক্তার রানী, নয়াগাঁও এলাকার জনগণ, বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিনিধি ও বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সনাক সদস্যরা।
ng
এই গবেষণায় তথ্যের সময়ব্যাপ্তি হলো এপ্রিল ২০১২ হতে মো ২০১৩ পর্যন্ত। জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ১৯ মে ২০১৩ থেকে ২১ মে ২০১৩ পর্যন্ত। তথ্য সংগ্রহের জন্য ৩০০ সেবাগ্রহীতার ওপর জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। তথ্য সংগ্রহের অন্যান্য পদ্ধতিগুলো হচ্ছে দলীয় আলোচনা, মুখ্য তথ্যদাতার সাক্ষাৎকার, প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য সংগ্রহ ও রিভিউ। জরিপকৃত তথ্যদাতাদের মধ্যে ৯২% ছিল নারী। ৪.৭% নিরক্ষর। তথ্যদাতাদের গড় বয়স ৩২ বছর। ৮০.৩% তথ্যদাতার পেশা গৃহিণী। জরিপের অন্তর্ভুক্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৫.০% ছিল ছাত্রী এবং ৪৫.০% ছাত্র। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্য খেলার মাঠ ছোট ও সীমানা প্রাচীর নিচু। খাবার পানির অভাব। বিদ্যালয়ে প্রায় ৫০ শতাংশ শিক্ষা উপকরণ ঘাটতি রয়েছে। ২০১২ সালের সমাপনী পরীক্ষায় পাশের হার শতভাগ। তবে কোনো শিক্ষার্থী এ বিদ্যালয় থেকে বৃত্তি পায় নি।

নয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মোট ১২টি খাতে বিভিন্ন মাত্রায় ফি আদায় করেছেন। নিয়ম বর্হিভূতভাবে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হতে ৬১.৪% শিক্ষার্থীকে গড়ে ২১.৩০ টাকা দিতে হয়েছে। অপরদিকে প্রথম শ্রেণির ১১.১% শিক্ষার্থীকে প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় ফি বাবদ ৫ টাকা থেকে ১৫ টাকা অতিরিক্ত প্রদান করতে হয়েছে। অনুরূপভাবে বিগত তিনটি পরীক্ষার ফি বাবদ গড়ে ২য় শ্রেণির (২৬.৩%), ৩য় শ্রেণির (২৯.৭%), ৪র্থ শ্রেণির (২৩.৪%) ও ৫ম শ্রেণির (১৬.০%) শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত ফি দিয়ে পরীক্ষায় অংশ গ্রহনের সুযোগ পেতে হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ২ টাকা থেকে ১৫ টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়েছে। এছাড়াও বই বিতরণ, চারুকারু ও শিক্ষা উপকরণ খেলাধুলা ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান, দপ্তরি/ক্লিনার, মেরামত বাবদ ইত্যাদি ক্ষেত্রে কিছু পরিমানে ফি প্রদানের প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। সার্বিকভাবে ৫ টাকা থেকে ১০০ টাকা প্রদান করতে হয়েছে।

অনুপস্থিতির জন্য জরিপের রেফারেন্স সময়ের মধ্যে ২৪.৬% ছাত্র-ছাত্রী উপবৃত্তির ৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা কম পেয়েছে। অভিভাবকগণ শিক্ষার্থীদের দিয়ে ক্লাসরুম ও মাঠ পরিষ্কার করানো পছন্দ করেন না। জরিপে দেখা যায় ৭৫% তথ্যদাতা জানান যে শিক্ষকগণ সব সময় সঠিক সময়ে বিদ্যালয়ে আসেন এবং সব সময় শিক্ষকগণ নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ক্লাসে অবস্থান করেন বলে জানিয়েছেন ৭২.৩% তথ্যদাতা। ক্লাস রুটিন অনুযায়ী পাঠদান করেন ৮৭.০% এবং ৫৬.০% ক্ষেত্রে শিক্ষকগণ মাঝে মাঝে শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করেন। ৮৪.৯% উত্তরদাতা বলেছেন শিক্ষকগণ শিক্ষার্থীদের কোনো খোঁজ খবর নেয় নি। ৩৯.৬% শিক্ষার্থী মন্তব্য করে যে নিজ বিদ্যালয়ের শিক্ষকের নিকট প্রাইভেট না পড়লে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শিক্ষার্থীদের দিয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজ করানো হয়। শিক্ষকরা নির্দিষ্ট গাইড বই কিনতে বাধ্য করেন। সন্তানের লেখাপড়ার খোঁজ খবর বা যতœ নেন ৬৬.০% অভিভাবক। বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির মিটিং-এ সকল সদস্য উপস্থিত থাকেন না।

৪০.৩% উত্তরদাতা জানান, বিদ্যালয়ে থেকে তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য ভালভাবে জানতে পেরেছেন। জরিপে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয়ে উত্তরদাতাদের সন্তুষ্টির মাত্রা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশুনার সার্বিক মান নিয়ে ৪০.০% অভিভাবক সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। শিক্ষকের আচরণের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ৪৬.০% উত্তরদাতা সন্তুষ্টির প্রকাশ করেছেন।


এই গবেষণায় যে অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামোগত সমস্যা উঠে এসেছে তা উত্তরণে সনাক কিছু সুপারিশমালা তুলে ধরে। এর মধ্যে স্থানীয় পর্যায়ে সমাধানযোগ্য সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে, শিক্ষার্থী ভর্তি, অনুপস্থিতির জরিমানা, বই বিতরণ, চারু-কারু, দপ্তরি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে বিধি- বহির্ভূতভাবে টাকা আদায় বন্ধ করা। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া কমাতে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে অভিভাবক ও ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্বুদ্ধকরণ নিয়মিত করা। উপবৃত্তির শিক্ষার্থী নির্বাচনে যতœবান হওয়া। অভিভাবক ও মা সমাবেশ অব্যাহত রাখা। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে স্যাটেলাইট তথ্য ও পরামর্শ ডেস্ক, লিফলেট ও স্টিকার বিতরণ, উপবৃত্তির বিভিন্ন তথ্য ইত্যাদি প্রচার অব্যাহত রাখা। এসএমসির সদস্যদের বিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করা।

শিক্ষকদের সময়মত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি ও ক্লাসে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবস্থান নিশ্চিত করাসহ পাঠদান পদ্ধতি ও উপকরণের ব্যবহার নিশ্চিত করা; এ ছাড়াও নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের কিছু সুপারিশ করা হয়েছে, যেমন; বিদ্যালয়ের নিয়মিত ও সহ-শিক্ষা কার্যক্রম এবং বিভিন্ন দিবস উদ্যাপন সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য সরকারি বরাদ্দ দেওয়া। এসএমসি সদস্য নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত এবং ন্যূনতম শিক্ষিত ব্যক্তিদের বিবেচনা করা বিধান করা।

বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষকদের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও পর্যাপ্ত টয়লেটের ব্যবস্থাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। শিক্ষার্থীদের জন্য গাইড বই প্রকাশে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে নিষেধাজ্ঞা ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

এটিএনবিডি